ফ্লাশফিকশন’ : কল্পকথার নতুন প্রচেষ্টা

ফ্ল্যাশফিকশন : পঁচিশ তারা ঝলকের দ্যুতি

মোহিত কামাল ষ বিদ্যাপ্রকাশ

ঢাকা, ২০২৬ ষ ৪০০ টাকা

পঁচিশ তারার ঝলকের দ্যুতি পাঠককে দেখানোর সময় (পড়ুন পড়ার সময়) কথাশিল্পী মোহিত কামালের ‘ফ্লাশফিকশন’ সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে, শব্দটির সব অর্থসহ শ্রদ্ধা জানাতেই পারি। তাঁর শ্রমিকতার নিষ্ঠায় কোনো ঘাটতি নেই। কারো কারো কাছে তাঁর কাজের ফল যথার্থ মনে না-ও হতে পারে, না হোক। কিন্তু কাজকে কাজের ভূমিতে তিনি স্থাপন করেছেন। এই সত্য মান্য। গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘কাফকার শব্দকুঠার’-এ মোহিত কামাল কাফকার বয়ানে নিজেকে সমালোচনাও করেছেন : ‘তোমার লেখার মগ্নতায় ফাঁক আছে।’ ভূমিকার আর একটা বাক্য – ‘মূল্যায়নের ভার প্রিয় পাঠক, আপনাদের ওপর। বোদ্ধাদের বিচারে গৃহীত হলে শ্রম সার্থক হয়েছে মনে করব।’ সাহিত্যের ‘বোদ্ধা’ বিষয়ে জীবনানন্দের বিখ্যাত পঙ্ক্তি আমার মনে পড়ে, ‘বরং নিজেই তুমি লেখো নাকো একটি কবিতা।’   

‘ফ্লাশফিকশন’-এর বাংলা করা হয়েছে ‘ঝলকগল্প’। ২৫টি ঝলকগল্প পড়ার আগে গ্রন্থের সুলিখিত ভূমিকা অধ্যয়ন করা আবশ্যক কাজ। ‘ক্ষুদ্র আর্ক’, ‘ফ্লাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন’ ইত্যাদি বিষয়ে পাঠক জানলে রচিত ঝলকগল্প এবং তার চারিত্র্য বুঝতে সুবিধা হবে।

গ্রন্থের মূল নামের নিচে ‘তারা’ কেন ব্যবহার করলেন? খটকায় ছিলাম। ইতিবাচকভাবে মনে হলো, গল্পমেজাজ, কথনমেজাজ, ভাষাবুুনন এবং বিষয়মেজাজে একটা দূরতর আলোকপ্রভার

বিচ্ছুরণ-রীতি বিভাব-আবরণে জারি আছে বলেই ‘তারা’ বলা হলো কি-না!   

দুই

গল্প ছিল না কবে? গল্প না বললে, না শুনলে চিন্তা করা মানুষ, কথা বলা, শরীরে শরীর নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষ, কাজকর্ম করা, খিদের সঙ্গে দিনযাপন করা এবং ধ্বংসে আনন্দিত হওয়া এবং স্বপ্নচর্চা করা মানুষ এক যান্ত্রিক শোভামাত্র।

বনচারী মানুষ যেসব সরব-নীরব উচ্চারণে – চোখ, মুখ, হাত এবং পায়ের যেসব ইশারায় – তাদের যাপনের জীবনকথা, পশু শিকারের কথা পরস্পরকে বলতেন, সেসব গল্পর সঙ্গে আরো গল্প শতাব্দ শতাব্দ পরে বিবিধ মাত্রায় অক্ষরের ঘেরাটোপে বর্ণিত বা চিত্রিত হতে হতে ‘লেখক-কথক’ লিখেছেন গল্প, উপন্যাস এবং  ‘ফ্লাশফিকশন’। ‘ফ্লাশফিকশন’ যদিও নতুন কিছু নয়।

গল্প না বললে আরব্য রজনীর দুই বোন শাহারজাদী ও দুনিয়াজাদীর মৃত্যু হবে। দুই ভাই, দুই সুলতান শাহরিয়ার ও শাহজামান গল্প শোনেন এবং অপেক্ষা করেন নতুন গল্পের জন্য।

দুই বোন শুধুই কথক নন, তাঁদের আমরা কথাবলা লেখক যদি মনে করি এবং দুই ভাইকে শ্রোতা ও কথার পাঠক যদি মনে করি, তাহলে একটা মীমাংসায় পৌঁছানো যেতে পারে, মীমাংসা অনেকে গ্রাহ্য না-ও করতে পারেন, না করুক – মানুষের গল্প না থাকলে মানুষ স্বপ্নহীন, নিজেই নিজের সঙ্গহীন দাস।  

তিন

আরব্য রজনীতে আমরা অনেক ‘ফ্লাশফিকশন’ পড়েছি। পড়ছি। যেমন : কুকুরের দান, তিনটি আপেল, দুই নারী, রত্নহার ইত্যাদি। গল্পগুলির শব্দসংখ্য ৯০০ শব্দের কম।

এবং  হোর্হে লুইস বোরহেসের কালেক্টেড ফিকশনস (পেঙ্গুইন বুকস : ১৯৯৮)-এর ‘দ্য প্লট’ (শব্দ সংখ্যা

১৫০-এর কম। অর্থাৎ এটা ‘মাইক্রোফিকশন’), এবং ‘এ প্রবলেম’, ‘দ্য ইয়োলো রোজ’, ‘দ্য উইটনেস’, ‘মারটিন ফিইরো’, ‘মিউটশেনস’ এবং ‘প্যারাবল অফ কারভেনটেস অ্যান্ড দ্য কুইজোট’-এ শব্দ সংখ্যা ৫০০-৭৫০-এর মধ্যে। (এরকম ছোট ফিকশন আরো আছে)।

নাগিব মাহফুজের ‘দ্য ড্রিমস’-এর ভূমিকায় অনুবাদক রেইমন্ড স্টোক – এক বা একাধিক প্যারায় লিখিত নাগিবের স্বপ্নগুলিকে (মোট স্বপ্ন ১০৪টি) ‘ন্যানোনভেলাস’ বলেছেন। (১০৩ নম্বর ‘স্বপ্ন’র শব্দসংখ্যা ৭৫টি)। চূড়ান্ত অর্থে ‘ন্যানোনভেলাস’ শর্ট ফিকশন। বনফুল পোস্টকার্ডে যে-গল্প (দুঃখিত নাম মনে পড়ছে না) লিখেছিলেন তার শব্দসংখ্যা সম্ভবত ৭৫-এর কম।

পল কনলেই-এর ‘ন্যানোনভেলাস অব নিউইর্য়ক’ বিখ্যাত উদাহরণ।

‘ফ্লাশফিকশন’ এবং ‘ন্যানোনভেলাস’কে একই তুলাদণ্ডে নিয়ে আমি অধ্যয়ন করতে ভালোবাসি। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত অধ্যয়নবোধ।

মোহিত কামাল গ্রন্থের ভূমিকায় পৃথিবীর ‘ফ্লাশফিকশন’ লেখকদের নাম লিখেছেন। বোরহেসের নাম দেখলাম না।

চার

‘সাম্প্রতিক ইউরোপ-আমেরিকার গবেষণার (?) স্বতন্ত্র ধারা অনুযায়ী ফ্লাশফিকশন আর অনুগল্প এক নয়’, (ভূমিকা)। ‘ফ্লাশফিকশন অনুগল্প নয়’ – প্রস্তাবটি পশ্চিমের কিছু সাহিত্যবোদ্ধা গল্পসাহিত্যের মাথার ওপর ওই তিলক বা জন্রা বসিয়ে দিয়েছেন। এবং ওই তিলকের সাধারণ রৌদ্র বিভিন্নরকম লেখার এবং ‘ডে’ ও ‘দিবস’ বিষয়ক খবর আমরা পড়ছি। তথ্য ভূমিকায় আছে : ‘ফ্লাশফিকশন সম্প্রতি বিশ্বসাহিত্যের একটি পাঠকপ্রিয় শাখা হিসেবেও বিদ্বজ্জনদের নজর কেড়েছে। গত সাত-আট বছর ধরে ব্রিটেনে ‘ফ্লাশফিকশন ডে’ পালিত হয়ে আসছে। নিউজিল্যান্ডেও ‘জাতীয় ফ্লাশগল্প দিবস’ পালিত হয়।’

(যেন আগে ‘ছোট ফিকশন ছিল না!! ছোট শব্দটির জায়গায় ‘ফ্লাশ’ শব্দটি বসিয়ে যেন নতুন কিছু করা হলো।)। কিছুদিন পর হয়তো দেখা যাবে, পশ্চিমে শুরু হয়েছে, ন্যানোনভেলাস ডে।

প্রাচ্যের অনেক লেখক ও পাঠক বেশ মুগ্ধ হন এই ভেবে, একটা নতুন জন্রা পাওয়া গেল। পশ্চিমের সাহিত্যবোদ্ধা কিছু গবেষক কয়েক দশক পরপর সাহিত্যের বা অন্য শিল্পকর্মের সামনে একটা তিলক বসিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন, দিলাম একটা নতুন বাতেলা। অবশ্য শিল্প-সাহিত্য নিয়ে বিখ্যাত চিন্তাআন্দোলন বা চিন্তাপ্রস্তাবের (সুররিয়ালিজম, দাদাবাদ, পরাবাস্তববাদ, জাদুবাস্তবতা ইত্যাদি) প্রভাব এখনো জায়মান।   

পাঁচ

পাঠক গ্রন্থটি পড়ার সময় ‘ফিকশন’ সম্পর্কিত নোট মনে রাখতে পারেন। ‘অ্যান ইনভেনটেড আইডিয়া অর স্টেটমেন্ট অর ন্যারেটিভ’ (অক্সফোর্ড ডিকশনারি)। এবং ‘ শেক্সপিয়ারের দোলনা’ (শব্দ সংখ্যা ৮৭৩) ফিকশনের শেষে তারা চিহ্ন দিয়ে ইটালিকে লেখা ‘মেটাফিজিক্যাল ফ্লাশফিকশন’। ‘শেক্সপিয়রের দোলনা’ পড়ার আগে মাথায় রাখতে হবে – মেটাফিজিক্স কী?

মেটাফিজিক্স – এটি দর্শনের এমন একটি শাখা যা বাস্তবতার মূল প্রকৃতি – অস্তিত্ব, স্থানকাল, কার্যকারণ এবং বস্তু ও মনের সম্পর্কের মতো ভৌত জগতের ঊর্ধ্বে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে। এটা মূলত জড়ো বা প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরের জগতের সীমা অতিক্রম করে।

প্রধান অর্থ ও প্রেক্ষাপট –

অধিবিদ্যক  (মেটাফিজিক্যাল) :  ভৌত জগতের সীমা অতিক্রম করে,

আধ্যাত্মিক : আত্মা বা পরম সত্তা সম্পর্কিত,

দর্শনশাস্ত্র সম্বন্ধীয় : অস্তিত্বে মূল সত্য খোঁজার জ্ঞান।

ছয়

মোহিত কামালের তারার ঝলকে গল্প + ভুঁয়োদর্শন + উপদেশ +  পরামর্শ + জীবনের উত্থানপতনের ‘ফ্লাশ’ পাওয়া যাবে। তিনি সহজ ভাষায়, উপস্থাপনের খেইধরা কৌশলে আখ্যানবিষয় লিখতে পারেন। ‘ফ্লাসফিকশন : পঁচিশ তারার ঝলক-এর পাঠ শেষে পাঠক যে-ভাষ্য পাবেন, যতটুকু আমি বুঝেছি, আমার বোঝা ভুলও হতে পারে, ভুল ছাড়া ক’জন বাঁচে? – তা নিম্নরূপ :

প্রতিটি ঝলকগল্পের নিচে কত শব্দে গল্পটা বলা বা লেখা হলো সেই সংখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেমন, ‘কাফকার শব্দকুঠার’ (শব্দ : ৭০১), ‘বৃষ্টি ও চিংড়ির কাহিনি’ (শব্দ : ৫৮০), ‘প্রজ্ঞার আলো’ (শব্দ : ৬১৯), ‘আশা-হতাশা’ (শব্দ : ৯৫৬) ইত্যাদি।

প্রতিটি গল্পের পাঠক হতে পারেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। অবশ্য সব ফিকশনে নয়, কোনো কোনো ফিকশনে পাওয়া যাবে, যেমন : ‘হঠাৎ চোখে পড়ল, গাছের উপর একটা ছায়ামূর্তি।’ (‘আমার তুমি তোমার আমি’); ‘কথা শেষ হতেই ছায়াটা উড়ে গেল আকাশে। মুহূর্তের মধ্যে আলোর ঝলক এসে কবরস্থানে ঢুকে পড়ল’ (ওই); ‘হঠাৎ সামনের আমগাছটার পাতাময় ঝাঁকের ভেতর অদ্ভুত একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল। বাতাসে শুধু পাতা নড়ছে না, কথাও যেন ভেসে আসছে’, (‘বৃষ্টি ও চিংড়ির কাহিনি’); ‘হঠাৎ মনে হলো ছবিগুলো কাঁপছে। খুব সূক্ষ্মভাবে, ঠিক যেমন পাতার ডগায় শিশির কাঁপে। ওদের চোখের পাপড়িও যেন নড়ে উঠল’

(‘ফড়িং-জীবনের কাব্য’)। যা ৮-১০ বছরের শিশুদের রহস্যবোধে রূপকথাজাত এবং জাদুবাস্তবতার চিন্তা-বিভাব তৈরি করতে পারে।

সুপরামর্শ, উপদেশ অনেকটা ঈশপের কৌশলে বলা হলেও রূপক উপমা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ভিন্ন রকম হয়েছে।

ক. ‘প্রশ্ন করার অর্থ তোমার ভেতরের তোমাকে আরও বেশি মজবুত করে দেওয়া’, (‘প্রজ্ঞার আলো’);

খ. ‘অন্যকে জানার আগে নিজেকে সঠিকভাবে জানো। নিজের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলো, সত্য আর সাহস আঁকড়ে ধরো। তাহলে তুমি বুঝবে তুমি কেন এসেছ,’ (‘শেক্সপিয়রের দোলনা’);

গ. ‘বৃষ্টি কেবল আনন্দ নয়, কেবল স্মৃতিও নয়। বৃষ্টি প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার দায়ও।’ (‘বৃষ্টি ও চিংড়ি কাহিনি’); ‘বিশ্বাস করতে হবে। কারণ সফল হতে চাইলে সামনের সব বাধা দূর করতে হবে। বিকল্প পথ তৈরি করে লক্ষ্যের দিকে ছুটে যেতে হবে। থেমে গেলে হতাশা জয়ী হয়ে যাবে। বাধা দূর করে এগোতে পারলে হতাশা পালাবে, আশা সফল হবে’ (‘আশা-হতাশা’)। এরকম উপদেশ ও পরামর্শ আরো ফ্লাশফিকশনে আছে।

ফ্লাশফিকশনের ২৫টি শিরোনামের মধ্যে ১০টি নাম পড়লেই পাঠক বুঝতে পারবেন একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে লেখক নীতি ও নৈতিকতার শেকড়ের সঙ্গে ফিলোসফিকে ফিলোসফাইজ করতে চেয়েছেন। যেমন : ‘উপকার’, ‘ক্ষমা-প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার সেরা উপহার’, ‘জন্ম ও মৃত্যু’, ‘ভুল ও শুদ্ধ’, ‘খড়কুটোর জীবন’, ‘শান্তির দূত’,

‘সহজ-কঠিন তর্কের নতুন চোখ’,

‘আশা-হতাশা’, ‘কথার মূল্য’ এবং ‘প্রজ্ঞার আলো।’ 

পুনশ্চ : আমি কোনো বই সম্পর্কে যখন লিখি, বইটির মধ্যে কী কী বিষয় কীভাবে বলা বা লেখা এর কিছু সূত্র ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করি। বইটি ভালো না অপাঠ্য তার বিচার করি না। আমার বুঝে ওঠা সূত্র অন্য পাঠকের কাছে মান্য না-ও হতে পারে।