কী রে, কনে গিছিলি ফাহাদ?
– রাজেদের বাড়িতি গিইছিলাম।
– কী অত্তি গিইছিলি সিয়ানে?
– সিয়ানে মচ্ছব ছেল। খেইয়ে-দেইয়ে রওনা দিলাম।
– তা কী খাওয়ালো?
– অনেক অয়োজন ছেলো। ডাল, ভাজি, নাভ্রা, তরকারি, তেঁতুলির অম্বল, পায়েস; কত কিছু।
– তা ভালোই হলো খাওয়া-দাওয়া, নাকি?
– হয়। তো কিছুদূর আলি হেলিকাপ্টারডা গড়বড় কইরছে। দ্যাহো দি বিশুদা, কী অলো? ইট্টু পাম্প লাগবি মোনে অয়।
– দে দেহি। ই তো টায়ার ফুটো হইয়ে গিইছে দেখতি পাতিছি। দাঁড়াও দি নি, সুপার গুলু দিয়া লাগাই দি।
নড়াইল বাজারের কাছে রাস্তার পাশে বিশাল একটা পুরনো মান্দার গাছ ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গায়ে গোদের মতো থোক
থোক টিউমার যেন। ইয়া বড় বড় কাঁটা। শীতকালে গাছটা ন্যাড়া হয়ে যায়। আবার বসন্তের শুরুতে কচিকচি পাতা গজায়। সবুজে সবুজে ভরে যায় ডালপালা। আর গোটা গাছটা লালে লাল হয়ে যায় ফুলে। কী যে সুন্দর লাগে! স্বর্গের পারিজাত যেন। এর গোড়ায় বিশুদার গ্যারেজ। তার প্রকৃত নাম যে বিশ্বজিৎ, তা কেউ জানে না। সে নিজেও ভুলে গেছে কি না সন্দেহ! কবে যেন অব্যবহৃত হতে হতে মরচে পড়ে গেছে নামের গায়ে। বিশু নামটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এখন। গ্যারেজ তো নয়; সাইকেল, রিকশা, ফুটবল সারাইয়ের দোকান। সাইকেল বা
রিকশা-ভ্যানে পাম্প করার দোকান। বাঁশের বেড়া দেওয়া একচালা একটা আস্তানা। সামনে চেরাই কাঠের তক্তা দিয়ে একটা ঝাঁপ। শেকল দিয়ে তালাবন্ধ থাকে। কিন্তু বিশুদা তাকে গ্যারেজ বলে। অন্য লোকজনও এখন গ্যারেজই বলে থাকে। মান্দার গাছের সঙ্গে লাগানো কালো একটা টিনের প্লেটের ওপর সাদা কালি দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড – ‘বিশুদার গ্যারেজ’।
সাইকেল-রিকশা সারাইয়ের কাজ করলে কী হবে, কথাবার্তা, চাল-চলন, পোশাক-আশাকে বিশুদা ফিটফাট। মাথার চুল লম্বা।
গোঁফ-দাড়িও বড় বড়। গায়ের রং ফর্সা। দরবেশের মতো চেহারা। গায়ে হাফ শার্ট, পরনে সাদা ধুতি। চেষ্টা করে মার্জিত বাংলায় কথা বলতে, কিন্তু পারে না। মুখ ফসকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে যায় নড়াইলের আঞ্চলিক বাংলা। বিশুদার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো কিছু নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই, ভ্রুক্ষেপও নেই। প্রতিদিন যা পায়, তাই দিয়ে বাজার করে। কম হলেও চলে, বেশি হলেও চলে। যেদিন যা পায়, সেদিন তা শেষ করে ফেলে। বলা যায়, দিন আনে দিন খায়। হ্যান্ড টু মাউথ। কিন্তু সে নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা বা মাথাব্যথা নেই। কারো রিকশায় পাম্প লাগলে বা নষ্ট হলে সারাই করে যে যা দেয়, তাই নেয়। কখনো কারো কাছে চেয়ে দাম রাখে না। ছাত্রদের কাছ থেকে কোনো টাকা রাখতে চায় না সাইকেল ঠিক করলে, কিংবা পাম্প করলে। তাদের কাছ থেকে কোনো পয়সা নেয় না। বিনে পয়সায় সারাই করে দেয়। ছাত্রদের খুব ভালোবাসে বিশুদা। পকেটের টাকা খরচ করে ছাত্রদের চানাচুর, আইসক্রিম, লজেন্স ইত্যাদি খাওয়ায়। তারাও খুব পছন্দ করে বিশুদাকে। ছাত্রদের কাছে বিশুদা ‘আইডল’।
সংসারে মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ নেই। বিয়েথাও করেনি। ঝাড়া হাত-পা।
বছরের পর বছর বিশুদা এই একই কাজ করে। তার যেন কোনো ক্লান্তি নেই। বিশ্রাম নেই। তবে একটা বিষয়ে তার খুব আগ্রহ ছিল – যাত্রাগান। কোথাও যাত্রাপালা থাকলে বিশুদা সেখানে যাবেই। সন্ধের আগেই গ্যারেজ বন্ধ। এই বিশেষ দিনগুলোতে বিশুদাকে পাওয়া যেত না। একই যাত্রাপালা তার কয়েকবার দেখা। প্রতিবারই কাহিনি তার কাছে নতুন লাগে। অনেক ডায়ালগ মুখস্থও। সাইকেল সারাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রিয় দু-একটা ডায়ালগ শুনিয়েও দেয় ছাত্রদের – ‘যদি সত্য জেনে থাকো, যদি জেনে থাকো তোমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য, তাহলে এসো ভাইসব, আরো একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি, পলাশীর প্রান্তরে যে রত্ন হেলায় হারিয়ে এসেছি,
বঙ্গ-জননীর কনক-কিরীটে আরো একবার তা পরিয়ে দিতে পারি কি না। … আর হলো না, আর হলো না, শেষ চেষ্টা হলো না। সুখে থাকো ভাইসব। হতভাগ্য সিরাজের বক্ষরক্তে বাংলার সব কালিমা ধুয়ে-মুছে যাক। আঃ …।’ তখন তার চোখ-মুখের ভাবই পাল্টে যায়।
বিশুদা সবার প্রিয় পাত্র, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের কাছে। সদাশিব মানুষ। এমন সাদাসিধে সদাহাস্যময় রসিক মানুষ খুব কম দেখা যায়। আর ভুলভাল যা হোক কণ্ঠে সবসময় হিন্দি-বাংলা গান বাজে পানের দোকানের মতো। গান যেন তার প্রাণ।
এহেন বিশুদা হঠাৎ একদিন উধাও। নেই। কোথাও নেই। কেউ তার কোনো খোঁজও জানে না। সেই সাইকেল গ্যারেজ তেমনি পড়ে আছে – বন্ধ। দিন মাস বছর যায়। বিশুদার কোনো খোঁজ নেই। মনের কষ্ট মনেই পুষে রাখে তার সাগরেদরা। বিশুদার দেখা নেই। অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। বিশুদা লাপাত্তা। নানা জন নানা কথা বলে। কিন্তু ঠিক তথ্য কেউ দিতে পারে না। কেউ বলে, নদীতে ডুবে মারা গেছে। কেউ বলে, কুমিরের পেটে গেছে। কেউ বলে, সন্ন্যাসী হয়ে গেছে। সংসারে আর কেউ না থাকায় কেউ তার খোঁজও করে না। কেউ বলে, নকশাল করতো। স্বদেশি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল। কেউ আবার বলে, সর্বহারা করতো। কেউ কেউ বলে, ডাকাতির আসামি, এক রাতে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে, জেলে পুরে দিয়েছে। কেউ টাটকা খবর বলে, নোয়াপাড়ার বাগদা গ্রামে একটা খুন হয়েছিল। বিশুই খুনি। মার্ডার কেসের আসামি। পলাতক। নানারকম জনশ্রুতি বিশুদাকে নিয়ে। কিন্তু কোনোটার কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। সবই উড়ো খবর। প্রকৃত খবর কেউই দিতে পারে না। প্রকৃত খবর বিশুদা লাপাত্তা, এটাই সত্য। কিন্তু লোকে যা-ই বলুক, তার শিষ্যরা এর কোনোটাই বিশ্বাস করে না। তারা জানে, বিশুদা নির্দোষ, তার মতো ভালো মানুষ হয় না। বিশুদার পক্ষে কোনো খারাপ কাজ করা সম্ভব নয়। তার সাগরেদরা সব কথা হজম করে যায়। আর মনে মনে কষ্ট জমা করে রাখে। বিশুদাকে হারানোর কষ্ট, না পাওয়ার কষ্ট।
বছর দুই বাদে একদিন হঠাৎ বিশুদা এসে হাজির। এবার ঠিক আগের মতো নয়। সাধু-সন্ত গোছের চেহারা। গোঁফ-দাড়ি আরো বড়। এবারে কাঁচা-পাকা। বলা নেই, কওয়া নেই, বিশুদা লাপাত্তা; বলা নেই, কওয়া নেই, বিশুদা হাজির। আবার গ্যারেজ চালু হলো। আগের মতো নয় যেন। অনেক কিছুতে একটা ফাটল ধরেছে। কোথায় যেন একটা পার্থক্য আছে। আগের বিশুদার মধ্যে একটা প্রাণচাঞ্চল্য ছিল। এখন ধীরস্থির। কিছুটা গম্ভীরও বটে। তবে মুখের সেই হাসিখুশি ভাবটা রয়ে গেছে। শুধু চাল-চলনে কেমন একটা গাম্ভীর্য। মাঝেমধ্যেই দেখা যায় হাতে কাজ না থাকলে আসন গেঁড়ে চোখ বুঁজে ধ্যান করে। বিশুদা কি সাধু হয়ে গেল নাকি? তার মধ্যে সাধু সাধু গোছের একটা ভাব জন্মেছে। কিছুটা তান্ত্রিক গোছের। কপালে কাপালিকদের মতো ঊর্ধ্বমুখী সিঁদুরের রেখা আঁকে। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। বিশুদা নাকি কামরূপ কামাখ্যা চলে গিয়েছিল। সেখানে যোগ-অভ্যাস করেছে। মাথা নিচের দিকে দিয়ে পা ওপরের দিকে করে নাকি কঠোর তপস্যা করেছে। তন্ত্রমন্ত্র শিখেছে।
ফাহাদরা বিশুদাকে জিজ্ঞেস করে তার অন্তর্ধান হওয়ার বিষয়ে। কোনো সদুত্তর দেয় না। রহস্যময় মিটিমিটি হাসে। ভাবখানা এই – গূঢ় কোনো রহস্য আছে, তা বলা যাবে না। বলা যায় না। বললে ‘সর্বনাশ হয়ে যাবে’ গোছের একটা ভাব। তবে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে তার আচরণে। ধীর-স্থির শান্ত-সৌম্য ভাব। পোশাকেও নতুনত্ব। গেরুয়া রঙের কাপড়। হাতে পিতলের বালা। সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী ভাব। এক বিকেলে বিশুদাকে একা পেয়ে ফাহাদ জিজ্ঞেস করলো,
– তুমি নাকি কামরূপ কামাখ্যায় গেইছিলে বিশুদা? এট্টু ঠিক কইরে কওদিনি?
– হ, গিইছিলাম তো? দুই বছর সাধনা কইরেছি। কঠিন সাধনা।
– এট্টু খুইলে কও তো? কী খেইতে, কী কইরতে? জানতি ইচ্ছে অরে।
– ওদের দেশের খাদ্যখানা খেতাম। সাধনা করতাম। ধ্যান। তন্ত্রমন্ত্রের দেশ।
– শুনতি পাওয়া যায় যে, কোনো পুরুষ মানুষ গেলি ওখান থিইকা নাকি আর ফেরত আসতি পারে না? তাদের ছাগল ভেড়া বানিয়ে রেইখে দেয়? ওটা নাকি নারীদের দেশ? আরো আরো কত কী!
– না, না; ওসব ঠিক না। তাইলে আমি ফিইরা এলাম কী কইরে?
– তা তো দেখতিছি? এট্টু খুইলে বলো না?
– সব কি আর বলা যায়? তবে …
তবে বলে রহস্যময় একটা হাসি টাঙিয়ে রাখে ঠোঁটে। মনে হয় মেঘলা দিনের রোদে একখানা গামছা উঠোনে শুকোতে দিয়েছে। কিন্তু কিছু বলে না। তবে বলেই দাঁড়ি টানে কথায়। বিশুদা ওদের কত জ্ঞান দেয়, কত উপদেশ দেয়। ছাত্রদের কাছে দিন দিন সে রহস্যময় হয়ে উঠেছে। এই রহস্য ছেলেপেলেদের মনে হালকা ভয়েরও উদ্রেক করে। তাদের বিশ্বাস, না জানি কী তন্ত্রমন্ত্র শিখে এসেছে। কী না কী করে বসে? স্নানের নিয়ম শেখায়,
– তোরা সিনান করার নিয়ম জানিস? নদীতে ঝপ্ কইরে লাফ দিয়ে পইড়ে ডুব দিয়ে উঠিস। ইটা কোনো সিস্টেম না। আগে ইট্টু সর্ষের তেল বাঁ হাতের তালুতে নিবি। ডান হাতের তর্জনীর মাথায় লাগেইয়ে দুই নাকে দিবি। তারপর নাভিতে ইট্টু তেল লাগাতি হবি। তারপর হাতের তালুতে ইট্টু তেল নিইয়্যা ঠিক মাথার মদ্যিখানে ঠেইসে ধরবি। এরপর ধীইরে ধীইরে জলে নেইমে আগেই ভুস্ কইরে ডুব মারবি নে। ইট্টু জল হাতে তুইলে আগে মাথার তালুতে দিবি। তারপর আঙুল ভিজিয়ে দুই কানে জল দিবি। শেষে বুকে। এমনি কইরে শরীরটার ওম ভাঙাবি। তারপর সূর্যের দিকে মুখ কইরে জোড় হাতে সূর্য প্রণাম করবি। সূর্য হতিছে সকল শক্তির মূল। আদিম মানুষ আগে সূর্যের উপাসনা করতো। সূর্য উপাসক ছিল। কয়েক মিনিট পরে ডুব দিবি। এইতে কইরে শরীরে ঠান্ডা লাগবি নে। আর কোনো অসুখ-বিসুখও হবি নে। কোনো তাড়াহুড়ো করবি নে। জীবনটা কি তাড়াহুড়ো করার বিষয়? ধৈর্য ধরার বিষয়। অপেক্ষা করার বিষয়। সবুরে মেওয়া ফলে।
শীত গ্রীষ্ম বর্ষা – তা সে যে ঋতুই হোক বিশুদা নদীতে নেমেই স্নান করে। তার কোনো শীত নেই, কাল নেই। জলের তলে ডুব দিয়ে হারিয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর শুশুকের মতো ভুস্ করে জেগে ওঠে। বিশুদা একবার বাজি ধরে আধাঘণ্টা ছিল জলের তলে। সবাই তো তাজ্জব বনে গেছিল। কথা ছিল, সে যদি আধাঘণ্টা জলের তলে ডুবে না থাকতে পারে, তবে সেখানে উপস্থিত সকলকে পেটচুক্তি মিষ্টি খাওয়াবে। আর যদি সফল হয়, তবে মুদির দোকানদার হারাধন ফলিয়া সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবে। বিশুদা আধাঘণ্টারও বেশি জলের তলে ছিল ডুব দিয়ে। নদীর পাড়ে বড় ভিড় জমে গেছিল। ডুব দিলো, আর ওঠে না তো ওঠেই না। নদীতে শুশুক ডোবে শুশুক ওঠে, বিশুদা আর ওঠে না। অনেকে ভেবেছিল, মারা গেছে বোধ হয়। ফাহাদের প্রায় কান্না পেয়ে গেছিল। বিশুদা মরেটরে গেল নাকি, ভেবেছিল। তারপর যখন জাগল, তখন সে কী তুমুল করতালি? সবাই বিশুদাকে ঘিরে ধরেছিল। কত প্রশংসা, কত কথা? সবাই বলাবলি করছিল, কামরূপ কামাখ্যা থিক্যা জাদু শিখ্যা আইছে। এরপর থেকে বাজারে তার কদর আরো বেড়ে গেল। সবাই এখন কেমন সমীহের চোখে দেখে বিশুদাকে। আবার একটু ভয়ও করে, জাদুটোনা জানে তো? কী থেকে কী হয়ে যায়, কে জানে? ফাহাদ একদিন একা পেয়ে বিশুদাকে জিজ্ঞেস করে বসল,
– ও বিশুদা, সত্যি কইরে কও দিনি, এতক্ষণ কি কেউ থাকতি পারে জলের তলে? ক্যাম্বায় থাকলা?
– আরে বোকা, অতক্ষণ খালি খালি কেউ থাকতি পারে নিকি জলের তলে? টেকনিক জানতি অয়?
– কী টেকনিক? আমারে শিওবা এট্টু?
– কেউরে কবি না তো? তাইলি শিওতে পারি।
– না। কবো না নি।
– শোন্, আমি অতক্ষণ জলের তলে থাহি নাই। এক ডুবে অতক্ষণ থাহা যায়? কাছেই বড় এট্টা কচুরির ঝোপ দিখছিলি না? ডুব দিয়া ওই ঝোপের মদ্যি গিয়া নাক জাগাইয়া ছিলাম। কতক্ষণ পরে বারুইয়া আবার ডুব দিয়া সিহানে আসি ভুস্ কইরা জাগছি। কেউ টের পায়নি। এই হলো গিয়া কাণ্ড।
– ও, এই টেকনিক? দারুণ তো!
– জীবনের সকল খিত্রেই টেকনিক জানতি অয়। নইলি কি বাঁচা যায়?
– তাই তো! ভালো কতা কইছো তো!
– জীবনের সব টেকনিকে আবার কাজও অয় না ফাহাদ? তখন সব ভেস্তে যায়।
সাবিত্রীদির যেদিন বিয়ে হয়ে গেল, তার পরদিন থেকেই বিশুদা নেই। এক কাপড়ে উধাও। এবারে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলানোর পালা। সাবিত্রীদি কলেজ থেকে ফেরার পথে মাঝে মাঝেই বিশুদার দোকানে এসে হাজির হতো। কখনো আসত শাড়ি পরে। মিষ্টি মিষ্টি হাসত। কেমন যেন একটু অন্যরকমভাবে তাকাত, কথা বলত দুজন। বিশুদাকে সেদিন বেশি খুশি দেখাত। খুশিতে ডগমগ হয়ে জিলাপি খাওয়াত সবাইকে। তখনো এসব বুঝত না ফাহাদরা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ শিখে ফেলছে তারা। গণিত কঠিন লাগলেও
এ-গণিত আয়ত্ত করে ফেলেছে সহজেই। সেইসব সমীকরণ থেকে বিশুদা ও সাবিত্রীদির বিষয়টা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে তারা। কিন্তু কামরূপ কামাখ্যা থেকে ফিরে আসার পর একবারও কাউকে সাবিত্রীদির কথা বলেনি বা জিজ্ঞেস করেনি বিশুদা। যেন কিছুই হয়নি, এমন। নিস্তরঙ্গ জলেও যেমন মিহি ঢেউ লুকিয়ে থাকে, তেমনি বিশুদার চোখের ভেতরও একটা কিছুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। সেখানে লোনা জলের ঢেউ নেই, তবে বাষ্প আছে।
সাহসে ভর করে ফাহাদ একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলো,
– বিশুদা, সাবিত্রীদির কথা মনে আছে? তার কথা জানো কিছু?
– মনে আছে। মনে থাকপে না ক্যান? মন কি শ্লেট? মন থিকা সবকিছু কি মুছে ফেলা যায়? তবে কী লাভ কাউরে মনে রেখে বল? যে কাঁটায় গন্ধ বিলোয় না, শুধু হুল ফুটোয়, সে কাঁটা না থাহাই ভালো রে ফাহাদ।
কিছুটা বোঝে, কিছুটা মাথায় ঢোকে না। ফাহাদের। তাই চুপ করে থাকে। বিশুদার কথা আজকাল যেন কেমন মাথার ওপর দিয়ে যায়। তবে আগের চেয়ে বেশি নির্লিপ্ত এবং বেশি মাত্রায় সাধু হয়ে গেছে বিশুদা। মাছ, মাংস, ডিমও খায় না। শুধু শাক-সবজি আর ছাগলের দুধ। স্ব-পাকে চালিয়ে নেয়। কোথাও যায়ও না তেমন। যাত্রাগানেও না, ফুটবল খেলার মাঠেও না। শুধু ঘর আর গ্যারেজ; গ্যারেজ আর ঘর।
বিশুদা যেন আগের চেয়ে আরো বেশি ভাবুক হয়ে গেছে। উদাস চোখে মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। কী দেখে, কী ভাবে – তা সে-ই জানে। এক বিকেলে বিশুদা উদাস চোখে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
– জানিস ফাহাদ, মানুষ হলি গিয়া
প্রকৃতির মতোন। পাল্টায়। নদীর জোয়ার-ভাটার মতোন। এই ভালো, এই মন্দ। মাঝে মাঝে মোনে অয়, সব শেষ। আবার মোনে অয়, না তো? এই যে মান্দার গাছটা দেখতিছিস না? শীতকালে সব পাতা ঝইরে গিয়ে একেবারে ন্যাড়া। মইরে গেছে মোনে অয়। কুমিরের গতরের নাহাল, টুটাফাটা। বসন্তে আবার কচিকচি নতুন পাতা গজায়। আবার সবুজে সবুজ। প্রাণের স্পন্দন। মরাগাছে ফুল ফোটে। তারপর লালে লাল। দখিনা বাতাসে ঝিরিঝিরি নাচতে থাহে। প্রাণে দোলা দেয়। মানুষের জীবনও এইরকমই। জানিস, একএক সময় আমার মনে অয় – মান্দার গাছটা যেন আমি। আমি চাইয়া থাহি গাছটার দিকে। আর মোনে অয়, আমি খাড়াই রইছি রাস্তার কান্দায় একা। খুব একা।
এইসব কথা শুনলে ফাহাদের আরো ভয় ভয় করতে থাকে। বাইরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। বাতাসে কুয়াশা মিশেছে। একটু শীত শীতও করছে যেন। ফাল্গুন মাসের মন্দা শীত। মান্দার গাছের লাল ফুলগুলো আর লাল নেই, অন্ধকারে কালো কালো আভা ছড়াচ্ছে। ফাহাদ উঠে পড়ে। তাদের বাড়ি যেতে পথে শ্মশান পড়ে নদীর পাড়ে। এখন না গেলে সে আর বাড়িই ফিরতে পারবে না। কিন্তু চুম্বকের মতো কী এক টানে বিশুদা যেন তাকে আটকে রাখে। পা বাড়াতে গিয়েও আটকে যায়। আবার মোড়ায় বসে পড়ে ফাহাদ। আজকাল ফাহাদের একটা সমস্যা হচ্ছে। বিশুদা যা বলে, সে যেন তাই দেখতে পায়। বিশুদা যখন বলল যে, সে যেন ওই মান্দার গাছটা, তখন থেকে বিশুদার দিকে তাকালে ফাহাদ বিশুদাকে মান্দার গাছ হিসেবে দেখতে পায়। গেরুয়া পোশাক, লাল উত্তরীয়, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। লম্বা লম্বা চুল। চোখ দুটোও লাল। লুকিয়ে-চুরিয়ে নাকি গাঁজাও খায়। তা খেতেই পারে। সাধক বলে কথা। বিশুদা আর মান্দার গাছটা – যেন দু-ভাই। ফাহাদ স্বাভাবিক হতে পারে না। কী এক ঘোর লেগে থাকে চোখে!
– জানিস ফাহাদ, মোন থিকা মুছে ফেলতি পারছি না সাবিত্রীরে। আজো ভুলতে পারি নাই। সব স্মৃতি মোছা যায় না রে! তার কতা মোনে অলি চহে আন্ধার দেহি। কিচ্ছু ভাল্লাগে না।
বিশুদা সাবিত্রীদির কথা বলতেই ফাহাদ তাকিয়ে দেখে সাবিত্রীদি যেন সামনে দাঁড়িয়ে। ধবধবে সাদা শাড়ি জড়ানো গায়ে। বিধবার সাজ। মাথার খোলা চুল হালকা হাওয়ায় উড়ছে। ফাহাদ বাকরুদ্ধ। সাবিত্রীদি এলো কোত্থেকে? তার তো বিয়ে হয়েছে অনেক দূরে? তা ও আবার বিধবার বেশ? তবে কি তার স্বামী মারা গেছে? চোখ রগড়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখে, নির্ভুল – সাবিত্রীদি। এ কোনো তন্ত্রমন্ত্র নয়, সাবিত্রীদি। ভয়ে ফাহাদের গলা শুকিয়ে কাঠ। কী হতিছে? বিশুদাকে হাতের কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে আঙুল তুলে ইশারা করে দেখাচ্ছে সাবিত্রীদিকে। বিশুদা চোখ তুলে তাকায়।
অবাক, সত্যিই তো সাবিত্রী! কুয়াশার ভেতর আরেক কুয়াশা! শান্ত নিঃশব্দ প্রকৃতি। স্তব্ধ সব।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.