আবুল কাসেম ফজলুল হক ‘প্রতিভাবানের প্রতীক্ষায়’

‘আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো ব্যক্তিও আজ বাংলাদেশে দুর্লভ।’ – কথাটি শুনেছি একদিনের আলাপচারিতায়, বাংলাদেশের মনীষাগত দুর্বলতা প্রসঙ্গে, বদরুদ্দীন উমরের মুখে। কেন তিনি কথাটি বলেছিলেন? কী অভিপ্রায় ছিল তাঁর এই বাক্যে? আবুল কাসেম ফজলুল হকের মনীষাগত কিংবা প্রত্যয়গত ন্যূনতার ইঙ্গিত ছিল কী এ-বাক্যে? না – এর কোনোটিরই ইঙ্গিত ছিল না সেখানে। শুধু বলতে চাওয়া হয়েছে – এমন মানুষ এ-সমাজে ‘দুর্লভ’ হয়ে পড়ছে। সমাজের অপরাজেয় এবং দুর্জয় দুর্বলতার ইঙ্গিত এ-বাক্যের স্বরূপে। এখানে সমাজ মানে, বড় অর্থে, শিক্ষিত ও জ্ঞানমন্ত বৃহৎ এবং ব্যাপ্ত পরিধিকে বুঝে নিতে হবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক মাথা নত করেননি কোথাও। না দুর্নীতির কাছে, না অন্যায়ের কাছে, না কোনোরূপ তোষণ-তৎপরতার কাছে। অথচ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা এই তিন স্তরে নিমগ্ন, নিমজ্জিত – আজো। যাঁরা কিছুটা জ্ঞানমন্ত, যাঁরা শিক্ষিত, যাঁরা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী, তাঁদের মধ্যেও এই অবনত মনের পরিচয় সর্বত্র প্রত্যক্ষ। বদরুদ্দীন উমর তারই ইঙ্গিতে ওই বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন সেদিন, মনে পড়ছে। আবুল কাসেম ফজলুল হক এই অবনত সমাজের একজন দুর্লভ মানুষ ছিলেন, সন্দেহ নেই।

তিনি ইচ্ছা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে মন্ত্রী হতে পারতেন। সচিব-আমলা হতে তো তাঁর কোথাও ন্যূনতা ছিল না। কেবল তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেও ‘শিক্ষক-রাজনীতি’র সঙ্গে যুক্ত হয়ে অঢেল টাকা  উপার্জন করতে পারতেন! অনায়াসে হতে পারতেন উপাচার্য কিংবা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। বিদ্যা ও জ্ঞান ছিল তাঁর এসব ক্যারিয়ার ও পেশায় নিজেকে জড়ানোর পক্ষে। এক কথায়, সাধারণভাবেই সেরকম যোগ্যতা ও উচ্চতা ছিল তাঁর। অথচ তিনি পুরো জীবনই থেকেছেন লেখাপড়া নিয়ে – বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি আর অগণিত শিক্ষার্থী ছিল তাঁর আরব্ধ অনুভব ও বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের সর্বপ্রধান ক্ষেত্র। মননশীলতা, প্রত্যয় আর নৈতিক চরিত্রকে দিয়েছিলেন তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব – আত্মজীবনে ও সমাজের পক্ষে। এটাই তাঁর জীবনধর্মের হয়তো সর্বপ্রধান পরিচয় – বদরুদ্দীন উমর ‘দুর্লভ মানুষ’ বলে যাঁকে উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। সমাজ ও মানুষের শৃঙ্খলমুক্তির পক্ষে এই মানুষের চিন্তার ধরনটা তাই প্রথমে বুঝে নেওয়া দরকার, আলোচনার কিছু সীমাবদ্ধতা মনে রেখে।

দুই

আবুল কাসেম ফজলুল হক যে-সমাজে বাস করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, সে-সমাজ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল। সকল শিক্ষিত মানুষেরই সেটা থাকা উচিত, তিনি মনে করতেন। কিছু কম বয়সে তিনি দেখেছিলেন, তাঁর সমাজে কবি, সাহিত্যিক, লেখকরা ‘আদমজী ও দাউদ’ পুরস্কার এবং ‘সরকারের করুণা লাভের’ জন্য ‘এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা’ করছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, তাঁরা ‘তাঁদের করুণালাভের লোভে নিজের অন্তঃস্থিত শিল্পানুসন্ধিৎসা, সত্যানুসন্ধিৎসা ও সৌন্দর্যচেতনার মৃত্যু’ ঘটিয়ে ‘আত্মপ্রসাদ’ লাভ করতে চাইছেন। তিনি এই বক্তব্য পেশ করেন ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত ‘প্রতিভাবানের প্রতীক্ষায়’ প্রবন্ধে। তখনো তাঁর লেখা কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। অথচ পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত এবং মৈত্রেয়ী দেবী-সম্পাদিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রবন্ধ সংগ্রহ (১৯৭০) বইতে এই সুন্দর লেখাটি সংকলিত হয়েছে গুরুত্ব বিবেচনায়, তখনকার মূল্যবান ব্যক্তিবর্গের গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ও নামের সঙ্গে। তাঁর সে-লেখার এক জায়গায় আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, উনিশ শতকে এই  ভূখণ্ডের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে যে শিক্ষিতেরা ছিল সমাজের উজ্জীবনী শক্তি – দেড় শতাধিক বৎসরের ব্যবধানে বিকাশের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করার পর তারা আজ ক্ষয়িষ্ণু-মুমূর্ষু শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং বর্তমান সামাজিক অবস্থানে তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে – এখন ইতিহাসের মঞ্চ থেকে তাদের বিদায় নেবার পালা। তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক পৃষ্ঠপোষকদেরও বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সিফিলিসাক্রান্ত বারবনিতাদের মতই পদলেহী সুবিধালোভী আত্মবিকৃতি বন্দীবিবেক বুদ্ধিজীবীরা আজ সমাজ প্রগতির পথে আবর্জনা। স্বার্থলোভী চরিত্রহীন রাজনীতিকেরা ও স্বর্ণলোভী ধনিকেরা যেমন আজ প্রগতির সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে কেবলমাত্র শ্রেণীস্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত, তেমনি সুবিধালোভী শিক্ষিতেরাও আজ তাদের মানবিক অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে কেবল ধনিকদের উচ্ছিষ্ট লাভের আশায় প্রতিমুহূর্তে লালায়িত। ব্যাধিগ্রস্ত বারবনিতাদের মতই তাদের মন শুকিয়ে মরে গেছে – দেহ শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। ওই মন আজ সম্পূর্ণ বন্ধ্যা, ওতে আবাদ করতে চাইলে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। ওতে ফসল ফলবে না, ফুল ফুটবে না, ফল ধরবে না। ওই মনে কোন প্রকার জীবন-জিজ্ঞাসা,

নীতি-জিজ্ঞাসা, সৌন্দর্য-জিজ্ঞাসা ও মূল্য-জিজ্ঞাসা আজ আর অবশিষ্ট নেই।

বাস্তবতা এই যে, এই সুযোগ ও সুবর্ণ দুর্বলতা হাতছাড়া করতে চায়নি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তখন। এখনো চায় কী? ‘কায়েমি স্বার্থবাদী প্রতিক্রিয়াশীল’ শক্তি চায়নি ‘নতুন কোন আদর্শের চিন্তার বিকাশ ঘটুক কিংবা প্রগতিশীল নতুন কোন আদর্শের প্রচার হোক।’ এটা তখনকার ‘সকল প্রচার মাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানই কায়েমি স্বার্থবাদী প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের হস্তগত’ ছিল। আজো আছে কী? ‘প্রগতিশীল বক্তব্য, চিন্তা ও আদর্শকে প্রচার’ তারা কিছুতেই চাইতে পারেনি, যেমন আজকেও চায় না তেমন মাধ্যম।

আবুল কাসেম ফজলুল হক যখন তাঁর সমাজ সম্পর্কে এই বক্তব্য পেশ করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল আটাশ। যৌবনে হয়তো কিছু উত্তাপ বেশি থাকে, মেজাজে ও মনীষায়। তাই তখন সমাজের, রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অসংগতি তাঁর মনে আঘাত করে দারুণ তীব্রতায়, দুর্দান্ত গতি নিয়ে। সত্য যে, সমাজের গভীরঘন অন্ধকারটা তাঁর মনকে তখন বিষিয়ে তোলে অশেষ নৈরাশ্যে। সমাজে, সাহিত্যে, রাজনীতিতে তিনি কেবলি অসাড়তা ও অন্তঃসারশূন্যতা দেখেছিলেন। তাই নির্দ্বিধায় এ-কথা বলতে পেরেছিলেন, প্রাণহীন, হৃদয়হীন, বুদ্ধিহীন, আবেগ অনুভূতিহীন, চরিত্রহীন, পদলেহী, উচ্ছিষ্টলোভী, সুবিধালোভী, মেরুদণ্ডহীন, আত্মবিক্রীত, অন্তঃসারশূন্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের জন্য সাহিত্য রচনা করতে গেলে লেখককেও অবশ্যই প্রাণহীন, বুদ্ধিহীন, – হতে হবে এবং সকল প্রকার সৌন্দর্য জিজ্ঞাসা, জীবন জিজ্ঞাসা, নীতি জিজ্ঞাসা ও মূল্যবোধ মন থেকে মুছে দিয়ে ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’-এর সেøাগান তুলতে হবে। কেবল শিল্প-সাহিত্যের বেলাই নয়, রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও আমাদের দেশে সন্ত-বুর্জোয়া-মুৎসুদ্দি-আমলারা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন উভয় অংশই আজ এক সার্বিক ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে – এই শ্রেণীর সামনে আজ আর কোন ভবিষ্যৎ নেই।

অথচ আবুল কাসেম ফজলুল হক রাজনীতির ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রক্ষা করেছেন তাঁর পুরো জীবনে। কেন ও কীভাবে? মানবেতিহাসের সকল ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করে যে-প্রতিষ্ঠান, তার নাম পলিটিকস (রাজনীতি)। মার্কসের

এ-কথা আবুল কাসেম ফজলুল হক জীবনব্যাপী মান্যতা দিয়েছিলেন। তিনি ওই প্রবন্ধে নিজেই বলেছেন, ‘রাজনীতি সমাজের সমস্ত কাজের মূল পরিচালিকা শক্তি।’ জীবনে নানা পটপরিবর্তন হয়েছে তাঁর, কিন্তু রাজনীতি বিষয়ে তিনি প্রথম যৌবনের এই প্রত্যয়কে কোনো দিন অবহেলা করেননি। বাঙালি চিন্তাজগতের নতুন সূর্যোদয়ের প্রথমপর্বে রাজনীতি নিয়ে এমন দুর্দান্ত প্রত্যয়ের দেখা মেলে বাংলা ভাষায়। এ-তথ্যের ঠিকানাটা উল্লেখ করা দরকার, প্রমাণের স্বার্থে।

তিন

উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ-দার্শনিক অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৪৮ সালে জাতীয় উন্নতির উপায় নিয়ে বাণিজ্যের অপরিহার্যতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ও অধঃপতন ব্যবস্থাপকদিগের উপর নির্ভর করে।’ একই সালে মাতৃভাষার উন্নতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজার এক আজ্ঞাতে যাহা হইবে, সহস্র সহস্র প্রজার যুগপৎ চেষ্টাতেও তাহা সম্পন্ন হওয়া দুষ্কর।’ এটা একদিকে রাজনীতির স্বরূপের কথা, অপরদিকে জাতীয় উন্নতির পক্ষে এক মৌল শর্ত। হয়তো এই কারণে একই সময়ে, দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের মানুষ অক্ষয়কুমার ও মার্কসের মুখে এই অমোঘ সত্য উচ্চারিত হয়েছিল। অথচ তাঁরা দুজনেই সমবয়সী এবং সমাজ ও রাজনীতি সচেতন, জীবন-জিজ্ঞাসায় ও চিন্তার ক্ষেত্রে বিপ্লবী। জাতীয় উন্নতি ও অবনতি শেষ পর্যন্ত যে ‘রাজনৈতিক নেতৃবর্গে’র ওপর নির্ভর করে –

এ-বক্তব্যে অক্ষয়কুমার ও মার্কস একই সমতলের মানুষ। বিশ শতকের, আমাদের অপর একজন সমাজ-দার্শনিক আবদুল হক এই প্রত্যয়ে সমান আগ্রহী ছিলেন। তিনি যেমনটা বলেছেন, আমার ‘প্রথম অভিজ্ঞতা হলো ভাষা সাহিত্য ইতিহাস ভূগোল যা-ই হোক, কবি-সাহিত্যিককে আমরা যতোই সম্মান দিই, দেশ ও জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন আসলে রাজনৈতিক নেতৃবর্গ।’ কীভাবে এই নেতৃত্ব সত্য হয়ে উঠতে পারে – এ নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হকের অভিমত ছিল।

তিনি মনে করতেন, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলই কেবল সমাজ ও দেশের মুক্তির নিয়ামক হতে পারে, অন্য কিছু নয়, অপর কেউ নন। তাঁর মতে, ‘জনগণকে গড়ে তোলার জন্য যা অপরিহার্য তা হলো জনগণের সঙ্গে থেকে, জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশে গিয়ে, জনগণের কাছ থেকে তাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে অবহিত হয়ে, তারপর জনগণকে সুশিক্ষিত ও সুসংগঠিত করে গড়ে তোলা।’ বলা বাহুল্য, এ-কাজ পুরোপুরি রাজনীতির। কোন রাজনীতি? ‘সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী’ রাজনীতি যে নয়, তা পরিষ্কার। কেননা এ-শ্রেণির নেতৃত্বের ওপর – সততা ও যোগ্যতার ওপর – জনগণ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না। কী ধরনের নেতৃত্ব চাই?

আবুল কাসেম ফজলুল হক দেখাতে চেয়েছেন – চীনে যেমন লু সুন ও মাও সে তুং ছিলেন, ফ্রান্স যেমন পেয়েছিল নেপোলিয়ানকে – আমাদের দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চাই সে-রকম বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। ওই প্রবন্ধেই তিনি লু সুনের বরাত দিয়ে বলতে চেয়েছেন, আমাদের চাই প্রতিভাবান নেতৃত্ব। কেবল রাজনীতি ক্ষেত্রে নয় – সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব – সর্বক্ষেত্রে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সমাজে কোন প্রতিভাবানের সাক্ষাৎ আজও আমরা পাইনি বলেই একজন প্রতিভাবানের জন্য আমাদের এত উৎকণ্ঠা।’

জিজ্ঞাসা – ‘প্রতিভাবান’ কেন? প্রতিভাবানের জন্ম এবং তাঁর হয়ে-ওঠা কী কোনো স্বাভাবিক ঘটনা? নাকি তার জন্যে চাই উপযুক্ত সমাজ ও যোগ্য আবহ? নাকি এসব শর্ত ছাড়াই প্রতিভাবানের দেখা মিলতে পারে যে-কোনো সমাজে? আরো এক জিজ্ঞাসা – প্রতিভা কী? ‘প্রতিভা’ অর্থাৎ বিশেষ্যকে পেটালেই কী ‘প্রতিভাবান’ অর্থাৎ বিশেষণের জন্ম হয়? মোটকথা, সমাজের বিপুল অসংগতির বেদনা ও দুঃখ যে-প্রাণকে কাঁদায় এবং সে-কান্না থেকে যে-প্রাণ তার মুক্তির উপায় খোঁজে, সেখানে প্রতিভাবানের দেখা মিলতে পারে, উপযুক্ত আবহের গুণে! কেননা সেরকম আবহে কেবল জীবন ও জগৎকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। আর সেটা করতে পারে যে-বুদ্ধি, তারই নাম প্রতিভা। এছাড়া প্রতিভার অপর কোনো অর্থ নেই। যাঁর মধ্যে এই অপূর্ব সত্যের নাগাল পাওয়া যায় তিনিই প্রতিভাবান।

চার

প্রতিভাবানই কেবল নতুন দৃষ্টি ও নতুন জীবনের আলো ডেকে আনতে পারেন। দৃষ্টিদানের চেয়ে বড় দান মানবসমাজে অপর কিছু নেই। আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর পুরো জীবনই এই সত্যের আবির্ভাবের জন্য প্রতীক্ষা করেছিলেন। উল্লিখিত প্রবন্ধেই তিনি বলেছেন, নেপোলিয়ান সংগ্রামের জন্য পেয়েছিলেন বিশ্বস্ত, দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য বিরাট এক সৈন্যবাহিনী। এটা তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে কাজে লেগেছিল। এজন্য তিনি আল্পস পর্বত অতিক্রমের সময় বলেছিলেন, ‘আমি আল্পসের চেয়েও উঁচু।’ উন্নত নেতৃত্বের মূলে আছে জনসাধারণের উন্নত মানসিকতা ও নৈতিক চরিত্র – আবুল কাসেম ফজলুল হক এমনটাই মনে করতেন। যেখানে এর অভাব, সেখানে প্রতিভাবানের জন্ম হতেই পারে না, সেখানে অন্য অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও।

আবুল কাসেম ফজলুল হক এ-কথাও বলতে ভোলেন না যে, প্রতিভাবানের আবির্ভাব সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অপরিহার্য মৌল শর্ত। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত একটি লেখায়, তাঁর শিক্ষক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি দেশ সামগ্রিকভাবে বস্তু-সম্পদে যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, সামাজিক ন্যায়বিচার যদি সে-দেশে অনুপস্থিত থাকে, মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনাসমূহের বিকাশের সুযোগ যদি সেখানে কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় লোকের জন্যই অবধারিত থাকে, তা’হলে সে-দেশেও বৃহত্তর জন-জীবন ব্যর্থ হতে বাধ্য।’ বাংলাদেশ এর চমৎকার দৃষ্টান্ত। নজির পেশ করা যাক।

এ-অঞ্চলে সুদীর্ঘকাল ধরে নানা সময়ে বহু বিচিত্র ধরনের বিদ্রোহ হয়েছে, হয়েছে অভাবিত সব গণঅভ্যুত্থান, কিন্তু তার লক্ষ্যের মুক্তি ঘটেনি কখনো, কোনো দিনই! ন্যায়বিচার অপ্রতিষ্ঠা তার মৌল কারণ – স্বীকার করা ভালো। এমন আবহে প্রতিভার জন্ম অসম্ভব বলেই মনে হয়। আবুল কাসেম ফজলুল হক পুরো জীবনই এই আবহের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য লিখেছেন, কথা বলেছেন! জীবনের প্রায় শেষান্তে তিনি কামনা করেছেন,

বাংলাদেশের মানুষের জীবন সমৃদ্ধ, সুন্দর, আনন্দময় ও প্রগতিশীল হতে পারে। পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রেই মানুষের জীবন হতে পারে অনেক সমৃদ্ধ, সুন্দর, আনন্দময় ও প্রগতিশীল। কিন্তু বাস্তবে বিপুল অধিকাংশ মানুষই সামাজিক অবিচার ও দারিদ্র্যের মধ্যে দারুণ কষ্টে আছে। এ অবস্থায় কায়েমি-স্বার্থবাদীদের দেখা যাচ্ছে সক্রিয়, আর জনগণকে দেখা যাচ্ছে উদাসীন। বর্বরতা সক্রিয়, মনুষ্যত্ব নিষ্ক্রিয়। মানবজাতির মধ্যকার পশুশক্তি জাগ্রত, মানবশক্তি সুপ্ত। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মানুষের মধ্যকার মহৎ গুণাবলি বিকাশের শর্ত তৈরি করতে হবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক মনে করতেন, একজন প্রতিভাবানের প্রত্যয় ও চরিত্র থেকেই সুন্দর সমাজের স্বপ্ন ও কল্পনা আশা করা যায়! কেবল এজন্য চাই প্রতিভা – চাই প্রতিভাবানের আবির্ভাব – সাহিত্যে, দর্শনে, বিজ্ঞানে, ইতিহাসে, সমাজতত্ত্বে, সর্বোপরি রাজনৈতিক অঙ্গনে।