কয়েকবছর আগে কোলকাতা থেকে কয়েকজন লেখক, প্রকাশক ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। উনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন তখন ওঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। জেনেছিলাম, বাংলা সাহিত্যের খবরাখবর উনি ভালো রাখেন।
সেবার আমাদের ঢাকায় যাওয়ার একটিই উদ্দেশ্য ছিল। কোলকাতায় আমাদের নতুন বই বের হতেই তিনদিনের মধ্যে সেগুলোর পাইরেট এডিশন ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম সেগুলোতে ঢাকার বাংলাবাজারের বেনামি ঠিকানা ছাপা হতো। পরে সেটি বদলে গেল। কোলকাতার বইয়ের হুবহু ছাপতে লাগলেন পাইরেটরা। এমনকি কোলকাতায় প্রকাশকদের নাম-ঠিকানাও। একই বই একাধিক পাইরেট ছাপছেন। সেসব বই নিয়ে তাঁরা চলে যেতেন বিভিন্ন জেলার দোকানে। আইনসংগত বই জেলার দোকানদার যখন শতকরা চল্লিশ শতাংশ কমিশনে পেতেন তখন পাইরেটরা ষাট শতাংশ কমিশন তাঁদের বাকিতে দিয়ে আসতেন। একই বই নিয়ে চার-পাঁচজন পাইরেট একই দোকানদারের কাছে যেতেন। দোকানদার অবস্থা বুঝে একষট্টি, বাষট্টি শতাংশ কমিশন আদায় করে বই নিতেন। সেই বইয়ের দাম মাসখানেক বাদে পাইরেটরা পেতেন। যেহেতু লেখককে কিছু দেওয়ার দায় নেই, বিজ্ঞাপনের খরচ নেই, একবার ফিল্ম করিয়ে নিলে আবার কম্পোজের জন্যে পয়সা লাগছে না, তাই ওই কমিশন দেওয়ার পরও পাইরেটদের লাভ হয়। ফলে ন্যায্য দামে আইনসংগতভাবে ভারত থেকে নিয়ে আসা বই বিক্রি বন্ধ হয়ে গেল। তার ওপর আরও একটি সমস্যা তৈরি হতো। ধরা যাক, আমার কোনো লেখা কোলকাতা বা ঢাকার কাগজে ছাপা হয়েছে, বই হবার আগে আমি পরিমার্জনা করব বলে ঠিক করেছি, দেখলাম সেটি পাইরেটরা ছেপে ফেলেছেন। তখনও আমি ঠিক করিনি কোলকাতার কোন প্রকাশককে বইটা ছাপতে দেবো। ওঁরা নিজেদের পছন্দমতো কোলকাতার কোনো প্রকাশকের নাম-ঠিকানা ছেপেছেন, এমনকি উৎসর্গও করে দিয়েছেন আমার হয়ে এমন কাউকে যাকে আমি চিনি না। প্রচ্ছদও ওঁদের শিল্পীদের দিয়ে আঁকানো। প্রথম যিনি এই কাণ্ডটি করতেন তাঁকে অনুসরণ করতেন অন্য পাইরেটরা। তারপর কলকাতা থেকে যখন আসল বইটি বের হলো তখন সেগুলোই পাইরেটরা ছাপতেন। অর্থাৎ একই বইয়ের দুরকম প্রচ্ছদ ওঁদের কল্যাণে দেখা গেল। ইতিমধ্যে ঢাকার একটি দৈনিক সমীক্ষা করে খবর ছাপলো, আমার গর্ভধারিণী উপন্যাস নাকি পাইরেটরা এক লাখ কপি বিক্রি করেছেন।
এ-ও মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, উপন্যাসের অনেক পাতা না ছেপে তার সারাংশ নিজেরাই লিখে ছেপে ওঁরা খরচ বাঁচাচ্ছেন, তখন মনে হলো এর প্রতিবাদ করা দরকার। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার বার্ন কনভেনশনে সই করেনি এবং আমাদের ক্ষেত্রে ঢাকায় গিয়ে মামলা করা সম্ভব নয়, তাই ঠিক করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করব, ওই কুকর্ম বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে। কলকাতা থেকেই ওঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলাম, পেয়েছিলামও।
দলে ছিলেন প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আমি, আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসু এবং মিত্র ও ঘোষের সবিতেন্দ্রনাথ রায়। দুপুর তিনটের সময় আমরা সংসদ ভবনে পৌঁছালাম। আগে থেকেই জানানো ছিল বলে ঠিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পৌঁছাতে অসুবিধে হয়নি। তখন সংসদ চলছিল। এবং তার মধ্যেই সময় বের করে প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন। আমরা মূল বই এবং তার পাইরেটেড কপি তাঁর টেবিলে রেখে বক্তব্য জানালাম।
উনি হেসে সেক্রেটারিকে বললেন, বইগুলো আলাদা না রেখে মিশিয়ে দিতে। তারপর বললেন, ‘আপনারা বললেন, হুবহু নকল করছে পাইরেটরা, কিন্তু আমি বলে দিতে পারি কোনটা নকল কোনটা আসল।’ তারপর কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে দুটো বই তুলে ধরে বললেন, ‘এটা আসল, এটা নকল।’
আমরা জানালাম উনি ঠিক বলেছেন। উনি হাসলেন, ‘তাহলে বলুন, বাঙালি আর কিছু না পারুক, নকল করতে সেরা।’
এটা প্রশংসা না নিন্দা, আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম। সুনীলদা অনুরোধ করলেন, যদি এটা বন্ধ করা যায় তার ব্যবস্থা নিতে। উনি সেক্রেটারিকে বললেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যাপারটা জানান।’
এইসময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘরে ঢুকে অভিমানী গলায় প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন, গতকাল তিনি সংসদে যে-বক্তৃতা দিয়েছেন তার অংশবিশেষ বিটিভি দেখিয়েছে, ফলে মানুষ তাঁর বক্তব্য বুঝতে পারেনি।
ওঁদের এই আলোচনার সময় আমাদের থাকা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের বললেন, একবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে।
সেখানে গিয়ে শুনলাম তিনি ঘরে নেই। একজন আমলা জানালেন, ‘ব্যাপারটা খুবই অন্যায়, তবে কি জানেন, আমাদের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাচ্ছে। যেহেতু পাইরেটদের জন্যে বাজারে বই পাওয়া যাচ্ছে – তাই আর ডলার দিয়ে বই আমদানি করতে হচ্ছে না। তবু বলব, ব্যাপারটা খুব খারাপ।’
আমরা গেস্টহাউসে ফিরে এলাম হতাশ হয়ে। বুঝলাম, এতে কোনো লাভ হলো না। আমরা যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি, তা বিটিভি প্রচার করেছিল। সন্ধের পর এক ভদ্রলোক এলেন আমার কাছে। বললেন, ‘প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জনাব এরশাদ আমাদের সঙ্গে ওই বিষয়ে কথা বলতে চান।’ এই কারণে তিনি আমাদের আগামীকাল সকালে নাস্তার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
আমি বললাম, ‘এ-তো ভালো কথা। কিন্তু সবাইকে জানাই, কে কেমন ব্যস্ত থাকবেন তাতো জানি না। আপনি কাল সকালে একবার ফোন করবেন।’
সন্ধের পরে সুনীলদার ঘরে আড্ডা বসেছিল। ইমদাদুল হক মিলন থেকে অনেক কবি-লেখক সেই আড্ডায় মশগুল ছিলেন। আমি ওঁদের সামনে জনাব এরশাদের প্রস্তাবটা পেশ করতেই ওঁরা তীব্র আপত্তি জানালেন। সবাই বলতে লাগলেন, এরশাদ গণতন্ত্রের শত্রু, সাধারণ মানুষ তাঁকে অপছন্দ করেন, নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি উদ্গ্রীব, কিন্তু কবিতা নিজে লেখেন কিনা সন্দেহ। লিখলেও সেগুলো কবিতাই হয় না। এরকম লোক চাইবেন আমাদের সঙ্গে মিশে কবি হিসেবে জাতে উঠতে। কিন্তু আমরা ওঁর কাছে নাস্তা খেতে গেলে বাঙালি পাঠকরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হবেন। সুনীলদা চিরকালই বিতর্ক তৈরি করতে চান না। বললেন, ‘থাক। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি এদেশে। আর কী দরকার!’
দেখলাম, বাদল বসুও ওঁর সঙ্গে একমত। সবিতেন্দ্রনাথ রায় বললেন, ‘রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজের কাছে সকালে যেতে হবে, আগে থেকেই ঠিক করা আছে।’
কেউ যখন যাচ্ছেন না তখন আমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
জনাব এরশাদ নিজে কবিতা লেখেন, না অন্য কাউকে দিয়ে লেখান, তা আমি জানি না। বাংলাদেশের মানুষ ওঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচার করবেন। কিন্তু জনাব এরশাদ আমাকে অন্য কারণে আকর্ষণ করতেন। ভদ্রলোকের জীবনযাপন, নারীর প্রতি আকাক্সক্ষা, বইপড়ার নেশা মোটেই প্রেসিডেন্টসুলভ ছিল না। উনি যখন জেলে বন্দি ছিলেন তখন আমার সাতকাহন উপন্যাসের প্রথম পর্ব পড়ে দ্বিতীয় পর্ব পড়তে চেয়েছিলেন – এই খবর ঢাকার কাগজে বেরিয়েছিল। একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেলে বসে একটি কিশোরীর সংগ্রামের কাহিনী পড়ে উদ্বুদ্ধ, এটা আমাকে বিস্মিত করেছিল। অপুত্রক জনাব এরশাদের হঠাৎ পুত্রলাভ, রাতদুপুরে নতুন প্রেমিকার সঙ্গে মিলতে সেক্রেটারির বাড়িতে যাওয়া, আর এক প্রেমিকাকে সাংসদ করে দেওয়ায় সম্পর্কত্যাগের চেষ্টা করেও নাজেহাল হওয়া – যে-কোনো উপন্যাসের মশলাদার চরিত্র হতে পারে।
পরের দিন ফোন না করে ভদ্রলোক এলেন আমাদের নিয়ে যেতে। ওঁরা কেউ যেতে পারবেন না বলে দুঃখিত হলেন। বললেন, ‘স্যার বলছিলেন, আপনারা যদি সবাই ওঁর কাছে সমস্যাটা খুলে বলতেন, তাহলে উনি দলের সদস্যদের বলতেন বাংলাবাজার অবরোধ করতে।’
বললাম, ‘মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। আমরা বিদেশি, আর কোনো জটিলতার মধ্যে যেতে চাই না।’
তখন ভদ্রলোক বললেন, ‘বেশ। উনি আপনার পাঠক, সাহিত্যের কথা বলতে আপনি ওঁর কাছে চলুন। নিরাপত্তার কারণে ওঁর পক্ষে আসা সম্ভব নয়।’
যদি সাধারণ মানুষ জনাব এরশাদকে অপছন্দ করেন তাহলে তাঁর সঙ্গে যে কথা বলতে যাবে সে-ও কেন কালোতালিকাভুক্ত হবে? আমি গিয়েছিলাম। তারপরে ঢাকার কিছু দৈনিকে আমাকে কটূক্তি করে লেখা ছাপা হয়েছিল। সেই সকালে জনাব এরশাদের সঙ্গে আমার কী কথা হয়েছিল তা না জেনেই ওঁরা আমাকে আসামি বানিয়েছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, জনাব এরশাদকে নিয়ে একটা দারুণ উপন্যাস লেখা যায়। তাই সে-সময় ব্যাপারটা নিয়ে একটিও কথা লিখিনি। আজ এই কয়েক মাসে কালি ও কলমের পাঠকদের সঙ্গে যে-আত্মীয়তা তৈরি হয়ে গেছে তাতে মনে হয় কথাগুলো এই কাগজের পাঠকদের জানানো দরকার।
সেই ভদ্রলোকের গাড়ি যখন আমাকে জনাব এরশাদের বাড়িতে নিয়ে গেল তখন দেখলাম সেটির আয়তন বিশাল। বড় গেট পার হলাম উনি সঙ্গে থাকায়। সেখানেও পাহারাদার। তারপরে অনেকটা বড় লন। রুমের একপাশে বোধহয় অফিসঘর। সেখানে জনা চল্লিশেক মানুষ, যাঁদের দেখতেই বোঝা যায় গ্রাম থেকে এসেছেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘ওঁরা স্যারের জেলার মানুষ। দরকারে স্যারের কাছে আসে।’
সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে একটি বিশাল সাজানো বসার ঘরে নিয়ে এলেন আমাকে পথপ্রদর্শক। একটি দামি সোফায় বসতে বলে বললেন, ‘স্যারকে খবর দেওয়া হয়েছে। উনি আসছেন, একটু অপেক্ষা করুন, প্লিজ।’
ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন বাইরে।
আমি চুপচাপ বসে দেওয়ালে ঝোলানো ছবি দেখছি। ঘরভর্তি অনেক স্যুভেনির। আমি যাঁর বসার ঘরে বসে আছি তিনি এককালে বাংলাদেশের দণ্ডমুণ্ডের অধিকর্তা ছিলেন। আজ অবধি আমি কখনো বর্তমান অথবা কোনো প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলিনি। এইসময় তিনি এলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সালাম আলেকুম।’ ওঁর পরনে সিল্কের লুঙ্গি এবং দামি পাঞ্জাবি। আমি উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলাম। হাসিমুখে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আমি এরশাদ।’
‘সমস্ত পৃথিবীতে আপনি পরিচিত।’
‘ছি ছি। আমি একটি সামান্য মানুষ। বসুন।’
উনি আমার পাশে বসে বললেন, ‘প্রথমে আপনার ডানহাত একটু স্পর্শ করতে চাই!’
‘কেন?’ আমি অবাক হলাম।
‘যে-হাত দিয়ে ওইসব লেখা বেরিয়েছে,- দিন।’
আমরা বসে করমর্দন করলাম। তারপর বললেন, ‘শুনলাম অন্যরা ব্যস্ত থাকায় আসতে পারলেন না। আমি গতকাল টিভিতে আপনাদের ব্যাপারটা শুনেছি। এই সরকার কিছুই করবে না। আপনারা যদি বিরোধী নেতা হিসেবে আমার কাছে আসতেন, তাহলে আমি আর কিছু না পারি, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার করতে পারতাম। কিন্তু ওঁরা এলেন না। হয়তো আমাকে গুরুত্ব দিতে চান না।’ জনাব এরশাদ বললেন।
‘ব্যাপারটা তেমন নয়। আমরা মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসেছিলাম। তিনি অনুগ্রহ করে কথা শুনেছেন। আশা করছি ব্যবস্থা নেবেন। তাই জটিলতা বাড়াতে চাননি ওঁরা। তাছাড়া আগে জানা না থাকায় একটু অসুবিধে হয়েছে। আমি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
উনি মাথা নাড়লেন অবিশ্বাসে, ‘থাক। অন্য কথা বলি। জেলে বসে আপনার বই আমি পড়েছি। অনবদ্য। আপনি কি আমার কবিতা পড়েছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী রকম মনে হয়েছে?’ তাকালেন তিনি।
‘ঠিক আছে। দারুণ কিছু মনে হয়নি।’
‘আমি খুব চেষ্টা করি। আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু এই কবিতা নিয়েও বিরোধীরা অপপ্রচার করে। আমার দুর্ভাগ্য।’
‘আমি কি আপনার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারি?
‘স্বচ্ছন্দে।’
‘বাংলাদেশের বন্ধুরা বলেন, আপনি গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন।’
‘কী করে বলেন ওঁরা, জানি না। আমার আগে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের সময়ের বাংলাদেশ আর আমার সময়ের বাংলাদেশের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক তা অন্ধও বলে দেবে। আমি বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছি, পরিচিত করিয়েছি। আমার সময়েই রাস্তাঘাটের বিপুল উন্নয়ন হয়। বন্যার সময় আমি মানুষের কাছে জলভেঙে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করেছি, তাদের কী কী অসুবিধে হচ্ছে। এসব নিশ্চয়ই আপনিও জানেন।’
‘এগুলো আমি শুনেছি। কিন্তু যে-কোনো সরকারি কাজ পেতে গেলে আপনার স্ত্রীকে কমিশন দিতে হতো। বাজারে ওঁর নাম মাদাম টেন পার্সেন্ট বলে চালু ছিল। ব্যাপারটি নিশ্চয়ই আপনি জানতেন।’
‘আমাকে কেউ ওসব বলার সাহস হয়তো পায়নি। তাছাড়া, আপনি তো জানেন, স্ত্রীর আচরণের ওপর স্বামীর কন্ট্রোল সবসময়ে থাকে না।’
‘কিন্তু আপনার পুলিশ গণতান্ত্রিক মিছিলের ওপর নির্দয়ভাবে গুলি চালিয়েছিল।’
‘মিথ্যে কথা। দাঁড়ান। আপনাকে দেখাই -।’
জনাব এরশাদ নিজেই উঠলেন। সামনের টিভিতে একটা ক্যাসেট চালিয়ে দিলেন। আমি দেখলাম, বিশাল মিছিল এগিয়ে আসছে এরশাদবিরোধী ধ্বনি দিতে দিতে। পাশে বসে বললেন, ‘মিছিলের সামনে ওই অর্ধনগ্ন লোকটিকে লক্ষ করুন।’ দেখলাম একটি লোক, সর্বাঙ্গে চেন বাঁধা, উন্মাদের মতো চিৎকার করছে। পুলিশ তাদের থামতে বলল। এদিকে পুলিশবাহিনী, উলটোদিকে মিছিলের মুখ।
জনাব এরশাদ বললেন, ‘এবার দেখুন।’
দেখলাম কেউ একজন কিছু ধরিয়ে দিল লোকটির হাতে। পজ টিপে ছবি থামিয়ে জনাব এরশাদ বললেন, ‘কারো হাতে যখন বোমা পৌঁছে যায় তখন তাকে কী বলা হয়? উগ্রপন্থী? দেখুন ওই লোকটি সামনের পুলিশবাহিনীকে লক্ষ্য করে বোমাটি ছুড়ছে।’
ছবি চালু হলো। দেখলাম লোকটি বোমা ছুড়ল। একজন পুলিশ অফিসার আহত হয়ে পড়ে যেতে যেতে গুলি করলেন। লোকটি পড়ে গেল মাটিতে।
‘আমার কাছে যখন খবর এলো আমি পুলিশ অফিসারের এক্সপ্লানেশন চাইলাম। সে বলল, আত্মরক্ষা করার জন্যে গুলি করেছিল। লোকটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানলাম সে নেহাৎই ভ্যাগাবন্ড। গণতন্ত্র রাজতন্ত্র কিছুই বোঝে না। ব্রেনওয়াশ করে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবু সেই রাত্রে আমি বস্তির ভেতরে গিয়ে ওর বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। বাবা চুপচাপ বসেছিল। আমায় দেখে বলল, ‘মানছি’ ছেলেটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে বিশ-পঞ্চাশ টাকা তো দিত। সেটাও আর পাবো না।’ আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, যতদিন জীবিত থাকব ততদিন প্রতিমাসের এক তারিখে তাকে এক হাজার টাকা দিয়ে যাব। সমরেশবাবু, আমি ক্ষমতা থেকে সরে আসার পরেও আজ পর্যন্ত কথার খেলাপ করিনি।’
‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনি বাধ্য হলেন পদত্যাগ করতে।’
‘না বাধ্য হইনি। আমি সৈন্যবাহিনীকে ব্যবহার করে বহুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতাম। কিন্তু সেটা চাইনি। আমি মার্কোস নই। তাহলে যে-কটাদিন সময় পেয়েছিলাম তার মধ্যে প্রচুর ধনসম্পত্তি নিয়ে বিশেষ বিমানে কোথাও চলে যেতে পারতাম। আমি যেতে চাইনি। এই বাংলাদেশ আমার মা। এখান থেকে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার মাকে আমি ত্যাগ করতে পারি না।’
এবার শেষ কথায় এলাম। বললাম, ‘আপনি যখন দেশের প্রধান তখনো আপনার মহিলা-প্রীতির কাহিনী শুনতে পেতাম। মনে আছে, শিল্পদপ্তরের একজন বড়কর্তার বাড়িতে আমার নেমন্তন্ন ছিল, হঠাৎ রাত সাড়ে দশটায় খবর এলো আপনি সেখানে আসবেন। ফলে চলে আসতে হয়েছিল আমাকে। তখন আপনি রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু শুনেছি আপনি সেখানে একজন মহিলার সঙ্গে গল্প করতে গিয়েছিলেন। আপনার একজন দীর্ঘকালীন বান্ধবীর কথা সবাই জানেন, কিন্তু আপনি নতুন বান্ধবীতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ঠিক কিনা?’
জনাব এরশাদ হাসলেন, ‘দেখুন, মানুষ আমাকে ভালোবাসে। আমার জেলার মানুষ আমাকে ছাড়া কাউকে ভোট দেবে না। আমি যদি লম্পট হতাম তাহলে কি দিত? আমার জেলার সব কয়েকটি আসনে যদি দাঁড়াই তাহলে কোনোটাতেই হারব না। এটাই আমার গর্ব।’
বললাম, ‘আমার প্রশ্নের জবাব কিন্তু পেলাম না।’
জনাব এরশাদ বললেন, ‘এখন আমার সাতষট্টি বছর বয়স। শরীর, হৃদয় সব ঠিকঠাক আছে। আপনাকেই বলি, কারও চোখে আহ্বান থাকলে সাড়া না দিয়ে আমি পারি না।’পাইরেসি এখনো থামেনি। থামার কোনো লক্ষণ নেই। সরকারের বদল হয়েছে, কিন্তু পাইরেটরা একই থেকে গেছে। আজকাল আর এ-নিয়ে চিন্তা করি না। কিন্তু জনাব এরশাদের শেষ কথাটা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। তার আগে উনি যা বলেছেন সব বানানো হতে পারে, কিন্তু কজনের বুকের পাটা আছে মহিলাসংক্রান্ত দুর্বলতা স্বীকার করার? সবাই তো গোপনেই রাখতে চায়। ব্যাপারটা শুনে ঢাকার এক বন্ধু বলেছিল, ‘একজন পাইরেটকে জিজ্ঞাসা করো, কেন করেন? দেখবে সে-ও বলবে, কী করব, না করে পারি না।’ কিন্তু দুটো কি এক হলো? কী জানি!

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.