মনস্বী লেখক কাজী আবদুল ওদুদের প্রথম জীবনের চার বছরের ডাইরি আজ থেকে প্রায় সিকি শতাব্দী আগে আমাদের হাতে আসে। এই ডাইরি কবি আবদুল কাদিরকে দিয়েছিলেন ওদুদ সাহেবের কোনো স্বজন। কথা ছিল, কবি-সমালোচক-গবেষক-সম্পাদক আবদুল কাদির ওই ডাইরি উপযুক্তভাবে ব্যবহার বা প্রকাশ করবেন। তখন কাদির সাহেবের কাজী আবদুল ওদুদ (১৯৭৬) শীর্ষক গ্রন্থটি বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়ে গেছে। ওই বই প্রকাশের আগে ডাইরিটি হাতে পেলে কাদির সাহেব এর কোনো কোনো অংশের তথ্য ও উদ্ধৃতি তাঁর উপর্যুক্ত বইয়ে ব্যবহার করতেন। তাতে তাঁর বইটি আরো সমৃদ্ধ এবং অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর প্রামাণ্য হতো। কারণ ওদুদ সাহেবের প্রথম দিকের রচনা, গল্পগ্রন্থ মীর পরিবার (১৯১৮) এবং উপন্যাস ‘নদীবক্ষে’ (১৯১৮) ও আজাদ সম্পর্কে স্বয়ং লেখকের বেশকিছু উন্মোচনমূলক বক্তব্য ডাইরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আজাদ উপন্যাসটি ছিল লেখকের বেশ উচ্চাভিলাষী রচনা। রমারঁলার জাক্রিস্তফের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এ-উপন্যাসটি লেখা। ডাইরিতে এ-বই লেখার পরিকল্পনা ও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে লেখক বেশ কয়েক বার আলোচনা ও মন্তব্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাতে বইটি সম্পর্কে লেখকের দরদ ও উচ্চপ্রত্যাশা পরিস্ফুট।
কাজী আবদুল ওদুদ সাহেব ছাব্বিশ বছর বয়সে (১৯২০) কলকাতা থেকে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট সরকারি কলেজের (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) বাংলার অধ্যাপক হয়ে আসেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করেছিলেন (১৯১৯) পলিটিক্যাল ইকোনমিতে। অর্থনীতির ছাত্র হলেও তিনি বাংলার অধ্যাপক হতে পেরেছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই বাংলা সাহিত্যের চর্চায় আত্মনিয়োগ এবং তখনই তাঁর গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস পত্রিকা এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করায়।
আমরা কাজী সাহেবের যে-ডাইরি পেয়েছি তার সময়সীমা ১৯২৪ থেকে ১৯২৮ সাল; তখন তাঁর বয়স ৩০-৩৪। এ-সময়টাই তাঁর গড়ে উঠার এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ও বটে। কারণ, সাহিত্যজীবন শুরু করে এর বছরকয়েক আগেই তিনি রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখের প্রশংসা পেয়ে গেছেন।মেধাবী, মননশীল ও উদ্ভাবনী চিন্তার অধিকারী হিসেবে তখনকার মুসলিম তরুণ তুর্কিদেরও তিনি আকৃষ্ট করতেও সক্ষম হয়েছেন এবং এরই ফলে ঢাকার প্রগতিশীল তরুণ লেখক বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলন ও শিখাগোষ্ঠীর প্রধান দুই নেতার একজন হয়ে গেছেন। অতএব, তাঁর এই সময়ের ডাইরি যে তাঁর প্রতিভা, তখনকার প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ জীবন ও কর্ম-সাধনাকে বোঝার জন্যে মূল্যবান, সে-সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই।
পুটে কাপড়ের বাঁধাই করা নীল রঙের ২৫৬ পৃষ্ঠার ডাবল ডিমাই সাইজের চেয়ে এক ইঞ্চি ছোট রুল করা খাতায় (তাজ স্টেশনারি ওয়ার্কসের পপুলার নামের খাতা) এই ডাইরি লেখা, ‘লেখা’ না বলে কপি করা বলাই যথাযথ। কারণ অনেকেই জানেন, ওদুদ সাহেবের হাতের লেখা ছিল দুষ্পাঠ্য। শেষ জীবনে তিনি দুরারোগ্য পারকিনসন্স রোগে ভুগছিলেন, সেজন্যে প্রথম জীবন থেকেই তাঁর হাতের লেখা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। আর তাই তাঁর লেখা অন্যদের দিয়ে কপি করাতে হতো। এই ডাইরিও কেউ কপি করে দিয়েছেন। তবে লিপিকারের যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে কাজী সাহেব সেইসব অংশ নিজহাতে সংশোধন করেছেন।
কাজী আবদুল ওদুদের এই ডাইরির – তিনি লিখেছেন, ‘ডায়ারি’ – নিচে লেখা হয়েছে ‘নানা-কথা’। ডাইরির নাম-পৃষ্ঠার মাঝামাঝি লেখা আছে – ‘আবদুল ওদুদ’ এবং পৃষ্ঠার নিচের দিকে লেখা রয়েছে – বলা যায়, ওদুদ সাহেবের জীবনের মূলমন্ত্র (Motto) : “প্রাণ-কোরক – ফোটাই যে তার আনন্দ।”
আলোচ্য ডাইরি – যেমনটি আগেই বলেছি, চার বছর (১৯২৪-২৮) সময়কাল ধরে লেখা। তবে চার বছরের প্রতিদিন তিনি এ-ডাইরি লেখেননি। লিখেছেন অনিয়মিতভাবে এবং এতে অনেকের রোজনামচার মতো দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা স্থান পায়নি। এ-ডাইরি আসলে লেখকের তৎকালীন চিন্তাচর্চা বা ভাবুকতার দলিল। আর সেজন্যেই তাঁর তৎকালীন চিন্তাধারার মূলস্রোতের বাইরের কোনো ঘটনা বা বিষয়ের অনুপ্রবেশ এতে ঘটেনি।
আমরা এই ডাইরিকে তাঁর তৎকালীন সময়-পরিসরের চিন্তাভাবনার দলিল বলে আখ্যাত করেছি, তবে একে যদি তাঁর পরবর্তীকালের পূর্ণবিকশিত জীবন ও মনুষ্যত্ব সাধনা ও জীবনব্যাপী সত্যানুসন্ধানের পুষ্প-কোরক বা প্রাণ-কোরক বলি তাহলে সেটাও হবে যথার্থ ভাষণ। বাস্তবিক পক্ষে, ডাইরিতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের বিশদ বিস্তারই তাঁর পরবর্তীকালের সমগ্র সাহিত্যকর্মে পাওয়া যাবে।
এবার কাজী আবদুল ওদুদ সাহেবের ডাইরির একটা সংখাতত্ত্ব হাজির করা যায়। তিনি ১৯২৪ সালে ডাইরি লিখেছেন মোট সাঁইত্রিশ দিন। এর দিনগুলো উল্লেখ করছি না। কারণ দৈনিক প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় মদীয় ভূমিকাসহ তা ছাপা হয়েছে। উৎসাহী পাঠক ওই সংখ্যা থেকে তা দেখে নিতে পারবেন। ১৯২৫ সালে তিনি ডাইরি লিখেছেন জানুয়ারির ১১ ও ৩০ তারিখে, ফেব্রুয়ারি মাসের শুধু ১৪ তারিখে, ১৩৩১ বঙ্গাব্দের চৈত্রের শেষ দিনে, মে মাসের ৪ তারিখে এবং জুন ও আগস্টের যথাক্রমে ২১ ও ২৪ তারিখে। অর্থাৎ এ-বছরে ডাইরি পাচ্ছি মোট সাত দিনের।
১৯২৬ সাল তাঁর জীবন এবং বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় নতুন চিন্তা-চেতনার পদধ্বনির বছর। এ-বছরেও তিনি খুব বেশিদিন ডাইরি লেখেননি – আগের বছরের চেয়ে মাত্র তিন দিন বেশি, অর্থাৎ এ-বছরে ডাইরি লেখার পরিমাণ দশ দিন। এতে অন্তর্ভুক্ত দিনগুলো হলো : ১৫ জানুয়ারি, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ৩০ মার্চ, ২৭ এপ্রিল, ১ ও ১২ মে, ১১ জুন, ১০ সেপ্টেম্বর, ৪ নভেম্বর – মোট দশ দিন। এ-বছরের ডাইরি লেখার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ১৯ জানুয়ারি বা ২০ জানুয়ারি তিনি কোনো ডাইরি লেখেননি। স্মর্তব্য যে, এ-বছরেরই ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রগতিশীল তরুণ কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা ও বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলন শুরু হয় এবং এই সমাজের মুখপত্র শিখা পত্রিকার নামানুসারে এই গোষ্ঠীর নাম হয় শিখাগোষ্ঠী। আর এই গোষ্ঠীর আদর্শিক নেতা এবং দ্বিতীয় প্রাণপুরুষ ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ।
১৯২৭ সালে তিনি তাঁর দিনলিপি লেখেন ২১ মার্চ, ১লা বৈশাখ, ১১ ও ১২ জুলাই, ২৪ আগস্ট এবং ৩০ ও ৩১ অক্টোবর এবং ১০ নভেম্বর অর্থাৎ মোট আট দিন। ১৯২৮ সালে লেখেন ১ ও ৪ জানুয়ারি, ১১ মার্চ, ২০ জুন, এবং ২২ অক্টোবর – মোট পাঁচ দিন। অতএব চার বছরে তিনি দিনপঞ্জিতে ‘নানা-কথা’ লিখেছেন সর্বমোট সাতষট্টি দিন। এতে লেখার খাতাটির ২০৫ পৃষ্ঠা পূর্ণ হয়েছে।
দুই
ইতোমধ্যে দৈনিক প্রথম আলোর এ-বছরের বিশেষ ঈদসংখ্যায় ছাপা হয়ে গেছে বলে আমরা ১৯২৪ সালের সাঁইত্রিশ দিনে লেখা ডাইরি নিয়ে কোনো আলোচনা করবো না। শুধু ১৯২৬, ’২৭ ও ’২৮ সালে লেখা ডাইরি নিয়ে কিছু আলোচনা ও মন্তব্য করবো এবং কিছু অংশ উদ্ধৃত করবো। তবে সূত্র ধরিয়ে দেবার জন্যে ১৯২৪ সালের ডাইরির শেষ দুদিনের কিছু অংশ চয়ন করবো। তাতে ১৯২৪ সালে তাঁর মনন-বিশ্ব এবং ভবিষ্যৎ কাজের এলাকা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। উপর্যুক্ত বছরের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে লেখা ডাইরিতে তিনি বলছেন, ‘সব জড়তা, জঞ্জাল অর্থাৎ বৈচিত্র্যের নামে সে সকলের উদ্ভব হয়। সময়ের ভিতর দিয়ে সহজকে প্রকাশ করাই প্রত্যেক যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের লক্ষণ। রামায়ণে বীর দৃঢ় রামচরিত্র, মহাভারতে কুরুদেব, সব গন্ডগোলের ভিতরে যুধিষ্ঠির, ভীম, ভীষ্ম, শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন ইত্যাদির চরিত্র। শাহনামার বীরধর্ম, হাজেফে সবল, সরল প্রেম, ওমর খৈয়ামের সবল সন্দেহ, ভিক্টর হিউগোতে পতিত আত্মার সম্মুত্থানের দীপ্তি, টলস্টয়ে সোজা প্রতিবাদ, মহাত্মাজীতে সবল প্রেম, রবীন্দ্রনাথে ব্যাপক অথচ সবল অনুসন্ধান।’ বোঝা যাচ্ছে এই সময়ে কাজী সাহেবের মানসজগতের ভূগোলটি যথেষ্ট বিস্তৃত এবং গভীরতাশ্রয়ীও বটে।
আমাদের মনে হয়, বিশ্বসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে তখনই তিনি তাঁর চিন্তার শেকড়টি প্রোথিত করে নিয়ে নিজের অদূর ভবিষ্যৎ কর্ম-এলাকা নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন। ২৮ ডিসেম্বরের রোজনামচায় তিনি লিখছেন, “Muslim Renaissance in Bengal কি ধরনের হবে? আমি সে উদ্দেশে কি করতে পারি? আদৌ যথেষ্ট কিছু করতে পারি কি? জানি না। হয়তো আমার দ্বারা কিছু হতে পারে। মুসলমানের অতীতের সঙ্গে আরো বেশি পরিচয় লাভ করতে পারলে আমার দ্বারা অনেক কাজই হতে পারবে। খোদা তুমি সহায় হও।” তিনি যে পরবর্তীকালে ‘বাংলায় মুসলমান’, ‘বাংলার জাগরণ’, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে কাজ করবেন এবং বিশ্বঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠজনেরা তাঁর অনুধ্যানের বিষয় হবে সে-বিষয়টিও পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। আসলে তাঁর আজীবন সাধনায় এই দুটি ধারা চির অনুস্যূত। একদিকে বাংলা, বাঙালি মুসলমান, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, সৈয়দ আহমদ, নানক, কবীর – অন্যদিকে টলস্টয়, গ্যেটে, রমারঁলা ফেরদৌসি, সাদী, খৈয়াম হাফেজ। উপর্যক্ত দুটি ধারার সঙ্গে তৃতীয় একটি প্রবল ধারাও যুক্ত হয়েছে। এতে আছে হজরত মুহম্মদ (সা.), কুরআন, ইসলাম এবং আল্লাহ। এই বিষয়গুলিকে নিয়েই তাঁর মনন-বিশ্ব। আজীবন এই বিশ্বে জাগ্রত মনুষ্যত্ববোধ ও সৃজনশীলতার সাধনাই ছিল তাঁর অন্বিষ্ট।
তিন
১৯২৫ সালে প্রথম ডাইরি লেখেন তিনি ১১ জানুয়ারি তারিখে। এতে তাঁর জীবনবোধের একটি পরিচয়কে তিনি তুলে ধরেছেন এভাবে: “কয়েকটি কথা একটু পরিষ্কারভাবে দেখা দিচ্ছে –
১. দলের সঙ্গে গভীর স্বাভাবিক যোগ চাই – যেমন বাতাসের চাপেই মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে – লোকের বিরুদ্ধতা-প্রতিযোগিতা এসব অন্তরায় নয়, জীবনের পক্ষে অত্যন্ত দরকারি – এত দরকারি যে এই প্রতিবন্ধকতা ঢাকা না থাকলে আমাদের কোনো ওজনই থাকত না। ভাবের হাওয়ায় দুলে বেড়ানো খুব স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্য জ্ঞাপক অবস্থা নয়।” বিরাট দল গঠন এবং এই দলের মানুষের চিন্তাচেতনা ও প্রশ্নহীনতাকে তিনি মানবসমাজের জন্য অকল্যাণকর ভেবেছেন। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও যুক্তিহীন, বিবেচনাহীন গড্ডালিকা প্রবাহকে তিনি অনুমোদন করেননি। তিনি দলগড়া বা সংখ্যা বাড়ানোর কোনো তাৎপর্য খুঁজে পাননি। তিনি বলেছেন, সংখ্যা নয় ভেতরে তাজা মনওয়ালা মানুষ চাই।
অন্যত্র বলছেন, “আজ স্টোভ জ্বালার আগে গ্যাসের সোঁ সোঁ আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল – বাস্তবিক প্রতিভা একটা হঠাৎ আবির্ভাব নয়। গ্যাসে যে হঠাৎ আগুন ধরে উঠে আমরা দেখতে পাই, সে ঠিক হঠাৎ নয়। বহুক্ষণ আগুন ধরার যোগ্য হয়ে আসতে আসতে শেষে আগুন ধরে উঠে।”
৪ মের ডাইরিতে একটা জায়গায় লিখছেন, “মাঝে মাঝে মনে হয় আমিও সত্যই একজন কবি, তবে বিধাতা আমায় ছন্দ অধিকার তেমন দিলেন না কেন? এর উত্তর পেয়েছি। বৃষ্টি পড়ে – অতি চমৎকার ব্যাপার এই বর্ষণ। কিন্তু জগতে তার চমৎকারিত্ব ফোটে গাছপালা, নদনদীর চাকচিক্যে, শস্যের চমৎকারিত্বে, জীবের জীবনানন্দে। আমার এই স্বভাবের সৌন্দর্যের গাঢ় অনুভূতি ফুটতে চায় আমার চিন্তায়, ভাবনায়, দৃষ্টিতে, ব্যবহারে। আমিও ছন্দবিহীন নই। আর হয়তো জটিলতর সেই ছন্দ। সত্যকার প্রকাশ যদি লাভ করে তবে নিবিড়তর হবে তার আনন্দ।… গ্যেটের ফাউস্ট পড়চি। দেখছি অসাধারণ চিন্তাশীল লোকটি, কিন্তু সত্যিকার কবিও। প্রথম কয়েক দৃশ্যে জগতের বিচিত্র জ্ঞানবিজ্ঞান কবির হৃদয়ের রঙে কি চমৎকার রেঙে উঠেছে। বিজ্ঞানদর্শন সেখানে সত্যকার মানুষের জীবনের ভিতরে প্রবেশ করে অপরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
“এই রঙ কাব্যের প্রাণ বলে তত্ত্ব সেখানে একেবারে চাপা পড়ে রয়েছে। তাই শাহনামা বা মেঘনাদবধ চমৎকার কাব্য। জীব ও মানুষ প্রতিফলিত তার বুকে – এও কাব্যের এক সংজ্ঞা।”
কাজী সাহেব খড়হম-এর History of English Literature-এ নেটলির মূল্যায়নে হতাশা প্রকাশ করেছেন, তেমনি Bradley-i Oxford Literature পড়েও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি সাহিত্য সমালোচকদের মতামতকে বিশেষ বিবেচনা করে বলা নয় বলে মনে করেন। তাঁর মতে : “তাঁরা সাহিত্যের ভাবগুলোকে মুঠোর মধ্যে ধরে লোককে দেখাতে চান। সে দেখানো কত বিশ্রী যেন কতকগুলো রত্ন ধান ঝাড়া কুলোয় করে লোকের সামনে ধরে বলা, এই দেখ।”
১৯২৬ সালের ডাইরি শুরু হয়েছে ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখে। এই দিনের ডাইরির বিষয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজের বক্তৃতা। তখন রবীন্দ্রনাথ ঢাকা সফর করছিলেন। তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সভা-সংগঠনে বেশ কটি বক্তৃতা দেন। কাজী ওদুদ সাহেব জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজে কবির বক্তৃতা শুনে তাঁর মতামত ওই দিনের ডাইরিতে লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর ডাইরির সুবাদে একটি তথ্যগত অস্পষ্টতারও নিরসন হতে পারে। ড. ভূঁইয়া ইকবাল তাঁর বাংলাদেশে রবীন্দ্র সংবর্ধনা গ্রন্থে (বাংলা একাডেমী ১৯৯৩) বলছেন, ‘৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নর্থব্রুক হলে বিশ্বভারতী সম্মিলনী ঢাকা শাখা কবিকে সংবর্ধনা জানায়… এই সভার পর জগন্নাথ কলেজে কবিকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয় (পৃ. ২৬)।’ এখানে তথ্যগত অস্পষ্টতা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। কারণ, ড. ইকবালের বক্তব্যে মনে হয় নর্থব্রুক হলে বক্তৃতার পর ওই দিনই কবি জগন্নাথ [ইন্টারমিডিয়েট] কলেজে বক্তৃতা দিতে যান। কবি বিকেলে বক্তৃতার পর সন্ধ্যায় ওই কলেজে আবার একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন কিনা সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু ওদুদ সাহেবের ১১ তারিখের ডাইরি এ-ব্যাপারে আমাদের বিভ্রান্তি দূর করে। তিনি ১১ ফেব্রুয়ারির ডাইরিতে লিখেছেন: “যা আমার হাতের সৃষ্টি নয় তাতে আমার দরদ নেই। দেশকে আমি যদি নতুন করে সৃষ্টি করতে পারি তবেই দেশের প্রতি আমার প্রেম জাগবে। এই একই সৃষ্টির কাজে হিন্দুমুসলমান যদি লাগে তবে সেই ক্ষেত্রে তাদের পরষ্পরের সঙ্গে পরষ্পরের পরিচয় ও প্রেম হবে – দেশব্যাপী মিলন সম্ভবপর হবে। এই রবীন্দ্রনাথের কালকার জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ প্রাঙ্গণে প্রদত্ত বক্তৃতার মর্ম।” এই বক্তব্য থেকে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ওই কলেজে বক্তৃতা করেন ১০ ফেব্রুয়ারি।
রবীন্দ্রনাথের ওইদিনের বক্তৃতায় উপস্থিত থেকে কবির বক্তব্যে তিনি সন্তুষ্ট; তবে মন্তব্য করেছেন, কবি যেন, ‘মিলনের পথে কাল প্রাণের সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ছুটি নিয়েছিলেন।’ তিনি বলছেন মূল জায়গাটাতে এসে কবি যেন চেপে যান। হয়তো ছাত্রদের সভা বলেই। এর আগের অর্থাৎ ১৫ জানুয়ারির ডাইরিতে কাজী সাহেব রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখছেন : ‘আমাদের জাতি যখন সফলতা লাভ করবে, বেশ ঘরকন্যা পেতে বসবে, তখন রবীন্দ্রগীতি তাদের কানে খুবই যে হৃদ্য শোনাবে তা নয়, তবে একেবারে পরিত্যক্ত হবে না; কিন্তু নবপর্যায়ের জীবনের আরম্ভে তিনি পুনরায় আমাদের জাতির নায়ক হলেন। তাঁর সমস্ত কাব্য-কীর্তি মুক্তির এক নবগীতা। বুদ্ধির মুক্তিকে তিনি আশ্চর্য সুন্দর আর ক্ষীণদেহ অথচ অসাধারণ শক্তিশালী রূপদান করেছেন। এই তাঁর সৃষ্টি। এই দিক দিয়ে বাস্তবিকই তিনি অমর। সে রকম অমর একালের ভারতে দেখছি এই কজন – রামমোহন, মধুসূদন, রামকৃষ্ণ, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ; এরই ভিতরে এই তিনজন লক্ষ্যযোগ্য – রামমোহন, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ।”
২৫ ফেব্রুয়ারির ডাইরিতে চিত্তের একটা নতুন অনুভূতির – আনন্দানুভূতির কথা বলেছেন। চিত্তের এই আনন্দময় জাগরণের মুহূর্তে নিজেকে তাঁর ‘কবি’ বলে মনে হয়েছে। এবং কবিতা লেখায় হাত দেয়ার কথা তাঁর মনে হয়েছে। তিনি বলছেন : “বহুদিন আগে একবার বাবর সম্বন্ধে কাব্য লিখতে বসেছিলাম, কিন্তু সেদিন প্রাণতত্ত্ব আমাকে প্রেরণা দিয়েছিল। আজ তত্ত্ব নয়, প্রাণানন্দ এসেছে। মন বলছে, এ প্রকাশিত হোক। হযরত মোহাম্মদের কথা ভাবলাম, আজাদের কথা ভাবলাম, দেখলাম সবখানে তত্ত্ব প্রবলভাবে রয়েছে, তাই মন উঠল না। হঠাৎ বাবরের উপর চোখ পড়ল। হ্যাঁ, বাবর-কাব্য লিখতে হবে। কি লিখব পুরোপুরি জানি না। কিন্তু সে তত্ত্ব হবে না – এ-ঠিক’। ২৭ এপ্রিলের ডাইরিতে আছে নিজের লেখালেখির কথা, ‘সুন্দর পৃথিবী’র কথা, মৃত্যুচিন্তা ও বাঁচার আকুতি। এ-দিনের ডাইরির কিছু অংশ : “আজ আমার আজাদ প্রথমখণ্ড গুছিয়ে রাখলাম। এ পর্যন্ত কি কি লিখেছি একবার ভাবলাম।” ‘মুস্তাফা কামাল’ ইত্যাদি নিয়ে নবপর্যায় বার করতে যাচ্ছি, রবীন্দ্রনাথও বার করব। মনে হচ্ছে আমার বাণী হয়তো এখনো পুরোপুরি খুলে বলতে পারিনি, তাই আমি আরো কিছু দিন বাঁচবো।… হঠাৎ মনে পড়ল আজকার জ্যোছনা দেখেনি। দেখলাম। নীল গাছপালা – জ্যোছনার ভিতরকার নীল গাছপালা, উপরে কয়েকটি তারা। সুন্দর এ পৃথিবী, সুন্দর। মৃত্যু অসুন্দর নয়। তবু আজো ঠিক তার জন্য প্রস্তুত নই। মনে হয়, এখনো যে অনেক কাজ বাকি’।১লা মে তারিখে কলকাতায় হিন্দুমুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় মসজিদের সামনে বাজনা বাজানোর প্রতিবাদে লুটপাট ও দাঙ্গার গুজব শুনে মনে যে অশান্তি এসেছিল তা হালকা হয়ে যায় কলকাতা থেকে ঢাকায় আসার পথে এক মুসলমান যুবকের কতিপয় হিন্দু যুবকের সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের খবর শুনে। এই ছোট্ট খবরটি তাঁকে নতুন আশায় উদ্দীপ্ত করে। তবু হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়কেই তাদের সঙ্কীর্ণ ও অধার্মিকসূলভ মনোভাবের জন্যে তীব্র ভর্ৎসনা করে পরে লিখছেন : “বাংলাদেশের ওপর বিশ্বাস হচ্ছে। এখানকার হিন্দুমুসলমান সকলেরই ভিতরে জিনিস পাচ্ছে। আচ্ছা আমি কি মুসলমানকেই বেশী ভালবাসি? তা না হলে হিন্দুর কীর্তি আর মুসলমানের কুকীর্তি শুনে কেন আমার মন এত বিষণ্ন হল? না, আমি যে কেবল মুসলমানকেই ভালবাসি, তারই মঙ্গল চাই, তা সত্য নয়। মোটের ওপর আমি মানুষের কল্যাণ চাই। হিন্দু সেই কল্যাণের পথে সামান্য দু-এক পা এগিয়েছে, মুসলমান একপাও এগোয়নি। তাই মুসলমানের জন্য আমার এত দরদ। তাছাড়া আমি এদেরই ভিতরে জন্মেছি, নাড়ীর টান যে একেবারেই নাই, তা নয়। কিন্তু মুসলমানের জন্যে আমার ভালোবাসা যে এত গভীর আর এত বেদনাকাতর তা এই জন্যেই যে, সে আজ বড় দুঃস্থ, আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে দুঃস্থ। নইলে মসজিদের সামনে দিয়ে বাজনা নিয়ে সেকি এত উতলা হতে পারে? খাতির করে হিন্দু যদি তার মসজিদের সামনে বাজনা থামায় সে ভাল কথা; কিন্তু জোর করে সে তার মসজিদের এই কৃত্রিম সম্মান বজায় রাখবে, এর চাইতে শোচনীয় মনোভাব আর কি হতে পারে?’… ধর্ম যে ক্ষমায়, মানবকল্যাণ কামনায়। হায় মুসলমান একথা আজ একটুও বোঝে না!… এই ঘোর দিনে আল্লা মুসলমান নামে যে বিশাল তমসাচ্ছন্ন সম্প্রদায় পড়ে আছে তুমি তাদের অন্তরে, তোমার জ্যোতি ফুটিয়ে তোল।”

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.