খালি চোখে দেখা পরিসংখ্যান বলে কিছু থাকলে তা থেকে আমার মনে হয় যে বাংলাদেশে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে শাড়ির ব্যবহার কমে গিয়েছে। এর অবশ্য অনেক ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। শাড়ি পরে চলাফেরা করা মুশকিল। বিশেষ করে বাসে বা মোটর বাইকের পেছনে বসে যাদের যাতায়াত করতে হয় তাদের জন্য শাড়ি খুব সুবিধাজনক পোশাক নয়। তাছাড়া ধুয়ে-ইস্ত্রি করে শাড়ি ঠিকঠাক রাখাও সহজ নয়। তার চাইতে অন্যান্য পোশাক বেশি বাস্তবসম্মত। পাশ্চাত্য দেশে, বিশেষ করে শীতের দেশগুলোতে শাড়ির অসুবিধে তো আরো অনেক। যার ফলে উৎসব-পার্বণ বাদে বাংলাদেশের (এবং ভারতের) নারীদের শাড়ি পরা অনেক কমে গিয়েছে।
তাই বলে কি শাড়িকে মানুষ ভুলে যাচ্ছে? আমি কিন্তু এমন মানুষ জানি যাঁরা উত্তর গোলার্ধের শীতের দেশে সারা জীবন কাটিয়েও শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরেননি। শীতে বরফে কাজে কর্মে যেতে সবসময় শাড়িই পরেছেন। হাজার হাজার বছরের পুরনো এই পোশাকটি শুধু যে দৃষ্টিনন্দন তা-ই নয়, একদিকে সে-সংস্কৃতির ধারক আর অন্যদিকে ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করার মাধ্যম। কখনো কখনো এটি শক্তিশালী বক্তব্যও উপস্থাপন করতে পারে,
যে-কথায় একটু পরই আসছি।
শাড়ির জন্ম ভারতীয় উপমহাদেশে হলেও মানুষের চলাচলের ফলে পোশাকটি পরিচিত হয়েছে দেশের বাইরে – বিশ্বময়। আর তার সম্পর্কে সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কৌতূহল। ছয় মিটার বা তার বেশি দীর্ঘ একটি বস্ত্রখন্ড জড়িয়ে শরীরকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায় আর তার সঙ্গে একটি শৈল্পিক আবহ তৈরি করা যায় তা নিয়ে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের উৎসাহ রয়েছে। আর তারই নিদর্শন পেলাম ২০২৫-এর শরতে নিউইয়র্ক গিয়ে। জানতে পারলাম যে, নিউইয়র্ক হিস্টরিক্যাল মিউজিয়ামে শাড়ি বিষয়ে একটি প্রদর্শনী হচ্ছে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য নিউইয়র্ক শাড়ি’। ভাবছিলাম, এর অর্থ কী দাঁড়ায়? নিউইয়র্কের শাড়ি? তাহলে তো বিষয়টিকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে, এবং পরিসর হবে ছোট। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রদর্শনীটি সম্পর্কে প্রতিবেদন পড়ে একেবারে নিদিষ্ট করে না হলেও সে-রকমই ধারণা হলো।
বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কাসহ দেখলে ভারতীয় উপমহাদেশ আয়তনে বিশাল। এর বিভিন্ন অঞ্চলে পরা হয় বিভিন্ন ধরনের শাড়ি। এসব শাড়িতে ব্যবহৃত সুতা যেমন অনেক ধরনের, বুননের প্রক্রিয়াতেও রয়েছে তফাৎ। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন অঞ্চলে পরার ধরনেও রয়েছে প্রভেদ। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এবং তাদের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয় হরেক রকমের শাড়ি। সব দেখাতে হলে সেটি হবে এক বিশাল ব্যাপার। সে-কারণেই কি না জানি না, নিউইয়র্ক হিস্টরিক্যাল তাদের প্রদর্শনীতে নজর দিয়েছে প্রবাসে শাড়ির ওপর। ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকেই ভারতীয় বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ যেতে শুরু করেছিল আমেরিকায়। তাদের সঙ্গে গিয়েছে শাড়িও। এবং কালক্রমে জায়গা করে নিয়েছে সেখানকার সংস্কৃতিতে।
সেই পরিক্রমা থেকে প্রেরণা নিয়ে পরিকল্পনা ও আয়োজন করা হয়েছে প্রদর্শনীটি।
নিউইয়র্ক হিস্টরিকাল মিউজিয়াম ম্যানহাটনের সেন্ট্রাল পার্ক ওয়েস্ট আর ছিয়াত্তর নম্বর স্ট্রিটের কোনায়। আমার স্ত্রী ও আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে দশ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম। শরতের বিকেলের মিষ্টি রোদে একপাশে পার্কের গাছপালা আর অন্য পাশে বিভিন্ন বয়সের, উচ্চতার এবং ধরনের ভবন দেখতে দেখতে হাঁটা। অনলাইন টিকিট করেছিলাম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। টিকিটের সঙ্গে গাইডেড ট্যুর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু আমরা সাধারণত নিজেরা ঘুরে দেখতে পছন্দ করি। এখানেও গাইডকে বিনীতভাবে সেটা বলে এগিয়ে গেলাম।
চারতলায় ছিল শাড়ির বিশেষ প্রদর্শনী। আমরা সোজা সেখানেই চলে গেলাম। ঢুকতেই একটি নান্দনিক পোস্টারে প্রদর্শনীতে স্বাগত জানানো আর এর সম্পর্কে সংক্ষেপে দুটি কথা। তারপর বাঁ-দিকে একটি শেলফে শাড়ির রং এবং বুনন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। একটি ম্যাপে দেখানো হয়েছে পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে শাড়ি পরা হয় আর কত মানুষ সেটা পরে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, ভারতীয়রা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই গিয়েছে এই পোশাক – তা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ বা দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল ভূখণ্ডই হোক।
প্রদর্শনীর মূল অংশে প্রথমেই পোস্টার এবং পুরনো ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছে শাড়ি কীভাবে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যম হতে পারে। ঘটনাটি বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রথম সারির নারী স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯২৯ সালে তিনি আমন্ত্রিত হয়ে বার্লিন গিয়েছিলেন নারীর ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। কিন্তু পরাধীন দেশের ডেলিগেশন বলে তাঁদের জন্য কোনো পতাকা ছিল না। তাঁরা তাঁদের নিজেদের শাড়ি কেটে পতাকা তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। এভাবে পোশাকটি হয়ে উঠেছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যের বাহক।
অভিবাসী মানুষের সঙ্গে সঙ্গে শাড়িও কীভাবে দেশসীমা অতিক্রম করেছে তার উদাহরণ শিল্পী সুচিত্রা মাতাই ও তাঁর শিল্পকর্ম। তাঁর জন্ম গায়ানায়। পূর্বপুরুষ ভারতের উত্তর প্রদেশের; ব্রিটিশরা আখের খেতে কাজের জন্য যাদেরকে জোর করে এনেছিল তাদের একজন। শিশু সুচিত্রা ক্যানাডায় গিয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান পড়লেও পরে স্নাতকোত্তর ফাইন আর্টসে। হয়েছেন শিল্পী। ভাস্কর্য এবং পেইন্টিং দুটোতেই তাঁর দক্ষতা। বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে কাজ করেন তিনি, যার একটি হচ্ছে ভাস্কর্য ও অন্যান্য কাজে শাড়ির কাপড়ের ব্যবহার। তাঁর সৃষ্টি করা ভাস্কর্য ‘শি অ্যারোজ (ফ্রম আ পুল অফ টিয়ারস)’ নিউইয়র্ক প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণ। পুরনো এবং রিসাইকল করা শাড়ির কাপড় ব্যবহার করে তিনি সৃষ্টি করেছেন ভারতনাট্যমের মুদ্রায় শাড়ি পরিহিত এক নারী। এই কাজে তিনি দেখিয়েছেন শাড়ি আর ভারতীয় ধ্রুপদী ঘরানার প্রধান একটি নাচে তার ব্যবহার। প্রদর্শনীর এক কোণে ল্যাপটপে দেখানো হচ্ছিল সেই নাচের একটি উপস্থাপনা। বস্ত্রকে শিল্পকর্মে রূপান্তর এবং সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবহারের বাস্তব চিত্র এত সুন্দরভাবে উপস্থাপিত যে, প্রদর্শনীর কিউরেটরের প্রশংসা না করে পারা যায় না।
ভারতের নাচকে নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে স্থান পেতে অবশ্য অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকে সেসব নাচকে নাকি থিয়েটারের বিরতির সময় ছোট ছোট উপস্থাপনার সুযোগ দেওয়া হতো। আর সেগুলোকেও বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হতো। তবে কালক্রমে ভারতের
নাচ-গান নিউইয়র্ক তথা আমেরিকার সাংস্কৃতিক জগতে তার জায়গা করে নিয়েছে।
শুধু কিছু শাড়ি দেখানো এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য নয়। নিউইয়র্ক শহরের গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত নারীদের ব্যবহৃত শাড়ি দেখিয়ে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কাপড়টি এই শহরের সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নিয়েছে। তাদের একজন শাহানা হানিফ – নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি ও মুসলিম নারী। তিনি তাঁর শপথ অনুষ্ঠানে যে শাড়িটি পরেছিলেন সেটি রয়েছে প্রদর্শনীতে। একইভাবে নিজের ব্যবহৃত শাড়ি দিয়েছেন সুধা আচার্য, নির্বাহী পরিচালক, সাউথ এশিয়ান কাউন্সিল ফর সোশ্যাল সার্ভিসেস। তাঁর জামাওয়ার বেনারসী শাড়িটি ছিল এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। খাঁটি জরির পাড় আর ভেতরে সূক্ষ্ম কাজের জন্য শাড়িটি সহজেই নজর কাড়ে। এটি নাকি তিনি তাঁর মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে পরেছিলেন। এ ছাড়াও ব্রুকলিনের দুই ডিজাইনার নিকিতা শাহ আর রুআফ্জার সৃষ্টি করা দুটি আজরাখ শাড়ি ছিল দেখার মতো।
ভারতের অনেক শাড়ি যেখানে প্রস্তুত হয় সে-জায়গার নামে পরিচিত হয়, যেমন কটকি, পোচমপল্লি ইত্যাদি। কিন্তু আজরাখ নামটি একটু ভিন্নভাবে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। এটি একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ নীল। এই শাড়ি বোনার কাজটিকে প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত করার জন্য আকাশের নীল রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কারিগররা নাকি এই নামটি রেখেছেন। আদিতে আজরাখ শাড়িতে বিভিন্ন রঙের মধ্যে কিছুটা হলেও নীলের ছোঁয়া রাখা হতো। তবে কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন যে এই শাড়িটির প্রিন্ট করা এতই সময় ও শ্রমসাধ্য যে কখনো কখনো কর্মীরা ‘আজ রাখ’ বলে কাজ বন্ধ রাখতেন। মূলত সিন্ধু প্রদেশের, কিন্তু ভারতের কচ্ছ অঞ্চলে প্রস্তুত হয় এই শাড়ি। ব্লক প্রিন্ট-সিল্ক এবং সুতি যে-কোনো ধরনের কাপড়ের ওপরই হতে পারে। ডিজাইন জ্যামিতিক হলেও তাতে নান্দনিকতা রয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে পোশাকের সংযোগ দেখানোর জন্য শুধু শাড়ি নয়, অন্যান্য পোশাক এনে শিল্পী চিত্রা গণেশ সৃষ্টি করেছেন এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লেখা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ গল্পটির চিত্ররূপ দিয়েছেন তিনি লাইনোকাটে প্রিন্ট করা সাতাশ টুকরোর এক সিরিজের মাধ্যমে। সেখানে শুধু শাড়ি নয়, বিভিন্ন পোশাকে নারীকে উপস্থাপন করেছেন তার স্বপ্ন অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে। শাড়িগুলোর প্রদর্শনী যেখানে শেষ সেখানেই চলছিল একটি ভিডিও চিত্র। তাতে দেখানো হচ্ছিল বিভিন্ন ধরনের শাড়ি পরার পদ্ধতি। প্রদর্শনীর উপসংহার হিসেবে এটি প্রশংসনীয় সন্দেহ নেই; তবে কোনোদিন শাড়ি পরেননি এমন দর্শক নিশ্চয় বুঝতে পারবেন যে, কাজটি মোটেই সহজ নয়।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.