এগারো
আমরা তো অহনই চইলা গেলে পারতাম।
লালুবাবুর কথা শুনে ভুরু কুঁচকে তাকালেন ওয়াদুদ খান। কই?
দ্যাশে।
জয়িতা বলল, দেশে মানে বিক্রমপুরের কথা বলছ!
লালুবাবু হাসলেন। হ। গ্রামের বাড়িতে যাওয়াকে আমরা দ্যাশে যাওয়াই কইতাম।
ওয়াদুদ খানও হাসলেন। সেইটা ঠিকই আছে। আমরাও ছোটকালে তাই কইতাম। ঢাকায় আসলে গ্রামের বাড়িতে যাওনের সমায় কইতাম দ্যাশে যাইতাছি। তয় অহন তো দাদা যাওন যাইবো না।
ক্যা?
আপনেগ যাওনের ব্যবস্থা করা হইছে দোফরে।
হ, তাতো জানিই। তালুকদার বংশের লোকজনগ রিসিভ করতে যাইবা তুমি…
আউজকা তো দুইদল আসবো। একদল আইবো প্লেনে, আরেকদল বাসে। নীপেশ তালুকদার আর তার বউআসবো প্লেনে। তাগো আনতে আমি যামু এয়ারপোর্টে। আর দিপালী নাগ, তার গানের দল, শ্যামলাল দাস, কসুমকান্তি বসু তাগো লগে আরও দুই-চাইরজন তারা আসবো বাসে। তাগো আনতে যাইবো গণিদায়। তারা আসনের আগে খোকন একটা মাইক্রোবাস লইয়াইসা আপনেগ লইয়া যাইবো বিক্রমপুরে।
একটু হাসলেন ওয়াদুদ খান। এইভাবেই প্ল্যানটা করা হইছে। আপনেরা চইলা যাওনের পরও এই রুম দুইটা আমরা ছাড়ুম না। এইখানেই আইন্না তুলুম সবাইরে। এখান থিকা ইকটু ফ্রেস হইয়া, চা-টা খাইয়া মেলা দিমু। সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় পৌঁছাইয়া যামু বাড়িতে।
জয়িতা বলল, তার মানে ওদের সঙ্গে আমাদের দেখা হবে গণিদার বাড়িতে?
হ।
লালুবাবু বললেন, অগ লগে দেখা হইলে তর বহুত সুবিদা হইব।
কীসের সুবিধে?
ঘটিভাষায় কথা কইতে পারবি?
তাতো আমি এখনও পারছি। তুমি তোমার ভাছা বদলেছো, আমি তো বদলাইনি।
কথা বলছিলেন লালুবাবু ঠিকই, কিন্তু ফাঁকে ফাঁকে অন্যমনস্কও হচ্ছিলেন। জয়িতা খেয়াল করছিল ব্যাপারটা। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছেও করছে, ওয়াদুদ খান আছেন বলে জিজ্ঞেস করছে না।
লালুবাবু বললেন, চা আছে নাকি রে? আধাকাপ দিতে পারবি?
ব্রেকফাস্টের পর এককাপ করে চা খাওয়া হয়েছে, এখন আচমকা আবার কেন চা চাইছেন লালুবাবু কে জানে? এর আগে দাদুকে কোনওদিন এরকম দেখেনি জয়িতা। বলল, তোমার আজ কী হয়েছে গো?
কেন?
এইমাত্তর চা খেলে আবার এইমাত্তর চাচ্ছ ?
কিচ্ছু হয় নাই। চা খাইতে ইচ্ছা করতাছে।
ওয়াদুদ খান বললেন, তয় আনাই দেই।
তিনি ইন্টারকম তুলতে গেলেন, জয়িতা বাধা দিল। লাগবে না। পটে খানিকটা চা রয়েছে। দিচ্ছি।
কাপে চা ঢালল জয়িতা। কাপটা প্রায় ভরে গেল। দুধ-চিনি মেশাতে গেল, লালুবাবু বললেন, লাগবো না। লিকারই খাই।
কাপ নিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন লালুবাবু। আবার অন্যমনস্ক হলেন।
ওয়াদুদ খান বললেন, এত আগে বিক্রমপুর যাইতে চাইলেন ক্যা দাদা?
মনডা ছটফট করতাছে। যত আগে যামু ততো আগে দ্যাশটা দেখতে পামু, মাটিটা দেখতে পামু।
তা আমি বুজছি। তয় একবারে খাইয়া-দাইয়া বাইর হওনই ভালো। গণিদার বাড়িতে রাইতের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা আছে।
বুজছি বুজছি।
আর বেশিক্ষুণ না। একটার দিকে লাঞ্চ কইরা রওনা দিয়েন। আমি খোকনরে বইলা দিতাছি দেড়টা-দুইটার মইধ্যে য্যান আইসা পড়ে।
কোটের পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে খোকনের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন ওয়াদুদ খান। সেই ফাঁকে আবার অন্যমনস্ক হলেন লালুবাবু।
জয়িতা তীক্ষèচোখে তাকে দেখল এবং সিদ্ধান্ত নিল, ওয়াদুদ খান চলে যাওয়ার পরই দাদুকে সে ধরবে। তার মনে এখন সন্দেহটা বেশভালোভাবেই জেঁকে বসেছে, সকালবেলা তাকে না বলে কোথায় চলে গিয়েছিলেন দাদু? কী হয়েছে তাঁর? বারবার এরকম আনমনা হচ্ছেন কেন?
লালুবাবুর হাতে যে ঘড়িটা নেই এই প্রথম জয়িতা তা খেয়াল করল। হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, কী গো, তুমি সকালবেলা ঘড়ি পরে বেরোওনি?
লালুবাবু থতমত খেলেন। যাহ বাবা, ধরাটা তাহলে বুঝি পড়েই গেলেন। কী বলবেন ভাবছেন, তার আগেই মোবাইলে কথা বলা শেষ করে ওয়াদুদ খান বললেন, খোকন দেড়টার মইধ্যে আইসা পড়বো। তার আগে লাঞ্চ কইরা রেডি থাকবেন আপনেরা।
তুমি কি এখন চলে যাবে?
হ।
কোথায় যাইবা?
না তেমুন কোনও কাম নাই। ক্যান?
এমনি।
আসলে হইছে কী, আমি টেক্সটাইলের বিজনিস করি। ইসলামপুরে অফিস আছে, দোকান আছে। টেক্সটাইল মিলটা ঢাকার বাইরে। স্কুলের অনুষ্ঠানের লেইগা কোনওখানেই যাইতাছি না। ফাংশান শেষ কইরা তিন-চাইরদিন পর যামু। আমার স্বভাব হইল যখন যেইটা করি সেইটা লইয়াই ব্যস্ত থাকি। এককাম শেষ না কইরা অন্যকাম করতে পারি না।
তয় অহন আর যাইয়ো না। আমগ লগেই থাকো। এক লগে লাঞ্চ কইরা তুমি চইলা যাইয়ো এয়ারপোর্টে আর আমরা চইলা গেলাম বিক্রমপুরে।
হ, সেইটা মন্দ হয় না। আপনেগ লগে গল্প করলে সমায়টা ভালো কাটবো।
আসলে জয়িতার ভয়ে ওয়াদুদ খানকে ধরে রাখতে চাইছেন লালুবাবু। ঘড়ির প্রশ্নটা শোনার পরই তিনি বুঝে গেছেন তাঁকে নিয়ে জয়িতার মনে সন্দেহ ঢুকেছে। ওয়াদুদ খান চলে গেলেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে জয়িতা। কী ঘটেছে সব বের করে ছাড়বে। ঘটনা জানার পর গালাগাল করে নাস্তানাবুদ করবে তাঁকে। সেই অবস্থা থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য ওয়াদুদ খানকে যেতে দিতে যাইছেন না তিনি।
কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? কদিন? শেষ পর্যন্ত জয়িতাকে কেন, সবাইকেই হয়তো বলতে হবে ঘটনাটা। ততোক্ষণে কিংবা ততোদিনে ঝাঁঝটা কমে আসবে। যে কোনও ঘটনারই টাটকা এবং বাসি দুটো দিক আছে। ঘটনা বাসি হলে ওই নিয়ে আর তেমন মাথা ঘামায় না কেউ।
লালুবাবু চা শেষ করার আগেই আবার ঘড়ির প্রসঙ্গটা তুলল জয়িতা। কী হলো, কথার উত্তর দিচ্ছ না যে?
চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখলেন লালুবাবু। জয়িতার দিকে তাকালেন না, যেন তাকালেই ধরা পড়ে যাবেন। অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, কোন কথার?
ঘড়ি। ঘড়ি পরে বেরোওনি?
না।
কেন?
ভুলে গেছিলাম।
জামা জুতো সুয়েটার সব পরতে পারলে আর ভুলে গেলে কেবল ঘড়ির কথা?
ওয়াদুদ খান হাসিমুখে বললেন, বুড়া মাইনষের অনেক কিছু ভুল হয়। তুমি এইটা এত বড় কইরা ধরতাছো ক্যান?
ধরার কারণ আছে।
কী কারণ কও তো?
সন্দেহটা আর চেপে রাখতে পারল না জয়িতা। বলে ফেলল। আমার মনে হচ্ছে সকালবেলা কোথাও কিছু একটা ঘটেছে।
ওয়াদুদ খান চমকালেন, কী ঘটছে?
দাদু বোধহয় আমাদের কাছে কিছু লুকোচ্ছেন।
লালুবাবু অবাক হওয়ার ভান করলেন, কী লুকাইতাছি তর কাছে?
ভেবেছিলুম ওয়াদুদদা চলে যাওয়ার পর এই নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলব, পরে ভাবলুম ওয়াদুদদা তো আমাদেরই লোক, সব কথাই তাঁর সামনে বলা যায়।
তা তুই ঠিকই ভাবছস। আইচ্ছা ক।
তোমার ঘড়িটা আসলে কোথায়?
ওয়াদুদ খান হাসিমুখে বললেন, কইলো তো পরতে ভুইলা গেছে।
লালুবাবু কথা বলবার আগেই জয়িতা বলল, আমার মনে হচ্ছে কথাটা সত্য নয়। অন্য কোনও ঘটনা আছে।
কও কী?
হ্যাঁ, দাদু মিথ্যে বলছে।
লালুবাবু হাত তুলে কিছু একটা বলতে চাইলেন, তার আগেই জয়িতা বলল, আর মিথ্যে বলার চেষ্টা করো না দাদু। আমি তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। তোমার মুখ দেখেই আমি বুজদে পারছি তুমি মিথ্যে বলছ। পোশাক আশাকের ব্যাপারে তুমি খুবই সচেতন লোক। জুতো সুয়েটার সব পরেছ আর ঘড়ি পরতে ভুলে যাবে, এ হয় না। তাও বাংলাদেশে এসে, তাও বাইরে বেরুবার কালে! এ আমি বিশ্বাসই করছি না। নিশ্চয় ঘড়ি নিয়ে কিছু একটা হয়েছে। তুমি আমাদের কাছে লুকোচ্ছ। ফিরে আসার পর থেকেই আমি তোমাকে লক্ষ করছিলুম, তুমি থেকে থেকে আনমনা হচ্ছো? সত্যি করে বলো ঘড়িটা হারিয়েছ কী না!
ওয়াদুদ খানের চোখে তখন কী রকম সন্দেহ খেলা করছে। ভুরু কুঁচকে লালুবাবুর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ঘড়ি ছিনতাই হয় নাই তো দাদা? এত সকালে বাইর হইছেন, ছিনতাইকারীর পাল্লায় পড়েন নাই তো?
জয়িতা বলল, ছিনতাই ব্যাপারটা কী গো?
ওয়াদুদ খান হাসলেন। এই কথাটা বাংলাদেশে কোনও মানুষ যদি শোনে, তয় হাসতে হাসতে মইরা যাইবো।
কেন?
ছিনতাই জিনিসটা কী, ছিনতাই কারে কয় এইটা বাংলাদেশের দুধের পোলাপানেও জানে।
তার মানে খুবই পপুলার একটা ব্যাপার।
পপুলার ব্যাপার না, ভয় আতঙ্কের ব্যাপার।
আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন না দাদা।
ছিনতাই হইতাছে এক ধরনের ডাকাতি। ধরো তুমি কোনও রাস্তা দিয়া হাইটা যাইতাছো, নাইলে রিকশায় যাইতাছো, আঁথকা তিন-চাইরজন যুবক পোলাপান তোমার সামনে পিস্তল রিভলভার আর নাইলে ছুরি লইয়া খাড়াইলো।
ও মাগো! বুঝেছি, বুঝেছি। তারপর সর্বস্ব ছিনিয়ে নিল।
হ। ছিনাইয়া নেয় দেইখাই ছিনতাইকারী হইছে তাগো নাম।
ওসব সময়ে নিশ্চয় খুন খারাবিও হয়?
তাতো হয়ই। ছুরি মাইরা দেয়, গুল্লি কইরা মাইরা ফালায়।
সর্বনাশ!
গত কয়েক বচ্ছর ধইরা বাংলাদেশে এই হগল কাম বহুত বাইরা গেছে। দিনে দোফরে, সকালে বিকালে ঢাকার রাস্তাঘাটে এই হগল ঘটতাছেই।
পুলিশ কিছু করছে না?
কী আর করবো? মাঝে মাঝে ধরে দুই-চাইরডারে। আমরা তো হুনি পুলিশের লগে ছিনতাইকারী সন্ত্রাসী বেবাকতেরই লাইন ফাইন আছে। পুলিশ জানে সবই, চিনেও বেবাক ছিনতাইকারী সন্ত্রাসীগ।
বুঝেছি, বুঝেছি। মোম্বাইয়ের সিনেমার মতো। পুলিশ ওদের কাছ থেকে বখড়া খায়।
এসব কথা বলতে বলতে লালুবাবুর কথা যেন ভুলেই গিয়েছিল জয়িতা এবং ওয়াদুদ খান। এখন আবার তাঁর দিকে তাকাল দুজন মানুষ।
জয়িতা বলল, কী গো, ওরকম ছিনতাইকারীর খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব খোয়াওনি তো? ঘড়ি মানিব্যাগ সব ছিনিয়ে নেয়নি তো ওরা?
লালুবাবু পরিষ্কার গলায় বললেন, হ নিছে।
শুনে জয়িতার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল, ওয়াদুদ খান ভালো রকমের একটা ধাক্কা খেলেন। জয়িতা কথা বলবার আগেই তিনি বললেন, কন কী দাদা! সত্যই ছিনতাইকারীর পাল্লায় পড়ছিলেন?
হ, সত্যই পড়ছিলাম।
জয়িতা উদ্গ্রীব গলায় বলল, তোমার সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে?
সবকিছু আর কী! ঘড়িটা নিছে, ওয়াদুদ যে এক হাজার টাকা দিছিল সেইটা নিছে।
গায়ে হাতফাত তোলেনি তো?
না।
জয়িতা এগিয়ে এসে লালুবাবুর কাঁধে হাত রাখল, সত্যি করে বলো।
নাতনির মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে হাসিমুখে লালুবাবু বললেন, আরে না পাগল! গায়ে হাত তুলবো কেন? যা যা লগে আছিল দিয়া দিছি। জিনিস পাইলে বুড়া মাইনষের গায়ে হাত তোলবো ক্যান, ক?
ওয়াদুদ খান বললেন, অগ কোনও ঠিক নাই।
তয় আমার লগে খারাপ ব্যবহার করে নাই।
কামডা হইল কোন জাগায়?
জাগাটার নাম সেগুন বাগিচা। তয় পোলাপনগুলান শোনলাম ড্রাগ এডিক্টেড। রিকশাঅলা বলতাছিল।
জয়িতা তখন দাদুর বুকে মাথায় হাত বুলাচ্ছে। যেন ভয় পাওয়া শিশুকে আদর করে ভয় ভুলাচ্ছে। তুমি বুঝি ভয় পেয়েছ?
আরে না। আমি তো পয়লা বুজদেই পারি নাই। ওরা চইলা যাওনের পর নার্ভাস লাগছে।
ছিনতাইয়ের কথা শোনার পর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন ওয়াদুদ খান, উত্তেজিত হয়েছিলেন। এখন সেই উত্তেজনা কমেছে। লালুবাবুর মুখোমুখি বসলেন তিনি। সিগ্রেট খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু এয়ারটাইট রুমে সিগ্রেট খাওয়া ঠিক হবে না। রুম গন্ধে ভরে যাবে। তাছাড়া জয়িতা কিংবা লালুবাবু সিগ্রেট খাওয়া পছন্দ করেন কী না কে জানে! ঠিক আছে একটু পরে না হয় বাইরে গিয়ে খেয়ে আসবেন, এখন কীভাবে ছিনতাইকারীর পাল্লায় পড়লেন লালুবাবু সেই ঘটনা শোনা যাক। ঘটনাটা খুইলা কন তো দাদা, কেমতে কী হইল?
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন লালুবাবু। রিকশাঅলা চানমিয়ার কথা, রমনা থানার দারোগা বাকিবিল্লাহর কথা। সুটকো মতো ছিনতাইকারীগুলোর সঙ্গে পথচারীদের কথাও বললেন। শুনে ওয়াদুদ খান বললেন, এইভাবে একলা একলা বাইরে যাওন আপনের ঠিক হয় নাই।
তখন কী আর জানিরে দাদা ঢাকা শহরের এই অবস্থা!
শুধু ঢাকা শহরের না, পুরো দেশটারই এই দশা।
তা আমি বুজছি। একটা ভাতে টিপ দিলেই হাড়ির পুরা ভাতটার দশা বুঝা যায়। তয় ছিনতাইয়ের থিকাও আমার মনটা বেশি খারাপ হইছে ড্রাগের কথা শুইনা। ওই ছেলেগুলানের চেহারা দেইখা। ড্রাগ তো একটা জেনারেশানরে একদম ফিনিস কইরা দিছে।
হ দাদা, এইডা একদম ঠিক কথা কইছেন। রাস্তার ফকির ফাকরা রিকশাঅলা থিকা শুরু কইরা বড়লোকের পোলাপান তরি অনেকেই ড্রাগ খায়। আর ওই জিনিস একবার ধরলে ছাড়ন যায় না। ছাড়ন যায় না কথাটা ঠিক না, যায়, তয় বহুত কঠিন। বচ্ছর দুই আগে আমগ দ্যাশের বহুত নামকরা এক বড়লোকের মাজারো পোলাডা তো মইরাই গেল।
ড্রাগ এডিক্টেড আছিল?
হ। বহুত নামকরা ঘরের পোলা। কেমতে কেমতে ড্রাগ ধরছিল। শেষ পর্যন্ত মইরাই গেল।
তয় আরেকখান কথা শুইনাও মনডা খারাপ হইছে, ফেনসিডিল নামের একটা ড্রাগ বলে সবথিকা পপুলার। ওই জিনিস বলে ইন্ডিয়া থিকা আসে।
হ দাদা, কথাটা সত্য।
কিন্তু ইন্ডিয়ান সরকার এইডা বন্ধের চেষ্টা করতাছে না ক্যান?
ওইডা তাগো বিজনিস।
মানুষ ধ্বংস করা বিজনিস না করলে কী হয়?
ওয়াদুদ খান হাসলেন। সেই বিবেক পৃথিবীর কোনও বড় দেশেরই নাই দাদা। বিজনিসের লগে বিবেক মিলাইলে বিজনিস হয় না। দেখেন না নিজের অস্ত্র বেচনের লেইগা আমরিকা পৃথিবীর কোনও না কোনও দেশে যুদ্ধ লাগাইয়াই রাখে। আমগ স্বাধীনতা যুদ্ধের সমায়, একাত্তোর সালে পাকিস্তানি আর্মিরে অস্ত্র দিছে আমরিকা। সেই অস্ত্রে যে নিরীহ বাঙালি লাখ লাখ মারছে পাকিস্তানিরা, সেইটা কি আমরিকা জানতো না? জানতো। জাইনা শুইনাই দিছে। ওই যে কইলাম বিজনিস। ইন্ডিয়াও এখন ফেনসিডিলের বিজনিস করতাছে বাংলাদেশে। সেই ফেনসিডিল খাইয়া কে বাঁচল কে মরল হেইডা ইন্ডিয়া দেখবো ক্যান?
অনেকক্ষণ পর কথা বলল জয়িতা। কিন্তু ইন্ডিয়া জিনিসটা বানাচ্ছে ঠিকই, সেই দেশেও অল্পবয়েসি ছেলেপান রয়েছে, কই তারা তো ওই জিনিস খাচ্ছে না? তারা তো এডিক্টেড হচ্ছে না?
হ, এইটাই একটা কথা।
লালুবাবু বললেন, আমার মনে হয় কোথায় জানি একটা হতাশা কাজ করতাছে। এই জেনারেশানটারে বোধহয় কাজে লাগাইতে পারতাছে না দেশটা। যেইটা ইন্ডিয়া পারতাছে।
এসময় হঠাৎই উঠে দাঁড়ালেন ওয়াদুদ খান। আমি দাদা একটা সিগ্রেট খাইয়াসি।
কই থিকা?
এই তো লবিতে বইসা।
এখানেই খাও না।
না, এসি রুমে সিগ্রেট খাওয়া ঠিক হইব না।
আরে খাও খাও, আমরা আর কতক্ষুণ থাকুম।
না থাউক।
ওয়াদুদ খান বেরিয়ে গেলেন।
এবার দাদু আর নাতনি একা। লালুবাবু হাসিমুখে জয়িতার দিকে তাকালেন। অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হলো বুজলি।
জয়িতা গম্ভীর হলো। বুজলুম। কিন্তু তোমার যদি কোনও ক্ষতি হয়ে যেত?
কীসের ক্ষতি?
ওরা যদি তোমাকে ছুরিফুরি মেরে দিত, যদি গুলি করে দিত!তা যখন দেয়নি ওই নিয়ে আর ভেবে লাভ কী বল! তোর ব্যাগ-সুটকেস গুছিয়ে ফেল। খোকন এলেই বেরিয়ে পড়বো। ঢাকা শহরে থাকতে আর ভালোই লাগছে না। (চলবে)

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.