আমি সেই দিন হব শান্ত

প্রতীক হাসান ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল।

আতঙ্কের দৃষ্টিতে চারদিকে চোখ ফেরাল। তারপর কিছুক্ষণ বিছানার ওপর স্থির হয়ে বসে রইল। ঘরের মধ্যে সে একা। বিছানা থেকে নেমে লাইট জ¦ালানোর জন্য সে এগিয়ে গেল। লাইট অন করে আবার ঘরের চারদিকটা দেখল। না কেউ নেই। পুরোটাই স্বপ্ন। ঘুমের ঘোরে সে স্বপ্ন দেখেছে। ঘরের মধ্যে কেউ নেই। আর এতো রাতে কে আসবে তার ঘরে?

প্রতীক আবার বিছানায় গিয়ে বসে। মনে মনে ভাবে, নজরুলকে কেন স্বপ্ন দেখলাম? আমি কি তাকে খুব বেশি মনে করি? সেই কবে মারা গেছেন তিনি! আমি কী নজরুলকে নিয়ে খুব বেশি ভাবি? হয়তো অবচেতন মনে ভাবি। তার কবিতা আবৃত্তি করি। মনে তো করিই! কী অসাধারণ কবিতা! এক একটি শব্দ যেন বুলেট!

বল বীর-

বল উন্নত মম শির!

শির নেহারি আমারি,

নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!

প্রতীক স্বপ্নে দেখে কবি নজরুল নিজেই তার কাছে এসেছেন। তাকে বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। যাতে ভুলভাল আবৃত্তি না করে সেজন্য তিনি বারবার তাকে সতর্ক করছেন। কবি তাকে উদ্দেশ করে বললেন, শাহবাগে তুমি যে কবিতা আবৃত্তি কর তা দেশের মানুষ শুনছেন। মিডিয়ার মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ তুমি ঠিকঠাক কবিতা আবৃত্তি করছ না। এটা দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়েছে। তুমি ভালো করে শেখো। ঠিকঠাক উচ্চারণ করো। আমি যেভাবে আবৃত্তি করছি ঠিক সেভাবে আবৃত্তি করবে। একটুও যেন ভুল না হয়!

তারপর কবি উধাও হয়ে গেলেন। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর যেন এখনো দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কানের পর্দায় এসে আছড়ে পড়ছে। ব্যাপারটা তার কাছে বড় অদ্ভুত লাগছে। এটা কী করে সম্ভব! আমি শাহবাগে কবিতা আবৃত্তি করি সেটা কবি শুনতে পান! তার মানে, মৃত মানুষের আত্মা কি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে! প্রতিটি মৃত মানুষের আত্মাই কি এভাবে আবার পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়! আমার ঘরে কবি নজরুলকে যে দেখলাম, তার কবিতা আবৃত্তি শুনলাম; এটা কি শুধুই একটা স্বপ্ন! কী করে সম্ভব! আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আমি আর নিতে পারছি না!

প্রতীক হাসান কবি নজরুলের মতো বিদ্রোহী আবৃত্তি করার চেষ্টা করে। সে আগের মতো শুধু শুধু চিৎকার করে না, যেখানে দ্রোহ আছে সেখানে কণ্ঠস্বরের জোর দেয়। তিনি যেভাবে উচ্চারণ করেছেন, সেভাবে উচ্চারণ করার চেষ্টা করে। একবার দুইবার তিনবার করে আবৃত্তি করে। এখন তার মাথায় বিদ্রোহী ছাড়া আর কিছু নেই। প্রতিদিন সে বিদ্রোহী প্রাকটিস করে আর শাহবাগে গিয়ে আবৃত্তি করে। এই আবৃত্তি করে সে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। সে বোঝাতে চায়, সে সাম্যবাদী একটা মানুষ। মানবিক একটা মানুষ। কবি নজরুলের চেতনা বুকে ধারণ করে সে। এই চেতনা যার বুকে, তাকে কেউ উগ্রপন্থী বলে গালাগাল তো করবেই না; সন্দেহও করবে না।

শাহবাগে এমনিতেই কিছু মানুষ জুটে যায়। প্রতীক হাসান প্রতিদিন কিছু মানুষ নিয়ে শাহবাগে দাঁড়ায়। হাতে একটা হ্যান্ডমাইক। শুরুতে সে বক্তৃতা দেয়। তার বক্তৃতা দেওয়ার স্টাইল বেশ চমৎকার। মানুষ আকৃষ্ট হয় তার কথা শুনে। যা মনে আসে তাই বলে। কিন্তু এতো চমৎকার করে বলে, পথচারিরা একবার হলেও তার কথা শোনার জন্য একটু দাঁড়ায়। তার কথা বলার একটাই কারণ, কিছু লোক জড়ো করা। তারপর শুরু হয় তার আবৃত্তি। বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তি শুনলে কার না গায়ের লোম খাড়া হয়!

ওই পথে কিছু আবৃত্তি শিল্পী আসা-যাওয়া করে। তারা মুখে ভেংচি কেটে বলে, আবৃত্তির অ-ও জানে না, আবার বিদ্রোহী আবৃত্তি করছে! এই কবিতা আবৃত্তি করা কি অতো সোজা! মানুষকে বোকা বানিয়ে ফায়দা লোটার তাল।

এসব সমালোচনা প্রতীক হাসানের কানেও যায়। কিন্তু সে এসবে গা করে না। সে বলে, পাছে লোকে কিছু বলে। আমি তো আমাকে চিনি! লোকের কথায় আমি আবৃত্তি বন্ধ করে দেব? এটা হতে পারে না। প্রতিদিন কত লোক আমার আবৃত্তি শোনে। আমাকে ভালোবাসে। মানুষ ভাবে, আমি কতই না নজরুলপ্রেমী! সারাক্ষণ তার কবিতাই আবৃত্তি করে মানুষের চেতনাকে শানিত করি। গলাবাজি ছাড়া এই দেশে মানুষ কাউকে পাত্তা দেয়! যে যতবড় গলাবাজ সে ততবড় নেতা। তার কথাই মানুষ বেশি শোনে। সত্যমিথ্যা কয়জনে খতিয়ে দেখে!

প্রতীক হাসান কিছু পারুক আর না পারুক গলাবাজিতে ওস্তাদ। সারাক্ষণ চিৎকার করে কথা বলে। বড় বড় নেতাকে তুলোধুনা করে; গালমন্দ করে। কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। এতে সাধারণ মানুষের ধারনা জন্মে, ছেলেটাতো দুর্দান্ত সাহসী! একেবারে বাঘের বাচ্চা মনে হয়। ভুলভাল হলেও ওর বিদ্রোহী আবৃত্তি ঠিক আছে। অতো ত্রুটি ধরলে কী চলে! ও তো আর আবৃত্তি শিল্পী না; ও হচ্ছে নেতা। তরুণ বিপ্লবী নেতা।

কেউ কেউ অবশ্য এমন মন্তব্যও করেন, প্রতীক তো দেখছি কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলে না! ওর ব্যাকিংয়ে কে আছে? নিশ্চয়ই বড় কোনো দেশের সমর্থন আছে। কিন্তু এ রকম একটা ডানপন্থী অতি বিপ্লবীকে পরাশক্তি সমর্থন দেবে! এটা কী করে সম্ভব? ওরা তো দেখছি, উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলে! ওরা যে কখন কাকে সাপোর্ট দেয় বোঝা মুশকিল। ওপরে ওপরে দেখায়, ওরা সবচেয়ে বেশি মানবতাবাদী। মানবাধিকার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। পুরোটাই একটা ধোঁকাবাজি। নিজের দেশের মানবাধিকারের খবর নেই! অন্য দেশকে নিয়ে টানাটানি।

প্রতীক হাসান নিজেও জানে তাকে নিয়ে যেমন ইতিবাচক কথা মানুষ বলে; তেমনি অনেক নেতিবাচক কথাও মানুষ বলে। এ বিষয়ে প্রতীক হাসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সে প্রকাশ্যেই বলে, আমি তো ফেরেস্তা নই; আমি মানুষ। কথায় আছে না, ভালোমন্দে মানুষ; দোষেগুণে মানুষ। আমি তার বাইরে না। আমাকে নিয়ে সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক। সমালোচনা না হলে বরং মনে করতে হবে, আমি মরে গেছি।

সঙ্গে সঙ্গে তার সাঙ্গোপাঙ্গরা বলে ওঠে, ঠিক ঠিক!

এসব আতিপাতি নেতাদের আবার একটা গ্রুপ দাঁড়িয়েছে। এরা প্রতীককে ছাড়া কিছু বোঝে না। খেয়ে না খেয়ে সারাক্ষণ প্রতীক ভাইর পেছনে ছোটে। মাঝেমধ্যে স্লোগান দেয়, আমার ভাই তোমার ভাই, প্রতীক ভাই প্রতীক ভাই। প্রতীক ভাই তুমি এগিয়ে চল আমরা আছি তোমার সাথে।

প্রতীক অবশ্য তার সমর্থকদের ব্যাপারে দুই হাত খোলা। যখন যা টাকা হাতে আসে তা সমর্থকদের পেছনেই ব্যয় করে। ইদানীং অবশ্য তার টাকার ফ্লো কমে গেছে। সে

একটা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াত। সেখান থেকে ভালো পরিমাণে টাকা পেত। এখন সেটা বন্ধ। পড়াতে গেলে অনেক সময়

নষ্ট হয়। ওই ফাঁকে যদি আবার শাহবাগ হাতছাড়া হয়ে যায়! তাই সে শাহবাগ ছাড়ে না। যেন শাহবাগ রক্ষার এক অতন্দ্র প্রহরী।

প্রতীক হাসান আজ রাত করে বাসায় ফিরেছে। সে সাধারণত রাতে বাইরে থেকে খেয়ে আসে। আজ খায়নি। খেয়ালও ছিল না; বাসায় কোনো রান্না নেই। বাসায় আসার পর যখন ফ্রিজ খুলল, তখনই তার চৈতন্য হলো। কী আর করা। দুটি বিস্কুট আর এক গ্লাস পানি খেয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিন্তু তার পেটে ক্ষুধা। দুপুরেও কিছু খাওয়া হয়নি। ভেবেছিল রাতে ভরপেট খাবে। ভাবনা আর বাস্তবতার মাঝে যে বিস্তর ফারাক তা সে এখন বুঝতে পারছে।

প্রতীক হাসানের চোখে ঘুম নেই। সে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে ঘুমানোর প্রচেষ্টা চালায়। এ সময় তার মাথায় চেপে বসেন নজরুল। তিনি ইদানীং প্রতীক হাসানের কাছে আসছেন। বিদ্রোহী কবিতার ভুলভাল উচ্চারণ ঠিক করে দিচ্ছেন। নিজে আবৃত্তি করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আজও নজরুল এসেছেন। তিনি প্রতীককে উদ্দেশ করে বললেন, আজ তোমাকে কেউ কেউ খুব সমালোচনা করেছেন তাই না? তুমি ওসব নিয়ে চিন্তা করো না। কোনো রকম মন খারাপও করবে না। যে কিছু করে তাকে নিয়েই মানুষ সমালোচনা করে। শোন, তোমাকে আজ একটা কথা বলি। কলকাতার বনেদি কবিরা আমাকে কবিই মনে করতেন না। আমি যা লিখি তা নাকি কবিতাই হয় না। কবিগুরু আমাকে পছন্দ করতেন বলে তাকেও সমালোচনা করা হতো। তুমি তো শনিবারের চিঠি পত্রিকার নামই শোননি। সজনীকান্ত দাসের প্রধান পরিচালনায় কলকাতা থেকে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। এটি মূলত বিদ্রƒপাত্মক সাহিত্য পত্রিকা ছিল। এর প্রতিটি সংখ্যায় আমার বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা লেখা হতো। আমার কড়া সমালোচনা করা হতো। আমার কবিতার প্যারোডি করত। বিদ্রোহী কবিতাকে তারা কোনো কবিতাই মনে করেনি। সেই কবিতার প্যারোডি করেছে। এমন সমালোচনা করেছে যা আমাকে দারুণভাবে পীড়া দিয়েছে। সে সব সমালোচনা মুখবুজে সহ্য করেছি। অথচ এখন দেখ, আমার বিদ্রোহী কবিতা কিন্তু একশো বছর পার করেছে।

হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে প্রতীক হাসান। সে বলে ওঠে, তাই তো! তাই তো! বিদ্রোহী কবিতা কালজয়ী। আমি যেভাবে খুশি সেভাবে বিদ্রোহী কবিতা পাঠ করব। আমি আমার মনের ভাব ফুটিয়ে তুলব। বিদ্রোহী দিয়েই আমি মানুষের মন জয় করব। পুরো কবিতাটি এমনভাবে মুখস্ত করব যাতে কোথাও এতোটুকুও না আটকায়। তারপর সে মোবাইলে বিদ্রোহী লিখে সার্চ দেয়। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গড় গড় করে বিদ্রোহী পাঠ করতে থাকে।

দুই

গভীর রাত।

প্রতীক হাসান গভীর ঘুমে। ঘুমের ঘোরে সে আবারও নজরুলকে দেখে। সে দেখে, কবি নজরুল তার পাশে এসে বসেছেন। তাকে তিনি বললেন, আচ্ছা তুমি কি আমার একটা কবিতাই আবৃত্তি করবে? আর কোনো কবিতা তোমার পছন্দ হয় না? এখনকার সময়ে তো আমার ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। ওটা তুমি পড়েছ? না পড়লে পড়ে দেখ। তারপর ‘মানুষ’ কবিতাতেও কিন্তু সেই সাম্যের কথাই আমি বলেছি, যা এখনো প্রাসঙ্গিক। আমি কি একবার পড়ব? আচ্ছা অল্প করে আমি পড়ছি। পরে তুমি আমার বই দেখে নিয়ো।

গাহি সাম্যের গান –

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।

গাহি সাম্যের গান।

কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?

কন্ফুচিয়াস্? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!

বন্ধু, যা খুশি হও…

কী, ঠিক বলেছি না? এখনকার জন্য কবিতাটা প্রাসঙ্গিক না? এবার ‘মানুষ’ কবিতার প্রথম কয়েক লাইন পড়ছি। তুমি মন দিয়ে শুনবে। এর মর্মবাণী বুঝতে না পারলে উপলব্ধি করতে পারবে না।

গাহি সাম্যের গান –

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,

সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

কী বুঝলে? প্রাসঙ্গিক কিনা বলো! ভালো করে চিন্তা করে বলো। নাকি আরো পড়ব?

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় প্রতীক হাসানের। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চারদিকে তাকায়। কোথায় কবি! কবির কণ্ঠস্বর তার কানে এখনো বাজে। দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি শব্দ। সেই শব্দমালা প্রতীক হাসানের কানের পর্দায় আচড়ে পড়ছে। গভীর এক ঘোর তৈরি হয় প্রতীকের ভেতরে।

কবিকে খুঁজে বেড়ায় সে। কিন্তু কবি নেই! কবি তার মনকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে, প্রভাবিত করেছে। তার মাথায় নজরুলের কবিতা ছাড়া আর কিছু নেই। সে মনে মনে বলতে থাকে, গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।

প্রতীক হাসানের চোখে ঘুম নেই। তার চোখের সামনে নজরুলের চেহারাটা ভেসে ওঠে। তিনি যেন বলে ওঠেন, কি হে, এতো ছটফট কেন করছ? শান্ত হও। মনকে শান্ত করো। আমি যে কবিতাগুলো পড়লাম এগুলো মুখন্ত কর। কাল যেন আমি শাহবাগ চত্বরে তোমার কণ্ঠে আমার কবিতা শুনতে পাই। বিদ্রোহী তো অনেকবার আবৃত্তি করেছ; এবার মানুষ এবং সাম্যবাদী কবিতা আবৃত্তি করবে। মানুষের ভেতরে সাম্যবাদী চেতনা ঢুকিয়ে দিতে হবে। উগ্রবাদকে বিদায় জানাতে সাম্যবাদের চেয়ে বড় অস্ত্র আর নাই।

কথাগুলো ঘুরে ফিরে প্রতীকের মাথায় ঘুরপাক খায়। প্রতিটি শব্দ তীরের ফলার মতো তাকে বিদ্ধ করে, উতালপাতাল ঢেউ তোলে। সে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে। মোবাইল হাতে নিয়ে গুগলে সাম্যবাদী কবিতা সার্চ দিয়ে বের করে। তারপর পড়তে থাকে। মস্তিস্কের কোষে কোষে শব্দগুলোকে সাজাতে থাকে। যাতে কখনোই আর ভুলে না যায়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বারবার সে কবিতাটি পড়তে থাকে।

তিন

শাহবাগে প্রতীক হাসানকে লোকজন খুঁজছে। কিন্তু তার কোনো হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। কদিন ধরে সে শাহবাগে আসছে না। তাকে না পেয়ে একে অপরকে জিজ্ঞাসা করছে, তোমরা কেউ কি প্রতীককে দেখছ? ও কোথায় গেল? নাকি আবার গুম হয়ে গেল! এই দেশে যে গুম আর মব কালচার শুরু হয়েছে!

তাতে কোনো মানুষই আর নিরাপদ নয়। যে কেউ যে কোনো সময় গুম হয়ে যেতে পারে। আবার মবের মধ্যেও পড়ে যেতে পারে।

এসব আলোচনা পর্যালোচনার মধ্যেই একজন হাত মাইক নিয়ে বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে গেল। তার নাম রাকিব বলে সে নিজেকে পরিচয় দিল। সে বলল, আমাদের প্রতীক ভাইকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে কেউ গুম করে থাকতে পারে বলে আমরা ধারনা করছি।

খুঁজে পাচ্ছেন না মানে! আপনি কি তার বাসায় খোঁজ নিয়েছেন? জনৈক প্রশ্ন করল।

না। বাসায় তো খোঁজ নেওয়া হয়নি।

তাহলে কেন বলছেন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। না জেনে অপতথ্য ছড়াবেন না।

প্রতিদিন সে মানুষটা শাহবাগে আসে। এখানে না এলে যার ভাত হজম হয় না; সে কদিন আসছে না! এটা দুশ্চিন্তার বিষয় না?

হ্যাঁ দুশ্চিন্তার বিষয়। কিন্তু তার বাসায় আগে খোঁজ নিন। তারপর যা বলার বলুন।

রাকিব আর কথা না বাড়িয়ে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। আমার ভুল হয়ে গেছে।

শাহবাগ থেকে রাকিব রিকশা নিয়ে খিলগাঁর উদ্দেশে রওয়ানা হয়। কিন্তু তার কাছে প্রতীক হাসানের কোনো ঠিকানা নেই। শুধু সে জানে, রাকিব খিলগাঁয় থাকে। খিলগাঁর লোকজন যদি চেনে তাহলে হয়তো তার বাসা খুঁজে পাবে। না চিনলে তো আর খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

রাকিব মনে মনে বলে, প্রতীক ভাই আমাকে অল্পবিস্তর চেনে। তার কাছে আমার মোবাইল নাম্বার নেই। আমার কাছেও তার নাম্বার নেই। কিন্তু প্রথম পরিচয়ের দিন যদি মনে করে রাখতাম! তাহলে আজকের হয়রানিটা হতো না। আমি মানুষটা যে কেমন! আচ্ছা, প্রতীক ভাইকে যদি না পাই! আমার বাসায় ফিরতে ফিরতে তো অনেক রাত হয়ে যাবে। এখন সময়টা ভালো না! রাস্তাঘাটে পুলিশ খুব ঝামেলা করছে। যাকে তাকে ধরছে। রিকশাওয়ালার বাসা কোন দিকে?

দেখি তো জিজ্ঞাসা করে। রিকশাওয়ালা ভাই, আপনার বাসা কোন দিকে?

আমার বাসা আজিমপুর। কেন জানতে চাইলেন?

আজিমপুর কোথায়?

ছাপরা মসজিদের কাছে।

বলেন কী! আমার বাসাও তো আজিমপুরে। তাহলে তো ভালোই হলো। আপনি আমাকে ওখান থেকে আজিমপুর নিয়ে যাবেন।

আপনের দেরি হইব না?

না। আমি একজনের বাসা খুঁজব। না পেলে চলে যাব। আর পেলেও বেশি সময় অপেক্ষা করব না।

তাইলে নিয়া যাইতে পারি।

খুব ভালো হলো। আমি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম।

রিকশাওয়ালা হাসল। হ, দুশ্চিন্তা তো করারই কথা। দেশের যেই অবস্থা! কিছুই ভালো লাগে না। মনে হয় দেশ ছাইড়্যা চইল্যা যাই।

রিকশাওয়ালার কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে রাকিব। সে-ও মনে মনে ভাবে, আসলেই তো! দেশ কোন দিকে যাচ্ছে!

রাকিবকে চুপ থাকতে দেখে রিকশাওয়ালা তাকে উদ্দেশ করে বলে, ভাই আপনে যে কেছু কইলেন না? আমি যদি ভুল কিছু কইয়া থাকি তাও কন!

না। কথা ঠিক আছে। আমিও এই কথা নিয়েই ভাবছিলাম। আচ্ছা, একটু দাঁড়াও তো ভাই। একটু জিজ্ঞাসা করে নিই।

রিকশাওয়ালা একটা দোকানের সামনে দাঁড়াল। রাকিব দোকানদারের কাছে জানতে চাইল, প্রতীক হাসানের বাসা কোথায় বলতে পারবেন?

কোন প্রতীক হাসান?

শাহবাগে যে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে!

ওই বিদ্রোহী প্রতীক?

হ্যাঁ বিদ্রোহী প্রতীকই।

আমার হাতের দিকে তাকান। ওই যে রাস্তাটা দেখছেন? ওই রাস্তা দিয়া ডানদিকে গিয়া বাম দিকে যাইবেন। বুঝতে পারছেন?

হ ভাই পারছি।

যান তাইলে। উনি আপনার কী হন?

আমি তার একজন ভক্ত।

আচ্ছা আচ্ছা। আমিও ভাই তার একজন ভক্ত। এত্তোবড় কবিতা বিদ্রোহী কেমনে মুখস্ত করল আল্লাহই জানে।

রাকিব তার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে রিকশায় ওঠে। দোকানদারের দেখানো পথেই রিকশায় এগিয়ে যায়।

বাসার কাছে গিয়ে আবারও দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করে। দোকানদার তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। দরজা নক করতেই প্রতীকা হাসান এগিয়ে যায়। দরজা খুলে তাকাতেই রাকিবকে দেখে বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, আরে তুমি! আমি যদি ভুল না করি তুমি রাকিব!

জি। আসো আসো। কী ব্যাপার কও তো! কোনো সমস্যা?

রাকিব ঘরের ভেতরে যেতে যেতে বলে, ভাই আপনাদের কদিন ধরে শাহবাগে না দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ছি। তাই আপনার খোঁজে চলে এসেছি।

তোমার কাছে আমার ঠিকানা ছিল?

আপনি একদিন বলছিলেন, খিলগাঁ থাকেন।

হ্যাঁ। ঠিকানা তো দেইনি?

না। কিন্তু এই এলাকায় আপনাকে সবাই চেনে। কী নামে চেনে জানেন?

না তো!

ধারনা করেন তো?

উহু। পারছি না।

বিদ্রোহী প্রতীক।

তাই নাকি? সর্বনাশ!

সর্বনাশ কেন হবে? ঠিকই তো আছে। আপনার মতো বিদ্রোহী আবৃত্তি আর কয়জন করতে পারে?

আরে ধ্যাত! আমার কিছুই হয় না। আমি কবিতাটা মুখস্ত পারি। এইটুকু ছাড়া আর কিছু হয় না।

কি জানি ভাই! মানুষ কিন্তু আপনারটা নিছে।

নিলে ভালো। আচ্ছা, কী খাবে বলো?

কিচ্ছু না। আপনাকে শুধু দেখতে এলাম। আমরা তো ভাবছিলাম আবার কিডন্যাপ হলেন কি না?

না না! আমার মতো গরীব মানুষকে কেন কিডন্যাপ করবে?

করতে পারে না? আপনার একটা ফিল্ড তৈরি হইছে না? আপনি তো এখন আর ফেলনা না! জনপ্রিয়তাও একটা সম্পদ; জানেন তো! যাকগে, আপনি কাল যাইবেন তো শাহবাগে?

হ্যাঁ যাব।

তাইলে দেখে হবে। আমি এখন যাই। আমার বাসা আজিমপুরে। যাকে নিয়া আসছি তার বাসাও ওখানেই। ওর সঙ্গেই চলে যাব।

আচ্ছা আরেকটু বসো। তোমার কথা শুনি। শাহবাগের অবস্থা কী?

আপনি নাই। আপনি ছাড়া কি শাহবাগ জমে?

তাই নাকি? আরো দুইটা কবিতা মুখস্ত করছি। কাল যাব। নতুন কবিতা আবৃত্তি করব।

নতুন কবিতা? কার?

নজরুলের। সাম্যবাদী আর মানুষ।

ওহ! খুব ভালো হবে। দুটি কবিতাই অসাধারণ। আসি এবার। কাল দেখা হবে।

নিশ্চয়ই।

রাকিবকে বিদায় দিয়ে আবার ঘরে ফেরে প্রতীক। তারপর সে কবিতাগুলো আওড়াতে থাকে। কাল সে তিনটি কবিতা মাথায় নিয়ে শাহবাগে যাবে। পরপর তিনটি কবিতাই সে আবৃত্তি করবে। মানুষকে সচেতন করার জন্য এর চেয়ে ভালো মেডিসিন আর নেই।

চার

শান্ত নদীর মতো বেশ কিছুদিন শাহবাগ শান্তই ছিল। হঠাৎ করেই যেন অশান্ত হয়ে উঠল। চারদিক থেকে উত্তেজিত স্লোগান ভেসে আসছে। আমার ভাইয়ের কিছু হলে, জ¦লবে আগুন ঘরে ঘরে। আমি কে তুমি কে প্রতীক হাসান, প্রতীক হাসান। স্লোগানের তালে তালে হাততালিতে মুখরিত শাহবাগ। চারদিক থেকে মানুষ আসছে শাহবাগের দিকে।

প্রতীক হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে একপা দুইপা করে এগিয়ে আসছে শাহবাগের দিকে। সে জানে না শাহবাগে কী ঘটছে। সে মনে মনে ভাবে, আজ শাহবাগে নজরুলের সাম্যবাদী ও মানুষ কবিতা দুটি আবৃত্তি করবে। সে মাথার মধ্যে খুব ভালো করে গেঁথে নিয়েছে কবিতা দুটি। এরমধ্যেই সে কাছাকাছি চলে আসে। মানুষের সোরগোল তার কানে বাজে। কী ঘটনা! কী হচ্ছে শাহবাগে! নতুন কোনো ঘটনা ঘটেছে নাকি!

প্রতীক হাসান দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় শাহবাগ।

ততক্ষণে শাহবাগ যেন জনসমুদ্র। সবার কণ্ঠে এক স্লোগান তুমি কে আমি কে প্রতীক হাসান প্রতীক হাসান। বিস্ময়ের সঙ্গে মানুষগুলোর দিকে তাকায় সে। তারপর ধীরে ধীরে সভামঞ্চের ওপর গিয়ে দাঁড়ায়। তাকে দেখে সবাই আরো জোরে স্লোগান ধরে, তুমি কে আমি কে, প্রতীক হাসান প্রতীক হাসান।

প্রতীক হাসান আর অপেক্ষা না করে মাইকের সামনে দাঁড়ায়। ভাইয়েরা আমার! আমি হারিয়ে যাইনি। প্রতীক হাসান হারাবে না। হারানো যাবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থাকব। আপনাদের কাছে এ আমার অঙ্গীকার। তারপর সে সাম্যবাদী কবিতা আবৃত্তি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মাথায় বিদ্রোহী কবিতা ছাড়া আর কিছুই নেই। মানুষ কবিতাও সে পুরোপুরি ভুলে গেছে। বিদ্রোহীর শব্দগুলো বারবার তার মুখের সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বিদ্রোহী কবিতার প্রতিটি শব্দ তীরের ফলার মতো বের হতে থাকে তার মুখ থেকে।

শাহবাগ চত্বরে লাখো মানুষ। অথচ পিনপতন নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। কোনো স্লোগানও দিচ্ছে না। তারা সবাই গভীর মনোযোগে প্রতীকের বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তি শুনছে। সে কী শক্তি, সে কী আকর্ষণ!

‘যবে উৎপীড়নের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে

ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-

বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত

আমি সেই দিন হবো শান্ত!’