ঢাকার নাটক : ঢাকার বাইরের ভাবনা
যেহেতু আমি নাটকের মানুষ, নাটক নিয়েই লিখব। আমি ঢাকায় থাকি। এসেছি মফস্বল থেকে। ঢাকার নাটকচর্চার ফলে মফস্বলে কী প্রভাব পড়ছে লিখব এসব বিষয় নিয়েই।
একটা কথা বোধকরি সবাই স্বীকার করব যে, আমরা যারা ঢাকায় মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত তাদের বেশির ভাগই ঢাকার বাইরের শহর থেকে এসেছি এবং যারা ঢাকায় এসেছি তারা কোনো-না-কোনোভাবে তাদের নিজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একটি শূন্যতা সৃষ্টি করে এসেছি। উদাহরণ দেওয়ার দরকার না থাকলেও যা বলতে চাই তা বলার সুবিধার্থে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৮০ সালের দিকে কুষ্টিয়া শহরের মোট নাটকের দল ছিল ষোলোটি, আনুপাতিক হারে যা বেশ উল্লেখযোগ্য। প্রতি মাসেই কমপক্ষে ৬-৭টি দলের নাটকের প্রদর্শনী হতো। প্রতি দলেই কর্মীর সংখ্যা ছিল ন্যূনপক্ষে পঁচিশ, বড় দলগুলোতে চল্লিশের ওপরে। নাটকের সঙ্গে কবিতা, গান ইত্যাদি মিলে কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল জমজমাট। এখন এই ২০০৪-এ কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চলছে দুরবস্থা। একসময়কার সুপ্রতিষ্ঠিত দল নূপুর, বোধন, গড়াই, উদীচী নাটক করার মতো সংগতি রাখে না আর। এর সবচেয়ে বড় কারণ যেটি, সেটি হলো কর্মীর অভাব। কর্মীরা ঢাকায় চলে গেছেন জীবিকার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের চোখে দর্শনযোগ্য হবার আশায়। বাংলাদেশের অন্য শহরগুলোর অবস্থা যে কুষ্টিয়ার চেয়ে ভালো, তা নিশ্চয়ই কেউ জোর গলায় বলতে পারবেন না। যে-পরিস্থিতির কথা বললাম তা যদি সবই সত্যি বলে মেনে নিই, তবে যে-অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে তা হলো, ঢাকার বাইরে যারা যোগ্যতার ভিত্তিতেই দাপটের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যচর্চা করেছেন তারা এখন ঢাকায়।
সুতরাং অন্যভাবে বলা যায় যে, ঢাকার নাট্যাঙ্গনে নিজের শহরত্যাগী যোগ্য কর্মীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বড় নাট্যদলগুলোর দরজায়। বড় দলগুলো দরজা না খুললে, মাঝারিদের দরজার তালা না খুললে ছোট দলগুলোতে ঢুকছেন তারা। এভাবে প্রতিদিন বাড়ছে প্রতিযোগিতা। টিকে থাকার প্রতিযোগিতা, সেট টানার সুযোগ পাবার প্রতিযোগিতা, মিউজিকের সরঞ্জামাদি টানার, হল-ব্যবস্থাপনা করার সুযোগের প্রতিযোগিতা, তারপর অভিনয় কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজের সুযোগ পাবার প্রতিযোগিতা, তারপর শুরু হয় তারকাযুদ্ধ, তারপর তত্ত্বযুদ্ধ এবংশেষমেষ ভাঙন। এক ভেঙে দুই, দুই ভেঙে তিন ইত্যাদি ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ-রকমটা ঘটছে কেন? কারণ নানাবিধ, তবে মূল কারণ হয়তো সামন্ততান্ত্রিক যুগের শহর-সৃষ্টির পটভূমি এবং পরবর্তীকালে কনজুমারিজম-বেস্ড ওয়েস্টার্ন আরবানাইজেশন প্রোসেসের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গড়ে ওঠা রাজধানী কনসেপ্ট, যার মূল ভিত্তিই হলো কেন্দ্রীয়করণ।
প্রত্যেকটি রাষ্ট্রেরই চোখ থাকে, যা দিয়ে রাষ্ট্র সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে দর্শন করে এবং সকল মহৎ প্রচেষ্টাকে আলোকিত করে; কিন্তু কেন্দ্রীয়করণের ফলে রাষ্ট্রের চোখের পরিধি কমে কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং ফলে রাষ্ট্রের কাছে দর্শনযোগ্য হবার জন্য সবাইকে কেন্দ্রের দিকে ছুটতে হয়। ফলে সংস্কৃতির পরিমণ্ডল ছোট হয়ে রাজধানীনির্ভর হয়ে যায়, সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
এ-রকম একটা সীমাবদ্ধ জায়গায় আমরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিসংখ্যক যোগ্য এবং সৃজনশীল কর্মী কাজ করছি এবং রাষ্ট্রের চোখে দর্শনযোগ্য হবার চেষ্টা করছি। সবাই পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবার চেষ্টা করছি। ফলে বেড়ে যাচ্ছে প্রতিযোগিতা, বেড়ে যাচ্ছে চাটুকারিতা, তোয়াজ, তৈলমর্দন, কাদা ছোড়াছুড়ি, ভাঙন। একদিন দেখা যাবে যে, কলম-তুলি অথবা মঞ্চের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে যাবে অশ্রাব্য ভাষায় একে অন্যকে গালিগালাজ এবং তৈলমর্দনশিল্প। এ-সংকট-উত্তরণের জন্য সবার আগে দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে। এদেশে ফুটবল, ক্রিকেটের যে-ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা তার ছিটে পরিমাণও যদি সংস্কৃতির জন্য হতো তবে এদেশের সংস্কৃতির চর্চা এক অন্য রূপ নিত। আমাদের কত সমস্যা – মঞ্চ, দর্শন, প্রযুক্তি অনেক অনেক সমস্যা। খেলার মাঠের উন্নতির জন্য সরকারের অনেক আন্তরিকতা। কিন্তু মঞ্চে আমাদের এখনো ভ্যাপসা গরমের মধ্যে আদ্দিকালের আলো ও শব্দপ্রযুক্তি নিয়ে ঘাম ঝরিয়ে যেতে হচ্ছে। এ-যেন টিনের তলোয়ার নিয়ে লড়াই। লক্ষ্যে পৌঁছানোই ভীষণ দায়।
থিয়েটার : আমাদের দ্বারস্থ থিয়েটার
থিয়েটারকে আমি একদমই বুঝতে পারিনি। থিয়েটারের অন্তরকে আমার অন্তরে স্থাপন করতে পারিনি। সহস্রাব্দ-প্রাচীন বাংলা থিয়েটারকে চিনতে পারা বা বুঝতে পারাও খুব সহজ নয়। তবে এই তেইশ বছর থিয়েটারের সঙ্গে থেকে, থিয়েটারের মধ্যে থেকে আমাদের থিয়েটারের একটা বাহ্যিক রূপ আমি দেখেছি। সে-রূপ দেখে কখনো মোহিত হয়েছি, কখনো ব্যথিত হয়েছি। থিয়েটারকে ভালোবেসে যত কষ্ট পেয়েছি, ভালোলাগার অনুভূতি তার কাছে শিশুতুল্য। এখন মাঝে মাঝেই থিয়েটারকে ভালোবাসার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করি। নিজেকে প্রশ্ন করি, কেন ভালোবাসলাম এ-থিয়েটারকে?
নাট্য-সমালোচক মফিদুল হক দুই বাংলার থিয়েটার পত্রিকায় এক প্রবন্ধে ঢাকার মঞ্চনাটকের উত্থান ও বিকাশের কথা লিখেছেন। তিনি দাবি করেছেন, স্বাধীনতার পর শিল্পের যে-শাখায় সবচেয়ে বেশি উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে তা হচ্ছে মঞ্চনাটক। চলচ্চিত্র না, সেই অর্থে সাহিত্য না, নাটক। মঞ্চনাটক। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃহল নাট্যপ্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ভ্রƒণের সঞ্চার হয়। সে-নাট্য-প্রতিযোগিতার একটি বড় শর্ত ছিল, নাটকের পাণ্ডুলিপি হতে হবে দলের নিজস্ব নাট্যকারের লেখা। এই বিশেষ একটি শর্তই সেদিন বদলে দিয়েছিল প্রতিযোগিতার চেহারা। আমরা পেয়েছিলাম বেশ কজন নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা। সেলিম আল দীন, আল মনসুর, হাবিবুল হাসান, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, ম. হামিদ, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযূষ বন্দোপাধ্যায় এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক এই নাট্যচর্চা মুদ্রার এক পিঠ। মুদ্রার অন্য পিঠে ছিলেন নাটকে নিবেদিতপ্রাণ আরো অনেকে, স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই যাঁরা নাটকের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। বাংলার মঞ্চনাটকের জন্য একটা সুগম পথ যাঁরা রচনা করে চলেছিলেন। আবদুল্লাহ আল মামুন, মমতাজউদদীন আহমেদ, মামুনুর রশীদ, আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পর এঁদের হাতেই গড়ে উঠল গ্রুপ থিয়েটারের ভিত্তি। অনেক নাট্যদল জন্ম নিল। থিয়েটার, আরণ্যক, নাগরিক, নাট্যচক্র, ঢাকা থিয়েটার। গ্রুপ থিয়েটার-আন্দোলনের জোয়ার বয়ে গেল ঢাকার মঞ্চে। এ-সময়ে গ্রুপ থিয়েটার সবচেয়ে লক্ষণীয় অনুষঙ্গ হলো নাট্যকর্মীদের থিয়েটারের প্রতি নিবেদন। মঞ্চের পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। থিয়েটার নিয়ে ভাবনা, থিয়েটারে নিজের শ্রম-ঘাম-মেধার নিঃশর্ত বিনিয়োগ।
এরপর অনেক সময় গেছে। সঙ্গে করে নিয়ে গেছে থিয়েটারের জৌলুস কিংবা হয়তো আমরাই ধরে রাখতে পারিনি আমাদের শুরুর সেই প্রাণ দিয়ে থিয়েটারকে ভালোবাসার উচ্ছ্বাস। থিয়েটার এখন আমাদের কাছে দ্বারস্থ। ক্রমে আমরাই থিয়েটারের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি।
আমাদের থিয়েটার এখন নাট্যকারের দ্বারস্থ। নাট্যকারদের এখন অনেক ব্যস্ততা। টেলিভিশনের জন্যে নাটক লিখতে হয়, এনজিওদের জন্যে নাটক লিখতে হয়, বিজ্ঞাপনচিত্র লিখতে হয়। এখন এসবকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন অনেক নাট্যকারই। জীবিকার বিপরীতে প্রাপ্তিশূন্য মঞ্চনাটক-রচনার বিষয়টি এখন অনেকের কাছে বোঝার মতো। নতুন নাট্যকারও তেমন আসছেন না। আমাদের থিয়েটার এখন অভিনয়-শিল্পীদেরও দ্বারস্থ। দলের কর্মীদের কাছ থেকে এখন একমাস আগে সিডিউল নিয়ে তবে মহড়ার দিনক্ষণ ঠিক করতে হয়। টেলিভিশনে অভিনয় ও নির্মাণকাজে ব্যস্ততম শিল্পীরা এখন আর মঞ্চনাটক করেন না। করেন না বলাটা ভুল, করতে পারেন না। তাদের অন্তরটা হয়তো কেঁদে যায় মঞ্চের জন্য, কিন্তু সবকিছু সামলে তারা মঞ্চের আলোয় আর আসতে পারেন না। ওই অন্তর কেঁদে যাওয়া পর্যন্তই। থিয়েটারকে দ্বারস্থ করে নিজেরা ‘তারকা’খ্যাতি অর্জন করেছেন, কিন্তু থিয়েটারের প্রতি তারা কোনো দায়বোধ করেন না। নতুন যেসব কর্মী দলে আসেন তাদেরও বেশির ভাগের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য থাকে টেলিভিশনে অভিনয়। আমাদের থিয়েটার দ্বারস্থ মিলনায়তনের কাছে। সম্প্রতি চালু হওয়া শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হল বাদে নাটকের জন্যে এখন একটিমাত্র মিলনায়তন। দুটো ছিল, সংস্কারের কাজে একটি বন্ধ আছে। কবে চালু হবে কেউ জানে না। আদৌ হবে কিনা সে-প্রশ্নও আছে। যখন ইচ্ছা চাইলেই মহিলা সমিতিতে নাটক করা যায় না। কোনো কোনো দল মাসে দুটো প্রদর্শনীর সুযোগ পায়। কোনো দল একবার, কোনো দল দুমাসে একবার। আর সবকিছুর পরে থিয়েটার দ্বারস্থ দর্শকের কাছে। পিটার ব্রুকের কথায়, একজন দর্শকই থিয়েটারের শর্ত পূরণ করে। থিয়েটারের পরিভাষায় এ-কথা সত্য হলেও আমাদের বাস্তবতা অন্যরকম। দর্শক কমছে আমাদের থিয়েটারের। হয়তো সব দলের বা সব নাটকের না, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দর্শকের উপস্থিতি কম। দর্শক যদি না আসে, দর্শকের জোয়ার যদি না ভাসায় আমাদের নাট্যপ্রচেষ্টাকে তবে থিয়েটারই তো ভেসে যাবে একদিন। তবে এতকিছুর পরও আমরা হতাশ নই। আমরা জানি নাটকের পোকা আমাদের মাথার মধ্যে আছে। আমরা জানি আমাদের মেধা আছে, শ্রম-ঘাম দেওয়ার সামর্থ্য আছে। আমাদের গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আছে। এসবের মিলিত প্রচেষ্টাই আমাদের পৌঁছে দেবে থিয়েটারের স্বর্ণযুগে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.