চাঁদের ঘোলা আলোয় চারপাশ ভিজে জবজবে হয়ে আছে। মাঝরাত পেরোনোর পর চাঁদ এমনিতেই হেলে যায়। তখন তার জ্যোৎস্না লম্বা লম্বা বড় গাছ ছুঁয়ে আরো লম্বাটে ছায়া হয়ে শুয়ে পড়ে মাটিতে। এখানকার মাটির রং লাল। কাছাকাছি যে-পাহাড় আছে, তা পেরোতে তেমন মেহনত করতে হয় না। প্রথম প্রথম অবশ্য কষ্ট হতো, পরে অভ্যাস হয়ে গেছে ধীরে ধীরে।
শীতে জঙ্গলে পাতা ঝরে। সেই ঝরা পাতা, ভাঙা ডাল, কাঠকুটো কুড়োতে ঢোকে মেয়েরা, বাচ্চারা। এখন জঙ্গলে আদিবাসীর কাঠকাটা বারণ। কিন্তু কাঠ-মাফিয়া বনের মধ্যে সরকারি আলো হুক করে এনে আলো জ্বালিয়ে করাতকল বসিয়ে গাছ কেটে কেটে সাইজ করে লগ বানায়। তারপর গুঁড়ি, কাণ্ড, ডালপালা – সব আলাদা আলাদা করে কাটিয়ে ট্রাকলরি বোঝাই করে। তারপর বাজারে চলে যায় সেই কাঠ। এটা – মানে কাঠ এভাবে কাটার ব্যাপারটা খুব হয় পাহাড়ের ওপারে, যেখানে আগে বিহার ছিল, এখন ঝাড়খণ্ড।
এই ঝাড়খণ্ড নামের আলাদা রাজ্য একেবারেই রুলিং ক্লাসের ক্লিন ঢপ। সমস্তটাই এক আছে। সিস্টেম, সিস্টেমই তো বদলায়নি। সেটাই তো আসল। একআছে লোকগুলো – থানা, পুলিশ, দারোগা, কোর্ট, আমলা, মন্ত্রী। এতটুকু রদবদল হয়নি সেখানে। আমরা হাতে হাতে বন্দুক তুলে নেওয়ার পর –
রাইফেলের নলে, ম্যাগাজিনে, বাঁটে চাঁদের আলো পড়ে তৈরি করেছে আলাদা আলাদা রঙের মায়া। রাতে আউট পোস্টে লোক থাকে। আর্মড গার্ড। আর্মড মানে সত্তরের পাইপগান চালানো আর পেটো বাঁধতে পারা স্লোগানসর্বস্ব রোমান্টিক আবেগের লোকজন নয়। এরা সব ট্রেইনড, যাকে বলে গেরিলা ওয়ার ফেয়ার, মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি ট্যাকটিক্স জানা, এক্সপ্লোসিভ বিশেষজ্ঞ লোকজন। আর ডি এক্স, হ্যানড গ্রেনেড, ডিনামাইট, ডিটোনেটর, একে ফিফটি সিক্স, একে ফরটি সেভেন, নাইন এম এম পিস্তল, রাইফেল, রিভলভার – সব ধরনের আর্মস চালাতে এরা এক্সপার্ট। আর আছে মাইন তার ভয়াবহ ধ্বংসক্ষমতা নিয়ে।
শীতের ঝকঝকে আকাশে চাঁদটা কোত্থেকে উড়ে আসা চিলতে মেঘের আড়ালে গিয়ে একদম মাইন কভার হয়ে গেল। পুরনো দিনের মাইন যেমন হতো। ক্যাপ আছে মাথার ওপর। সেখানে পা পড়লেই ধুড়ুম। বিশাল বিস্ফোরণ। তাতে জান বাঁচলেও দুপা বাঁচানো খুবই কঠিন। এখন অবশ্য আরো মডার্ন আরো অনেক বেশি সফিসটিকেটেড মাইন চলে এসেছে বাজারে। আমরা নিজেরাই ক্লে-মোর মাইন বানাচ্ছি। ব্যবহার করছি। উড়িয়েও দিচ্ছি।
এসব কথা পরপর মনে পড়ার কথা নয় তার। পড়েওনি হয়তো। কিন্তু গল্প শুরু করতে গেলে লেখক, মানে যিনি লেখেন, তাঁকে খানিকটা হাজর-বাজর বকতেই হয়। সেই বকাবকির মধ্যে কোথা দিয়ে যেন বেরিয়ে আসে গল্পের মূল সুতোটা। যেমন তসর বা রেশম তৈরি করার আগে গরম জলে সেদ্ধ করে মারা হয় ভেতরের গুটিপোকাটাকে। তারপর তা থেকে বের করে আনা হতে থাকে, হতেই থাকে তসর, মুগা, এন্ডির সুতো। সিল্কের ধাগা। তার মানে এই কি, কাহিনীর বীজকে টিপে মেরে তারপর গল্প ফাঁদার চেষ্টা। যেমন ফুটন্ত জলে তসর বা রেশম গুটি। তারপর তার গা থেকে সুতোর আঁশ ছাড়ানো। একই পদ্ধতি কি চালু গল্পের বেলাতেও?
হাতের তালু, পায়ের পাতা শীতে বেশি বেশি ঘামে। কেন এই ঘাম, তার একটা অন্য বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। সেই ঘাম হওয়ার মূল পয়েন্ট অনেকেরই জানা। কিন্তু রাইফেলের বাঁট অনেকক্ষণ হাতে ধরে থাকলে তারপর হাতের ঘেমো পাতা থেকে সেই রাইফেল বা একে ফিফটি সিক্স সরিয়ে ঘাসের ওপর, পাথরের খাঁজে শোয়ালে, কিংবা দীর্ঘ বৃক্ষের গায়ে হেলান দেওয়ালে হাতের মধ্যে সেই গন্ধটা পাওয়া যায়। যে-ঘ্রাণ মিশে থাকে তসর বা রেশমগুটির গায়ে, তখনো সে জ্যান্ত। ভেতরে নড়াচড়া করে প্রাণ। আর দুচার দিন অপেক্ষা করলেই সেই গুটি কেটে বেরিয়ে আসবে প্রজাপতি। তার ডানায় ডানায় তখন পৃথিবীর অনেকগুলো রং। হয়তো-বা আকাশের, সমুদ্রের, আর অরণ্যেরও কিছু বর্ণালি ছুঁয়ে যায় তার পাখা।
সেই কবে কার রেকর্ড করা একটা গান শোনা ছিল না – ‘প্রজাপতি প্রজাপতি পাখনা মেল’!
আধুনিক বাংলা গান। পরের পরের সব লাইন আর মনে নেই সেভাবে। বরং সেখানে একটু বাদে ছিল একটা লাইন – ‘রঙে রঙে রঙ মশাল জ্বাল।’সেটুকু মাথার ভেতর থেকে উঁকি মারল মনের আয়নায়।
সাত-আট জনের একটা স্কোয়াড। দিনের বেলা তাদের চলাফেরা, মুভমেন্ট একরকম। রাত নামলে সেই কায়দা বদলে গিয়ে পুরোপুরি আলাদা। সেখানে তখন পুরোপুরি মিলিটারি যেন, এমন মেকআপ। অলিভ গ্রিন, নয়তো খাকি উর্দি। প্যান্ট শার্ট টুপি, মানে মাথার ক্যাপ সবকিছুই ম্যাচ করে। পায়ে ভারি বুট। তার ওপর পিঠে বেশ ওজনদার রুকস্যাক। তার মধ্যে নিজের সব জিনিস, যেমন রেগুলার ফৌজিদের হয়। জলের বোতল, দড়ি, টর্চ, ছুরি, এক্সপ্লোসিভ। এসপিওনেজের আরো নানান ম্যাটেরিয়াল। তার ওপর রাইফেল, বন্দুক বা একে ফরটি সেভেন, নয়তো একে ফিফটি সিক্স। অন্ধ্রে এই আর্মড স্কোয়াডের নামই তো দলম, যা বহন করে চলেছে তেলেঙ্গানার আর্মড পিজেন্টস স্ট্রাগলের গৌরবজনক ট্র্যাডিশন। তাই তো আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা পরভিনজি বলেন –
কী বলেন?
হাতিয়ার উঠাও অওর ইয়ে খুনি জমানা কো খতম কর।
কিসান ক্রান্তিকে লিয়ে কিসান মজদুর অওর বিদ্যার্থী যুবা পিড়িকে গাঁটবন্ধন জরুরি হ্যায়।
সাংবাদিকরা আমাদের প্রশ্ন করেন, আপনারা কি রেগুলার আর্মি তৈরি করেছেন?
নিশ্চয়ই। সে-আর্মি লংমার্চ করছে।
না, মানে সব জায়গাতেই কি আপনাদের রেগুলার রেড আর্মি, আই মিন সংগঠনের স্কোয়াড বা দলম, তাকে যাই বলি না কেন –
মেয়েটাকে কথার মধ্যে থামিয়ে দি। – আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। কতই বা বয়স মেয়েটার, বড় জোর কুড়ি-বাইশ। সবে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। তারপরই ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স নিয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎই বৈদ্যুতিন মাধ্যমে। তার নাম মধুরিমা।
জঙ্গলে ঝিঁঝির ডাক রাত বাড়লে তীব্র হতে থাকে। মাইনমুখো চাঁদের ঝকঝকে আলোয় তেজি ঝিঁঝিরা এত জোরে গলা সাধে যে, কিছু বলার নেই। সে-তো ওদের জায়গা, ওরা গল্প ফাটাবেই। এমনকি বাঁকুড়ার সুতানের জঙ্গলে যখন ভ্রাম্যমাণ স্কোয়াড নিয়ে ছিলাম কয়েকদিন বিএসএফ-এর তাড়া খেয়ে, তখন দুপুরবেলা – এই বেলা বারোটা-একটার সময় কি যে ডাক ঝিঁঝির, সে যারা না শুনেছেন, তারা বুঝতে পারবেন না। সেই ক্রিকেট-সং শুনতে শুনতে এক-এক বার মনে হয়, ওরে বাবা, এবার বুঝি মাথার মধ্যে ঢুকে পড়েছে সমস্ত পোকা। আর তারা একসঙ্গে দুহাত তুলে নাচছে, গাইছে। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। পরে থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে গেছিল।
বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক মধুরিমা বিশ্বাস। মনে আছে এখনো। সঙ্গের যে-ছেলেটা ক্যামেরা চালায়, প্রায় একই বয়সী। দুজনের পোশাকও প্রায় একই ছাঁচে। নীল জিন্সের ওপর সুতির ঢোলা, গোল গলা টি-শার্ট। মধুরিমারটা কালো। ছেলেটা – তার নাম পরঞ্জয় মুস্তাফি, ওরটা হলুদ। হলুদ মানে বেশ নরম হলুদ। চোখে ক্যাটক্যাট করে লাগে না।
ওদের সঙ্গে আরো একজন ছিল। মানে তিনজন এসেছিল ওরা একসঙ্গে কলকাতা থেকে। সঙ্গী আর একজনের নাম সাত্তার মল্লিক। সে কলকাতার লোক। মধুরিমা লোকাল করেস্পনডেন্ট। পড়াশুনা করেছে কলকাতায়, প্রেসিডেন্সিতে। এখন চাকরিসূত্রে এখানে পোস্টেড। বড় একটা টাটা সুমো নিয়ে এসেছে ওরা পাঁশকুড়া থেকে। সেটা সাত্তারসমেত থেকে গেল শহরেই। দুজনের বেশি কাউকেই অ্যালাউ করবে না আমাদের অর্গানাইজেশন। তাছাড়া মধুরিমা লোকাল করেস্পনডেন্ট। তার সঙ্গে খানিকটা কনট্যাক্ট, পরিচিতি, বিশ্বাসের ভিত আছে বলেই সেই ইন্টারভিউয়ের সুযোগ।
পরঞ্জয় ক্যামেরার লেন্সে লুক থ্রু করতে করতে বলেছে, এবার যাবো?
দাঁড়া, আগে চারপাশটা ঠিকঠাক গুছিয়ে নি।
পরঞ্জয় তখন তার ক্যামেরায় চোখ ছুঁয়ে আছে।
গানস্ সামনে রাখলে আপত্তি নেই তো?
না, না আপত্তি কীসের? আমরা তো আর্মড স্ট্রাগল করতেই নেমেছি। ক্লাস এনিমিদের বিরুদ্ধে ক্লাস স্ট্রাগল। সেটা তো আর বন্দুক ছাড়া সম্ভব নয়। আপনি তো এই সিস্টেমকে বাঁচিয়ে রেখে, আই মিন যে সিস্টেমটা একদম সড়া হুয়া – মানে পচে গলে তার চোদ্দটা বেজে গেছে, তাকে তো জিইয়ে রাখতে পারেন না।
আপনার ভয়েসটা একটু দেখে নেব।
ও সিওর। হোয়াই নট। পরঞ্জয়, তুই যা –
যেতে পারি তো! পনিটেল দুলিয়ে হলুদ টি-শার্ট বলে উঠল।
লাইট ওকে?
ওকে।
না, না, মুখে মাফলার ঢাকার দরকার নেই। ওটা ক্যামেরায় যা করার আমরা করে দেবো, না, না মুখ বুঝতে পারবে না। কেউ লোকেট করতে পারবে না আপনাদের প্রোফাইল।
আমি মধুরিমাকে জিগ্যেস করেছিলাম, চেহারা যে আড়ালে থাকবে, তার কোনো গ্যারান্টি আছে?
অবশ্যই আছে। আমরা কখনো কোনো কনট্যাক্ট নষ্ট করি না। কোন ফুলিশ পার্সন ব্রেক করবে এই কনট্যাক্ট? পাগল না পেট খারাপ! তা করলে পরে আপনি বা আপনার অর্গানাইজেশন বসতে দেবেন? কথা বলবেন!
কম্পোজিশনটা ব্যাপক আসছে। উইথ গানস্ ফ্রেম করছি। রাইফেল, এস এল আর, একে ফরটি সেভেন এটসেটরা এটসেটরা।
তাইতো করবি, সবটা আনবি। ফ্রেমে উইদআউট গান কমপোজিশন হবে নাকি? বিশেষ করে জাঙ্গল ওয়ারফেয়ারের ব্যাপারে?
ম্যাডাম, আমরা যদি ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে বসি!
সেটা কি ঠিক হবে ভাই! আপনারা বুঝে দেখুন। হাওয়ায় প্রশ্ন ভাসায় মধুরিমা। তার কথায় হয়তো-বা খসে পড়ে জঙ্গলের আরো কিছু বুড়ো পাতা। শুকিয়ে যাওয়া পাতার গায়ে লাল মাটির উড়ুক্কু ধুলো।
ক্যামেরা ওকে? জানতে চায় মধুরিমা।
ওক্কে।
লাইট?
ওক্কে।
ঠিক আছে। তাহলে এবার যেতে পারি? জানতে চায় মধুরিমা।
যা-না –
মধুরিমা তার টিভি চ্যানেলের নাম লেখা মাইক্রোফোন এগিয়ে ধরে মুখের সামনে। তার হাতের তালু আমার হাতের তালু যেমন ঘামে সে-রকমই ঘামছে দেখি। বারবার বড় তোয়ালে রুমাল বের করে হাতের চেটো মুছতে থাকে মধুরিমা। তার রুমাল থেকে খুব চড়া পুরুষালি পারফিউমের গন্ধ মিশে যায় বাতাসে। আর তার হাতের পাতা থেকে সেই যে চেনা কাঁচা গুটিপোকার গন্ধ যেমনটা পাওয়া যায় ফুটন্ত জলে সেদ্ধ হওয়ার আগে, তাই উড়ে উড়ে আসে প্রবল বিক্রমে।
হাওড়ার স্কুলে বায়োলজি স্যার উপেনবাবু শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার বৃত্তান্ত শোনান। জীবন বিজ্ঞান টিচার একদিন স্কুলে নিয়ে এলেন আস্ত গুটিপোকা। তার গায়ে কেমন উজ্জ্বল হলুদ ঢাকনা।
এর ভেতর পোকা আছে।
জ্যান্ত স্যার?
জ্যান্ত মানে, একদম জ্যান্ত।
নড়ে চড়ে?
নিশ্চয়ই।
হলুদ গুটিটা নিয়ে আমি অনেকটা কাছে আনি। তখনই তার গা থেকে পেয়ে যাই চেনা গন্ধটা। যেমন কিনা ঘামে ভেজা হাত-পা থেকে পাওয়া যায়। হাতের আঙুলের ফাঁকে, পায়ের আঙুলের ফাঁকে। মিষ্টি মিষ্টি ঝিমঝিমে, ভারি, একটু যেন আঁতুড় আঁতুড় গন্ধও। যেমন কিনা সিজারিয়ান বাচ্চা নিয়ে বড়দি সাতদিন বাদে নার্সিং হোম থেকে ফিরে এলে নতুন জন্মের একটা গন্ধ বাড়ির বাতাসে। তখন বর্ষাকাল। খুব ঝরছে দিনরাত। মুতের কাঁথা, অলিভ অয়েল, এডি ভিটামিন অয়েল, জনসন বেবি পাউডার – সব মিলিয়ে কি এক অপত্য আর স্নেহের মন কেমন করা সুবাস। কোলে দিলে গায়ে নাক ঠেকিয়ে রাখতে হয়।
মা বলতেন, এখন আর আঁতুড় আঁতুড় কী! সে-সব গেছে আমাদের ওপর দিয়ে। ছেলে হলে সাতদিন, মেয়েদের বেলা একমাস। জন্মের আঁতুড় মানে তো সবসময় ছোঁয়া ছানতি বাঁচিয়ে রাখা। খালাস হওয়া পোয়াতির আলাদা বিছানা। তার নাড়ি শুকোনোর জন্য গাওয়া ঘি গরম করে তাতে কালোজিরে আর রসুন দিয়ে ভালো করে নাড়াচাড়া করার পর সেটা নিয়ম করে দুবেলা খাওয়ানো। আর ঝালফালের কোনো বালাই নেই রান্নায়। কাঁচা পোয়াতির বাড়ি জ্বলে যাবে শুকনো লঙ্কা খেলে। তাই শুধু দুচারটে গোল মরিচের দানা বড়জোর, ব্যস। আঁতুড়ঘরে মশা তাড়ানোর জন্য ধুনোর ধোঁয়া। খোকা নয়তো খুকির হাগামোতার ন্যাকড়া কেচে টাঙানোর ব্যবস্থা, যদি বর্ষা নামে। আর কদিন পর সবে হওয়া ছেলেটির বা মেয়েটির গায়ে কাঁথা উঠবে। তারও কদিন পর সরষের বালিশ। তাতে মাথার গোল ভাবটা সুন্দর থাকবে। তালের আঁটি চেহারার তে-এঁটে মুণ্ডু হবে না। হবে না চ্যাপটাপানা বাজে মার্কা। ছোটদের গায়ে তখন আঁতুড়ঘরেই মাসি-পিসি বেরোয়। ছোট ছোট অ্যালার্জির দানা যেমন, তেমন দেখতে। মাসির কাপড়, পিসির কাপড় গায়ে দিলে নাকি সেই র্যাশ ভ্যানিশ।
খোকার ছদিন হলে ষষ্ঠীর দিন বাঙালবাড়ি বেশ ঘটা। নতুন কাপড়ের গায়ে কাঁচা হলুদে একশ আটবার রাম রাম রাম লিখে তারপর সেই কাপড় বাচ্চার গায়ে ছোঁয়ানো। ছজন বামুনের নেমন্তন্ন সেদিন। বামুনরা সেদিন কাঁসার নতুন ডিশে মিষ্টি পাবেন। সঙ্গে গোটা পান, গোটা সুপুরি, একটা আস্ত পৈতে, নগদ একটা কাঁচা টাকা। আর ঘটিবাড়ির ষাট ষষ্ঠীর দিনে আট কড়াই। বাট কড়াই।
আঁতুড়ঘরের বাইরে আধভাঙা কুলোর ওপর মোটা লাঠি দিয়ে মেরে মেরে বাজাতে বাজাতে বলতে থাকে, ‘আট কড়াই বাট কড়াই ছেলে আছে ভালো। ছেলের বাবার দাড়ি ধরে টানাটানি করো’।
এরকম বারবার তিনবার চারবার পাঁচবার…। পুরনো কুলো বাজাতে বাজাতে যাকে বলে একদম ফরদা ফাঁই করে দেওয়া কুলোর গা-হাত-পা। সোজাসুজি ভুতুড়ি বেরিয়ে গেল কুলোর। তারপর কুলো বাজানো শেষ হলে তখন বাচ্চাদের জন্য পোড়া মাটির চ্যাটালো খুরি, নয়তো বাঁশের চ্যাঁচারিতে তৈরি ছোট চুবড়িতে খই, গুড়ের বাতাসা, মুড়কি, গোটা গোটা সুপুরি আর বামুনদের জন্য আস্ত পৈতে, দক্ষিণার একটা কাঁচা টাকা। কুলো বাজানো খোকারাও পেত দশ নয়া পাঁচ নয়া। খুব বেশি হলে বড় জোর চার আনা। যারা কুলো ভাঙল তারা কখনো কখনো একটু আধটু স্পেশাল, মানে দু’একটা গুজিয়া, নয়তো একটা আস্ত দানাদার বাতাসা পেত উপরি পাওনা হিসেবে।
আসলে মধুরিমার টিভি চ্যানেলের মাইক্রোফোন ধরে রাখা হাতের তালু থেকে উড়ে এলো গুটিপোকার গন্ধ। সেই গন্ধের সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে গেল কতদিনের ছেড়ে আসা আঁতুড়গন্ধ। বড়দির সেই ছেলে এখন বেশ লায়েক। দেখা হলে মাঝে মাঝেই বলে উঠত, কীসব করো তোমরা? ইনকামের চেষ্টা নেই। টাকা না থাকলে কিছু হয় নাকি? টাকা মানেই এনজয়মেন্ট। নতুন নতুন আনন্দ। লেট নাইট। বড়দি আমার থেকে মোটে তিন বছরের বড়। তারপর মেজদি। এরপর আমি। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের আমি তার থেকে বছর কুড়ির ছোট ভাগ্নেটার দিকে তাকাই। ডানকানে ফুটো করে দুল পরার ব্যবস্থা করেছে। চুলের সামনের দিকে কালার হাইলাইট। হাতে দামি ঘড়ি। ইদানীং অবশ্য দেখা হয় না। তার কারণ হাওড়াই আর যাওয়া হয় না বেশ কয়েক বছর।
একজন পেশাদার বিপ্লবীকে তো চব্বিশ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকতে হয় বিপ্লবেরই কাজে। অর্গানাইজেশন তৈরি করা, নতুন নতুন বেল্ট, অ্যাকশনের পরিকল্পনা, অ্যাকশনের পর ঘেরাও দমন কেটে বেরিয়ে যাওয়া, বেস তৈরি করা – সবটাই মাথায় রাখার ব্যাপার আছে।
মধুরিমার টিভি-মাইক্রোফোনে গুটিপোকার গন্ধ উড়ে আসে বারবার। আমার মনে পড়ে যায় উপেন স্যারকে জিগ্যেস করেছিলাম, কোথা থেকে পেলেন স্যার গুটিপোকা?
সে পেলাম এক জায়গা থেকে।
স্যারকে বেশি চাপ দেওয়া যায় না। তবু মনের মধ্যে জানতে-চাইয়ের ভুড়ভুড়ি। বোকা-বোকা মুখে তাকিয়ে আছি দেখে স্যার বললেন, শোন, কিনে আনিনি। যেমন কিনা ব্যাঙ, গিনিপিগ, কেঁচো, আরশোলা কিনতে হয় বায়োলজি প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য। তারপর তাদের ক্লোরোফর্ম করে অজ্ঞান করিয়ে সাদা মোম জমানো ট্রেতে পিন দিয়ে গেঁথে গেঁথে ব্যাঙের চার পা টান টান করে সিজার্স আর স্ক্যালপেল দিয়ে ব্যাঙের পৌষ্টিক তন্ত্র, জননতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, কেঁচো আর আরশোলা ডিসেক্ট করে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিসগুলো দেখা, চিনে নেওয়া – পর পর।
আমার ছোটভাই হাওড়া স্টেশনে গুডস্ বাবুতো। ও-ই মাঝে মাঝে আনে এইসব পলু।
তার মানে উপেন স্যারের ভাই, যিনি হাওড়া স্টেশানে রেলের মালবাবু, তিনিই নিয়ে আসেন এই গুটিপোকাদের। তসর কিংবা রেশমগুটি। সাদা অথবা উজ্জ্বল হলুদ যার রং। গায়ে জ্যান্ত জ্যান্ত গন্ধ। ব্যাপারটা বুঝে নিতে পারি মাস্টার মশাইয়ের কথা শুনে।
জানিস তো, পলু তুঁত গাছে হয়।
সজনে গাছে খুব শুঁয়োপোকা হতে দেখেছি। শিউলি গাছেও। একদম ভরতি শুঁয়ো। কালো, সাদা – দুরকমই হয়। সাদার থেকে কালোর শোঁয়াতে নাকি বিষ বেশি। হাওড়ায় কালো শুঁয়োপাকাদের কেউ কেউ বলে, যমরাল। যমরাজ নয়, যমরাল। বানানটা কি জ দিয়ে হবে য-এর বদলে! পরে ভেবে দেখেছি। তবে উত্তর পাইনি কোনো।
উপেন স্যার তাঁর আগের কথাকেই টেনে এনে বলতে থাকেন তুঁত-পাতা খায় এইসব পলু। তার পর গুটি বাঁধে। খুবই চাষ হয় বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার দিকে। এক-এক পোকা ঘিরে এক-এক রকমের সুতো। তারপর আরো সব কী কী যেন বলতে থাকেন স্যার রেশমপোকার চাষ নিয়ে।
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, ঝাড়খণ্ড, বিহার আর অন্ধ্রের বিপুল এলাকা যে চষে ফেলতে হবে, স্কোয়াডের এরিয়া কমান্ডার হিসেবে, তখন কি জানতাম ছাই।
বাংলা মিডিয়াম স্কুলে জীবন বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে পলু, শূককীট, মূককীট – এরকম কত কী জানতে হয়। জেনে নিয়ে রাখতে হয় মাথার মধ্যে।
সেভেনটিজের সেই যে আন্দোলন, তার সঙ্গে আপনাদের এই দুহাজার দুই তিন বা চারের মুভমেন্টের পার্থক্য খুব আছে কি, না অনেকটাই একরকম। চিন্তায়, অ্যাকশনে কাছাকাছি!
মাইক্রোফোনের সামনে বেশ প্রত্যয় নিয়ে বলি, আসলে কি জানেন তো, সেভেনটিজের মুভমেন্টে অনেক স্যাক্রিফাইস ছিল, আত্মত্যাগের ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেটা অনেকটাই মধ্যবিত্ত ওরিয়েনটেড। প্রেসিডেন্সি, স্কটিশ, শিবপুর বি.ই কলেজ, যাদবপুর এনজিনিয়ারিং, দুর্গাপুর এনজিনিয়ারিং – এখানকার ক্রিম ছেলেরা সব মুভমেন্টে জয়েন করেছিলেন। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরা সবাই পড়াশুনোয় খুব ভালো, ক্যারিয়ারও খুব ভালো, যাদের বলা যেতে পারে একদম ক্রিম অফ দ্য সোসাইটি, তাদের তুলে আনল মুভমেন্ট। কিন্তু এই ব্যাপারটার মধ্যে একটা অসুবিধেও হলো। ডিক্লাসড হওয়ার মানসিকতায় যারা গ্রামে এসেছিলেন ভূমিহীন কৃষকদের নিয়ে সংগঠন গড়বেন বলে, আমি ছোট করছি না কাউকে, তারা কেউ কেউ মধ্যবিত্ত মানসিকতা থেকে একেবারেই মুক্তি পাননি। এটা একটা বড় ত্রুটি ছিল। তাদের আচারে আচরণে, কথায়, গায়ের রঙে – সবখানেই বাঙালি মধ্যবিত্তপনা। ফলে যতই শ্রদ্ধেয় নেতার নির্দেশ থাক – চায়ের দোকানে কখনো বসে গপ্পো করবে না; বড় রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড অ্যাভয়েড করবে।
কালো টি-শার্ট নিয়ে এবার যেন ঝাঁপিয়ে আরো খানিকটা সামনে চলে এল মধুরিমা – চায়ের দোকান মানে? যে-প্রত্যন্ত গ্রামে আপনি কৃষকের জীবনকে বরণ করে নিয়ে ডিক্লাসড হয়ে সংগঠন করতে গেছেন, সেখানে চায়ের দোকান কই আড্ডা মারার মতো?
সে-কথায় আসছি। ঠিক সেই দূর প্রত্যন্তর অঞ্চলে হয়তো নেই, কিন্তু শহর-বাজারে চায়ের দোকান আছে। সেখানে বসে চা, বেগুনি বা ফুলুরি খাওয়া ছেলেটির গায়ের রং, কথার উচ্চারণ, চুলের ভাঁজ – কিছুই তো মেলে না ওখানকার মাটির সঙ্গে। ফলে দ্রুত চোখ পড়ে যায় জোতদারের লোকজন, অন্য পলিটিক্যাল ফোর্স, থানার ইনফরমার – তারপর যদি একটা অ্যাকশন হয়, তখন তো কথাই নেই। সবাই ভয়ংকর অ্যালার্ট। জোতদার নয়তো ধনী চাষি বা পুলিশের এজেন্টের ওপর অ্যাটেম। হয় ফিনিশ, নয়তো আধমরা। খতম বা আধা খতম – যাই হোক না কেন, তখন তো টনক নড়ে গেছে। সর্বত্র রেড অ্যালার্ট, নজরবন্দি। গ্রাম ঘিরে কম্বিং অপারেশন। সি আর পি, মিলিটারি, পুলিশ তো ছিলই। আর থাকত ই এফ আর –
আপনি সেভেনটিজের কথা বলছেন?
অফকোর্স। সেভেনটিজের গোড়ার কথা। মানে ইমারজেন্সি চালু করার আগে পর্যন্ত। তারপর তো সব ছিটকে ছেতরে গেল।
কিন্তু মাগুরজান, রূপসকুণ্ডী – রাইফেল ছিনতাই। পুলিশ ফাঁড়ি অ্যাটাক করে রাইফেল ছিনিয়ে নেওয়া হলো। চারু মজুমদার বললেন, গণমুক্তি ফৌজ তৈরি হয়ে গেছে। ভূমিহীন কৃষক হাজার হাজার বছরের শোষণের জোয়াল কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে –
ম্যাডাম আপনি বোধহয় সেভেনটিজের পার্টি লিটারেচার, মানে ‘দেশব্রতী’, ‘লিবারেশন’ – এইসব পড়ে কথা বলছেন।
তা হয়তো পুরোপুরি সবটা নয়, কিন্তু কিছু তথ্যানুসন্ধান, আই মিন ফিল্ডওয়ার্ক তো আমাকে করতেই হয়েছে।
ফিল্ডওয়ার্ক ছাড়া কিছু হয় নাকি!
বাঁ-হাতের তালুতে চুন মেশানো তামাক কুঁচি ডলতে ডলতে মুখের মধ্যে ফেলার আগে আরো একবার আকাশের দিকে। শীতের আকাশ যে-রকম হয়, তেমনই ঝকঝকে ধোঁয়াহীন আর সুন্দর। খুব সকালে ওরা এসেছে ক্যামেরা, যন্ত্রপাতি নিয়ে। তার আগেই খবর দেওয়া ছিল। ওরা যোগাযোগ করেছিল আমাদের সঙ্গে সংগঠনের সোর্স মারফত। কাল রাতে পুবে চাঁদ হেলে গেলে শেষরাতে জঙ্গলের মধ্যে তৈরি করা প্লাস্টিক ছাউনির টেন্টে চাঁদের বিদায়ী আলো গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। জঙ্গলে জমে থাকা শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কখনো কখনো কিছু একটা দৌড়ে চলে যাওয়ার শব্দ। তেমন করে ঘুম তো লেগে থাকে না দুচোখে, সতর্ক থাকতে হয়। পাশে রাইফেল, গুলির কেস। বুলেট-ভর্তি ম্যাগাজিন – একে ফিফটি সিক্স। এরিয়া কমান্ডারের দায়িত্ব কত।
খৈনির ধুলো ঝাড়ছি। ফুঁ দিয়ে আলগা চুন, তামাক পাতা উড়িয়ে দেওয়ার আগে মুখ, চোখ সরিয়ে নিল মধু –
আঃ পরঞ্জয়, তুই না –
পরঞ্জয় নামের হলুদ গেঞ্জি আমার বাঁ-হাত থেকে নিজের ডান হাত পেতে খৈনি নিতে নিতে হালকা করে দোলাল নিজের পনিটেল। ওর নীল জিন্সে শীতের রক্তিম ধুলোবাহার।
গালে খৈনির টোপলা করে ক্যামেরায় আবার লুক থ্রু করল পরঞ্জয়। তার মনে মনে এরকম একটা ঢেউ উঠল। সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়ত। আমার পুরনো কলেজ। কী করে যে হাওড়ার বেঙ্গলি মিডিয়াম স্কুল থেকে এসে জেভিয়ার্সে চান্স পেলাম। তখন অবশ্য ডেল্লিবোর্ডঅলাদের এত দাপট ছিল না। সেটা একটা কারণ।
যা বলছিলাম, মধুরিমা আবার তার পুরনো কথার গায়ে কথা বসাতে চাইল।
আমি কি যাবো? পরঞ্জয় জানতে চাইল।
চল।
মানে সব ঠিক আছে তো?
ঠিকই তো আছে। নো প্রবলেম।
আমি বলছিলাম, পরঞ্জয়কে আগের বাক্যটি বলে পরের কথা আমার দিকে বলল মধুরিমা। মানে বলতে চাইছি সেভেনটিজের আর্মড স্ট্রাগল অনেকটাই মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক হয়ে গেল। প্রেসিডেন্সিয়ান – মানে প্রেসির ছেলেমেয়েরা, মূলত ছেলেরাই, বিই কলেজ, যাদবপুরের ছেলেরা –
এই আরবান মিডল ক্লাস অ্যাগরেরিয়ান স্ট্রাগলে যোগ দিল বা যোগ দিতে চাইল, কিন্তু…
সেই কিন্তুটাই তো জানতে চাইছি আপনার মুখ থেকে।
এটা কোনো ক্রিটিসিজম বা ব্যাক বাইটিং নয়। যেটুকু আমার অভিজ্ঞতা, তাতে বলছি সেভেনটিজের অনেক পরের দিকে – বলতে গেলে স্ট্রাগলের শেষ সময়ে যে-ট্রাইবালরা – আই মিন সাঁওতাল, ভূমিজ, মুণ্ডা, লোধা, খেড়িয়া, শবর, ওঁরাও – এরকম যাঁরা আছেন, যাঁদের ঘাড়ে সামন্তি শাসনের জোয়াল সবচেয়ে বেশি করে চেপে আছে, তাঁরা এই স্ট্রাগলটাকে ধরে নিলেন। অর্থাৎ ওঁদের লড়াইটা লড়ছেন ওঁরাই। বাবুরা, শহর থেকে আসা প্রফেশনাল রেভেলিউশনারিরা লড়ে দিচ্ছেন না। দেখবেন আমাদের সংগঠনে টুডু, মাঝি, সোরেন, হাঁসদা, কিস্কু, শবর, মুণ্ডা – এই পদবির মানুষরা অনেক অনেক বেশি এসেছেন শোষণের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোর জন্যে। এটা কিন্তু সেভেনটিজে ছিল না।
একেবারে ছিল নাকি?
হয়তো একেবারেই ছিল না – এটা বলা নেহাতই বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, কিন্তু যতটুকু যা হয়েছিল তখন, মানে যাদের আন্দোলন, তাদের অংশগ্রহণ – ডিরেক্ট পার্টিসিপেশন, সেটা পশ্চিম বাংলায় যত না হয়েছে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি হয়েছে বিহারে, ওড়িশ্যায়, অন্ধ্রে। আদিবাসী মানুষ উইদ র্যাডিকাল পলিটিক্স বন্দুক ও তীর-ধনুক উঠিয়ে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে একেবারে এই আন্দোলনের প্রায় শেষ পর্যায়ে।
তার মানে আপনাদের যে-কর্মপদ্ধতি, তার সঙ্গে সেভেনটিজের কাজকর্মের নিশ্চয়ই অনেক ফারাক।
অবশ্যই। আমি কারও আত্মদানকে ছোট করছি না, অসম্মান করছি না। এখানে আমি না বলে অবশ্য আমরা বলাই শ্রেয়। আমরা বলতে আমাদের অর্গানাইজেশন, সেখানে আমরা দেখেছি স্টেট মেশিনারি সাংঘাতিক পাওয়ারফুল। তার যোগাযোগ-ব্যবস্থা অনেক উন্নত। সেভেনটিজে যে-টেকনলজির অ্যাডভান্সমেনটের কথা ভাবাই যেত না। তখন পুলিশ মিলিটারি, সি আর পি, বি এস এফ, ই এফ আর-এর হাতে ওয়ারলেস সেট। এখন তো পকেটে পকেটে মোবাইল। দূরে যাবেন রোমিং করিয়ে নিলেই হলো। সিগন্যাল-ব্যবস্থা জোরদার থেকে আরওজোরদার হচ্ছে ক্রমে।
আপনারাও কি ওয়ারলেস সেট, ওয়াকিটকি –
হ্যাঁ করছি। ব্যবহার করছি। একে ফরটি সেভেন আটকাতে পালটা একে ফরটি সেভেন। একে ফিফটি সিক্সের বদলে বা বলতে পারেন, তাকে প্রতিরোধ করতে পালটা একে ফিফটি সিক্স। নাইন এম এম-কে রেজিস্ট করতে নাইন এম এম। শুধু আবেগ আর পাইপগান দিয়ে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তোলায় আমরা বিশ্বাস করি না।
কিন্তু ভিয়েতনামে –
হ্যাঁ, তারা পেরেছিলেন কমরেড হো-র নেতৃত্বে। কিন্তু দেখুন, সেখানেও একটা কন্টিনিউ সাপ্লাই লাইন ছিল। আর্মস সাপ্লাই লাইন। চীন এবং সোভিয়েত নিজেদের সমস্ত রকম কন্ট্রাড্রিকশন্স, ঝামেলা শিকেয় তুলে রেখে, এমনকি উসুরি নদীর ধারে তখনকার সোভিয়েত লাল ফৌজ আর চাইনিজ রেড আর্মি যে আই বল টু আই বল – একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, তখন কিন্তু ভিয়েতকং গেরিলাদের জন্য সোভিয়েতের অস্ত্র, বারুদ, গুলি, রসদ – সব যাচ্ছে চীনের ভেতর দিয়ে। তার আগে অবশ্য চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আমেরিকান সেভেনথ ফ্লিট, সপ্তম নৌবহরকে জল দেওয়া। সে যাই হোক, কিন্তু চীন অ্যালাউ করেছে সোভিয়েত-সাপ্লাই ভিয়েতনামের গেরিলাদের জন্য। নর্থ ভিয়েতনামের রেগুলার আর্মির জন্য।
আপনাদের এরকম কোনো সাপ্লাই লাইন।
নো কমেন্টস। তবে এটুকু বলতে পারি, ইন্টারন্যাশনাল সিচুয়েশন তো এখন একেবারেই অন্যরকম – সে-অর্থে সোসালিজমের কোনো সেন্টার এখন তো আর নেই।
শুনেছি একটা করিডোর নাকি বানিয়েছেন আপনারা, মানে আপনাদের মুখপত্র, আই মিন অরগ্যানে বেরিয়েছে ডিটেল ম্যাপ-ট্যাপ দিয়ে নেপালের যে-মাওয়িস্ট মুভমেন্ট, তার সঙ্গে যোগাযোগ-রেখা – একদম ইউপি, দণ্ডকারণ্য, বস্তার, অন্ধ্র, ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড হয়ে পশ্চিম বাংলায় – পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, খানিকটা হুগলি। এর অনেকটাই নাকি লিবারেটেড জোন। সেখানে আপনাদেরই রাজ চলে, প্যারালাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন –
প্যারালাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের যে-কথা আপনি বলছেন, ঠিকই আছে বহুদিন। অন্ধ্রে, বিহারে – বিশেষ করে মধ্যবিহারে, ঝাড়খণ্ডের বহু জায়গায়, অন্ধ্র, বস্তার, দণ্ডকারণ্যে আমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনই চলছে। রেগুলার আর্মি – পিপলস লিবারেশন আর্মি মার্চ করছে সেখানে। অন্ধ্রের কাঠ-মাফিয়া, তেন্দুপাতার – মানে বিড়ি যারা তৈরি করে তাদের মূল লিফটা যোগান দেওয়ার যে-মজুরি ছিল, তাকে আমরা বাড়িয়েছি থ্রু মুভমেন্ট। এর জন্য অনেক খেসারত দিতে হয়েছে আমাদের। শহীদ হয়েছেন আমাদের কমরেডরা। জঙ্গল-মাফিয়া, তেন্দুপাতার ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত মাথা নুইয়েছে। হার মেনেছে। রাজি হয়েছে আমাদের শর্তে।
সেখানেও অভিযোগ আছে আপনাদের সম্বন্ধে – কোথাও কোথাও গোপনে আপনারা অ্যালায়েন্স করেছেন কাঠ-মাফিয়া আর তেন্দু-পাতার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। মানে আপনারা তোলা হিসেবে টাকাটা নেন –
কথাটায় তীব্র আপত্তি আছে আমার। তোলা, তুলতে থাকা বলতে আপনি কী বোঝেন! আমরা তো মস্তান বাহিনী নই যে তোলা তুলব। কিন্তু হ্যাঁ, অর্গানাইজেশন চালাতে গেলে অনেক অনেক টাকা লাগে। আর্মস, অ্যামিউনিশন, মেডিসিন, ফুড, ড্রেস –
আপনারা শুনেছি পুলিশ, মিলিটারির ড্রেস, জুতো, টুপি কিনে জঙ্গলে পাঠান?
নো কমেন্টস। এ-প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না।
বাজার থেকে এত এত পোশাক, জুতো কিনে জঙ্গলে পাঠান কীভাবে গেরিলাদের কাছে?
এই প্রশ্নের জবাবও দেবো না।
ওকে।
ভায়োলেন্স বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি –
আমরা ভায়োলেন্স সমর্থন করি। রাষ্ট্র যখন জোর করে ভায়োলেন্স চাপিয়ে দেয় আমাদের ওপর, তখন বাধ্য হয়ে আমরাও পালটা প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
কিন্তু আপনারা তো চাইছেন এই স্টেট মেশিনারিকে থ্রু আর্মড স্ট্রাগল উচ্ছেদ করে, একটা নতুন সিস্টেম আনতে।
অবভিয়াসলি। চাইছিই তো। এ-ব্যাপারে কোনোই লুকোছাপা নেই আমাদের। বরং আমরা এ-ব্যাপারে খুবই স্পষ্টবাদী। আমরা চাই এই যে শোষণভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, তাকে শেকড় থেকে উপড়ে ফেলে দিতে।
তাহলে রাষ্ট্র তো রিট্যালিয়েট করবে। মানে আই মিন রাষ্ট্রও তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবে। রাষ্ট্র – মানে স্টেট পাওয়ার তো আসলে একটা অন্ধশক্তি। পুলিশ, মিলিটারি, সীমান্ত, কাঁটাতার, আইন, বিচার, ফাঁসি, দ্বীপান্তর, জেল – সবই তো তার হাতের মধ্যে। তো আপনারা যদি সেই মহাশক্তিধর সিস্টেমকে আক্রমণ করেন, তাকে উচ্ছেদ করতে চান, তাহলে সিস্টেম তো বদলা নেবেই। আর অন্ধশক্তির রিভেঞ্জ বড়ই ভয়ংকর। তার আক্রমণ – এখানে আমরা হয়তো প্রতি-আক্রমণ শব্দটাও ব্যবহার করতে পারি, কারণ স্টেট তো একটা সিস্টেম। সেই সিস্টেমকে চালায় একটা মেশিনারি। আপনারা তো সেই মেশিনারিকেই অ্যাটাক করেছেন। ফলে সিস্টেম তো আপনাকে পালটা অ্যাটাক করবেই। আর যখন এই আক্রমণ, যাকে আপনারা ঘেরাও, দমন, রাষ্ট্রের প্রতিহিংসা বলছেন, নেমে আসবে আপনাদের ওপরে, তখন যদি আপনারা তাকে আটকাতে না পারেন আর সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে চিৎকার করেন, সেই সময় কি গোটা ব্যাপারটা খানিকটা হালকা হয়ে যায় না?
এই প্রশ্নে মুখে আলাদা কোনো ভাঁজ পড়ল না তার। বরং একটু হেসে, সামান্যতম উত্তেজিত না হয়েই জবাব দিল, দেখুন – এটা হচ্ছে ফিলসফি অফ ওয়ার। অর্থাৎ যুদ্ধ। আমরা রাষ্ট্রকে আঘাত করছি। মানে রাষ্ট্রের সিস্টেমকে আঘাত করছি, রাষ্ট্রও পালটা আঘাত করছে আমাদের। কিন্তু যুদ্ধেরও তো একটা এথিক্স আছে।
না সেটা বোধহয় নেই। আমি ইনটারাপ্ট করছি আপনার কথায়। এই কথাটুকু অফ দ্য রেকর্ড বলি, আপনাদের মারছে পুলিশ, মিলিটারি, বিএসএফ – তাতে আমাদের কোনো সমর্থন নেই। কিন্তু আপনারাও তো মাইন বসিয়ে পুলিশের জিপ, গাড়ি, ভ্যান উড়িয়ে দিচ্ছেন। মারা যাচ্ছেন নিরীহ পুলিশ কর্মচারী।
কে বলেছে, সবাই নিরীহ? বান্দোয়ানে যে-মাইন ব্লাস্ট করিয়েছে আমাদের সংগঠন, তাতে যে-ওসি মারা যায়, সে ভয়ানক অত্যাচারী ছিল। তাকে মারতে গিয়ে কয়েকজন আপাত নির্দোষ পুলিশকর্মী মারা গেছেন। এটা নিয়ে নিশ্চয়ই সমালোচনা হবে। কিন্তু আমরা যেটা বলছি, আমরা তো সিস্টেমের বিরুদ্ধে। এই সিস্টেমটাকে ভাঙতে চাই। তাই আমাদের সামনে সিস্টেমের রক্ষাকর্তা হিসেবে যা যা বাধার প্রাচীর আসে, তার সবটাই উপড়ে তুলে ফেলি। বা তুলে ফেলতে চাই।
পাশে ফটফট করে খৈনি ঝাড়ছে একটি ছেলে। ইন্টারভিউ নেওয়ার মাইক্রোফোন না সরিয়েই
মধুরিমা তার মুখখানাকে একপাশে সামান্য ঘুরিয়ে রাখল। সিগারেট তবু সহ্য হয়, কিন্তু এই চুন-তামাকের গুঁড়ো, ওফ হো, অবনকশাস! ফটফট ফটরফট করে খৈনি ঝাড়াঝাড়ি। বাঁ-হাতে রেখে ডানহাত দিয়ে পেষা – সবটাই কেমন যেন অস্থির অস্থির আর অসহনীয় মনে হয়। দূরে কোথায় যেন পাখি ডাকছে। একদম না থেমে, একটানা। কী পাখি কে জানে! এই জঙ্গলে কতরকমের পাখিই তো আছে। তাদের কারও ডাক, সবটা তো চেনা সম্ভব নয়। শহর, আধা-শহর আর কতটুকু রাখে পাখির খবর? সেই তো কাক, চড়াই, বড় জোর শালিক, গাঙশালিক – ব্যস। দু-এক পিস দোয়েল বা বুলবুলি হলে তো রাজ্যজয় হয়ে গেল একেবারে যাকে বলে।
নিজের কাঁধ-ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট, দেয়াশলাই বের করল মধুরিমা। এটাও ছাড়তে হবে। খুবই হার্মফুল এই টোব্যাকো। কিন্তু টেনশনের কাজ থাকলে তখন স্মোকিং খানিকটা যেন আশ্রয় দেয়। সেই সময়টুকুর যে-চাপ, তাকে আড়ালও করে খানিকটা। কিন্তু তাতে তো সিগারেট খাওয়া বেড়ে যায়। একটার পর একটা সিগারেট। চট করে তখন তার হিসাব রাখাও মুশকিল।
আমি যদি একটা সিগারেট খাই –
নিশ্চয়ই। আপত্তি নেই।
না, সেভাবে পারমিশন নিইনি। কিন্তু আপনি তো ধোঁয়া না খেলেও, আই মিন স্মোক না করলেও দেখলাম চুন মেশানো র-তামাক চিবোচ্ছেন। সেটাও কিন্তু কিছু কম হার্মফুল নয়। প্রথমে আমি আপনাকে নন-স্মোকার ভেবে সিগারেট ধরাইনি। পাছে প্যাসিভ স্মোকিংয়ে অন্য ধরনের কোনো ক্ষতি –
না, না, ধরান না। তাতে কী আছে? একথা বলেই হয়তো আনমনা হয়ে গেল মাইক্রোফোনের সামনে কথা-বলা। এরিয়া কমান্ডার কানখাড়া করে কী যেন শোনার চেষ্টা করতে লাগল বারবার। সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে লাইটারে তার মুখাগ্নি করার আগেই মধুরিমা খানিকটা যেন চুপ হয়ে গেল। পাখিটা ডেকেই যাচ্ছে। ডেকেই যাচ্ছে। একটানা, তীক্ষ্ম সেই কলতান।
তবে কি কোনো সংকেত! কোনো বিপদের গন্ধ পেয়েছে আরো অনেক দূরে পাহারায় থাকা সেই তিন বা চারজন, যারা জঙ্গলের বড় বড় গাছের আড়ালে নিজেদের খানিকটা বুঝি গোপনই রেখেছিল। তবু তাদের জলপাই উর্দির আভাস, রাইফেলের ইস্পাতকঠিন নলে শীতের রোদের আশ্চর্য ফুলকারি, কঠিন মুখ, তীক্ষ্ম ঝকঝকে চোখের আবছা এক ঝলক – সবটুকুই তো চোখে থেকে গেছে। তারপর মোটরবাইকে অনেকটা এসে তারপর অচেনা হাঁটাপথ। ইন্টারভিউ করতে যাওয়া তো নয়। এ-সময় তো নিজেদের কেমন যে পণবন্দি পণবন্দি মনে হয়, অকারণেই।
পাখির ডাকটা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বাঁ-হাত বাড়িয়ে অভ্যাসে খৈনি নিতে নিতে আবারো চুপ করে মাথা নিচু করে থাকা মানুষটাকে দেখে মধুরিমার মনে হয়, এর মাথার দাম এক লক্ষ টাকা। মাথাভর্তি কালো চুল একটু বড়ই। বাকিরা যে-দুতিনজন আশপাশে পজিশন নিয়ে আছে, কিংবা খুব কাছে হাতিয়ারদের দেখভাল করছে যে, তার মাথাতেও একদম ফৌজি কাটিং।
আমাকে একটা দে তো। নীরবতা প্রথম ভাঙল পরঞ্জয়ই। এই এক দোষ পরঞ্জয়ের। সবরকম নেশা করবে, কিন্তু কোনোটাই নিজে রাখবে না। সবসময় হাত বাড়িয়ে দেবে। খুবই ক্যাজুয়ালি, যেন কিছুই হয়নি। এটা ওর প্রাপ্য। কোনো কথা না বলে মধুরিমা সিগারেট এগিয়ে দিল পরঞ্জয়ের দিকে। তারপর না চাইতেই লাইটার।
পাখিটা তখনো ডেকে যাচ্ছে। একি তবে সংকেত? বিপদসংকেত কোনো? রাষ্ট্রের কোনো পালটা অ্যামবুশ বা অভিযান? গোটা অ্যাকশনটাই কি গুটিয়ে আনছে তারা? ঋত্বিককুমার ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র শেষ দৃশ্যে যেমন। আকণ্ঠ মদ্যপান করা নীলকণ্ঠ বাগচী। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, ট্রটস্কিকে নিয়ে অনেক অনেক কথা, দীর্ঘ দীর্ঘ সংলাপ তাঁর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা র্যাডিক্যালদের সঙ্গে। তারপরই শেষ রাত থেকে রাষ্ট্রের আক্রমণ। খানিক উর্দি। অবিরাম গুলি ও পালটা গুলিবর্ষণ। অবশেষে নীলকণ্ঠ বাগচীর মৃত্যু। তখন প্রায় ভোর কিংবা ভোর। বাংলা মদে নিজের নিয়তিকেও হয়তো-বা ধুয়ে দিতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক। কিন্তু এখন, ঠিক এই মুহূর্তে এরকম যদি কোনো অ্যাকশন হয়, সেখানে দনাদ্দন দনাদ্দন ছুটে আসে সীসের বুলেট। ট্যা-রা-রা-রা করে ডেকে ওঠে একে ফরটি সেভেন বা একে ফিফটি সিক্স। কিংবা বি এস এফ যদি মর্টার দাগে। কিছুই তো বলা যায় না। আত্মগোপনকারী বিরোধীদের খুঁজে বের করতে রাষ্ট্র তো কত কী করে।
সিগারেটে খুব আলতো আলতো টান দিতে দিতে মধুরিমার ঠোঁট আরো বেশি শুকনো আর খসখসে লাগছে। সিগারেটের ফিলটারের হলুদ ওই শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটে বসে যেতে চায় আরো বেশি করে। তাকে ছাড়িয়ে দুআঙুলের ফাঁকে আনতে গেলে টান পড়ে নরম চামড়ায়। তাতে ঠোঁট ফাটার ভয় থাকে আরো একটু বেশি। এই সময়ে নিজের সাইড ব্যাগ থেকে লিপগ্লস বা লিপগার্ড, নয়তো ভেসলিন বের করে লাগানোটাই একমাত্র রেমিডি। কিন্তু সেটা এখনই, এই পরিস্থিতিতে করা সম্ভব নয়। খুবই বিসদৃশ লাগবে। ওই লিপগার্ডের ব্যাপারটা কিছুতেই যায় না এই সঙ্গে। তার চেয়ে বরং পাতি যা সিস্টেম, সেটাকেই প্রয়োগ করা। জিভ বুলিয়ে বুলিয়ে থুথু দিয়ে ভিজিয়ে রাখা ঠোঁট। ওপর-নিচে ক্রমাগত জিভের ন্যাতা বুলোনো। তাতে অবশ্য ঠোঁট ফাটার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে আরো অনেক বেশি। ফাটবেও। কিন্তু আর উপায় তো কিছু নেই। ফলে ঠোঁটের ওপর জিভের আনাগোনা বাড়ল।
গালে খৈনি ফেলার আগে পরঞ্জয়ের দিকেও এক চিমটে বাড়াল মধুরিমার অ্যাসাইনমেন্টের সাবজেক্ট। ডান হাতে সিগারেট রয়েছে। তবু বাঁ-হাত বাড়াল পরঞ্জয়, অভ্যাস। তারপর বাঁ-হাতের তালুতে বানানো খৈনি নিয়ে ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে রাখা সিগারেট ঘন ঘন টানতে লাগল।
পাখিটা তখনো ডাকছে। সিগারেটটা হালকা হালকা টান দিতে দিতে মধুরিমার দুহাত সামান্য সামান্য কাঁপছে। হাতের তালু, পায়ের পাতা ঘামছে অনেক বেশি। গুটিপোকার চেনা গন্ধটা আবারো মুচড়ে ধরছে শীতের বাতাস। চমৎকার হলুদ রোদ একটু সবুজ সবুজ ছায়া মেখে খানিকটা অন্যরকম রং নিয়ে গড়িয়ে পড়ছে শুকনো পাতা, ঘাস, জংলি লতার গায়ে। সেই সবুজ আর সবুজ-ধূসরতার পাশে হয়তো একটি দুটি তিনটি হলুদ-কালো নয়তো ভেলভেট-কালো রঙের প্রজাপতি। তাদের ডানার ছন্দে নতুন দিনের আনন্দ।
দূরে পাখি ডাকছে। খৈনি মুখে নেওয়া সেই তেত্রিশ চৌত্রিশ চুপচাপ বসে। তার নাকে কি বারবার উড়ে আসছে মধুরার হাতের তালু থেকে উড়তে উড়তে বাতাসে-মেশা গুটিপোকার গন্ধ? হলুদ-কালো, আর কালো যেন ভেলভেটের পেছন পেছন সাদার ওপর চিত্তির-বিত্তির অন্য একটি প্রজাপতি উড়তে উড়তে দূরের সবুজে হারিয়ে যেতে চাইল। সঙ্গের মোবাইলের সুইচ অফ। তেমনই শর্ত ছিল ইন্টারভিউ নেওয়ার আগে থেকে। পরঞ্জয়ের সেলফোনও বন্ধ। কোনো যোগাযোগ নেই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে। চারপাশে শুধুই শীতের জঙ্গল, বড় বড় গাছ। ঝরা পাতা। চারপাশ দেখতে দেখতে পাখির একটানা ডাক শুনে মনে পড়ল মধুরিমার।
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে একটু দূরে ছুড়ে দিল পরঞ্জয়। তারপর বাঁ-হাতে রাখা খৈনি ফেলে দিল মুখে। জিভ দিয়ে খানিকটা নাড়াচাড়া করে জায়গামতো খৈনির টিবলিটাকে সেট করে জানতে চাইল, এবার যাবো?
দাঁড়া, একটু জল খাব। বলেই মধুরিমা নিজের শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিতে নিতে সাইড ব্যাগে হাত দিল।
জল খাবেন! আনাব! অবশ্য আপনাদের মিনারেল ওয়াটার দিতে পারব না বোতলের। টিউবওয়েলের পরিষ্কার জলও না। পুকুরের জল ফুটিয়ে ছেঁকে ফিলটার করে খাই আমরা। প্রিমিটিভ স্টাইলে।
সেটা কেমন? জানতে চাইল পরঞ্জয়।
নো থ্যাঙ্কস। লাগবে না। জল আছে আমার, বলে মধুরিমা তার বোতল খুলল।
মাটির বড় কলসির ভেতর জল, মোটা করে বেছানো বালি, নুড়ি। তার নিচে ফুটো। এবার তারও নিচে একইরকম কলসি, সেখানে শুধু বালি আর নুড়ি। ওপর থেকে নিচের কলসিতে জল পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। তারও তলায় তিন নম্বর কলসি। সেখানে ফাইনাল জল জমা হচ্ছে। এবার ছেঁকে নিয়ে ফিটকিরি বা হ্যালোজেন মেশানো। কর্পূরও চলতে পারে। আগে খুবই ব্যবহার হতো কর্পূর, জীবাণুনাশক হিসেবে। কিন্তু এখন তো সবই সিনথেটিক কর্পূর। তবুও আমরা ব্যবহার করি। গ্রামের লোককেও শিখিয়েছি। বিহার, ওড়িশ্যা, ঝাড়খণ্ড, বস্তারের কমরেডরা অনেকসময়েই ঝরনার জল খাওয়ার জন্য ধরে রাখেন বোতলে, ওয়াটার বটলে। কিন্তু তাতেও রিস্ক থেকে যাচ্ছে। এনিমি কখনো কখনো মিশিয়ে দিতে পারে বিষ জলের প্রাইম সোর্সে ঝরনায়, তাতে পুরো দলমটাই বিপদে পড়ে যাবে। ফলে সতর্ক থাকতে হয়।
মধুরিমাকে জল পরিশুদ্ধকরণের কথা বলতে বলতে চোখের সামনে স্কুলে পড়া বিজ্ঞান বইয়ের পাতা মাঝে মাঝেই ফরফর ফরফর করে উড়ে যাচ্ছে। কাল সারারাত ফৌজি পোশাক পরে জঙ্গলে কেটেছে, ঘুমোবার অবকাশ ছিল না। ডিউটি ছিল গার্ডের। মানে যারা গার্ড দিচ্ছে, তাদের নেতৃত্ব দেওয়া আর কি। সারারাতই জুতো-মোজা পরা আছে। শীতে বরাবরই পা ঘামে। সেই ঘামাঘামিতে মোজার যা অবস্থা হয়েছে, খুললেই জমাটবাঁধা দুর্গন্ধ ছুটে এসে ধাক্কা দেবে নাকে। কিছুতেই সময় পাওয়া গেল না জুতো-মোজা ছাড়ার। তার আগেই ওরা এসে গেল। শীত বলে তাই জলপাই সবুজ জামাপ্যান্ট এখনো ঘামে ঘামে সেদ্দ হয়ে যায়নি। গরম হলে আর দেখতে হতো না। আসলে এত ঘামি না! মাথায় ফৌজি ক্যাপও রাখতে পারি না সবসময়। খুলে রাখতে হয়।
পাখিটা সমানে ডাকছে। যার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য এখানে আসা তার বডি ল্যাঙ্গোয়েজে কোনো চঞ্চলতা নেই, এসব দেখতে দেখতে পরঞ্জয় সবুজ ঘাসের ওপর খৈনির রং মাখা কালচে সবুজ থুথু নামিয়ে দিতেই একটা ঘেসো পোকা কিলবিল কিলবিল করতে করতে বেশ ধীরছন্দেই লুকিয়ে পড়ল ঘাসের আড়ালে।
স্কুলপাঠ্য বিজ্ঞান বইয়ের পাতা হাওয়ায় উড়ে উড়ে তার সামনে কতবার যে এলোমেলো হয়ে গেল। এমনকি সেই জল-পরিশোধনের ছবিটাও বদলে গিয়ে সেখানে প্রতিফলন, প্রতিসরণ, আলোর গতি, সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য ও পৃথিবীর অবস্থান, বিকার, বকযন্ত্র, টেস্টটিউব – সবই আগে-পেছনে কোনো নিয়ম না মেনেই চলে আসতে থাকল। আর কাল রাতে, আবছামতো কুয়াশার আড়ালে তারা যে সাত আটজন এসে দাঁড়িয়েছিল বনের পথে সেটা নিজের চোখে না দেখলে তো বিশ্বাসই হবে না। কী অসম্ভব বিশাল সেই চেহারা! কুয়াশার সেলোফেন মোড়া চাঁদের গা থেকে তখন যেটুকু আলো বনের গাছে, পাতায়, জমিতে পৌঁছচ্ছে, তার সবটুকুই ছানা কাটা জলরঙের। অথচ তারা তো চুপচাপই দাঁড়িয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ একজন চাঁদের দিকে শুঁড় তুলে হঠাৎই আনন্দধ্বনি অথবা বিপদসংকেত দিলে আমরা – মানে আমাদের আর্মড স্কোয়াডের লোকজন একটু ভয় পেয়েই দুপা পিছিয়ে নিজের নিজের বন্দুক আর রাইফেলের ট্রিগারে হাত রাখলে আমিই বরং তাদের বাঁ-হাত উঠিয়ে দাঁড়াতে বলি। ফিসফিস করে বলি, ডোনট মুভ। আর এগিও না। আগের মতো বাড়ো।
আসলে ইংরেজটাই কেন জানি না প্রথম এসে যায় জিভে তিনবছর সেন্ট জেভিয়ার্সে ইংলিশে অনার্স পড়ার সূত্রে। ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হওয়া তখনো বেশ টাফই ছিল। তার ওপর হাওড়ার বাংলা মিডিয়াম। যদিও ইংলিশে নম্বর ভালো। তাই অ্যাটেম নিলাম। তারপর হাওড়ার বিনু চৌধুরি, মানে সকলের কমন বিনুদা বললেই জেভিয়ার্সে স্পোর্টস কোটায় হয়, তুইতো ক্রিকেটটা ভালোই খেলিস। দেখ না অ্যাটেম করে। ফর্ম তোল। তারপর আমি দেখছি। ওরা কিন্তু ক্রিকেট টিমটা মন দিয়ে করবে।
শুনেছি আরো নানারকম কোটা আছে বিনুদা।
তা আছে। ক্রিশ্চান কোটা তো একটা আছেই। তবে প্লাস পয়েন্ট একটা মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের প্রেফারেন্স আগে, এ-রকম আমি শুনেছি। ফাদারের সঙ্গে সামান্য জানাশোনা আছে আমার, খেলাধুলোর সূত্রেই। তোর ইংরেজিতে ভালো নম্বর আছে, ক্রিকেটটা ভালো খেলিস। দ্যাখই না ট্রাই করে।
হাওড়ার ইয়ংমেনস ক্রিকেট ক্লাবের কোচ বিনু চৌধুরির কথায় উৎসাহিত হয়ে ফর্ম তুলে এনে ফিলাপ করে জমা দিয়ে দিলাম। হয়েও গেল। বলতে গেলে স্পোর্টস কোটাতেই। কলেজের হয়ে ক্রিকেটও খেলেছি বেশ নিয়ম করেই। আর তারপর সেখান থেকে পাশ করে বেরিয়ে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির টিমেও বেশ ডেঁটে থেকে যাওয়া যাকে বলে। আসলে জেভিয়ার্সের অভ্যাসেই মুখ দিয়ে আগেভাবে চলে আসে ইংরেজিটা। আর গতকালই রাতে ডোন্ট মুভ বলে গোটা আর্মড স্কোয়াডকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার পর আমি তো সেই চাঁদ অথবা আকাশের দিকে শুঁড়তোলা গজরাজের দিকে তাকাই। তার শুঁড়ের দুপাশে বেরিয়ে থাকা সাদা দাঁতে চাঁদের আলোর থাকা-না-থাকা। এই কি তবে দলপতি? মাঠে মাঠে ধান পাকার সময় তো এটাই। গ্রামে গ্রামে তাড়ির দোকানে বাখর দেওয়া খেজুর রসের হাঁড়িতে নতুন তাড়ি। এটাই তো সময় ওদের নেমে আসার।
গোল চাঁদ পুবে টুপ করে ঢোকার আগে বেশ ছড়িয়ে বসেছে আকাশে। হাওয়ায় দারুণ শীত। ওদের কি ঠান্ডাও লাগে না! অন্তত সে-রকম কোনো জড়তা তো চোখে পড়ল না আমাদের। ডোন্ট মুভ, আগে এতো বাড়ো – এটা শোনার পর আর্মড স্কোয়াড আর সামনে এগোয়নি। কিন্তু দলমের সবাই যথেষ্ট একসাইটেড। আমাদের এই যে বেস এরিয়া, যেখানে আমরাই প্যারালাল প্রশাসন চালাই। গণআদালত বসিয়ে স্পট রায় নি। সেই রায় এগজিকিউট করি পিপলের সামনে। নিয়মিত স্কোয়াড ঘুরে বেড়ায় রাতে, দিনেও। যত মিটিং হয় সব গভীর রাতে। সেখানে সংগ্রামের রিপোর্ট ভুলত্রুটি নিয়ে সমালোচনা-সমালোচনা। তর্ক-বিতর্ক। বাক-বিতণ্ডা। বাদ-প্রতিবাদ। চলতেই থাকে। চলতেই থাকে। দুলাইনের লড়াই তো থাকবেই। তার সঙ্গে ইনার পার্টি স্ট্রাগল। ডেমোক্রেটিক সেন্ট্রালিজম – গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার তো এটাই বৈশিষ্ট্য।
আকাশের গোল চাঁদ নিজের শুঁড়ে প্রায় ধরে ফেলেছে যে-হাতিটা, সেই কি দলপতি? ওদের যে ছ-সাত জনের দল, তার এরিয়া বা কোর বা এরিয়া কমান্ডার? নাকি সে নিতান্ত সৈনিক!
কুয়াশার পাতলা আড়ালের ওপারে চাঁদ-লাগা ছ-সাতটা, কী আটও হতে পারে, কালচে মাটি রঙের ছোটখাট পাহাড়। তাদের শুঁড়ে, মাথায়, পায়ে – গায়ের আরো কোথাও কোথাও চাঁদ নিংড়ানো আলো। সেই আলোয় যত না আলো, তার চেয়ে ছায়া কিছু কম নয়।
এরা বনে ঢুকল মানে আমাদের অসুবিধে হবে। দলমের কে একজন যেন বলে উঠল চাপা গলায়।
কেন, কিসের অসুবিধে হবে? ওরা ওদের মতো। আমরা আমাদের মতো।
সেটি ঠিক আছে হয়তো। কিন্তু এক বন থেকে অন্য বনে, এক রাজ্য থেকে ভিন রাজ্যে হাতি যাওয়া মানেই তো হুলা পার্টি, মশাল, হইচই, টায়ার জ্বালানো আগুন তাদের দিকে ছোড়া – সবই নাকি জংলি হাতি তাড়াতে। এভাবেই ওদের ফেরাবার চেষ্টা পুরনো ঠিকানায়। কিন্তু হাতিরা শুনলে তো! মাঠে মাঠে নতুন ধান পেকে উঠছে, হাওয়ায় হাওয়ায় তার সুগন্ধ এদিক ওদিক – সবদিকে। তাছাড়া তাড়ির দোকানে খেজুর তাড়ির সফেন আহ্লাদ। ফলে সোনালি ধানবোঝাই মাঠে নেমে পড়। যত ইচ্ছে খাও পেট পুরে। বাকিটা খেতে না চাইলে – মানে পেটে না ঢুকলে নষ্ট করো। তাড়ির দোকানের বেলাতেও তাই। সুযোগ পেলে ঢুকে তাড়ি খাও চোঁ চোঁ। তারপর মাতাল হয়ে ইচ্ছে খুশি করে বেড়াও।
হাতের ইশারায় দাঁড়িয়ে পড়েছে দলমের সাথিরা। কিন্তু হালকা হালকা কুয়াশার ঠিক ওপারে গায়ে প্রায় গা লাগানো গজবাহিনী। তাদের এই একসঙ্গে লেগে লেপটে থাকা দেখে বেশ ভালো লাগে। কেমন বিশ্বাস করে একে অন্যকে। সেখানে দুপা, দু হাত আর একটি মাথাঅলা মস্তিষ্কজীবী মানুষ, কখন যে আক্রমণ করে বসবে কাকে! নিজেকেই চেনে না।
চাঁদের দিকে শুঁড় তোলা দাঁতাল আবারো নিজস্ব বৃংহণে একটু এলোমেলো করে দিল বনভূমি। দূরের আকাশে তখন জ্বলজ্বল করছে শুকতারা। মাথার ওপর পা ছড়ানো শিকারি কালপুরুষ। তার হাতের তীর-ধনুক, সঙ্গের কুকুর – সবই তো নক্ষত্রে বোনা। তারায় তারায় ফুটে-ওঠা। সেই নক্ষত্রমণ্ডলীর দিকে তাকালে মাটির দিকে নেমে আসা হিমের চোরামার টের পাওয়া যায়।
আর যেটা জিজ্ঞাসার ছিল, হাতের জ্বালানো সিগারেট প্রায় শেষ করে অনেকটা দূরে ফেলে দেওয়ার পর মধুরিমা জানতে চাইল, নিজের স্কুল-কলেজ, বাড়ির কথা কিছু বলবেন?
না। এককথায় সারা হয়ে গেল।
কেন? এরকম একটা জিজ্ঞাসা মনের মধ্যে ঢেউ তুললেও তা বলা হলো না মধুরিমার। সংগঠনের কাছে ব্যক্তি কি তাহলে একেবারেই অকিঞ্চিৎকর?
বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না? দেখতে ইচ্ছে করে না পুরনো পাড়া, বন্ধু-বান্ধব? ছেড়ে আসা স্কুলের গেট, পাঁচিল, খেলার মাঠ, কলেজের কমনরুম?
এর উত্তর আমি দেবো না।
হাতিদের দলপতি তার দাঁতে জ্যোৎস্না মেখে নিয়ে বারবার শুঁড় তুলে জানতে চাইছিল কাল রাতে, এভাবে মাইন বিছিয়ে রেখেছ রাস্তায়, যদি আমাদের পা পড়ে। তখন তো উড়ে একেবারে ফর্দা ফাঁই হয়ে যাবো।
না, না। সেভাবে মাইন বিছিয়ে রাখিনি একেবারেই। বরং খবর থাকলে তখনই অ্যাকশনের পরিকল্পনা করে আমরা মাইন পুঁতি। তারপর দূর থেকে রিমোট কনট্রোলের বোতাম টিপে…। সেসব শুধু পুলিশ, মিলিটারি, সি আর পি, বি এস এফের ভ্যান ওড়ানোর জন্য। কনভয়ের পাইলট কার বা গোটা কনভয়টাকেই ধুলো করে দেওয়ার জন্য এইসব রিমোট কনট্রোলের ব্যবস্থা।
আমি কি যাবো? খৈনির থুথুতে মুখ বোঝাই অবস্থাতেই জানতে চাইল পরঞ্জয়।
না, এগুলো তো আসবে না।
ওক্কে।
আকাশ থেকে চাঁদ প্রায় পেড়েই আনব – শুঁড় নাড়ানোর এমন ভঙিতে গজপতি যাকে কিনা দলপতিও বলা যাবে, পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল, রেললাইনে তো প্রায়ই কাটা পড়তে হয় ইদানীং। ট্রেনের ধাক্কায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ে হাতি। নয়তো ধাক্কা খেয়ে কাতরায়। বন কেটে, পাহাড় ফাটিয়ে রেললাইন। বেশ, তা নাহয় হলো। কিন্তু হাতির যাওয়া-আসার রাস্তা। সেটা কারা দেখভাল করবে? জঙ্গল কেটে বসত, ফসলের ক্ষেত, মানুষের ঘরবাড়ি, তাড়ির দোকান, বাংলা মদের ঠেক, বাজার, হাট, পঞ্চায়েত অফিস, পার্টি অফিস – সব হচ্ছে, কিন্তু হাতির চলাফেরার রাস্তা নেই। কেউ এসব নিয়ে ভাবে কি? আন্দোলন তো দূরের কথা। তাহলে হাতি যাবে কোথায়? বনে তার খাবার নেই। যেসব জিনিস হাতি খায় – কয়েতবেল, কলা গাছ, কলা, গাছের নরম পাতা – সেসব ক্রমেই কমের দিকে। তাহলে হাতি কী করবে? সে তো নামবেই কাঁচাপাকা ধানের ক্ষেতে, ভাঙবেই তাড়ির দোকানের ঝাঁপ।
হালকা হালকা কুয়াশার ঢেউ দুই দলপতির মাঝখানে। দুজনে দুজনকে সবটা হয়তো দেখতেও পাচ্ছে না সবসময়। বাড়া-কমার কিছু একটা ব্যাপার আছে কি কুয়াশার মধ্যে? নাকি অনেকক্ষণ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দুচোখ। হয়তো সে তখন মনে মনে বলে ওঠে, আমি আর দেখব না। এই না বলাটুকুই হয়তো আড়াল তৈরি করে দেখা না দেখার মাঝে। হাতিদেরও কি এমন হয়?
দলপতির কথা শুনে হাতের একে ফিফটি সিক্স আপনা থেকেই কেমন যেন আলগা হয়ে আসতে চায়। কোনোরকম দেবী-দেবতা, অতিপ্রাকৃত শক্তি, অলৌকিকে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু প্রায় শেষ রাতের এই প্রায় হওয়া-না-হওয়ার মাঝে কোনো এক অজানা আলো-অন্ধকারে মাখামাখি দলপতি আমায় কি এক প্রশ্নের মুখোমুখি যেন দাঁড় করিয়ে দেয়।
এই যে এখনকার সমাজ, যার বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের, তা পুরোপুরি বদলে গেলেই কি হাতিদের নির্বিঘ্নে পথচলা আদৌ সম্ভব হবে? তার পায়ে-চলা রাস্তায় কেউ বানাবে না ঘর-বাড়ি, বসাবে না বাজার, বুনবে না ফসলের ক্ষেত্র! এসব ভাবতে ভাবতে কমান্ডারের আঙুলও আলগা হতে থাকে একে ফিফটি সিক্সের গা থেকে। শেষ রাতের জ্যোৎস্না সেই সময় একই সঙ্গে নতুন করে আছড়ে পড়ে মহা মহা হাতিদের পিঠে, একে ফিফটি সিক্সের নলে। সেই ইস্পাতকঠিন বারুদ ও গারদে কালচে রং সেটুকু সময়ের জন্যও হয়তো কেমন যেন নরম হয়ে ওঠে আকাশ থেকে নামা আলোর দোলনায় দুলতে দুলতে।
আমরা কোথায় যাবো? দাঁতাল জানতে চায়। ক্রমশ জঙ্গল কমে আসছে একটু একটু করে। তাও কাটা কোটার পর যেটুকু বনবাদাড় ছিল, সেখানে আবার তোমরা সেঁধচ্ছ। তোমাদের হাতেও বন্দুক। ওদের হাতেও বন্দুক। মাঝখানে আমরা। আমাদের কোনো বন্দুক নেই, বারুদ নেই। গ্রেনেড, আর ডি এক্স, ল্যান্ড মাইন – কিছু নেই। তাহলে আমরা কোথায় যাবো বাপু হে? সর্বত্র নাকি খুব উন্নয়ন হচ্ছে, এসব শুনতে পাই এখন। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন নিয়ে কেউ ভাবে কি?
ঘাড়ে পনিটেল রোদ মেখে শুয়ে আছে। তাকে একটু নাড়াচাড়া দিয়ে সামান্য নিচু হলো পরঞ্জয়। কোত্থেকে একটা বুড়ো পাতা যেন বোঁটা খসে উড়তে উড়তে তার শ্যাম্পু করা চকচকে পনিটেল, ঘাড়, হলুদ গেঞ্জি ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাটির ওপর খুব সাবধানে এসে ল্যান্ড করল।
সত্যি সত্যি সেই ছ-সাতটা হাতির দল যদি হঠাৎ বন ফুঁড়ে এসে দাঁড়ায় পরঞ্জয়ের ক্যামেরার সামনে! আর মধুরিমা বিশ্বাস তার স্বভাবমতো, পরঞ্জয় তুই এবার যা – এটুকু বলে দলপতির শুঁড়ের কাছাকাছি এগিয়ে দেয় মাইক্রোফোন, তাহলে কত যে দীর্ঘশ্বাস, কত কত না বলা কথা! ছবি। কত যে এক্সক্লুসিভ স্টোরি!
ইন্টারভিউ দিতে দিতে একটা জায়গায় এসে কেমন যেন আটকে গেছে কমান্ডার। ঘাসের ওপর তার পা ছড়িয়ে দিয়ে – ভঙ্গিই কি বলে দিচ্ছে, আমি একটু টায়ার্ড! আর এই বিরতিটুকুর ফাঁকে একগাদা খিদের মিসাইল যেন-বা একই সঙ্গে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে একই সঙ্গে। সঙ্গে বিস্কিটের প্যাকেট আছে। কয়েকটা ভেজিটেবল স্যান্ডউইচ, ডিম সেদ্ধ কয়েকটা। এতক্ষণ সাক্ষাৎকার নেওয়ার উত্তেজনায়, তাড়নে খিদের বোধটাই চলে গেছিল বোধহয়। এখন একটু একটু করে খিদের বোধ খোঁচা দিচ্ছে ভেতরে।
আমাদের রাস্তা কী হবে কমান্ডার? দলপতি নিজের গলায় শাঁখ বাজিয়ে জানতে চাইল।
হিমিকা মেশানো চিকের আড়ালে আশ্চর্যরকমের শান্ত সেই হাতিরা। কেবল একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে দাঁতাল দলপতি। কমান্ডার তার কোনো উত্তর দিতে পারছে না। হাতের একে ফিফটি সিক্স হয়তো একটু একটু করে আলগাও হয়ে উঠছে এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে।
বন কেটে বসতি মানে কি উন্নয়ন? জানতে চাইল দলপতি।
কমান্ডারের মুখে কোনো কথা নেই।
হাতির গম্ভীর নাদে কেঁপে কেঁপে উঠছে শান্ত বনভূমি। শীতের হলুদ হয়ে যাওয়া প্রবীণ পাতারা একটা দুটো, একটা দুটো করে খসে পড়ছে সকলের অজান্তেই।
হঠাৎই আরো কোনো গভীর, পুরু ছায়া তৈরি হয়ে গেল কমান্ডারের দলম আর দলপতির পালের মধ্যে। যে-শুঁড় দিয়ে চাঁদ পাড়ার কথা ভেবেছে দলপতি, সেই আকাশের চাঁদও কেমন যেন লাফ দিয়ে সরে গেল আরো খানিক পুবে। চাঁদ ছোঁয়ানো অন্ধকারে এদিক-ওদিক জোনাকিরা আলোর ফুল সাজিয়ে চুপচাপ বসে আছে। কোথাও কোথাও হঠাৎ হঠাৎই অজানা সরসর শব্দ। হয়তো মেঠো ইঁদুর, নয়তো বেজি কিংবা শেয়াল।
মধুরিমার ঠোঁট, গলা আবারো শুকিয়ে এলো তেষ্টায়। শীতে জলতেষ্টা পেতেই থাকে। তার ওপর ঠোঁট খরখরে হয়ে আছে। ঝোলায় রাখা প্যাকেট থেকে বিস্কুট বের করে চিবোতে চিবোতে মধুরিমার মনে হলো খিদেটা বুঝি বেড়ে গেল আরো। এতক্ষণ খাওয়া হয়নি, তাই বোধহয় পেটের মধ্যে খাবো খাবো ভাবটা চাপা পড়েছিল। এখন বিস্কুট আর জল পড়তেই লাফিয়ে উঠল খিদের আগুন। খাই খাই করে এক জ্বালা শুরু হতে লাগল ভেতরে ভেতরে। মস্ত একঢোক জল খেয়ে মধুরিমা বলল, এবার আমরা গুটিয়ে আনব।
কমান্ডারের মুখে আবারো ক্যামেরা লুক থ্রু করতে করতে আলো-ছায়া – সব বুঝে নিতে চাইল পরঞ্জয়। আর সে একটু যেন অবাক হয়েই দেখতে পেল তার লেন্সে ফুটে উঠছে একটি মস্ত শুঁড়অলা মাথা। ব্যাপারটা বুঝে নিতে নিতে তার চোখে সাদা সাদা এক জোড়া দাঁত জেগে উঠল। এবার গজদন্তসমেত ভারি মাথা, খুদি খুদি চোখ, চোখের কোণে একটু যেন সাদামতো পিচুটি ও তার গায়ে কালো কালো দুটো একটা মাছি – সবই দেখতে পাচ্ছে পরঞ্জয়।
অদ্ভুত চুপচাপ এই বনভূমিতে ঘাসের গায়ে প্রজাপতিরাও স্থির হয়ে আছে। আর তারপর তারা উড়ে কখন যে চলে গেল, পরঞ্জয় টেরও পেল না। বরং ঘাসগুলো নীল, গাছেরা সব লাল আর প্রজাপতিরা ঝলমলে সোনালি, রুপোলি হয়ে গেলে তার ক্যামেরায় এদের সবার ছায়া নিজস্ব রঙে। তারপর সবটাই কোন ম্যাজিকে ফিল্মের নেগেটিভ হয়ে যায় কেমন করে, পরঞ্জয় বুঝতে পারে না। এমনকি তার পাশে এখন হাতে নিজেদের চ্যানেলের নাম লেখা, লোগো আঁকা মাইক্রোফোন হাতে মধুরিমাও নেই।
পরঞ্জয় বেশ অবাকই হলো মনে মনে। কি আশ্চর্য, সবাই কি আউট অফ ফোকাস হয়ে গেল নাকি! তার ক্যামেরার লেন্সে তখন শুধুই একটি বড় দাঁতালের মাথা, শুঁড়। চোখের কোণে কালচে কালচে মাছি, প্রথমে মনে হয়েছিল সামান্য, এখন দেখা যাচ্ছে অনেকটাই ক্যাত্তর। তারপর এদিক ওদিক দু-একটা জোঁক, একদম রক্ত খেয়ে টাবটুব।
কমান্ডার, তোমরা তো তোমাদের করিডর তৈরি করে নিতে পেরেছ বলছ, নেপাল থেকে শুরু করে, নেপালের লাগোয়া উত্তর প্রদেশ, বস্তার, দণ্ডকারণ্য, অন্ধ্র, ওড়িশ্যা, বিহার, ঝাড়খণ্ড হয়ে অবশেষে পশ্চিমবাংলা। বিপ্লবী জোন তৈরি নাকি কমপ্লিট, সেখান থেকে – মানে ওই রাস্তায় রেগুলার মার্চ করবে রেড আর্মি, দলম, আর্মড স্কোয়াড, কিন্তু আমাদের করিডর – তার কী হলো!
পরঞ্জয় সেই মহাগজের কথা শুনতে পাচ্ছে। তার ক্যামেরার ফ্রেমে শুঁড় খানিকটা আকাশের দিকে তুলে বলে যাওয়া এই দলপতি আবারো জানতে চাইল খাবারের টান পড়েছে জঙ্গলে। থাকার জায়গা নেই। আমাদের হাজার হাজার বছরের চলার রাস্তা একটু একটু করে বন্ধ করে দিয়ে সেখানে দখলদার মানুষের ক্ষেতিবাড়ি, মদের দোকান, সিনেমা হল, ভিডিও হল, পার্টি অফিস।
আমরা আমাদের জায়গা হারিয়ে ফেলেছি বহু বছর। যেসব গাছ, গাছের কচি ডাল-পাতা খেয়ে আমরা পেট ভরাতাম, বাঁচতাম, সেইসব গাছ এখন আর নতুন করে প্রায় লাগানোই হয় না। তার বদলে বনসৃজনের নামে যা লাগানো হচ্ছে – সেই ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি – আমরা তা খাই না। খেতে চাই না। কচিবাঁশ, তেঁতুল, কয়েতবেল – কে লাগাবে তাদের?
দলপতির এসব কথা কি শুনতে পাচ্ছে মধুরিমাও? টেক করছে?
আমাদের সমস্ত রাস্তা নষ্ট হয়ে গেল। এখানে ওখানে রেললাইন, বাস-রাস্তা। বিদ্যুৎছোঁয়া তারের বেড়া দিয়ে দিয়ে আটকাবার চেষ্টা করা হতে লাগল আমাদের। কিন্তু সেই আড়াল আমরা মানলে তো। বেড়াকে কীভাবে বিদ্যুৎহীন করা যায়, সেটাও আমরা বুদ্ধি করে বের করলাম। কায়দা করে গাছ বা কলাপাতা ফেলে দিয়ে তারপর কৌশল করে বেরিয়ে যাওয়া।
হাতি লোকালয়ে ঢুকলে হইহই পড়ে যায়। হুলা পার্টি, পটকা, কেরোসিন-মশাল, টায়ার জ্বালনো আগুন – কিছুই বাদ থাকে না তাদের তাড়াবার জন্য। জ্বলন্ত মশাল গায়ের ওপর ছুড়ে মারলে কেমন লাগে? ছ্যাঁকা লাগে না? আগুন লাগানো টায়ার যদি লাগানো যায় নরম চামড়ায়, তাহলে যন্ত্রণা হয় না? হাতি বলে তার কি কষ্ট, দুঃখ কিচ্ছুই নেই!
পরঞ্জয়ের ক্যামেরায় দাঁতালের দিগন্তজোড়া ছবি। সবটা ধরাও যাচ্ছে না ঠিক করে। মাঝে মাঝেই অতবড় শুঁড়, মুখ – সব খানিকটা খানিকটা কেমন করে যেন চলে যাচ্ছে ফ্রেমের বাইরে। এই যে এতক্ষণ ছিল আকাশ আলো করা রোদ্দুর, তার তাপ-উত্তাপ, রং যেমন তেমন করেও পেয়েছে চারপাশ, সেইসব রোদ্দুরের রং, গন্ধ সরে গিয়ে কোথা থেকে যেন উড়ে আসতে লাগল কুয়াশারগুঁড়ো। তার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসা হিম হিম ঠান্ডায় সমস্ত শরীর উঠতে লাগল শিউরে শিউরে। এ-কোন অলৌকিক কুয়াশা? অন্ধকারের একি মার অসময়ে? পরঞ্জয়ের হলুদ টি শার্টে বনের অন্ধকার ডুবে যাবে বলে হাত বাড়াল।
বেশ জোরে জোরে হাওয়া দিচ্ছে এখন। শীতে এমনিই প্রকৃতির স্বাভাবিকতায় প্রবল থাকে শীতের বাতাস। এখন এই হিম হাওয়ায় পরঞ্জয়ের মনে হতে লাগল তার একদম ভেতর পর্যন্ত সব বরফ হয়ে যাবে। দমকা হাওয়া, কুয়াশা, শীতের জোরদার ঘেরাটোপ, একটু আগে তার তো কোনো চিহ্নই ছিল না।
পরঞ্জয় নিজের ভেতর নিজে হাতড়াচ্ছে। যে মোটরবাইকঅলারা তাকে আর মধুরিমাকে চোখ বেঁধে নিয়ে এসেছে এই বেশ গভীর বনে, তারাই বা এখন কোথায়? আর সেই গাইডদের দেখা না পেলে তো প্রায় অসম্ভব এই বন থেকে বেরুনো। কোথায় কোন রাস্তার মারপ্যাঁচ আছে কে জানে! এই জঙ্গল তো হাতেপায়ে ছড়াতে ছড়াতে ঝাড়খণ্ড হয়ে চলে গেছে ওড়িশ্যায়।
হাওয়া দিচ্ছে বেশ জোরে। হাওয়া না বলে তাকে ঝড় বলাই ভালো। বনের মাটিতে লুটিয়ে থাকা শুকনো পাতারা পাক খেয়ে খেয়ে উঠে যেতে চাইছে আকাশে। পাগলা বাতাসের টানে শুকনো পাতাদের সেই আকাশমুখী হওয়ার দৃশ্য অন্যসময় হলে হয়তো গেঁথে রাখত পরঞ্জয় ক্যামেরায় স্টক শট হিসেবে। পরে কোনোভাবে কাজে লাগিয়ে দেওয়া যাবে। এরকম সুযোগ তো সবসময়ে ঠিক সামনে আসে না। এতো যাকে বলে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছে চান্স। শুধু তাকে দুহাত বাড়িয়ে নিয়ে নেওয়া।
বনের মধ্যে ঝড়ের সঙ্গে পাতা উড়ছে। উড়ে বেড়াচ্ছে লাল ধুলো। তার সঙ্গে আর কিছুই নেই প্রায়। শহরে জোরালো বাতাসের সঙ্গে যেমন ধুলো, ময়লা, আবর্জনা, বাতিল প্লাস্টিক, ফেলে দেওয়া ঠোঙা, শালপাতা, আলগা চুল, ছেঁড়া কাগজ, বাস-ট্রামের টিকিট, আর সাত-সতেরো হাবিজাবি ওড়ে, এখানে সেই সুযোগ নেই। বরং এই ভীমকায় বাতাসের ছোটাছুটিতে রঙবাহারি প্রজাপতিরা সুতোকাটা ঘুড়ি হয়ে এদিক ওদিক এলোমেলো খানিকটা ওড়াউড়ি করার পর বাতাসের গায়ে ভর দিয়েই কোথায় যেন উবে গেল। হয়তো ভয় পেয়েছে। হয়তো বাতাসে ডানা ভাসিয়ে স্থির থাকতে পারছে না। তাই -।
শুধু পরঞ্জয়ের হলুদ টি-শার্টে একটি কালো প্রজাপতি বাঁ-কাঁধের সামান্য নিচে ডিজাইন হয়ে দুডানা ছেতরে বসে। ওসব দিকে অন্যসময় নজর পড়লে খুবই আহ্লাদ হতো হয়তো একস্ জেভিয়ার্স স্টুডেন্ট পরঞ্জয় মুস্তাফির। কিন্তু এখন এই উথাল-পাথাল হাওয়ার ভেতর, সর্বনেশে হিমহিম ঠান্ডায় পরঞ্জয় বুঝতেই পারল না কী করবে। মাথার মধ্যে সমস্ত কিছু একসঙ্গে নেচে বেড়াচ্ছে তাল পাকিয়ে গিয়ে। সে এক মহা জগঝম্প অবস্থা। এই কাহিল সিচুয়েশনের মধ্যেই ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে আবারো দাঁতাল আর তার সঙ্গের ছ-সাত কি বড়জোর আটটা হবে – বাহিনীকে দেখতে পেল পরঞ্জয়। দলপতি দাঁতাল এখন অনেকটাই লং শটের দূরত্বে চলে গেছে হয়তো। তার সঙ্গী অন্যরাও দিব্যি এঁটে গেছে ফ্রেমের মধ্যে। কেউই তেমন করে আউট অফ ফোকাস হচ্ছে না। অথচ এদের সবাইকে অল্প আউট অফ ফোকাসের কায়দায় ফেড করে দিয়ে যদি একটু বেশি প্রমিনেন্ট করে তোলা যায় দাঁতালকে, তাহলে ছবির কমপোজিশন, ফ্রেম, বলতে গেলে টোটাল মজাটাই বদলে যাবে। কিন্তু এখন সেইসব মজা নিয়ে ভাবার সময় আর নেই। দূরে কোথায় সেই যে পাখিটা ডাকতে আরম্ভ করেছিল খানিক আগে, সে আবার শুরু করেছে ডাকাডাকি। ডাক না বলে তাকে গোঙানি বা কোঁকানি বলাই ভালো। সেই ডাকাডাকি শুনতে শুনতে বুকের মধ্যে গড়িয়ে যেতে থাকে হিমপাথর। বরফের বল গড়াতে থাকলে যেমন অবশ করে দেয় সবকিছু – তার গড়ানোর রাস্তায়, তেমনই প্রায় হাল এখন পরঞ্জয়ের।
পাখিটা আবারো ডাকছে। থেকে থেকে ডাকছে। বনের গাছেরা নীলচে-ধূসর কুয়াশা মেখে একদম দৈত্যরাজের এক-একটা চ্যালা। পরঞ্জয়ের হলুদ টি-শার্টে একটা কালো প্রজাপতি, ডানা ছেতরে চুপচাপ। মাঝে মাঝে তার পাখায় নড়াচড়ার ছন্দ। হয়তো সেটা বেপরোয়া বাতাসের জন্য, নয়তো এমনি এমনিই। অচেনা জঙ্গলে কত কী ঘটে থাকে!
আমি ফিরব কী করে? যার বাইকে এসেছি, সেই কনট্যাক্ট ম্যানকে দেখছি না। সেই লোকটাকে, যার মুখ, মাথায় মাংকি টুপির রহস্যঘন আবরণ, আর তারও ওপর গামছার প্যাঁচ, তাকে কিছুতেই আবিষ্কার করা যাচ্ছে না কাছাকাছি কোথাও। নামও জানা নেই যে চিৎকার করে করে সেই নাম ধরে ডাকবে পরঞ্জয়। আসলে নাম জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়ার কোনো সুযোগই তো তৈরি হয়নি আসার সময়।
হাওয়ার টানের সঙ্গে একটা গোঙানোর শব্দও চারপাশে। কমান্ডার, মধুরিমা – কেউই আশপাশে নেই। ঘাস, ঝরা পাতার ওপর শুয়ে থাকা রাইফেল, একে ফিফটি সিক্স, একে ফিফটি সেভেন, দোনলা বন্দুক – কিছুই আর চোখে পড়ছে না এখন। কোথায়, কোনখানে ভ্যানিশ হয়ে গেল তারা? কোন দিগন্তে? সাত্তার বসে আছে – অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্যে কখন ফিরব, এই উদ্বেগ নিয়ে পাঁশকুড়ায়। তার সঙ্গে ভাড়ায় আনা টাটা সুমো। পকেটের মোবাইল ঝড়, কুয়াশার মধ্যেই বের করে অন করার চেষ্টা করল পরঞ্জয়। যদি সাত্তার, মধুরিমা কাউকে ধরা যায়। বোঝা যাবে সিচুয়েশনটা। কিন্তু কোথায় কী! সিগন্যালই নেই। হাজার বোতাম টিপেও ধরা যাচ্ছে না কোনো লাইন। রাগে, কষ্টে, কি এক না জানা ব্যথায় মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে পরঞ্জয়ের। এখান থেকে বেরুব কী করে আমি! কোনো রাস্তাই চিনি না। তার ওপর মধুরিমা নেই। কোথায় যে উবে গেল টিভি জার্নালিস্ট মধুরিমা বিশ্বাস। আর কোথায়ই বা সেই পরভিনজির অর্গানাইজেশনের এরিয়া কমান্ডার?
কোথাও কিচ্ছু নেই। আছে শুধু ঝড় আর থকথকে গাঢ় কুয়াশা।
মধুরিমা, মধু – উ-উ – পরঞ্জয়ের খুব ইচ্ছে হলো গলা ছেড়ে ডাকে। তারপর বলে কো-থা-য়, তু-উ-মি। কিন্তু ব্যাপারটা অনেকটা যেন পাতি বাংলা নয়তো মুম্বাইয়া হিন্দি সিনেমা সিনেমা হয়ে যাবে ভেবে গাঢ়, ভারি কুয়াশার দিকে তাকিয়ে রইল পরঞ্জয় মুস্তাফি।
পাখিটা সমানে ডাকছে।
ঝড়ের মধ্যেও তার ছেঁড়াছেঁড়া গলার স্বর ভেসে আসছে কানে।ক্যামেরার লেন্সে ছায়া ছায়া ছবি হয়ে তখনো দলপতি। তার সাদা গজদাঁতে লাল ধুলো। বনের শুকনো পাতার টুকরো, শুকিয়ে যাওয়া ঘাস। পরঞ্জয় মুস্তাফির হলুদ টি-শার্টের বাঁ-দিকে ডানা মেলা কালো প্রজাপতিটা আবারো ডানা নাড়তে লাগল।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.