শিল্পী রশিদ চৌধুরীর মরণোত্তর একক চারুকলা-প্রদর্শনী শিল্পকলা একাডেমী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করেছে এবং বলা যায় তাদের এই প্রশংসার্হ আয়োজন সব শিল্পরসিকদের দারুণ তৃপ্তি ও আনন্দ দিয়েছে। কেননা শিল্পী রশিদ চৌধুরীর মতো জাতশিল্পীর সৃষ্টকর্মগুলো একজায়গায় একসঙ্গে দেখা একটি দুর্লভ শিল্প-অভিজ্ঞতা সবার কাছে। শিল্পকলা একাডেমীর পরিচালক শিল্পী সুবীর চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই প্রদর্শনী সার্থকতায় পূর্ণ হয়েছে। বিশেষ করে শিল্প-সংগ্রাহকদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে যেভাবে তিনি সবার কাছ থেকে শিল্পীর অমূল্য সৃষ্টকর্ম যোগাড় করে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন, তা এককথায় অনবদ্য। সেইসঙ্গে শিল্পকলা একাডেমী শিল্পী রশিদ চৌধুরীর ওপর একটি বস্তুনিষ্ঠ শিল্প-পুস্তক প্রকাশ করেছে, যেটি রচনা করেছেন শিল্পী ও শিক্ষক আবুল মনসুর এবং সম্পাদনা করেছেন শিল্পী সুবীর চৌধুরী। এটিও খুব প্রশংসার কীর্তি।
রশিদ চৌধুরী-সম্বন্ধে এরকম বলা যায় যে, তিনি শিল্পী হয়ে-ওঠার আগে থেকেই শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জীবনযাপন, কথাবার্তা, বন্ধুকৃতি, ব্যবহার, শিক্ষা, শিক্ষকতা, কর্মকুশলতা, সৃষ্টিশীলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা-প্রবণতা – সবকিছু শিল্পের জন্য উৎসর্গীকৃত ও নিবেদিত ছিল। জীবনের প্রতি মুহূর্তে তিনি যে-কোনো মাধ্যমের সৃষ্টশীলতা নিয়ে ব্যস্ত এবং নিয়োজিত ছিলেন। স্বল্পজীবনের অধিকারী শিল্পী মাত্র চুয়ান্ন বছর জীবিত ছিলেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিনি বিস্ময়করভাবে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে যে-অজস্র কাজ করে গেছেন, তা দেখলে বা জানলে অবাক হতে হয়। ১৯৩২ সালে জন্ম, ১৯৮৬ সালে মৃত্যু। ১৯৫৪ সালে সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে শিল্পশিক্ষা শেষ করে ১৯৫৬ সালে স্পেনের মাদ্রিদে ভাস্কর্য-শিল্পে এবং ১৯৬০ সালে ফরাসি দেশের প্যারিসে ফ্রেস্কো, ভাস্কর্য ও ট্যাপিস্ট্রিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। যতদূর সম্ভব জানা যায়, যদিও তথ্যটি বইতে লিপিবদ্ধ নেই, বিদেশ থেকে অর্থাৎ প্যারিস থেকে শিক্ষাগ্রহণশেষে ঢাকায় ফিরে এসে প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী করেন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরীবাগের বাড়িতে ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে। তিনি তখন বিদেশী স্ত্রী ফরাসি-ভাস্কর অ্যানিসহ নতুন আমদানিকৃত ফরাসি মোটরগাড়ি সিটরন নিয়ে ঢাকায় আসেন। সারাজীবন প্রচণ্ড শ্রম ও কষ্ট করে জীবনের সাথে শেষদিন পর্যন্ত কঠিন বাস্তবতা আর দুরারোগ্য কর্কটরোগের সঙ্গে অসম যুদ্ধ করে গেছেন, সেইজন্য তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং ছাত্রী জান্নাত চৌধুরী যথার্থভাবে তাঁকে শিল্পীশ্রমিক বলে আখ্যায়িত করে গেছেন। যে-কোনো অবস্থায় তাঁর সৃজনশীলতার বহুমুখী বিস্তার লক্ষ করা যেত। শিল্পীর সঙ্গে অনেকের মতো বর্তমান প্রবন্ধকারের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল এবং তা তাঁর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অংশ। মনে আছে, তিনি একবার ধানমন্ডির এক বাড়ির গ্যারেজের উপরে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। তখন তাঁর সঙ্গে জমজ কন্যা রিতা-রোজা এবং ভাস্কর-স্ত্রী অ্যানি। যদিও তাঁর স্ত্রী কোনোদিন শিল্পকর্ম করেননি, তবে তাঁর কাজের সঙ্গে পরিচয় পেয়ে অবাক হতে হয়েছিল। একবার যখন তিনি মাটি দিয়ে নিবন্ধকারের আবক্ষ মূর্তি যে-অসামান্য দ্রুততায় নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, তা দেখে সবাই বিস্ময়াভূত হয়ে পড়েছিল। শিল্পীর বাসায় প্রায়ই আড্ডা হতো। তখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী সাহিদ হাসান, ফরিদ তাজ চৌধুরী, মাহবুব হুসেন খান, সায়ীদ মোস্তফা কামাল ও এই প্রবন্ধকার মিলে না নামে একটি সাহিত্যের নিরীক্ষাধর্মী পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। রশিদ চৌধুরী সবকিছু দেখেশুনে পত্রিকার সৃষ্টিধর্মী-চরিত্র পেয়ে এককথায় তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। পত্রিকার প্রচ্ছদ-নির্মাণ থেকে শুরু করে ভেতরের পৃষ্ঠায় নিরীক্ষাধর্মী স্কেচ এবং মূল ফরাসি থেকে কবিতার তরজমা পর্যন্ত করতে শুরু করেন। তখন সেই ছোট ফ্ল্যাটবাড়িতে গিয়ে দেখা গেল সেখানে কোনো আসবাবপত্র নেই। সমস্ত মেঝে দেড়ফুট উঁচুতে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। বসার জায়গা পাওয়ার জন্য একটি তক্তা উঁচু করে ওঠাতেই সেটি টেবিল এবং তার চারপাশে বসার জায়গায় রূপান্তরিত হয়ে গেল। নিচের প্রায় জায়গা স্টোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সবাই তাঁর চমৎকার সৃষ্টির অভিনবত্বে মুগ্ধ। তিনি কবিতা লিখতেন, এর বেশ কয়েকটি না-তে ছাপা হয়েছিল। ফিল্মে দারুণ উৎসাহী ছিলেন। নদী, মাঝি, নৌকা ও বাঁশের লগি – এই চারটি চরিত্র-উপাদান নিয়ে শিল্পমণ্ডিত ফটো-কম্পোজিশন প্রাধান্যবহুল একটি প্রামাণ্যচিত্রের চিত্রনাট্যও তৈরি করেছিলেন। মোটকথা, চারুকলাসহ প্রায় প্রতিটি শিল্পমাধ্যম নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক ভাবনার বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এর মূলে ছিল শিল্পীর ইউরোপিয় শিক্ষার দ্বারা মানসগঠন ও সেইমতো পথচলা। শিল্প শুধু ভাস্কর্যে বা চিত্রশিল্পের মধ্যেই আবর্তিত হবে, তা নয় – এটিকে ব্যবহারিক শিল্পরূপে আকার ও উপযোগিতা পেতে হবে। শিল্পের মহান বিস্তার সর্বত্র ও সব উপাদানে বিরাজিত, প্রকৃতি যেমন। জামার্নির উইমারে ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত বাউহাউস নামে একটি অভিনব স্কুল পরিচালিত হয়েছিল, যার মূলে ছিলেন স্থপতি মিজ ভান্ডার রো, শিল্পী পল ক্লি, স্থপতি মার্সেল ব্রুয়ার, শিল্পী-ভাস্কর মোহোলি নাশ, শিল্পী ক্যান্ডিসকি প্রমুখ সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব। স্থপতি ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস ১৯১৯ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত স্কুলটির পরিচালক ছিলেন। ব্যবহার্য যাবতীয় বস্তুসামগ্রী, বস্ত্র, আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, ধাতু বা কাঠের জিনিসপত্র – প্রতিটি জিনিস শিল্পরূপে রূপান্তরিত হওয়ার উপযুক্ত। শিল্পী রশিদ চৌধুরী এই শিল্পদর্শনে বিশ্বাস করতেন এবং সেইমতো যেখানে যখন সুযোগ পেয়েছেন তা বাস্তবায়ন করার জন্য আজীবন চেষ্টা করে গেছেন। শিল্পী রশিদ চৌধুরী শিক্ষক হিসেবে আদর্শস্থানীয় ছিলেন। যেটি জানতেন সেটি ছাত্রছাত্রী বা বন্ধু-বান্ধবদের অকপটে এবং অবলীলায় জানিয়ে দিতে পছন্দ করতেন। সবসময়ে এক নতুন পথে চলতে এবং নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। ভাস্কর্যে উচ্চশিক্ষা নিলেও তাঁর কোনো ভাস্কর্যের উল্লেখযোগ্য কাজ দেখা যায় না। মনে হয়, এই বিষয়টি তিনি ব্যবহারিক শিল্পের মধ্যে সন্নিবেশিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। মূলত এই প্রয়াসে মনে করা যায় যে, চারুকলাশিল্প, যেটি তাঁর প্রিয়, প্রথম ও মূল প্রকাশ-মাধ্যম যেটিকে ব্যবহারিকতার চিন্তা-চেতনায় ট্যাপিস্ট্রি বা তাপিশ্রীর বিশাল পরিসরে সার্থকভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন এবং এই মাধ্যমে চরম সার্থক হওয়ার পাশাপাশি এই ভূখণ্ডের প্রথম আধুনিক শিল্পী-ব্যক্তি বা অগ্রদূত হিসেবে নিজেকে পরিচিহ্নিত করতে পেরেছেন। দেয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কোতেও তাঁর বিশেষ পারঙ্গমতা ও শিক্ষা ছিল। কিন্তু সেদিকে তিনি অগ্রসর হননি। আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রবেশ-লাউঞ্জের সুন্দর সিঁড়ির সামনে যে-ক্লাসরুম-ভবন দাঁড়িয়ে, তার দেয়ালে বহুদিন যাবৎ শিল্পীর একটি অসমাপ্ত দেয়ালচিত্রের কাজ দেখা যেত। তিনি জানিয়েছিলেন, বিশেষ পদ্ধতিতে সেটির বহির্ভাগ শ্বেতপাথরের মতো মসৃণ ও চাকচিক্যময় করে তোলা যায় এবং তিনি তেমনটিই করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত ফ্রেস্কোর কাজে তিনি সুযোগের অভাবে তেমন করে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেননি। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার এবং ফ্রান্সের ইসসোয়াত সরকারি কলেজে তাঁর একটি করে দেয়ালচিত্রের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। টেরাকোটা বা পোড়ামাটি এবং সরাচিত্রেও তিনি তাঁর অনুপম সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তেলরং, জলরং, গোয়াশ, তুলি-কালি-মাধ্যম তাঁর প্রিয় ছিল। ট্যাপিস্ট্রি ছাড়াও লিথোগ্রাফ, টেম্পেরা ও আরবি ক্যালিগ্রাফিতে বেশকিছু কাজ করেছেন। লিথোগ্রাফে প্রজাপতি ও বালিকা, বিশেষ করে স্বাধীনতা যেখানে মানুষ, পশু-পাখি-সাপ-বাঘ-কুমির সবই স্বাধীনতার পতাকা আর মশাল হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে – সেই অসামান্য গতিময় কাজটি দেখা যায়। তুলি-কালিতে হাতির পিঠে ‘হাওদা’ কাজটিও কয়েকটি কালো-ক্ষিপ্র শক্তিশালী লাইনে অপরূপ হয়ে ফুঠে উঠেছে। এ-সবই তাঁর শিল্পক্ষমতার অনবদ্য প্রকাশ। উজ্জ্বল লাল, হলুদ, গাঢ় নীল, সবুজ, মাটি রং ছাড়া তিনি কালো রঙের ভীষণ অনুরক্ত ছিলেন। প্রায় ছবি বা ট্যাপিস্ট্রিতে তা দেখা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ এবং পরামর্শে শেরেবাংলা নগরের গণভবনের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু তা অর্ধসমাপ্ত ছিল। সম্পূর্ণভাবে দেশজ উপাদান দিয়ে তিনি গণভবন সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন। কাঁথা, ট্যাপিস্ট্রি, বেত, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদি ব্যবহার করার সঙ্গে, এখনো মনে পড়ে প্রবেশদ্বারে ঢুকতেই বিশাল বিশাল মাটির জালা বা কোলা স্থাপন করেছিলেন আর ভেতরের বসার ঘরে ঐতিহ্যবাহী মাটির পাত্র, মাটির ফুলের টব ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়েছিলেন। শিল্পী রশিদ চৌধুরী মনেপ্রাণে বাঙালি-মানসিকতায় জারিত ছিলেন। তিনি চারুশিল্প, দেয়ালচিত্র, ট্যাপিস্ট্রি, সরাচিত্র – যে-মাধ্যমেই তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখে যেতে চেয়েছেন, সবখানেই বাঙালি ঐতিহ্য, ইতিহাস ও কৃষ্টি পরম্পরা বা ধারাবাহিকতার মূল প্রবহমানতার সঙ্গে নিজেকে পরিচালিত করে গেছেন। তাঁর প্রকাশভঙ্গি আধুনিক পশ্চিমি বা ইউরোপিয় বিমূর্ত ধাঁচের অভিব্যক্তিময়ী হলেও বিষয় ও বিশ্বাসে পুরোপুরি বাঙালি বা দেশজ মনোময়তা ও বোধানুভবে সম্পূর্ণভাবে সংরক্ত ছিল। সেইজন্য তাঁর ছবি গভীর-অতল অন্তর্লোকস্পর্শী। ছবি-সৃষ্টিতে গুরুশিল্পী শাগাল, মাতিস এবং ট্যাপিস্ট্রিতে গুরুশিক্ষক জঁ লুরসাতের দ্বারা প্রভাবান্বিত হলেও কালে কালে নিজস্ব পথ, ধারা ও মত সৃষ্টি করে সার্থকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর ছবির পেছনের প্রিয় পটভূমি লোকজ দেব-দেবীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনে আর্কেইক বা প্রাচীনতার অনুষঙ্গী। গ্রামের পুতুল, বাঁশি, আসবাবপত্র, জীবজন্তু ও তার সঙ্গে উজ্জ্বল রঙের সমাহার ঘটেছে তাঁর সৃষ্টকর্মে, যা চরম উৎকর্ষতায় প্রকাশিত হয়েছে শিল্পীর ট্যাপিস্ট্রিতে এবং মনে হয় মূলত তেলরং, টেম্পেরা বা গোয়াশ-মাধ্যমে পেইন্টিংয়ের চেয়ে ট্যাপিস্ট্রির বাণিজ্যিক মূল্য শিল্প-বোদ্ধা ও শিল্পীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করার কারণেও তিনি এই মাধ্যমের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলন। এসবে পাট, সুতো, সিল্কের বা উলের সব ধরনের উপাদান তিনি ব্যবহার করেছেন। এখানে উল্লেখ্য, ঐতিহ্যবাহী মেলা বা আড়ং-এর লোকজ ব্যবহার্য বস্তুসামগ্রী, দেব-দেবীর বিগ্রহ, রাধাকৃষ্ণের চিরন্তন ঐকতান ইত্যাদি তাঁর চিত্রকর্মে যেমন উৎস ও উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে গ্রামদেশের প্রকৃতি, নদী-নালা, গাছ-পালা, নৌকো-নদী বা মানুষজন তেমনভাবে ব্যবহৃত হয়নি। এতে বোঝা যায়, শিল্পীর দৃষ্টি সবসময়ে জনজীবনের মূল উৎস বা সারাৎসারের প্রতি নিবদ্ধ ছিল, কোনো বহিরাবরণ বা বহির্ভাগের দিকে নয়। এতে শিল্পসত্তার গভীর অনুভবের পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়। এইজন্য তাঁর ছবি-সৃষ্টি সবসময়ে বাঙালি স্বপ্ন, সত্তা ও অস্তিত্বের সন্ধান দেয়। রঙের ব্যবহারের সঙ্গে বিভিন্ন আকার এবং গঠনের মিশেলে যে-গতিময় চাঞ্চল্য, উজ্জ্বল বর্ণময়তা এবং নিস্তব্ধ শব্দহীনতার মধ্যে বিচ্ছুরিত বাঙ্ময় ও আনন্দময় আলোকমালার গীতিময় অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়, তা তাঁর বিশাল ট্যাপিস্ট্রির সামনে দাঁড়ালেই হৃদয়ঙ্গম করা যায়। কোনো শিল্পমূল্য না খুইয়ে শিল্পকে ব্যবহার করে জনগণের কাছে নেওয়া, শিল্প-শিক্ষাকে অবধারিত ঢাকা-কেন্দ্রীক থেকে বৈচিত্র্যময় করে বিকেন্দ্রিতভাবে চট্টগ্রাম-কেন্দ্রীক এবং অন্যদিকে প্রসারিত করা, বর্তমান শিল্পের বহমান অজর, গোঁড়া ও অপরিবর্তিত মূল্যবোধের মধ্যে প্রাণময় সুবাতাস প্রবাহিত করার জন্য অচলায়তন ভাঙা, শিল্প-শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন মনোভঙ্গি প্রবর্তন, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কস্থাপন সম্বন্ধে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, আধুনিক শিল্পধারার সঙ্গে ঐতিহ্যময় দেশজ উপাদানের মিশেলে উত্তর-আধুনিক শিল্পনির্মাণের উজ্জ্বল প্রয়াস, শুধু বাঙালি জাতির নির্যাস-উৎসের সাহায্যে পরিপূর্ণভাবে নিজস্ব অস্তিত্ব-ঐতিহ্যের একটি মৌলিক শিল্পসৃষ্টির ঐকান্তিক চেষ্টা ও তা সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে একজন সৃষ্টিশীল শিল্পীর জন্য উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনাসমৃদ্ধ দেশ ও মানবপ্রেমী হওয়া – এইরকম বহুবিধ কৃতিত্বে শিল্পী রশিদ চৌধুরী ঋদ্ধবান, যা ভাবীকাল অনুসরণ ও গ্রহণযোগ্যতার দাবি রাখে। সংগঠক ও আয়োজক হিসেবেও তিনি তাঁর গুরু জয়নাল আবেদিনের মতোই তুলনারহিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুশিল্প বিভাগ এবং চট্টগ্রাম আর্ট কলেজ- স্থাপনে পথিকৃতের ভূমিকা রাখা ছাড়াও শিল্পীদের আবাসগৃহ নিয়ে শিল্পীপল্লী ও ট্যাপিস্ট্রি শিল্পের সামগ্রিক বিকাশে তাপিশ্রীপল্লী স্থাপনের চেষ্টা করে গেছেন। শিল্পীর যে-আত্মপ্রতিকৃতি, তা কয়েকটি লাইনে তার স্বভাবসিদ্ধ ব্যক্তিত্বে প্রকাশিত হয়েছে, যেটি তাঁর বন্ধু শিল্পী-সম্পাদক মিজানুর রহমানকে উৎসর্গ করেছেন, সেখানে ছবির নিচে লিখেছেন, ‘বন্ধুবরেষু মিজান, তুমি চেয়েছ আত্মপ্রতিকৃতি যা আত্মসমালোচনার শামিল। আর তাছাড়া নিজেকে সবসময়েই আয়নায় দেখেছি তা ছিল উলটো। তাই আমি আমাকে চিনেছি উলটো করেই। যেখানে সত্যি নিজেকে চেনা যায়, তা হলো নিজের নিজের মাঝে, সেখানেই আমি সবচেয়ে ব্যর্থ।’ একথাগুলোর মাঝেই তাকে বিনয়-স্বভাষী একজন সৃষ্টিশীল শিল্পী হিসেবে চেনা যায়। এইরকম মানুষ-শিল্পীর আবির্ভাব দেশ, সমাজ, ইতিহাস ও পারিপার্শ্বিকতাসহ সবকিছুর উপকারে আসে এবং তা কালে কালে গর্ব আর অহংকারের মহার্ঘ বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। শিল্পী-শিক্ষক-আয়োজক রশিদ চৌধুরী তেমনি একজন চারুশিল্পের অগ্রপথিক এবং কীর্তিমান পুরুষ।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.