পুতুল তোমার জনম কিরূপ কে জানে
আলোক লতায় বাইন্ধা সুতায় সে টানে।
কথাগুলো যেন কার? কোনো উপন্যাস, নাটক কিংবা কবিতার অংশবিশেষ। স্মরণশক্তি লেখককে ভুলে গেলেও লাইনগুলো টুকে রেখেছিল মেমোরি-ডিস্কে। কী অবাক এক জীবন পুতুলের! ওর জীবন নাচে নাচিয়ের সুতোর টানে। অথচ পুতুলনাচের আসরে আড়ালের নাচিয়েকে কে দেখতে চায়? সবাই মুগ্ধ পুতুলের ঢং-ঢঙে। কখনো সে হাসে, হাসায়, কাঁদে আবার আবেগে হয়ে ওঠে গদগদ। সবটাতেই দর্শক হেসে কুটিকুটি। এখন অজ-গাঁয়ের কোনো পালা-পার্বণে মেলা হলে কখনো কখনো পুতুল নেচে ওঠে নাচিয়ের সুতোয়। কিন্তু শহরে? এখানে ‘পুতুলনাচ’ বিষয়টিকে ইতিহাস-বইয়ে চাপা দিয়ে পুতুল-নাচিয়েরা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। এ-সময়ের শিশুরা আনমনে পুতুল খেলার ফাঁকে পুতুল দিয়ে কথা বললেও জানে না পুতুলনাচ কী? কেমনতরো ঠমকে পুতুল নেচে গল্প বলে? রাজা-রাজার গল্প, কাঠুরিয়ার গল্প, সত্যের গল্প, জীবনের গল্প, পুরাণের দেব-দেবীদের সাথে নিয়ে পুতুলনাচের জমজমাট আসর আজ যবনিকা-পতনের অপেক্ষায়। তবে কি পুতুলের প্রাণ নিবু নিবু? বঙ্গদেশের এমন ঐতিহ্যবাহী নাট্যঅঙ্গ কি সত্যিই হারিয়ে যাবে? বিষয়টি বিজ্ঞজনের মাঝে প্রথম নাড়া দিল শিল্পী মুস্তফা মনোয়ারকে। তিনি জন্ম দিলেন কিছু নতুন পাপেটের। তবে পাপেটে প্রাণসঞ্চারের প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন বহুযুগ ধরে প্রচলিত এদেশীয় পুতুলনাচ থেকে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সুর মিলিয়ে মুস্তফা মনোয়ার বলেন, বহুযুগের ওপার হতে বৃষ্টি এলো। অর্থাৎ বৃষ্টি আজ হঠাৎ একদিনে আসেনি। দীর্ঘ সময় পার হয়ে পুঞ্জীভূত জলীয় কণা জমে জমে তবে বৃষ্টির জন্ম। তেমনিভাবে জন্ম মুস্তফা মনোয়ারের পাপেটের। তাঁর সৃষ্ট এসব পাপেটের প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হয় আমাদের আবহমান পুতুল-নাচিয়েদের কাছে। যাদের দীর্ঘ শ্রম আর শিল্পসাধনায় সভ্যতার শুরুতে এক সরল আর অনাবিল আনন্দের এই মাধ্যমটির জন্ম।
বাংলাদেশের পুতুলনাচ
সভ্যতার প্রাচীনতম বিনোদন-মাধ্যম পুতুলনাচ। প্রচলিত আছে, সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর ধর্মপ্রচারের জন্য ব্যবহার করেছিলেন পুতুলনাচ। প্রাচীন মিশরে পিরামিডের ভেতরে সোনাদানার সাথে ঠাঁই পেত পুতুলও। আর আমাদের ভারতবর্ষে সংস্কৃত নাটকে পুতুলনাচ ছিল অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম থেকে শুরু করে মালবিকাগ্নিমিত্রমসহ নানা নাটকের অভিনয়ে অংশত পুতুলনাচ-প্রয়োগের নিদর্শন মেলে। ধারণা করা হয়, সুতা দিয়ে পুতুলনাচ হতো বলে পুতুল-চালনাকারীদের সূত্রধর বলা হতো। পরবর্তীকালে অবশ্য সূত্রধর সংস্কৃত নাটকের একটি চরিত্র হয়ে ওঠে, যার কাজই ছিল দর্শক-সমক্ষে নাটকের প্রস্তাবনা পেশ করা। সত্যিই ভাবতে অবাক লাগে, একটা সময় বিনোদনের এই সরল মাধ্যম পুতুলনাচ বাংলাদেশের হাট-মাঠ, উৎসব, মেলা-পার্বণের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অঙ্গাঅঙ্গিভাবে। কারু আর চারুশিল্পের অপূর্ব যোগাযোগের এ-মাধ্যম শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার মধ্যেও ছিল এক সরল নাট্যাঙ্গিক হিসেবে। এতে একদিকে যেমন গল্প ছিল, ছিল সংলাপ, গান-নৃত্য, তেমনি ছিল মনোহরী পুতুলের দেহাবয়বে ভাস্কর্যের এক প্রাথমিক প্রয়াস। বিচিত্র গড়ন আর চালনার ভিন্নতায় সুতো-পুতুল, বাজি-পুতুল, দস্তানা-পুতুল কত রকম পুতুলই না নাচত-গাইত আসরে আসরে।
পুতুল চাই পুতুল
সুতো-পুতুল/ স্ট্রিং পাপেট
সাধারণত সুতোয় চালনা করা হতো যে-পাপেট তাদের সুতো-পুতুল বলা হয়। আমাদের দেশে এ-ধরনের পুতুলনাচেরই প্রচলন ছিল। এদেশে সাধারণত মঞ্চের ওপরে একটি ধাপে বসে চালকরা তিনটি সুতো দিয়ে এই পাপেট চালনা করত। ইউরোপ-আমেরিকায় এই জাতের পাপেটকে স্ট্রিং পাপেট বলে। সেদেশে কখনো কখনো নয়টি সুতোয় পরিচালনা করা হয় এক একটি পাপেট।
দস্তানা পাপেট/ গ্লাভস্ পাপেট বা হ্যান্ড পাপেট
গ্লাভস্ বা দস্তানার মতো এই পুতুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে চালনা করা হয় এই পাপেট। পাপেট-চালক অবস্থান করে মঞ্চের নিচে। সে ঢাকা থাকে কাপড় বা অন্য কোনো আবরণে। কেবল মাথার ওপর হাত তুলে হাতের নানা ভঙ্গিমায় চালনা করা হয় এই পাপেট। একজন চালক দক্ষতা-অনুযায়ী এতে তার দুহাত দিয়ে দুটি পাপেটও চালাতে পারে।
দণ্ড-পাপেট/ রড পাপেট
পুতুলের গায়ে নানা আকৃতির লোহার বা স্টিলের দণ্ড থাকে। এই দণ্ড দিয়ে এ-পাপেট চালানো হয় বলে একে রড পাপেট বলে। ২ থেকে ৫ ফুট উচ্চতার এই পাপেট-চালনায় চালক অবস্থান নেয় মঞ্চের নিচে।
মা পেট
পশু-পাখি বা মানুষ রূপের খোলসের মধ্যে আপাদমস্তকভাবে একজন পাপেট-চালক ঢুকে নানা অঙ্গভঙ্গি করে হয় মাপেক চালনা। মানুষের ইংরেজি ম্যান আর পুতুলের ইংরেজি পাপেট। এই দুইয়ে মিলে হলো মাপেক। বিখ্যাত আমেরিকান পাপেটিয়ার জিম হ্যানসন এই মাপেকদের জন্মদাতা। আমেরিকার বিশ্বখ্যাত পাপেট শো ‘সেসিমি স্ট্রিটে’ বিগ বার্ড নামে যে-হলুদ পাখিটি আছে সেটি একটি মাপেক।
ওপরের এই চার গোত্রের পাপেট ছাড়াও ছায়াপুতুল নামে আরেক ধরনের পাপেট আছে। সাধারণত চামড়া বা প্লাস্টিক শিটে একটি বস্তুর আকার দিয়ে তাতে নানা ধরনের নকশা জুড়ে এ-পাপেটের ওপর ফেলা হয় আলো, সে-আলো অন্ধকার ঘরে সাদা পর্দার ওপর পড়ে হয় এই ছায়াবাজি পুতুলনাচ। ইন্দোনেশিয়ায় এই ছায়াপুতুল খুবই ঐতিহ্যবাহী এক আর্ট-ফর্ম।
অনেক হলো এদের বংশ-পরিচয়ের বৃত্তান্ত। এবারে আসা যাক সেই আগের কথায়। বহুগুণের ওপার থেকে বৃষ্টি আসার গল্পে — কেমন করে মুস্তফা মনোয়ার গড়লেন পাপেট, তাতে জুড়ে দিলেন প্রাণ।
মুস্তফা মনোয়ারের পাপেটেরা
বাঁকুড়ায় কাটে মুস্তফা মনোয়ারের শৈশব। সেখানেই প্রথম পুতুলনাচের সঙ্গে পরিচয়। তখন চার-পাঁচ ফুটি বাঘো পাপেটের মুখে সাধারণ গল্প তাঁর বালকমনে অসাধারণ লেগেছিল। তেমন কোনো কারসাজি নেই, নেই পাপেটের চলনে আরোপিত কৌশলের কপচানি, গল্পের মাঝেও বাড়াবাড়ি নেই। সাধারণ জীবনের ঘটনার মাঝে হয়তো কখনো রাধা-কৃষ্ণের গান জুড়ে দেওয়া হতো। সে-গানও ছিল সরস-সুরেল। গ্রামীণ মানুষের করা এইসব পুতুলনাচ তাঁর কিশোরমনে বিনোদনের সঙ্গে জন্ম দেয় কৌতূহলেরও। আর সেই কৌতূহল তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন আজীবন। জীবনের প্রতিটি বাঁকে উন্মোচন করতে চেয়েছেন সেই কৌতূহলের জাল। ’৫৮ সালে যখন কলকাতা আর্ট কলেজে পড়েন তখনো আর্টের রংতুলি নিয়ে স্বপ্ন আঁটতেন পুতুল বানানোর। ভাস্কর্যের ক্লাসে আনমনেই মুখোশ বানাতেন। তাঁর গড়া বিষণ্ণ, উৎফুল্ল, রাগীসহ নানান মুডের মুখোশ যেন তাঁকে শেষ পর্যন্ত ইশারা করত পুতুল গড়ার। আর্ট কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতার পাট চুকিয়ে আসেন বাংলাদেশে। সেটি ’৬১/৬২ সালের কথা। ঢাকার আর্ট কলেজে নিযুক্ত হন শিক্ষকতায়। রুটিন ক্লাসশেষে ছাত্রদের নিয়ে মেতে উঠতেন নানা সৃষ্টিযজ্ঞে। এই করতে করতে হঠাৎ একসময় ছাত্রদের নিয়ে গড়েন নানা আকৃতির পাপেট। বিষয়টি প্রথম চোখে পড়ে কলিম শরাফির।
তিনি তখন একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করছিলেন। সেই ডকুমেন্টারিতে জুড়ে দিলেন মুস্তফা মনোয়ার আর তাঁর ছাত্রদের বানানো পাপেটদের নিয়ে একটি পুতুলনাচের দৃশ্য। শুটিং হলো এফ.ডি.সি-তে। এই প্রথম ক্যামেরার সামনে নিজের পুতুল-ভুবনের পারফরম্যান্স তাঁকে উৎসাহী করে তোলে। পরবর্তীতে আর্ট কলেজ ছেড়ে যুক্ত হলেন বিটিভিতে অনুষ্ঠান-প্রযোজক হিসেবে। শুরু করলেন ভিডিও ফরম্যাটে নানা আঙ্গিকের অনুষ্ঠান-নির্মাণ। কিন্তু পুতুল যার প্রাণে তার কি ভুলে থাকা সম্ভব পুতুলনাচকে? আর পাকিস্তানি আমল তখন। পাকিস্তানি শাসকদের নজরদারি অন্যসব ক্ষেত্রের মতোই টেলিভিশন-অনুষ্ঠান-নির্মাণেও ছিল বহাল। তাই রবীন্দ্র-নজরুলসহ দেশীয় নানা আঙ্গিককে অতটা সরাসরি উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও ছিল নানা বাধ্যবাধকতা। শেষে স্থির করলেন পুতুল দিয়েই উপস্থাপন করবেন দেশীয় নানা কাহিনী আর ঐতিহ্য। শুরু করলেন একটি পাপেট-শো সেই ‘৬৫ সালে। দুটি চরিত্র বাঘা আর মেনি। বাঘা বেজায় সাহসী কিন্তু বুদ্ধির ভান্ডারে ঘাটতি আছে বেশ। অন্যদিকে মেনি কিছুটা ভিতু হলেও বুদ্ধি তার উপচেপড়া। এ-সময়ের প্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র-নির্দেশক সাইদুল আনাম টুটুল সে-সময়ে এই পাপেট-শোতে যুক্ত ছিলেন পাপেটিয়ার হিসেবে। বয়সে তিনি ছিলেন কিশোর ওই সময়ে। দুবছর বেশ জনপ্রিয়তার সঙ্গে চলল এই পাপেট-শো। এই শো-র বাঘা আর মেনি ছিল হ্যান্ড পাপেট। হাত দিয়ে এদের পরিচালনা করা হতো। তারপর এলো মুক্তিযুদ্ধ। মুস্তফা মনোয়ার চলে গেলেন কলকাতায়। যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলেও পুতুলনাচকে নিয়ে গেলেন শরণার্থী শিবিরে। তখন একটি দল তৈরি হচ্ছিল। তাঁরা তাঁদের প্রাণসঞ্চারী গান নিয়ে বিভিন্ন শিবিরে ঘুরবে, জাগাবে মুক্তিসন্ধানী প্রাণের মাঝে আশা আর উদ্দীপনা। এঁদেরই পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি মুক্তির গান শীর্ষক চলচ্চিত্রে। সেখানে মুস্তফা মনোয়ারের পাপেটও ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ইয়াহিয়া খানের বাহিনী বেধড়কভাবে পরাস্ত হচ্ছে— এমন সব কাহিনী নিয়ে তিনি গড়ে দিলেন নানা আঙ্গিকের পুতুল। সাইদুল আনাম টুটুল, তারেক, স্বপন চৌধুরীসহ মুক্তির গানের সেই দলের নানান জনকে তিনি শিখিয়েছিলেন যুদ্ধকালীন পুতুলনাচ। মুক্তাঞ্চলে রাতের বেলায় কাঠের আগুনের আলোয় সাধারণ মানুষ এইসব পুতুলের বীরোচিত কাহিনী দেখত। তারা হেসে কুটিপাটি হতো, মুহুর্মুহু পড়ত মুক্তিকামী মানুষের হাততালি। সাধারণ কৃষক নিড়ানির কাস্তে দিয়ে ইয়াহিয়ার বাহিনীকে কুপোকাত করত এসব পুতুলনাচের আসরে। তখন সেইসব যুদ্ধ-আতঙ্কগ্রস্ত মানুষও প্রত্যয়ী হয়ে উঠত যুদ্ধে যাবার জন্য। পুতুলনাচ যে সাধারণ বিনোদনকে ছাড়িয়ে প্রেরণার হতে পারে, তা সে-সময় প্রমাণিত হয়।
যুদ্ধ শেষ হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু পুতুলনাচ ক্রমেই হারাতে লাগল সাধারণের জীবন থেকে। মুস্তফা মনোয়ার আবারও হাল ধরলেন। আশির দশকে তিনি আবার টেলিভিশনে শুরু করলেন পাপেট-অনুষ্ঠান। এখানেও এলো জোড়া পাপেট-চরিত্র ‘ক’ আর ‘খ’। ক-তে কাক আর খ-তে খরগোশ। এই অনুষ্ঠান-উপস্থাপনায় ছিলেন একজন আপামনি। ক চরিত্রটি কাক হওয়াতে ওর উচ্চারণে কাকের ডাকের কড়কড়জনিত একটি আওয়াজ ছিল। সে আপামনিকে আপা না বলে অপ্রা বলত ওর স্বভাবজনিত কাকের উচ্চারণে। এটি শিশুদের দারুণ আনন্দ দিত। এই অনুষ্ঠানটি তার গুণগত নৈপুণ্যের কারণে দর্শক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জাপান অ্যাওয়ার্ডও লাভ করে। বেশ বছর এটি চলল।
তারপর এলো মীনা। মীনা কার্টুনের মতো এই পাপেট মীনাও দর্শক-জনপ্রিয়তা পায়। এতে মীনা ছাড়া আরো দুটি উল্লেখযোগ্য পাপেট-চরিত্র ছিল— রাজু পাপেট আর মিঠু পাপেট। মিঠু অবশ্য একটি পাখি-পাপেট। এরা সবাই ছিল রড পাপেট। শুরুর দিককার কথায আবার আসা যাক। বলা হয়েছিল, মুস্তফা মনোয়ারের প্রাণে পুতুলের প্রাণ নাচে অপার কৌতূহলে। তাই যার প্রাণে পুতুলের প্রেরণা এত গভীর তার পক্ষে শুধু দু-একটি টেলিভিশন-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই পুতুলনাচের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব নয়। তাই নিজে নিজেই গড়লেন একটি প্রতিষ্ঠান—’এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’। নানা গড়নের পাপেট বানানো, নানা আঙ্গিকের কাহিনী তৈরি করা, গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণসহ নানা নিরীক্ষামূলক কাজকে ঘিরে আদোপান্ত ব্যস্ত হলেন এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে। পুতুলনাচে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করলেন নিজেকে। উদ্দেশ্য এই নিবু নিবু মাধ্যমটির পুনর্জাগরণ। শিশুশিক্ষার সঙ্গে আনন্দের মেলবন্ধন ঘটাতে পাপেট নিয়ে তাঁর এই কর্মযজ্ঞের শুরু। নতুন কিছু ছেলে-মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রফেশনাল পাপেটিয়ার করে তুললেন। দেশজ নানা কাহিনী থেকে পাপেট-চরিত্র গড়ার জন্যও সঙ্গে নিলেন আরো কিছু উদ্যামী তরুণকে, যারা পাপেট গড়ে। সাহায্যের হাত বাড়াল ফোর্ড ফাউন্ডেশন। পরবর্তী সময়ে এলো নরওয়েজিয়ান এম্ব্যাসি। ধীরে ধীরে গড়লেন একটি অডিও-ভিডিও স্টুডিও আর পাপেট ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপে সৃষ্ট পাপেটের পারফরম্যান্স এই স্টুডিওতে ধারণ করা হয়। এই ওয়ার্কশপে তিনি গড়লেন নতুন এক পাপেট-চরিত্র পারুল। পারুল তাঁর মতে সাত ভাই চম্পাকে জাগানোর শক্তিসম্পন্ন একটি চরিত্র। সত্যিকার অর্থে সাধারণ কাহিনীর মধ্য দিয়ে চারপাশের ঘুমিয়ে থাকা নানা বিষয়কে শিশুদের দেখাবার জন্যে তাঁর এই পারুল-চরিত্রের সৃষ্টি। তাছাড়া নারী অবহেলিত আমাদের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে। তাই এই নারীকে মুখ্য করে ছোট্ট মেয়ে পারুল-পাপেটের সৃষ্টি। বিটিভিতে তাঁর এই পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ‘৯০-এর দশকে পারুল-পাপেটকে কেন্দ্র করে শুরু করে ‘মনের কথা’ নামে একটি অনুষ্ঠান, যেটি আজও চলছে। এই অনুষ্ঠানে পারুলের সঙ্গে গায়েন-চরিত্রে বাউল-পাপেট আর বলদ-পাপেটসহ নানা চরিত্র আছে। এইসব চরিত্র আমাদের কৃষ্টি থেকে নেওয়া। এদের মাধ্যমে যে-কাহিনীর উপস্থাপন করা হয় তাও স্বদেশী। বলে রাখা ভালো, মুস্তফা মনোয়ার-সৃষ্ট এইসব পাপেট কিন্তু রড-পাপেট।
টেলিভিশন-অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পাপেট-শো করা এই ‘পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’র একটি নিয়মিত কাজের অংশ। মুস্তাফা মনোয়ার বললেন, ‘আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার মধ্যে বিনোদন আর সুকুমার বৃত্তিবিকাশের বড়ই অভাব।’ এটি আজ থেকে কত বছর আগে রবীন্দ্রনাথও বলেছিলেন, ‘বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা-কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র, কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না।’ সত্যিই তো নিজের ওজনের চাইতে অধিক বইয়ের ভারে ক্লান্ত আমাদের শিশুদেরকে তো আমরা কেবল মুখস্থ করে ফার্স্ট করাবার এক প্রতিযোগিতায় নেমেছি। এখানে আনন্দ কোথায়? এই আনন্দশূন্যতায় মুস্তাফা মনোয়ার শুরু করলেন শিক্ষকদের পাপেট-চালানোর কৌশল-শিক্ষাদানের। একই সঙ্গে বিনোদন আর শিক্ষাকে কীভাবে এই মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায় তা শেখাতে তাঁর এই প্রশিক্ষণ-আয়োজন। ইউনিসেফসহ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তাঁকে সহায়তা করেছে এ-কাজে। এছাড়া হবু শিক্ষকদেরও এ-ট্রেনিং তিনি দিচ্ছেন ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। পাশাপাশি চলছে পাপেট-রাজ্য গড়ার। প্রস্তুতিপর্ব চলছে এখন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই করে এদেশীয় কৃষ্টি ঠিক রেখে চলছে পাপেট-সৃষ্টির প্রাথমিক কাজ। সঙ্গে নিয়েছেন এদেশেরই কিছু সৃষ্টিমুখর উদ্যমীকে। পাণ্ডুলিপি তৈরি, পাপেটসহ বিভিন্ন মানুষ-চরিত্রের সৃষ্টি, পাপেট-চালনা, ক্যামেরায় ধারণ, সেটের নকশা-প্রণয়ন, গ্রাফিক্সের কারিগরি ইত্যাদির নানা খুঁটিনাটি নিয়ে একটি দল গঠন করেছেন তাঁরা। নয়নতারা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। এখানেই চলছে দিন-রাত্রির পাপেটে প্রাণসঞ্চারের আয়োজন। প্রজেক্ট-হেড সারা যাকের। মামুনুর রশীদ প্রধান লেখক। তাঁর নেতৃত্বে একদল তরুণ লিখে চলেছেন পাণ্ডুলিপি। কখনো সংযোজন, কখনো বিয়োজন — এই করে পাণ্ডুলিপিগুলো আঁতুড়ঘরে জন্ম নেবার অপেক্ষায়। সিসিম স্ট্রিটের হেড অফিস আমেরিকা থেকে এসেছেন বিশেষজ্ঞ লেখক অ্যানি ইভান্স। পাপেটের বৈশিষ্ট্য, হাসি-কান্না আর অনুভূতিগুলো ধরিয়ে দিতে একটি ওয়ার্কশপেরও আয়োজন হয়ে গেল জুনে। লেখা-তৈরির সময় আবার পন্ডিত মহাশয়ের মতো এসে খাড়া হচ্ছে সিলেবাস। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অক্ষর শেখা, পুষ্টি, পরিবার, যোগাযোগ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ইত্যাদি নানা অবজেক্টিভকে নিয়ে তারা গড়েছেন সিলেবাস। আর এই সিলেবাসের বিষয়গুলোকে নিয়ে লেখা হচ্ছে চিত্রনাট্য।
অন্যদিকে পাপেটের চলন-বলন আর আলাপ-প্রলাপ শেখাতে হাজির আমেরিকার বিখ্যাত পাপেটিয়ার মার্টিন রবিনসন। সিসিমপুরের পাপেটগুলো হবে হ্যান্ড পাপেট বা গ্লাভস্ পাপেট। সত্যি কার অর্থে হ্যান্ড পাপেটের প্রচলন এদেশে নেই। সেই কবে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানে মিষ্টি, নামি নামের দুটি পাপেট ছিল হ্যান্ড পাপেট। তারপর তো আর হ্যান্ড পাপেটকে নিয়ে তেমন কিছু দেখা যায়নি। তাই হ্যান্ড পাপেট চালানোর অভিজ্ঞতাও এখানে নেই। একেবারেই শূন্য থেকে নতুন কিছু ছেলেমেয়েকে এই পাপেট চালানো, তাদের অঙ্গ-ভঙ্গি, সংলাপ-প্রক্ষেপণসহ নানান বিষয় শেখানো হচ্ছে। থিয়েটার থেকে আসা এইসব ছেলেমেয়েও বেশ উৎসাহের সঙ্গে রঙ করে চলেছে পাপেট-চালানো আর বলোনে।
প্রজাপতি, লিচু চোর, পরশ পাথর, বাঘ ও বক, ফাঁদে পড়িয়া বগা কান্তেসহ নানা দেশীয় গল্প নিয়ে পাপেট-প্রডাকশন তৈরির কাজ। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ আশাকরি আবারো জমজমাট আসর হয়ে উঠবে এই সৃষ্টি-উদ্যমী শিল্পীর হাত দিয়ে। এর মাঝেই হঠাৎ শোনা গেল আমেরিকার পাপেট-কোম্পানি ‘সিসিম স্ট্রিট’ আসছে বাংলাদেশে। সেই বিশ্বখ্যাত পাপেটিয়ার জিম হ্যানসনের গড়া এই পুতুল-কোম্পানি পৃথিবীর নানা দেশেই গেছে। তবে এদেশে তারা এ-ই প্রথম।
সিসিমপুরে যাই
সে-এক অবাক জগৎ। শিশুদের সত্য-আনন্দের এক স্বপ্নের জগৎ। এখানে ভেদাভেদের টুকিটাকি নেই, নেই কুটিলতা, নেই মিথ্যা। আছে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার এক আনন্দময় ভুবন। অফুরান প্রাণশক্তি নিয়ে এখানে উল্লাস আছে, খেলা আছে, আছে কল্পনার সৃষ্টিশীল প্রকাশ। শিশুরা স্বপ্ন দেখবে, নিজেদের মতো করে বিশ্ব দেখবে, চারপাশেকে শিখবে, চিনবে সুন্দরকে — এই প্রত্যাশা নিয়ে অবশেষে বাংলাদেশে আমেরিকার পাপেট-কোম্পানি ‘সিসিম স্ট্রিট’ এলো। টেলিভিশনের কল্যাণে সিসিম স্ট্রিটের পাপেটদের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। বিগ বার্ড, টেলি মনস্টার ইত্যাদি নানা পাপেট-চরিত্র আর মানুষ-চরিত্রের সমন্বয়ে এই সিসিম স্ট্রিট লাখো দর্শকের প্রাণ জয় করে এসেছে প্রায় দু-দশকের অধিক সময় ধরে। এবারই তারা পাপেটের বাক্স-পেঁটরাসেমেত হাজির বাংলাদেশে। উদ্দেশ্য এদেশীয় ঢঙে সিসিমপুর নামে একটি অন্য একটি টিম ব্যস্ত স্টুডিওতে ভিডিও ফরম্যাটে এদের ধারণ নিয়ে। ক্লোজ শট, লং শট, পাপেটিয়ারকে এড়িয়ে পাপেটকে ফ্রেমে রাখা, শট থেকে অন্য শটে নাটকীয় আকর্ষণ ধরে রাখা, ইত্যাদি দারুণ সব ভিডিও টেকনিকের প্রশিক্ষণ চলছে এদের। সাবেক একুশে টেলিভিশনের জনপ্রিয় ‘দেশজুড়ে’ অনুষ্ঠানের প্রযোজক ফুয়াদ চৌধুরী এ-ভিডিও দলের পুরোধা। সঙ্গে আছেন সিরিজ-প্রডিউসার হিসেবে রতন পাল। এই স্টুডিও ডিরেক্টরের প্রশিক্ষণ দিতে এসেছেন আমেরিকার সিসিম স্ট্রিট থেকে নাদিন জিলস্ট্রা।
এছাড়া লাইভ অ্যাকশন অর্থাৎ পাপেট ছাড়াও বিভিন্ন বাস্তব শিশুতোষ বিষয় নিয়ে ডকুমেন্টারিও স্থান পাবে এই পাপেট-শোতে একটি নিয়মিত আয়োজন হিসেবে। আগামী বছর এই সিসিমপুর টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হবে দর্শকদের সামনে। এই বিশাল পাপেট-আয়োজন থেকে কিন্তু বাংলাদেশের পাপেট-জনক মুস্তাফা মনোয়ারও বাদ পড়েননি। তিনি এই দলটির সঙ্গে আছেন চিফ ক্রিয়েটিভ অ্যাডভাইজার হিসেবে।
ভিনদেশী ‘সিসিম স্ট্রিট’ বাংলাদেশের শিশুদের সামনে খুলে দেবে বিনোদনের এক নতুন জানালা, যে-জানালা দিয়ে উঁকি দেবে শিক্ষার আলো। তবে সেখান থেকে যেন দেশীয় কৃষ্টি আর ঐতিহ্য বাদ না পড়ে। কারণ পুতুল তো যেমনি নাচায় তেমনি নাচবে, তাই নাচিয়েকে হতে হবে সতর্ক ও শিক্ষিত। পাপেটের মাঝে প্রাণ আসুক, হাসুক অনাবিল আনন্দে আমাদের সন্তানেরা।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.