২০২৬ সালের ২রা জুলাই সমকালীন চারুকলার আকাশ হারিয়েছে এর অন্যতম এক দীপ্তিময় নক্ষত্রকে, দীর্ঘ দিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ৬৪ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক আতিয়া ইসলাম এ্যানি। মৃত্যুতে শিল্পীর শরীরী অবসান হলেও তাঁর রেখে যাওয়া ক্যানভাস, সমাজবাস্তবতার তীব্র ব্যবচ্ছেদ ও অবাধ্য রঙের আঁচড়গুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের
শিল্প-ইতিহাসে তিনি বেঁচে থাকবেন।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে যে প্রগতিশীল নারীবাদী শিল্প-আন্দোলনের জোয়ার তৈরি হয়েছিল, আতিয়া ইসলাম এ্যানি ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি। তিনি শুধু ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি, বরং প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক মিথ এবং সামাজিক ভণ্ডামির মুখে তাঁর তুলিকে দাঁড় করিয়েছিলেন এক ধারালো তলোয়ার হিসেবে। শিল্প সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব একটি গভীর উপলব্ধি ছিল। তিনি প্রায়ই বলতেন, শিল্প শুধু দেখার আনন্দ দেয় না, শিল্প মানুষকে ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে এবং ক্যানভাস হলো সমাজের ভেতরের ক্ষতগুলো চিনে নেওয়ার সবচেয়ে বড় আয়না। তাঁর পুরো জীবনই ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন ক্যানভাস, যেখানে রঙের প্রতিটি বিন্দু ছিল
একেকটি গভীরতম প্রশ্ন, যা তিনি রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষের নৈতিক মনস্তত্ত্বের দিকে ছুড়ে দিয়েছিলেন।
যাঁরা আতিয়া ইসলাম এ্যানিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তাঁরা জানেন, ক্যানভাসে প্রকাশিত তীব্র প্রতিবাদী রূপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক পরম মমতাময়ী, সংবেদনশীল এবং কোমল মন।
১৯৬২ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া এ্যানি ছিলেন একাধারে স্পষ্টভাষী, আপসহীন অথচ দারুণ বিনয়ী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ঢাকার মধ্যবিত্ত ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণে খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভেতরে চারপাশের পরিবেশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার এক সহজাত ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। চারুকলার ছাত্ররাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয় এবং আশির দশকের শুরুতে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে, ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি সমসাময়িক রূঢ় ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা নিয়ে যেমন সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকতেন, তেমনি শিশুদের জন্য তাঁর মন ছিল অবারিত ও ভালোবাসায় পূর্ণ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল নিজের একক শিল্পচর্চাতেই মগ্ন থাকেননি, বরং সানবিমস স্কুল এবং নিজের প্রতিষ্ঠিত ঝাঁপি স্কুল অফ আর্টে শিশুদের ছবি আঁকা শিখিয়েছেন। শিশুদের কাছে তিনি ছিলেন ‘প্রিয় এ্যানি মিস’, যিনি চার দেয়ালের কঠোর নিয়মে নয়, বরং আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুদের কল্পনার ডানা মেলতে শেখাতেন এবং বলতেন, প্রতিটি শিশুই জন্মগতভাবে একজন মুক্তশিল্পী, যাকে সমাজ তার নিয়মকানুন দিয়ে বন্দি করে ফেলে। কোমল আর কঠোরের এক অদ্ভুত সুন্দর মিশেল ছিলেন এই মানুষটি, যিনি ক্যানভাসে যতটা দৃঢ়ভাবে সত্য প্রকাশ করতেন, ব্যক্তিজীবনে ঠিক ততটাই কোমলতায় আগলে রাখতেন তাঁর চারপাশের মানুষদের।
আতিয়া ইসলাম এ্যানির চিত্রশৈলী যে-কোনো বোদ্ধা বা সাধারণ দর্শক এক নজরেই চিনে নিতে পারেন। কারণ তাঁর কাজের একটি নিজস্ব সিগনেচার তৈরি হয়েছিল, যা সমকালীন অন্যদের থেকে আলাদা। তাঁর ছবির ভাষা প্রথাগত বাস্তববাদের চেনা সীমানা ভেঙে অনায়াসে সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ এবং ফ্যান্টাসির এক জাদুকরী জগতে পা রাখে। তিনি রঙের ব্যবহারে ছিলেন সাহসী এবং উজ্জ্বল ও কাঁচা অ্যাক্রিলিক রঙের মুখোমুখি বিন্যাসে তিনি ক্যানভাসে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি ও তীব্র সংঘাত তৈরি করতেন, যা দর্শককে থমকে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করত। ক্যানভাসে জলরং বা তেলরঙের চেয়ে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমকে বেশি পছন্দ করতেন এই শিল্পী, কারণ এই মাধ্যমের দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাঁর ভেতরের তাৎক্ষণিক ক্ষোভ ও আবেগকে দ্রুত ক্যানভাসে ধরে রাখতে সাহায্য করত। সম্প্রতি তাঁর ক্যানভাসে পপ আর্টের এক নতুন ও পরিশীলিত প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি এমনসব প্রাত্যহিক উপাদান ব্যবহার করেছেন, যা সাধারণত চারুকলার প্রথাগত নান্দনিকতায় ব্রাত্য ছিল, যেমন বারকোড, মিনারেল ওয়াটারের বোতল, কোমল পানীয়র ক্যান, ব্রয়লার মুরগি, ইঁদুর কিংবা তেলাপোকা। তাঁর চিত্রকর্ম ‘হিন্ড্রেন্স দুই’-এর কথাই ধরা যাক, যেখানে ওপর থেকে ঝুলছে উল্টো করে রাখা ব্রয়লার মুরগি আর নিচে শান্ত হয়ে বসে আছেন তিনজন বোরকা পরিহিত নারী। এই যে আপাত-অসংলগ্ন ও বৈপরীত্যপূর্ণ বস্তুর মেলবন্ধন, এটাই এ্যানির অনন্য শৈলী। তিনি প্রতীক, রূপক এবং সংকেতের সাহায্যে দৃশ্যমান জগতের পেছনের অদৃশ্য সত্যকে উন্মোচন করতেন এবং ক্যানভাসকে করে তুলতেন এক একটি সামাজিক দলিল।
তুলির পেছনের এই গভীর দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় অবস্থান করত দুটি প্রধান বিষয়, অর্থাৎ পুরুষতন্ত্রের ভণ্ডামি এবং আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অবক্ষয়। তাঁর জীবনের ল্যান্ডমার্ক সিরিজ ‘উইমেন অ্যান্ড সোসাইটি’ ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা। যেখানে নারীকে কেবল ভোগের বস্তু কিংবা গৃহস্থালির চার দেয়ালের এক যান্ত্রিক উপাদান হিসেবে দেখা হয়, সেখানে এ্যানি নারীর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত, যৌন আকাক্সক্ষা, তীব্র হতাশা, একাকিত্ব এবং অনুশোচনাকে ক্যানভাসে সুচারুরূপে তুলে এনেছেন। নারী স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে তাঁর একটি উক্তি স্মরণীয় – যেখানে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘যে-সমাজ নারীকে দেবী বলে পূজা করে অথচ দিনশেষে তাকে চার দেয়ালে বন্দি দাসি বানিয়ে রাখে, সেই সমাজের ক্যানভাস কখনো সুন্দর হতে পারে না এবং আমার জীবনভর লড়াই আসলে সেই দ্বিমুখী ভণ্ডামির বিরুদ্ধে।’
আতিয়া ইসলাম এ্যানি সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে, নারীর শরীর কোনো বিজ্ঞাপন বা করপোরেট কামনার উপাদান নয়, তা এক স্বাধীন ও জীবন্ত সত্তা। পরবর্তী সময়ে তাঁর এই শিল্পদর্শন আরো বিস্তৃত হয়ে বৈশি^ক রূপ নেয়। তিনি শুধু লিঙ্গবৈষম্যের চেনা বৃত্তে আটকে থাকেননি, বরং বিশ্বায়নের যুগে মানুষের অতিভোক্তাবাদ, খাবারের ভয়াবহ অপচয় এবং রাজনীতির ভেতরের পচনকে তাঁর চিত্রদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলেন। সমাজ যখন নিজের সুবিধার্থে অন্ধ হয়ে যায় শিল্পী তখন তাঁর দূরদর্শী তৃতীয় নয়ন দিয়ে সেই অন্ধত্বকে আঘাত করেন।
শিল্প এবং সমাজ নিয়ে আতিয়া ইসলাম এ্যানির নিজস্ব কিছু দার্শনিক চিন্তা ছিল, যা বিভিন্ন সময়ে তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে। এমনই এক কথনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমি এই সমাজেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সমাজে ঘটে যাওয়া কোনো অবিচারের সামনে আমি কখনো চোখ বন্ধ করে অলস বসে থাকতে পারি না। আমার শিল্পকর্ম আসলে আমার চারপাশের সমাজ পর্যবেক্ষণেরই এক তীব্র প্রতিফলন। সম্প্রতি রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক মূল্যবোধের যে ক্রমান্বয় অবক্ষয় ঘটছে আমার চিত্রকর্মের মাধ্যমে আমি তার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু জোরালো প্রতিবাদ জানাই।’
নিজের ছবির বিচিত্র এবং অদ্ভুত সব উপাদান নিয়ে তিনি একবার গভীর আক্ষেপের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি ক্যানভাসে অর্ধেক খোসা ছাড়ানো কলা, অর্ধেক খাওয়া আপেল, বার্গার, কাঁচি, মিনারেল ওয়াটারের বোতল, তেলাপোকা কিংবা নারীর পোশাক আঁকি, কারণ এগুলোই এখনকার সমসাময়িক সভ্যতার আসল নিষ্ঠুর এবং নগ্ন বাস্তবতা।’ এই সাহসী কথাগুলোই প্রমাণ করে, তিনি কোনো কাল্পনিক রঙের স্বর্গে বাস করা রোমান্টিক শিল্পী ছিলেন না, বরং মাটির পৃথিবীর রূঢ় ও রুক্ষ বাস্তবতাই ছিল তাঁর তুলির প্রধান জ্বালানি ও শক্তি।
আতিয়া ইসলাম এ্যানি যখন আশির দশকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করছিলেন তখন বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্পাঙ্গন এক বিশাল পরিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৮২ সালে বিএফএ এবং ১৯৮৫ সালে এমএফএ করার সময়ে তিনি সান্নিধ্য পান বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ও দিকপাল শিল্পীদের। চারুকলার সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে তিনি নিজের চোখ ও মনকে দীক্ষিত করেছিলেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটে প্রখ্যাত ও কিংবদন্তি শিল্পী মুর্তজা বশীরের অধীনে দীর্ঘ কর্মশালা তাঁর কাজের নান্দনিক গভীরতা এবং রেখার শক্তি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে মুর্তজা বশীরের ড্রয়িংয়ের অদ্ভুত সূক্ষ্মতা এবং রেখার ভেতরের তীব্র অভিব্যক্তি তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর নিজের কাজেও তা দেখা যায়। এছাড়া বিশ^শিল্পের ইতিহাস-কাঁপানো সুররিয়ালিস্ট আন্দোলন, সালভাদর দালি কিংবা রেনে মাগ্রিতের পরাবাস্তববাদী চিন্তাভাবনা এবং অবচেতন মনের প্রকাশ তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল। তবে তাঁর শিল্পযাত্রার সবচেয়ে বড় এবং চিরন্তন অনুপ্রেরণা ছিল নারীর প্রাত্যহিক জীবনের অদৃশ্য সংগ্রাম। বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা যেভাবে প্রতিদিন হাজারো অদৃশ্য সামাজিক শিকল ভেঙে বেঁচে থাকার লড়াই করে, সেই লড়াকু জীবনই ছিল তাঁর ক্যানভাসে ছবি ফুটিয়ে তোলার মূল চালিকাশক্তি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে জার্মানির প্রখ্যাত শিল্পী হেলা বেরেন্টের পরিচালনায় ‘দ্য ডিফারেন্ট পারসপেক্টিভ ইন দ্য ওয়ার্ক অফ উইমেন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কর্মশালা তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আন্তর্জাতিক স্তরে এক নতুন মাত্রা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
বাংলাদেশের চারুকলার সুদীর্ঘ ইতিহাসে আতিয়া ইসলাম এ্যানির নাম উল্লিখিত থাকবে মূলত একটি বিশেষ কারণে, তিনি ক্যানভাসে নারীর অবজেক্টিফিকেশন বা বস্তুকরণের বিরুদ্ধে প্রথম সারির এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। দিলারা বেগম জলি, কনক চাঁপা চাকমা কিংবা ফারেহা জেবার সঙ্গে মিলে নব্বইয়ের দশকে তাঁরা যে সম্পূর্ণ নতুন ও প্রগতিশীল ধারার সূচনা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাকে আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন মর্যাদা ও পরিচয়ে উপস্থাপন করে। তাঁর এই অবদানের যোগ্য স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তিনি ১৮তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে গ্র্যান্ড প্রাইজ লাভ করেন, যা তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করা হয়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬০টিরও বেশি যৌথ প্রদর্শনীতে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। লন্ডনের ঐতিহাসিক গ্যালারি ওল্ডহ্যাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মতো মর্যাদাপূর্ণ সংগ্রহশালাগুলোতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর্মগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। এ্যানি শুধু নিজের স্টুডিওতে বন্দি থাকা কোনো শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে সূক্ষ্মদর্শী বিচারক, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং সামাজিক সংগঠক। বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে বসে তিনি অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে শিল্পকলার সঠিক ও প্রগতিশীল পাঠ দিয়েছেন।
আতিয়া ইসলাম এ্যানির চিত্রকর্মের গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তাঁর রঙের বিচিত্র রূপ এবং মিশ্র মাধ্যমের ব্যবহারের দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিপাত করতে হয়। তিনি ক্যানভাসে রঙের যে খেলা তৈরি করতেন তা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য ছিল না, বরং প্রতিটি রঙের পেছনে ছিল গভীর মনস্তাত্ত্বিক স্তর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় তাঁর ব্যবহৃত তীব্র লাল রঙের কথা, যা তিনি সচরাচর নারীর ভেতরের অবদমিত ক্ষোভ, রক্তক্ষরণ এবং সমাজের নিষ্ঠুরতাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করতেন। আবার একই সঙ্গে তাঁর ক্যানভাসে ধূসর এবং কালচে রঙের প্রাধান্য দেখা যেত, যা সমকালীন সভ্যতার নৈতিক অবক্ষয়, পচন এবং কালবেলার অন্ধকারকে নির্দেশ করত। তিনি ক্যানভাসে মসৃণ টেক্সচারের পরিবর্তে অনেক সময় খসখসে এবং রুক্ষ টেক্সচার তৈরি করতে পছন্দ করতেন, যা দর্শককে এক অব্যাখ্যাত অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত। এই বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই তাঁর সুররিয়ালিস্টিক চিন্তাভাবনাকে আরো বাস্তবসম্মত রূপ দিত, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আমাদের চারপাশের সমাজটা মসৃণ নয়, বরং তা প্রতিনিয়ত নানা অসমতা ও বৈষম্যের আঘাতে জর্জরিত। তিনি ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রে কাঠকয়লা বা চারকোল এবং পেন অ্যান্ড ইঙ্কের কাজও করেছেন, এগুলো তাঁর রেখার শক্তিকে আরো নিখুঁতভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল। তাঁর রঙের বিন্যাস এবং ক্যানভাসের পটভূমি এমন এক দৃশ্যপট তৈরি করত, যা শুধু চোখের দেখাতেই শেষ হয়ে যেত না, বরং মানুষের অবচেতন মনের গভীরে এক দীর্ঘমেয়াদি দাগ কেটে যেত।
এই বহুমাত্রিক শিল্পীর নিজের কণ্ঠস্বর ছিল ক্যানভাসের মতোই সমান বলিষ্ঠ। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং প্রদর্শনীর ক্যাটালগে প্রকাশিত তাঁর উক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি নিজের শিল্পচর্চাকে কোনো বিচ্ছিন্ন শৌখিন কাজ মনে করতেন না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘শিল্পী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নন, সমাজ যদি পচে যায় তবে শিল্পীর ক্যানভাসে সেই পচনের সুবাস বা দুর্গন্ধই উঠে আসবে এবং আমি ক্যানভাসে সুবাস ছড়াতে আসিনি, আমি এসেছি মানুষের ভেতরের কুৎসিত সত্যকে নগ্নভাবে দেখাতে।’ নিজের কাজের মাধ্যম এবং উপকরণ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেছিলেন যে, ‘আধুনিক যুগে আমাদের চারপাশটা প্লাস্টিক, করপোরেট লোভ এবং কৃত্রিমতায় ছেয়ে গেছে, তাই আজ আমি যখন ক্যানভাসে একটি মরা তেলাপোকা বা ছেঁড়া কাগজের টুকরো আঁকি, তখন তা সমাজের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কিছুই নয়।’ নারী শিল্পীদের লড়াই নিয়ে তাঁর আরেকটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘একজন পুরুষ শিল্পীর লড়াই শুধু তাঁর ক্যানভাসের সঙ্গে; কিন্তু একজন নারী শিল্পীকে প্রথমে লড়তে হয় তাঁর নিজের ঘর, সমাজ এবং প্রচলিত মানসিকতার সঙ্গে, তারপর তিনি ক্যানভাস ছোঁয়ার অধিকার পান।’ এই কথাগুলোই মনে করিয়ে দেয় আতিয়া ইসলাম এ্যানি শুধু রঙের জাদুকর ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রখর সমাজসচেতন তাত্ত্বিক ও চিন্তক।
আতিয়া ইসলাম এ্যানির আঁকা কালবেলা কিংবা কনটেম্পোরারি ন্যারেটিভসের অবাধ্য ক্যানভাসগুলো আমাদের সমাজকে প্রতিনিয়ত কঠোর ভাষায় প্রশ্ন করে যাবে। তিনি আমাদের দৃঢ়ভাবে শিখিয়েছেন যে, শিল্প শুধু বসার ঘরের দেয়াল সাজানোর কোনো শৌখিন বা বিলাসী বস্তু নয়, বরং শিল্প হলো সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার এক নান্দনিক ও শক্তিশালী মাধ্যম। যতদিন পর্যন্ত আমাদের এই সমাজে লিঙ্গবৈষম্য টিকে থাকবে এবং যতদিন পুঁজিবাদী লোভ মানুষের বিবেক ও মানবতাকে গ্রাস করবে, ততদিন আতিয়া ইসলাম এ্যানির সুররিয়ালিস্টিক ক্যানভাসগুলো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত থাকবে। তিনি তাঁর অবাধ্য তুলি আর সাহসী রঙের জাদুকরী আঁচড়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে যে গভীর দাগ কেটে গেছেন, তা সময়ের মহাকালের স্রোতে কখনো মুছে যাওয়ার নয়। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এই সাহসী নারী ও শিল্পীর স্মৃতির প্রতি। তাঁর ক্যানভাস থেকে ছড়ানো আলোর দীপ্তি চিরকাল ছড়িয়ে পড়ুক আগামী প্রজন্মের সমস্ত ক্যানভাসে ও মুক্তচিন্তার আকাশে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.