নব্বই পেরিয়ে অনন্তলোকে চলে গেলেন বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার। পরিণত বয়সেই তাঁর যাওয়া, তবু মনে হয় এই দুঃসময় দূর করে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির অন্তর্গত শক্তিকে জাগ্রত করতে বড় প্রয়োজন ছিল তাঁর।
গত ২৯শে জুন, সোমবার, সকালেই পেলাম সেই শোকাবহ দুঃসংবাদ; আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের কিংবদন্তি বর্ষীয়ান শিল্পী, সংস্কৃতি-সাধক, শিশুদের সুপ্রিয় শিল্পীভাই মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই! নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে গেছে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন। রেখে গেছেন স্ত্রী অধ্যাপক মেরী মনোয়ার, পুত্র সাদাত মনোয়ার, কন্যা নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও দেশ-বিদেশে বহু গুণগ্রাহী।
গত চার যুগ ধরে প্রিয় শিক্ষকের পরম আরাধ্য সঙ্গ, সহজবোধ্য শব্দে ছোট ছোট বাক্যে তাঁর কথা বলার অসামান্য ভঙ্গি, অনুকরণীয় শিক্ষাদান পদ্ধতি, হারমোনিয়ামের রিড ধরে দরদি-কণ্ঠের গান গাওয়াসহ অসংখ্য স্মৃতি চোখে ভাসছিল। বাড়ির ফোনে কথা বলে অনেকবার গেছি তাঁর বাসায় এবং স্টুডিওতে। হাসিমুখে কুশল জিজ্ঞেস করে বলতেন, ‘এবার বলো।’ মন দিয়ে কথা শুনে সমাধান দিতেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর, মাগুরার নাকোল গ্রামে। বাবা কবি গোলাম মোস্তফা পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষক; যিনি সেকালে জাতীয় জাগরণের কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মা জামিলা খাতুন। অল্প বয়সেই মাতৃবিয়োগ ঘটে মুস্তাফা মনোয়ারের।
শৈশব থেকেই ছবি আঁকায় আগ্রহী ছিলেন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সেকালের শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখে আঁকতে আঁকতে অংকনে একটু একটু করে পারদর্শী হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সরকারি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ছবি এঁকে জনসমক্ষে প্রদর্শনী করেছিলেন বলে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল।
১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান কলকাতায়। প্রথমে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। তবে পড়ালেখা তেমন এগোয়নি। সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁকে বলেন, ‘অনর্থক সময় নষ্ট না করে তুমি অংকনবিদ্যা শেখ।’ তাঁরই অনুপ্রেরণায় নবীন মুস্তাফা মনোয়ার ভর্তি হন কলকাতা আর্ট কলেজে। মনের মতো অধ্যয়নের জায়গা পেয়ে আর থেমে থাকেননি তিনি। বিস্তর অনুশীলন করতেন। আর্ট কলেজের আশেপাশে এবং কলেজ থেকে সহপাঠীদের সঙ্গে শহরতলি, গঙ্গা নদীর পাড়ে যেতেন আঁকার অনুশীলন করতে। ছুটিছাটায় দেশে এলেও আঁকার অনুশীলন অব্যাহত থাকতো।
সংগীতের প্রতি বরাবর অনুরাগ ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। আর্ট কলেজে পড়ার সময় কলকাতায় মনের মতো পরিবেশ পেয়ে ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে গান শেখা শুরু করেন। পরে দীর্ঘদিন গানের চর্চা চলে নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে যুক্ত থেকে। সে-সময় হিজ মাস্টার্স ভয়েসের এক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্র সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল অনুরাগ। আলোচনা কিংবা বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান-কবিতার বাক্য ও নাটকের সংলাপ বলতেন উদাহরণ হিসেবে।
কলকাতা আর্ট কলেজে অধ্যয়নকালে অনবরত চর্চায় ধারাবাহিকভাবে তিনি রপ্ত করেন ড্রয়িং, স্কেচ, জলরং, তেলরং মাধ্যমের প্রয়োগ। আর এভাবেই এসব মাধ্যমে তাঁর আঁকার হাত দক্ষ হয়ে ওঠে। এর ফল পেয়েছেন বার্ষিক ও সমাপনী পরীক্ষায়। ১৯৫৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জলরঙের চিত্রকর্মে তাঁর অপূর্ব দক্ষতার জন্য কলকাতা আর্ট কলেজে অধ্যয়নকালীন তিনি স্বর্ণপদক পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে ১৯৬০ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা আর্ট কলেজে। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর শিক্ষার্থীরা জলরঙে ছবি আঁকার অনুশীলনে ভালো করতে থাকে। শিল্পী রফিকুন নবী ও সতীর্থরা তাঁর ছাত্র। রফিকুন নবীর কাছে শুনেছি, মনোয়ার স্যার জলরঙে আঁকা দেখাতে যেয়ে কাগজে যেভাবে ওয়াশ চড়াতেন তাঁরা তা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতেন। কিন্তু আর্ট কলেজে তিনি বেশিদিন শিক্ষকতা করেননি। নতুন সম্প্রচার মাধ্যম গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬৫ সালের শুরুর দিকে ঢাকায় টেলিভিশনের সূচনাযাত্রার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন।
শিল্পের বহু মাধ্যমের অঙ্গন আপন সৃজনপ্রতিভায় রাঙিয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। খোদ সত্যজিৎ রায় মুগ্ধ ছিলেন তাঁর জলরঙে আঁকা ছবিতে। তাঁর প্রযোজিত রক্তকরবী নাটক দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই গুণীর প্রশংসায় আপ্লুত মুস্তাফা মনোয়ার বলেছেন, ‘ওই প্রশস্তি ছিল আমার কাছে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির আনন্দ!’ আমাদের শহিদ মিনারে শ্রদ্ধার পুষ্পস্তবক নিবেদনের সময় যে রক্তিম সূর্য চোখে পড়ে মিনারের স্তম্ভগুলোর নেপথ্যে, সেটির সংযুক্তিতে রয়েছে তাঁর ও আরেক গুণী শিল্পী ইমদাদ হোসেনের অবদান।
মুস্তাফা মনোয়ার সর্বাধিক জনপ্রিয় হন আধুনিক পাপেটের পথিকৃৎ হিসেবে। পাকিস্তান আমলেই টেলিভিশনে তিনি পাপেট শো শুরু করেন। ‘পারুল’ নামে পাপেট চরিত্র সৃষ্টি করেন। এছাড়া পরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’। এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও পরিচালনায় বিটিভি-নির্মিত শিশুদের অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’। মনের কথার পারুল, বাঘা, ষাঁড় আর বাউল চরিত্রের পাপেটের মুখে মজার মজার সব শিক্ষামূলক গল্প করাতেন শিল্পী নিজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। অন্য চরিত্ররা তাঁকে সম্বোধন করতেন শিল্পীভাই বলে। শিশু-কিশোদের কাছে এগুলো বিটিভির জনপ্রিয়তম অনুষ্ঠান।
এছাড়া শিশুদের জন্য ইউনিসেফের শিক্ষামূলক ‘মীনা’ ও ‘সিসিমপুর’ নামে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নির্মাণ প্রকল্পের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরু হয় তাঁর হাত দিয়ে ১৯৬৬ সালে। সেই সাদাকালো টেলিভিশন যুগে উইলিয়াম শেকসপিয়রের টেমিং অফ দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর নাটক মুখরা রমণী বশীকরণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবীসহ অনেক বিখ্যাত নাটকের প্রযোজনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের আগে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন পাকিস্তান টেলিভিশনের পরিচালক অনুষ্ঠান। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা নিলেও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সেই ভাষণ সেদিন প্রচার করা সম্ভব না হয়নি। তবে ভাষণটি রেকর্ডের ব্যবস্থা করা হয় এবং জনদাবির মুখে কর্তৃপক্ষ পরদিন রেকর্ডকৃত ভাষণ সম্প্রচারে অনুমতি দেয়। ১৯৭১-এর ২৩শে মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। জামিল চৌধুরী ও মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা এড়াতে ২২শে মার্চ রাত ১২টারও বেশি সময় ধরে অধিবেশন চালু রেখে দেশাত্মবোধক গান প্রচার করা হয়।
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধ শুরু হতেই মুস্তাফা মনোয়ার সব ছেড়ে চলে গেলেন কলকাতায়। শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গিয়ে তাঁদের চাঙা রাখতে তিনি পুতুলনাচ অর্থাৎ পাপেট দেখাতেন। তিনি দেখিয়েছেন একজন সাধারণ বাঙালি কৃষক ইয়াহিয়া খানকে আঘাত করতে করতে বলছেন – ‘আর কে কে মারবেন, আসুন।’ এভাবে পাপেটের কথা বলা দেখে দেশ ছেড়ে আসা দুঃখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটে। এরপর থেকে তাঁর পাপেট শো ছিল শরণার্থী শিবিরের অসহায় মানুষগুলোর কাছে আনন্দের উৎস। তিনি যেখানে যেতেন শিশুরা তাঁকে ঘিরে ধরত ‘পুতুলওয়ালা’ ‘পুতুলওয়ালা’ বলে।’ (সূত্র : জয়ধ্বনি ডট নেট)
এছাড়াও আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়া চিত্রশিল্পীদের উদ্বুদ্ধ করে গণহত্যা নিয়ে তাঁদের আঁকা এবং ছবির প্রদর্শনী আয়োজনে কামরুল হাসানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। এতে আরো অংশ নিয়েছেন – দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুন্ডু, প্রাণেশ মণ্ডল, বীরেন সোম প্রমুখ শিল্পী। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানও শিল্পীদের এই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইসহ বড় বড় শহরে এই প্রদর্শনী হয়। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার পূজাসংখ্যায় শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস জাহান্নাম হইতে বিদায়ের ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় ১৯৮৯ সালে বিটিভির পঁচিশ বছরপূর্তি উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী রামপুরা টিভি ভবনের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে দেশ-বিদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন হয়, তাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ ডাকসু সাংস্কৃতিক দলের শিল্পীদের অংশগ্রহণে কবি শামসুর রাহমানের কবিতা অবলম্বনে আমার গ্রন্থনা ও ডাকসুর সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক শিল্পী অশোক কর্মকারের নির্দেশনায় নৃত্য-গীতি-আলেখ্য স্বাধীনতা তুমির মঞ্চায়ন হয়। ভারতীয় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই এখানে সংগীত পরিবেশন করেন।
সরকারি চাকরির পেশাগত জীবনে তিনি পাকিস্তান টেলিভিশনের অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে কর্মাধ্যক্ষ, উপমহাপরিচালক এবং ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকার তাঁকে প্রথমে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এরপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে নিযুক্তি দেয়। গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট থেকেই তিনি ১৯৯২ সালে অবসরগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার।
১৯৯৩ সালে ঢাকায় আয়োজিত সাফ গেমস অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত ও রঙিনভাবে উপস্থাপনের জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় নির্মিত মাসকাট হরিণশাবক মিশুক ও ব্যাঘ্রশাবক অদম্য দারুণ সাড়া জাগিয়েছিল। সচল প্রাণবন্ত মাসকাটের সঙ্গে রুনা লায়লার গান পুরো স্টেডিয়ামকে মাতিয়ে দিয়েছিল। একে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য পেছনের পরিকল্পক মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর ওই টিমে বিটিভির পরিচালক আনোয়ার হোসেন এবং আমিসহ অনেকেই যুক্ত ছিলাম। মনোয়ার স্যার কাগজে অদম্যর একটা ড্রয়িং আমার হাতে দিয়ে বলেন, ‘এটিকে দশগুণ বড় করে হুবহু আঁকতে হবে। পারবে?’ আমি সেদিন অনেকগুলো মোটা বাঁশ কাগজ জোড়া দিয়ে সেটি রোল করে রেখে দিলাম। পরদিন থেকে শুরু করলাম ড্রয়িং। সাফ গেমসের কাজ নিয়ে সে এক মহাযজ্ঞ লেগেছিল মনোয়ার স্যারের স্টুডিওতে! স্যার সবার কাজ দেখে ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে দিতেন।
মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের সঙ্গে আমাদের অসংখ্য স্মৃতি। বহুবার স্যারের বাসায় গেছি বিটিভি এবং চারুশিল্পীদের নানা কাজে। ২০১৪ সালে তৎকালীন মহাপরিচালক কবি আসাদ মান্নানের অনুরোধে বিটিভির পঞ্চাশ বছরপূর্তির লোগো করেছিলেন তিনি। আমাদের শিল্পনির্দেশনা শাখার আয়োজনে আর্ট ক্যাম্প উদ্বোধন করে ছবি এঁকেছেন, অংশগ্রহণকারী অনুজ শিল্পীদের উৎসাহ জুগিয়েছেন।
আমার অগ্রজ সহকর্মী শিল্পী মো. জালাল উদ্দিন বাংলাদেশের তিনজন নারী শিল্পী – ফরিদা জামান, নাসরীন বেগম ও কনক চাঁপা চাকমার শিল্পরীতি নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। আমি ধারাবর্ণনায় কণ্ঠ দিয়েছি আর মুস্তাফা মনোয়ার স্যার তাঁদের চিত্রকর্মের ধ্যান-ধারণা নিয়ে আলোচনা করায় প্রামাণ্য কাজটি মূল্যবান হয়ে ওঠে। একাধিক টিভি চ্যানেলে সেটি বারকয়েক প্রচার হয়।
এছাড়া ২০২৩ সালে শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের আয়োজনে নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনীর সমাপনী অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ার প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। আর আমি ওই প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনার জন্য ছিলাম প্রধান আলোচক। ওই আয়োজনে দীর্ঘ সময় তাঁর সান্নিধ্যের সুযোগ পেয়েছি। আমি ও আমার স্ত্রী তাঁর সঙ্গে ছবি তুলেছি।
সংস্কৃতি অঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পান মুস্তাফা মনোয়ার। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে সুলতান স্বর্ণপদক, ২০১২ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। বড় লজ্জার কথা – মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা সত্ত্বেও সরকার মুস্তাফা মনোয়ার ও সন্জীদা খাতুন প্রমুখ গুণীকে স্বাধীনতা পদক প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে।
আমাদের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রকদের মন পাঠ করে চলেননি তাঁরা। চলেছেন দেশের ও দশের মঙ্গল কামনা নিয়ে। আমাদের সমুদয় নীচতা ও ক্ষুদ্রতা থেকে তাঁরা বেঁচে থাকতেও যেমন দূরে ছিলেন, মৃত্যুর পরে তো আরো মুক্ত ওই গুণীরা।
মুস্তাফা মনোয়ার বেঁচে থাকবেন শিশুদের কাছে তাঁর বিপুল কাজের জন্য; তেমনই আমাদের সংস্কৃতিজনদের হাতে ধরে শিল্পবোধ শেখানোর শিক্ষক হিসেবে তাঁর আদর্শই আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করবে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.