বাঙালি মুসলমানের প্রথম বিশিষ্ট সাহিত্য-সংগঠন

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি : সাহিত্যকর্ম ও সমাজচিন্তা

রবিউল হোসেন – কথাপ্রকাশ

– ঢাকা, ২০২৫ – ৬০০ টাকা।

১৮৯৯ সালে কলকাতায় ‘বঙ্গীয় সাহিত্য বিষয়িনী মুসলমান সভা’ নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলেও এর মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। এর আগে এটি ছাড়া মুসলমান কর্তৃক আরো দু-চারটি সমিতি বা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চা কোনোটিরই উদ্দেশ্য ছিল না, যার প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় ১৯১১ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র প্রচেষ্টায়। কিন্তু মূলত আর্থিক ও আরো নানা কারণে তখন-তখনই সমিতির পক্ষে পত্রিকা প্রকাশ সম্ভব হয়নি। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে সাত বছর। ১৯১৮ সালের জুন মাসে সমিতি তার মুখপত্ররূপে উন্নত মানসম্পন্ন ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা প্রকাশ করতে সমর্থ হয়। বৈশাখ ১৩২৫ চিহ্নিত প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লা ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (তিনি ভোলা জেলার অধিবাসী ছিলেন); পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮০, মুদ্রণ সংখ্যা ১০০০, দাম ছয় আনা।

মুসলমানদের সর্বাঙ্গীণ দুর্দশা ও তা থেকে মুক্তির প্রয়াস বোঝানোর প্রয়োজনে ‘সাহিত্য-সমিতি’ ও এর মুখপত্রের ইতিহাস সংক্ষেপে হলেও এই আলোচনার স্বার্থে বলা দরকার। ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’-এর সদস্য সংখ্যা যে-সময়ে হাজারেরও বেশি, তাদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়জন। মুহম্মদ শহীদুল্লা জানিয়েছেন, সাহিত্য পরিষদে হিন্দু-মুসলমানে কোনো ভেদ না থাকলেও সাহিত্যিক দারিদ্র্যের কারণে বড়লোকের ঘরে গরিব আত্মীয়ের মতো পরিষদের সভায় তাঁদের যোগ দিতে হতো। তাছাড়া বিশেষভাবে মুসলমান সমাজের জন্য যা তাঁরা করতে চান, সেটা সাহিত্য পরিষদের দ্বারা সম্ভব হবে না। তাঁদের মনে হয়, পরিষদের সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্ছেদ না করেও মুসলমানদের একটি নিজস্ব সাহিত্য-সমিতি থাকা দরকার। সেই আকাক্সক্ষা থেকেই জন্ম নেয় উদার ও অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি।

সাতচল্লিশের দেশভাগ পর্যন্ত ৩৬ বছরের জীবনকালে সমিতি সাতটি সাহিত্য সম্মেলন, একটি ঈদ সম্মেলন ও রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান করতে সমর্থ হয়। ১৯১৮ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে ‘সাহিত্য-পত্রিকা’র ২২টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের রচনায় পত্রিকাটি উচ্চমান অর্জন করে। পরে ১৯২৭ সালে সমিতি কিছুটা উজ্জীবিত হয়ে উঠলে বছরের শেষদিকে প্রকাশ পায় এর দ্বিতীয় মুখপত্র মাসিক সাহিত্যিক। এর আয়ুষ্কাল ছিল এক বছর। ত্রৈমাসিকের মতো অতটা না হলেও এটিও মানসম্পন্ন ছিল। কেবল বাঙালি মুসলমানের নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলার সামাজিক ইতিহাসে সাহিত্য-সমিতির কর্মকাণ্ডের একটি মর্যাদাশীল স্থান আছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে রবিউল হোসেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি : সাহিত্যকর্ম ও সমাজচিন্তা নামে একটি গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন।

বইটিতে মূল অধ্যায় পাঁচটি। সেগুলোর শিরোনাম আগে দেখে নেওয়া যাক : ১. বাঙালি মুসলমানের

সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি, ২. বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির যত কর্মকাণ্ড, ৩. বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার অবদান, ৪. সাহিত্যিক পত্রিকার ভূমিকা এবং ৫. বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মিলন-এর সাহিত্যিক-সামাজিক প্রভাব।

ইতিহাসের কোনো বিশিষ্ট ঘটনাই বোধকরি আকস্মিকভাবে ঘটে না, তার একটা ভিত্তি বা পরম্পরা থাকে। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র প্রতিষ্ঠাও তারই একটা দৃষ্টান্ত। সমিতি প্রতিষ্ঠার বছরে এবং তার আগে কলকাতা ও মফস্বলের কোনো কোনো জেলায় কয়েকটি মুসলিম-সংগঠন গড়ে উঠলেও চারিত্র্য ও ক্রিয়াশীলতায়

সাহিত্য-সমিতির সঙ্গে সেগুলোর তুলনা চলে না। লেখক সংক্ষেপে এসব সংগঠনের পরিচয় দেওয়ার পর ১৯১১ সালের সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখের সেই বিশেষ দিনটির কথা বলেছেন, যেদিন কিছু উৎসাহী তরুণ ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কলকাতার ৯নং অ্যান্টনি বাগানে ‘করিম বক্স ব্রাদার্স’ দফতরিখানার মালিক আবদুর রহমানের প্রশস্ত বৈঠকখানায় এক সভায় মিলিত হয়েছিলেন। সেই সভাতেই জন্মলাভ করে মুসলমানদের নিজস্ব সম্ভাবনাময় সাহিত্য সংগঠন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি; সভাপতি নির্বাচিত হন স্কুলসমূহের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক আবদুল করিম, সম্পাদক মুহম্মদ শহীদুল্লা।

প্রধানত আর্থিক কারণে দীর্ঘকাল সমিতির কোনো কার্যালয়ের ব্যবস্থা করা যায়নি, যদিও সুবিধা-অসুবিধার মধ্য দিয়ে সমিতির কার্যক্রম চলছিল। তার প্রমাণ প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় ২৯নং মির্জাপুর স্ট্রিটে (বর্তমানে সূর্য সেন স্ট্রিট) অবস্থিত চৌধুরী মোহাম্মদ নায়েকের নামাঙ্কিত লায়েক জুবিলি ইনস্টিটিউশনে সমিতির প্রথম বার্ষিক অধিবেশন ও একই সঙ্গে প্রথম ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মিলন’ একিন উদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য বার্ষিক অধিবেশন ও সাহিত্য সম্মেলনের ভিন্নতা সম্পর্কে এখানে বলে নেওয়া ভালো। সমিতির নিয়মে বার্ষিক অধিবেশনে সদস্য ছাড়া আর কেউ যোগ দিতে পারতেন না। আসলে এ ছিল বার্ষিক সভা। অন্যদিকে সাহিত্য সম্মেলনের পরিসর ছিল উন্মুক্ত।

১৯১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ের পর একাধিক কারণে সমিতি যথেষ্ট গতিমান হয়। তার প্রকাশ লক্ষ করা যায় ২৭শে ডিসেম্বরে কলকাতা মাদ্রাসাসংলগ্ন মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে মহাসমারোহে দ্বিতীয় সাহিত্য সম্মেলন উদ্যাপনে। ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে সমিতির স্থায়ী কার্যালয় ও পাঠাগার স্থাপনের জন্য ৪৭/২ মির্জাপুর স্ট্রিটে একটি হল ভাড়া নেওয়া হয়। পরের মাসে সিদ্ধান্ত হয় ত্রৈমাসিক সাহিত্য-পত্রিকা প্রকাশের। কাজের পরিসর বেড়ে যাওয়ায় মির্জাপুর স্ট্রিটের স্বল্পায়তন হলঘরে আর চলছিল না। ফলে ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩২নং কলেজ স্ট্রিটের একটি সুপরিসর বাড়ির দ্বিতীয়তলায় সমিতির কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়। এটি সুবিদিত যে, বাংলার মুসলিম সমাজ-জীবনে ও সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে এই বাড়িটি ঐতিহাসিক মর্যাদা পেয়েছে।

বোঝা যায়, এই সময় সমিতির জীবনে জোয়ার এসেছিল। কিন্তু ১৯২১ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে শুরু হয় ভাটার টান। ঢাকায় নবপ্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সেক্রেটারি নিযুক্ত হয়ে কাজী ইমদাদুল হক মে মাসে কলকাতা ত্যাগ করেন। পরের মাসের গোড়ায় শহীদুল্লাও ঢাকা চলে যান বিশ^বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার জন্য। কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের সংকল্প নিয়ে মুজফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলামও সমিতির আস্তানা ছেড়েছিলেন। সম্ভবত ১৯২২-২৩ এই দু-বছরের বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ায় মালিক উচ্ছেদের মামলা করেন। ডিক্রি পেয়ে সমিতির সমস্ত আসবাব ও বইপত্র রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়।

যাবতীয় সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা উজিয়ে নভেম্বর ১৯২৩ পর্যন্ত কীভাবে সাহিত্য-পত্রিকার প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল, ঈদ সম্মেলন ও রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান ছাড়া ১৯২৮ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে চতুর্থ থেকে সপ্তম চারটি সাহিত্য-সম্মেলনের ব্যবস্থা করা গিয়েছিল, রাস্তায় ফেলে-দেওয়া আসবাব ও বইপত্র উদ্ধার করে এয়াকুব আলী চৌধুরী ৪৩নং মির্জাপুর স্ট্রিটের একটা ভাড়া-করা ঘরে রাখার ব্যবস্থা করে সমিতিকে বাঁচিয়ে তোলেন এবং তার দ্বিতীয় মুখপত্র মাসিক সাহিত্যিক-এর প্রকাশ সম্ভব হয় ইত্যাদি সমিতি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় প্রচুর তথ্য-উপাত্ত ও বিবরণ-বিশ্লেষণের মাধ্যমে আলোচ্য বইয়ে রবিউল হোসেন আমাদের জানিয়েছেন।

এ-ধরনের কাজের ইতিহাসগত মূল্য অপরিসীম। সেজন্য প্রভূত শ্রম দিতে হয়। লেখক তা দিয়েছেনও। কিন্তু কিছু তথ্যভ্রান্তি ও লেখকের অসচেতনতা মনোকষ্টের কারণ হয়েছে। পরিসরের দিকে লক্ষ রেখে সংক্ষেপে দু-চারটি দৃষ্টান্ত দিই। লেখক ১৪ পৃষ্ঠায় প্রথম বাংলা সংবাদপত্রের নাম বলেছেন বাংলা গেজেট, অথচ ১২৪ পৃষ্ঠায় জন ক্লার্ক মার্শম্যান-সম্পাদিত দিগদর্শন-এর নাম (এপ্রিল ১৮১৮) বলা হয়েছে। পরের তথ্যটিই সঠিক। আর

বাঙালি-সম্পাদিত প্রথম সংবাদপত্র বাংলা গেজেট নয়, বাঙ্গাল গেজেটি, সম্পাদক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য, প্রকাশকাল ১৮১৮। যে-সভায় সাহিত্য-সমিতি গঠনের সিদ্ধান্ত হয় তাতে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সভাপতিত্ব করেছিলেন বলে লেখক জানিয়েছেন। এটি মারাত্মক ভুল। মারাত্মক বলছি এ-কারণে যে, এই ভুল আরো একাধিক স্থানে করা হয়েছে। যেন ধরে নেওয়া হয়েছে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম আবদুল করিম হলেই তিনি চট্টগ্রামের সাহিত্যবিশারদ হন। যিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি ছিলেন স্কুলসমূহের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক। কলকাতাতেই থাকতেন।

সাহিত্য-সমিতিতে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। লেখক যে তাঁর পরিচয় জানেন না, তা নয়। ১৯১৭-১৮ সালের কার্যনির্বাহক কমিটির নামের তালিকায় সভাপতি হিসেবে চাকুরিগত পরিচিতিসহ আবদুল করিমের নাম আছে

(পৃ ২৯)। তবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সাহিত্য-সম্মিলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু এখানেও লেখকের অসচেতনতার স্বাক্ষর রয়েছে। বলেছেন, মূল সভাপতি ও অভ্যর্থনা-সভাপতির ভাষণ মুদ্রিত হয়েছিল সাহিত্য-পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম ও চতুর্থ সংখ্যায়। পরের বাক্যে রয়েছে প্রথম সংখ্যাটির নামকরণ করা হয় ‘চট্টগ্রাম-সাহিত্য-সম্মিলন-সংখ্যা’ (পৃ ৫৯)।

সাহিত্য-পত্রিকার প্রথম সংখ্যার মুদ্রণকাল জুন ১৯১৮। এ-বছরের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত

সাহিত্য-সম্মেলনের বিষয়াদি তাহলে প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয় কি করে? আসলে তা ছাপা হয় চতুর্থ সংখ্যায়। অধিক আর কিছু বোধকরি না বললেও চলে।

এসব ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও আলোচ্য বইটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বাঙালি মুসলমানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটা গৌরবজনক অধ্যায়কে রবিউল হোসেনই প্রথম সবিস্তার তুলে এনেছেন। এর আগে

সাহিত্য-পত্রিকার নির্বাচিত সংকলন প্রকাশ করেছেন সেরা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা সংগ্রহ নামে (অঙ্কুর প্রকাশনী ২০১৯)। এই দুটি বই সম্মিলিতভাবে বাঙালি মুসলমানের প্রথম বিশিষ্ট সাহিত্য সংগঠন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি ও এর দুটি মুখপত্রের আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনার যোগ্য।