একদিন পথ ফুরোয়

তাঁর সামনে একটি সমুদ্র এগিয়ে দিলে তিনি সবটুকু জল পান করার শক্তি রাখতেন। এমনই ছিল তাঁর জীবনতৃষ্ণা। তিনি সেলিনা বাহার জামান। দুহাতে বেড় দিয়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন নিজেদের অর্জনের যা কিছু সঞ্চয়। কিন্তু তাঁকে চলে যেতে হলো অকালে।

দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য-সাময়িকীতে তিনি যে-আত্মজীবনী লিখতেন তার নাম ছিল ‘পথে চলে যেতে যেতে’। হ্যাঁ, একদিন পথ তো ফুরোবেই – সবার জন্যে এটি প্রাকৃতিক সত্য। পথ যদি আগেই ফুরিয়ে যায় তখন সেই দহনের মাত্রা থাকে না। মেনে নিতে কষ্ট হয়। মেনে নিতে সময় লাগে – কাঠপোড়া আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার যন্ত্রণা দহন করে নির্মমভাবে। চোখ ভিজে যায়। তাঁর মৃত্যু এমনই নিষ্ঠুর সত্য।

মৃত্যুর কয়েকদিন আগে, ২৫ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ বইটি দিয়ে বললেন, ‘এ-বইয়ে আপনার একটি লেখা নিয়েছি। আপনাকে বইটি দেওয়া হয়নি। দুটো কপি এনেছি। একটি আপনার।’ আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ‘আপা স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের ব্যাপারে আপনি একটি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। আপনার ধৈর্যের পায়ে সালাম। ‘মৃদু হাসিতে উজ্জ্বল সেলিনা আপার মুখ বড় বেশি জ্বলজ্বলে ছিল সেদিন। ওই হাসি তো জীবনকে অর্থবহ করার প্রেরণায় উদ্দীপিত হাসি। মৃত্যুর ছায়া সেখানে ছিল না। তারপরও কত দ্রুত – অবিশ্বাস্য মনে হয়, যখন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভোর সাতটায় ফোন করে জানালেন – তাঁকে দেখতে যাওয়ার সাহস হয়নি, সারাদিন ঘরের ভেতর গুটিয়ে থাকলাম। কালি ও কলমে ছাপার জন্য আবুল হাসনাত যখন বললেন তাঁর ওপর একটি লেখা দিতে, তখন মনে হলো তাঁর জীবনসাধনাকে ধরার সাধ্য কি আমার আছে? হাসনাত সাহেবের কথা মানা করার জো ছিল না, লিখতে আমাকে হবেই, তাঁর কথা অন্যদেরকে জানানোর জন্যে, যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেনি তাদের জন্য।নানা বিষয়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। স্মারকগ্রন্থ-প্রকাশ তার মধ্যে অন্যতম। স্মারকগ্রন্থ-প্রকাশে তাঁর উদ্যম, ধৈর্য, নিষ্ঠা আমাদের সামনে দৃষ্টান্তস্বরূপ। কখনো ইতিহাসের মানুষকে হাজির করেছেন সমকালে, কখনো ব্যক্তির দায় বহন করেছেন এককভাবে। নিজ-অর্থ ব্যয় করে এইসব বই প্রকাশ করেছেন। বিক্রি করে খরচ উঠবে – এই ভাবনা তাঁর ছিল না। কাজটি বড় – বড় কাজটি করেছেন এমন পরিতৃপ্তি নিয়ে তিনি আমাদের সামনে গলগল করে বলে গেছেন সেইসব মানুষের কথা। একক প্রচেষ্টায় প্রকাশ করেছেন সাতটি স্মারকগ্রন্থ। যেদিন আবদুল ওয়াহাব মাহমুদ স্মরণে বইটি আমাকে দিলেন সেদিন অবাক হয়ে বলেছিলাম, ‘এঁর সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না।’ হেসে বললেন, ‘তাঁকে সবার সামনে হাজির করানোর দায়িত্ব বোধ করেছি।’ পরে ওঁনার সম্পর্কে তাঁর বই থেকে জেনে নিজের অজ্ঞতায় লজ্জা পেয়েছি। আবদুল ওয়াহাব মাহমুদ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : ‘তিনি সম্পূর্ণতই একজন ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন, প্রগতিপন্থী মানুষ ছিলেন। দাঙ্গা ও দেশভাগের মতো নানা নৈরাজ্যে তিনি নিরলসভাবে অগ্রসর চিন্তার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভিয়েতনাম বা কিউবার সংগ্রামী মানুষের স্বাধিকার-প্রতিষ্ঠা বা ধর্মনিরপেক্ষতা ও শান্তির মিছিলে রৌদ্রদগ্ধ কলকাতার রাজপথে তাঁকে দৃপ্ত পায়ে সহস্র মানুষের উত্তাল তরঙ্গে হাঁটতে দেখা গেছে। …ভারতবর্ষের অর্থনীতির করুণ ও বিপর্যয়কর অবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন সর্বত্র। এমন সহজ সরল ও সোজা মানুষ আমাদের কাছে আদর্শস্থানীয়।’ আর সম্পাদকীয়তে লিখেছেন : ‘তাই তাঁর কথা সাধারণ মানুষকে জানাবার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাঁর কথা জানতে পারলে – নতুন প্রজন্ম তাঁর চরিত্রের গুণাবলীতে আকৃষ্ট হলে, আমার শ্রম সার্থক হবে।’ এভাবে তিনি শ্রমের দায় কাঁধে নিয়েছিলেন, সংস্কৃতির শুভবোধের রূপান্তরের স্বার্থে। এভাবে – এভাবেই তাঁর একক প্রচেষ্টা তাঁকে ব্যতিক্রমি মানুষ করেছে। তিনি সম্পাদনা করেছেন বেগম রোকেয়া স্মারকগ্রন্থ, জহুর হোসেন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম স্মারকগ্রন্থ, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ। মায়ের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাঁর একটি প্রকাশনা-উৎসব হয়েছিল জাতীয় জাদুঘর সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ সালে। অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রটি ছাপা হয়েছিল তাঁর নাতনি আনার নামে। আমি আলোচক ছিলাম। এই স্মারকগ্রন্থে তিনি একশটির বেশি লেখা সংযোজন করেছিলেন। এতগুলো লেখা জোগাড় করার ধৈর্য বুঝি তাঁর পক্ষেই রাখা সম্ভব। আনোয়ারা বাহার চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ আলোচনা প্রসঙ্গে মনে হয়েছিল, একজন পরিপূর্ণ মানুষ কখনো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন না নিজেকে। সেলিনা আপা তাঁর মায়ের মতো পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন। মায়ের কর্মস্পৃহা, সংস্কৃতিচর্চা, শিক্ষাজীবন, সমাজ-সচেতনতা সবটুকুই নিজের

ভেতরে ধারণ করেছিলেন তিনি। বিপুলা এ-পৃথিবীর দায় তাঁর কাছে বোঝা মনে হয়নি।

তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিশুদ্ধ গণিতে এম.এসসি.তে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ছত্রিশ বছর গণিতে অধ্যাপনা করেন সরকারি কলেজে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান থাকাকালে অবসর গ্রহণ করেন। মেয়েরা অঙ্ক বোঝে না, এমন একটি ধারণা প্রায়শ শোনা যায়। কিন্তু সেলিনা আপা সে-বেড়ি ভেঙে দিয়েছিলেন নিজের মেধা ও যোগ্যতায়। দীর্ঘ বছর ধরে ছেলেমেয়েদের গণিত শিখিয়েছেন। এও তাঁর অগ্রণী ভূমিকাপালনের দৃষ্টান্ত – গণিতের মতো নিরেট এবং কঠিন বিষয়ে।

শৈশব-কৈশোরে নৃত্যশিল্পী ছিলেন। বাবা হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও মা আনোয়ারা বাহার চৌধুরীর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর ভাইবোনেরা এ-দেশের সংস্কৃতির জগতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। মা শুধু শিক্ষাবিদই ছিলেন না, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও হবীবুল্লাহ বাহার কলেজ-প্রতিষ্ঠায় ছিলেন অগ্রণী মানুষ। এই মায়ের অনুপ্রেরণায় নৃত্য, সংগীত, সাহিত্য নিয়ে যে-পারিবারিক পরিবেশ এবং বাবার নিরন্তর সমর্থন তাঁদের মানবিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনাকে তীক্ষè করেছিল নিঃসন্দেহে। চারবেলা চারদিক পত্রিকায় ‘পঞ্চাশের দশকে ঢাকার সংস্কৃতিচর্চা’ প্রবন্ধে সেলিনা আপা একটি সময়কে অকপটে তুলে ধরেছেন। এই লেখা পড়ার সময় মনে হয়েছিল কী অসাধারণ স্মৃতি তাঁর! কত অসংখ্য নাম তাঁর স্মৃতি-ভাণ্ডারে মজুদ আছে। সাদামাটা সরল ভাষায় স্মৃতিচারণ করেছেন বললে কম বলা হবে। তিনি নিজেও জানতেন এই স্মৃতিচারণ সময়ের দলিল। সেজন্য যত্ন করে লিখেছেন – নাম উল্লেখ করেছেন। অবাক লাগে, কত যত্নে যে সংগ্রহে রেখেছেন সেই সময়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি। বোঝাই যায়, তরুণ বয়স থেকেই তিনি ইতিহাসমনস্ক ছিলেন। সেজন্য স্মৃতিচারণ করার সময়ও তিনি ব্যক্তিবিশেষের কাজের মূল্যায়ন করেছেন। দেশভাগের পরে সে-সময়ের পূর্ববঙ্গে সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে যে-শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তার কথা তিনি এভাবে বলেছেন, ‘এই দেশভাগ বা দেশত্যাগের ফলে সেদিন সারাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল নানা রকম সমস্যা। ব্যাপক হারে দেশত্যাগের ফলে সাংস্কৃতিক ভুবনে দেখা দিয়েছিল শূন্যতা। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হবার ছিল না। বিশেষ করে, ঢাকার সাংস্কৃতিক জগতের ভিত্তিমূল নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। শিল্প-সাহিত্য, সঙ্গীত-নৃত্য, নাটক – সব ক্ষেত্রেই এই শূন্যতা ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল সমগ্র সমাজকে। যাই হোক, ধীরে ধীরে এ-অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল এ-দেশের মানুষ। বিরুদ্ধ পরিবেশে বহু মানুষের পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার এক পরিবেশ। তখনকার মানুষ আজকের মতো উগ্র, হিংস্র, প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেনি। মানুষ ছিল শান্ত, স্নিগ্ধ সহানুভূতিশীল আর পরোপকারী। তাই সে সমাজের সংস্কৃতিও বহমান ছিল শান্ত নদীটির মতো।

১৯৪৭-৪৮ সালে ঢাকার নৃত্যাঙ্গনে প্রায় কোনো শিল্পীই ছিল না। একমাত্র নৃত্যশিক্ষক ছিলেন কেষ্ট পাল, তিনি নিজে পারফর্মার ছিলেন না, কখনো নৃত্য প্রদর্শন করতেন না। একেবারে শূন্য অবস্থা থেকে অতি ধীরে ১৯৪৯ সালের গোড়ার দিকে তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন তার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। নৃত্যনাট্য নয়, স্টারি ডান্স (ঝঃধৎু ফধহপব) – একক নৃত্য বা দলনৃত্যে অংশ নিতেন ছাত্রীরা।’

সেলিনা আপা নিজে এইসব নৃত্যে অংশগ্রহণ করতেন। অদ্ভুত তাঁর পরিমিতিবোধ। নিজের নামের উল্লেখ ছাড়া তিনি কোনো বাড়তি কথা বলেননি নিজের সম্পর্কে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধর্মীয় অনুষঙ্গের বিপরীতে তাঁরা যে-নৃত্য-সংগীতের চর্চা করে সংস্কৃতির শূন্যস্থান পূরণ করেছিলেন এটিও তাঁর অগ্রণী ভূমিকার একটি দিক। শুধু অংশগ্রহণেই শেষ হয়নি তাঁর দায়িত্ব, তিনি পঞ্চাশ বছর পরে সে-ইতিহাস লিখে আরেকটি অংশ পূরণ করে গেছেন।

এ-বছরের ১৯ মে তিনি আমাকে দিয়েছিলেন তাঁর বই কয়েক ছত্র প্রাণের পত্র। লিখেছিলেন, ‘মিতা সেলিনা হোসেনকে শুভেচ্ছাসহ’। বইটি চিঠির সংকলন। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘১৯২৫ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই আশি বছর সময়কালে এপার বাংলা ওপার বাংলার ৪৭ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির লেখা ৮৬টি চিঠিই কয়েক ছত্র প্রাণের পত্র।’ ভাবতে অবাক লাগে সেলিনা আপার জন্ম ১৯৪০ সালে। জন্মের ১৫ বছর আগে লেখা চিঠিগুলোও তিনি সংগ্রহ করেছেন এবং সংরক্ষণ করেছেন যত্নের সঙ্গে। প্রকাশ করেছেন নিজ-উদ্যোগে। কত গভীরতা, কত মমতা এই যত্নের ভেতরে নিহিত – এর পরিমাপ করা সম্ভব নয়। বইটিতে ৫১ জন পত্র-লেখকের ছবি আছে, সঙ্গে চিঠির অনুলিপিও। বইয়ের প্রকাশনায় মানের স্বার্থে তিনি খরচের চিন্তা করেননি। এমন ঋদ্ধ রুচির মানুষও কম এই সমাজে।

শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্বও তিনি নিয়েছিলেন। এ-বছরের মে মাসে এই বই প্রকাশিত হয়। বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৪৫টি লেখা। আরো সংযোজিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকার খবরাখবর ও সম্পাদকীয়, জীবনপঞ্জি, রচনাপঞ্জি এবং লেখক-পরিচিতি, এছাড়া নিজের লেখা সম্পাদকীয়। অন্যান্য স্মারকগ্রন্থও এভাবে সম্পাদিত হয়েছে। প্রকৃত সম্পাদনার দক্ষতা এইসব বইয়ে বিধৃত হয়েছে। একজন ব্যক্তিকে স্মারকগ্রন্থে উপস্থাপন করার জন্য যে-তথ্যসমূহ অনিবার্য তা সেলিনা আপার দৃষ্টি এড়ায় না। এটিও তাঁর একটি বড় গুণ। প্রতিটি বইয়ে তাঁর যত্ন ও নিষ্ঠা লক্ষণীয় এবং পাশাপাশি তথ্যের জন্যেও সহায়ক গ্রন্থ।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তাঁর প্রিয় প্রসঙ্গ। সেলিনা আপার বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কাজী নজরুল ইসলামের। ১৯২৫ সালে কবি চিঠি লিখেছিলেন তাঁর বাবা হবীবুল্লাহ বাহারকে। নজরুল বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়েছিল। নজরুল হুগলি থেকে চট্টগ্রামে চিঠি লিখেছিলেন বাহারকে। এই চিঠি লেখার ১৫ বছর পরে জন্মগ্রহণ করেন সেলিন বাহার জামান। সম্পর্কের সূত্র ধরে শুধু নয়, নজরুল ছিলেন তাঁর সাধনার বিষয়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত নজরুল পাণ্ডুলিপি এবং ২০০১ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের ধূমকেতু। দুটি বই-ই প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমী। নিঃসন্দেহে এই বইদুটি প্রকাশনার দিক থেকে ব্যতিক্রমি। এটিও তাঁর সম্পাদনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

তিনি লিখেছেন ছোটদের জন্য – পিকুর ছাগল ও বুলি মুরগী। লিখেছেন সংখ্যা নামে একটি অত্যন্ত কঠিন বই। প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমী। লিখেছেন দু-তিনটি জীবনী। কালান্তরে নারী নামে একটি বই প্রকাশের ইচ্ছে ছিল তাঁর, পাণ্ডুলিপি তৈরিও করেছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এভাবে আরো অনেক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছিলেন নিজেকে। সংবাদ-সাময়িকীতে তাঁর আত্মজীবনী ‘পথে চলে যেতে যেতে’ ধারাবাহিক প্রকাশিত হলে পড়ার সময় ভীষণ আনন্দ পেয়েছি। ছোট ছোট বাক্যে অকপট বর্ণনা। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি মুগ্ধ করেছে আমাদেরকে। তাছাড়া, তাঁর বাবা, মা, ফুফু এবং তাঁকে লেখা বিভিন্নজনের চিঠির সংগ্রহ কয়েক ছত্র প্রাণের পত্র প্রকাশ করেছিলেন, তারও মূল্য আছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন-প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ আমারে তুমি অশেষ করেছ সম্পাদনাও করেছিলেন তিনি।

তাঁর আরেকটি বিশেষ দিক হলো প্রতিটি বইয়ের উৎসর্গ। আনোয়ারা বাহার চৌধুরী স্মারকগ্রন্থের উৎসর্গ : ‘বাংলাদেশের অক্ষর পরিচয়হীন হতভাগ্য মেয়েদের উদ্দেশ্যে।’ আবদুল ওয়াহাব মাহমুদ স্মারকগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষের উদ্দেশ্যে।’ এভাবেই তাঁর সামাজিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ছোট অথচ তীক্ষè সম্পূর্ণ বাক্যে।

বাংলা একাডেমীতে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি নানা কাজ নিয়ে আসতেন। কখনো লাইব্রেরিতে বসতেন, আলোচনাসভায় আসতেন, আলোচনা-অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। আমার ঘরে আসতেন। আড্ডা হতো। আপাই বেশি কথা বলতেন। আমি নীরব শ্রোতা ছিলাম। তিনি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। শুনতে ভালো লাগত। মাঝে মাঝে নাতনি আনাকে স্কুল থেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আসতেন। তখনো আমার মনে হতো বাংলা একাডেমী তাঁর একটি প্রিয় প্রতিষ্ঠান।

আমরা একসঙ্গে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম জ্যোতির্ময়ী দেবী জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন পরিষদের আমন্ত্রণে। রাতের ট্রেনে যাত্রা। আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলেন সুনন্দা বড়ুয়া। আমি আর সেলিনা আপা মুখোমুখি সিটে বসেছি। আপা মাঝে মাঝে ঘুমুচ্ছিলেন। আচমকা ঘুম থেকে জেগে যাচ্ছিলেন। মৃদু হেসে একবার আমাকে বললেন, ‘আপনার ঘুম পাচ্ছে না?’ বললাম, ‘ঘুম আমার গভীর সমস্যা। রাতে বিছানাতেই ঘুম আসে না। ট্রেনে কিংবা বাসে তো প্রশ্নই ওঠে না।’ আপা কথা বাড়ালেন না। বললেন, ‘মনে হচ্ছে প্রেসার বেড়েছে।’ আপা সিটের গায়ে মাথা হেলালেন। হোটেলে দুজনে একঘরে ছিলাম। আপাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়েছিল। একদিন এসে তাঁর ক্যামেরায় তোলা সেই অনুষ্ঠানের ছবি দিয়ে গেলেন। তাঁর সৌজন্য আমাকে মুগ্ধ করে।

আজ ভাবি, সেলিনা আপার সঙ্গে সম্পর্কটা সৌজন্যের খানিকটুকু বেশি ছিল বোধহয়। কারণ আমার মেয়ে লারা এবং তাঁর ছেলে রিয়াজ উদয়ন স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত। লারার মৃত্যুর পর আপা কয়েকদিন বাসায় এলেন। তেমন কথা তো হতো না। চুপচাপ বসে থেকে চলে যেতেন। মনে হতো তাঁর ছবিটা আমার ভেতরটা ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রায় মাসখানেক পরে তিনি ড্রাইভারকে দিয়ে আমাকে এক পাতিল মোরগ-পোলাও পাঠিয়ে দিলেন। মৃতের বাড়িতে খাবার পাঠানো আমাদের সামাজিক রীতি। তাও সেই খাবার তিন দিনের মধ্যে পাঠাতে হয়। কিন্তু সেলিনা আপা সময় নিয়ে পাঠালেন কেন? তিনি জানতেন মৃত-বাড়ির জন্যে সামাজিকতারক্ষাই জরুরি নয়। মৃত-বাড়ির সবাই যেন খাওয়ার মতো মানসিক স্থিতি লাভ করে সেই সময়টি তিনি মৃতের পরিবারকে দিয়েছিলেন। তাঁর বোধের সঙ্গে একাত্ম হতে পারা কত যে কঠিন তা বুঝেছিলাম তাঁর বড় ছেলে পিকুর মৃত্যুর পরে। তাঁর সামনে যেতে পারিনি, কিংবা তাঁকে শেষ দেখা দেখতে যাওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ভেবেছি যেভাবে তিনি আমার সামনে প্রাণবন্ত হয়ে আছেন, তেমনই থাকুন।

জেন্ডার শব্দকোষ নামে একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করছি আমরা অনেকে। আপা আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাদের অনেক বিশিষ্ট নারীদের জীবনী লিখে দিচ্ছিলেন। ২৫ নভেম্বর আমাকে দুজনের জীবনী দিয়েছিলেন – শামসুননাহার মাহমুদ ও মেহের আহমদ।

এখন তিনি নিজেই এই শব্দকোষে একটি ভুক্তি হবেন। আমি নিজেই সেই ভুক্তিটি লিখব!কিন্তু ‘সেলিনা বাহার জামান স্মারকগ্রন্থটি’ কে করবেন?