হাসান অরিন্দম

  • আবু ইসহাক : গ্রামীণ জীবনের রূপকার 

    আবু ইসহাক : গ্রামীণ জীবনের রূপকার 

    আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩) প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।  তিনি পাঁচ দশকের বেশি সময় সাহিত্যজগতে বিচরণ করলেও তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র আটটি। এ-লেখকের গ্রন্থসংখ্যা কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা। আবু ইসহাক যথেষ্ট লিখতে পারেননি বলে তাঁর মধ্যে ‘আক্ষেপ’১ ছিল। উপরন্তু জীবনের শেষ এক যুগেরও বেশি সময় তিনি প্রধানত অভিধান সংকলনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার কিছু বাস্তব কারণে তিনি কখনো হয়তো সাহিত্য রচনার উৎসাহ হারিয়েছিলেন, তার কিছু দিকও লেখক উল্লেখ করে গিয়েছেন একটি নিবন্ধে।২  ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পূর্বেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালের মে মাসে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে যোগ দিয়ে আবু ইসহাক তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন। সিভিল সাপ্লাই বিভাগে কর্মকালে আবু ইসহাক নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, ঢাকা ও কলকাতায় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তবে ওই পদে অধিকাংশ সময় তাঁর নারায়ণগঞ্জেই কাটে।৩ নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালেই তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন – তরুণ চোখে দেখা অভিজ্ঞতার নিবিড় রূপায়ণ চলে লেখার খাতায়। তখনো বাংলায় দুর্ভিক্ষের প্রভাব কাটেনি। সূর্য-দীঘল বাড়ীতে তিনি যে জয়গুন, হাসু, শফির মা, লালুর মাকে এঁকেছেন সেই শ্রেণির অন্ত্যজ মানুষকে তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেনে চলার পথে। ওই সময়ই আবু ইসহাক জয়গুনের মতো সংগ্রামী নারী ও তার সাথিদের দেখেছেন ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যেতে আবার থলিভরা চাল নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ফিরতে। ফতুল্লা, চাষাঢ়া প্রভৃতি স্টেশনে পৌঁছার আগেই চালের থলিগুলো দুপদাপ পড়তো রেলরাস্তার পাশে। আরো দেখেছেন নারায়ণগঞ্জ রেল ও স্টিমার স্টেশনে হাসুর মতো নম্বরবিহীন ক্ষুদে কুলিদের।৪ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন। ‘হামিদা কুটির’ নামক বাড়ির মেসে থাকাকালে সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রথম অর্ধেকটা রচিত হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আবু ইসহাক বদলি হন পাবনায়। পাবনা শহরে প্রথমে একটি মেসে উঠলেও সে-জায়গাটি লেখালেখির জন্য অনুকূল মনে হয়নি; তাই তিনি পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক পণ্ডিতের বাড়ি ‘সপ্ততীর্থকুটিরে’ ওঠেন মাসিক ৫০ টাকা ভাড়ায়। সে-বাড়ির অনুকূল নির্জন দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখার কাজ শেষ করেন।৫ অবশ্য উপন্যাস লেখার ফাঁকে নারায়ণগঞ্জ, কলকাতায় বসে তিনি একাধিক গল্প লেখেন। কিন্তু সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশের জন্য প্রায় সাত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ইতোমধ্যে আবু ইসহাক ১৯৪৯ সালে পুলিশ বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে ঢাকার তেজগাঁও থানায় যোগদান করেন।  কবি গোলাম মোস্তফার আগ্রহে সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসটি নওবাহার পত্রিকায় ১৯৫১-৫২ সালে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১৩৬২ বঙ্গাব্দ) এ-উপন্যাস কলকাতার নবযুগ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।৬ উপন্যাসটি প্রকাশের পর আবু ইসহাক বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে বিবেচিত হন। মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-৭১) বাংলাদেশের যে তিনটি উপন্যাসকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করতেন সূর্য-দীঘল বাড়ী সেগুলোর অন্যতম।৭  আবু ইসহাকের কাহিনি নিয়ে মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী নির্মাণ করেন সূর্য-দীঘল বাড়ী নামক চলচ্চিত্র। ছবিটির মুক্তিকাল ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৭৯। এটি ছিল সরকারি অনুদানে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। তবে প্রদর্শকদের অনীহার কারণে ছবিটিকে প্রথমে ঢাকায় মুক্তি দেওয়া যায়নি। ১৯৭৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নাটোরের গীত সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত হয়।৮ পরে ১৯৮০ সালে ঢাকার পাঁচ-ছয়টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন শুরু হয়। সিনেমাটি সাধারণ দর্শকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় ব্যবসাসফল হয়নি। তবে কাহিনি ও নির্মাণশৈলীগুণে চলচ্চিত্রটি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্মিত অন্যতম শিল্পসফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছবিটি বহু পুরস্কার লাভ করে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এ-চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে বলেন : ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী আমাদের চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র দাপটে প্রতিষ্ঠিত ন্যাকা, ছ্যাবলা ও নকলবাজে গিজগিজ করা বাড়িঘর কাঁপাবার জন্য প্রথম প্রকৃত আঘাত। … এই ছবি বাংলাদেশের গরিব ও শোষিত গ্রামবাসীর জীবনযাপনের একটি অন্তরঙ্গ পরিচয়।’৯  আবু ইসহাকের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল সমকালীন বাংলাভাষার অভিধান (স্বরবর্ণ অংশ) বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে। অভিধান প্রণয়নের জন্য তিনি ১৯৯৩-৯৪ সালে মানিক মিয়া গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। অভিধানটি রচনার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে তিনি এই কাজে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টাও ব্যয় করেছেন।  দুই আবু ইসহাক প্রকৃতপক্ষে নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্যিক নন। তিনি মূলত realism ধারার লেখক। এই ধারার একজন শিল্পস্রষ্টা বিশেষ জটিলতায় না গিয়ে বাস্তব মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতিকে স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে যেভাবে দেখেন, সেভাবেই তুলে আনেন। অন্যদিকে নন-রিয়েলিস্টিক শিল্প-সাহিত্যকে সমালোচকেরা বিকৃত আয়নায় দেখা পৃথিবী বলে মনে করেন।১০  অবশ্য শিল্প-সাহিত্যে বাস্তব জগতের অনুকৃতি হলেও সেখানে হুবহু অনুকরণ করা হয় না, বাস্তববিশ্ব লেখকের চেতনা ও শিল্পীসত্তা দ্বারা জারিত হলে তবেই শিল্পসৃষ্টি সম্ভব হয়। আবু ইসহাক যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস  সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশ করেন ততদিনে বিশ্বসাহিত্যে গল্প-উপন্যাসের শিল্পগত দিক ও অঙ্গপ্রকরণ নিয়ে বহুবিধ পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ সাধিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্রমুখ ঔপন্যাসিক ভাব, আঙ্গিক ও ভাষাশৈলীর দিক থেকে নানা দুঃসাহসী পথে অগ্রসর হয়েছেন। সে-সকল নিরীক্ষার পথ আবু ইসহাককে তেমন আকৃষ্ট করেনি। অবশ্য শুধু নতুন আঙ্গিক বা নিরীক্ষা-বৈশিষ্ট্য দ্বারা সাহিত্যের উৎকর্ষ বা আধুনিকতা বিচার করা সংগত নয়। উপরন্তু আবু ইসহাকের এই শিল্পপ্রয়াসকে ক্ষেত্রবিশেষে উত্তর-আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে যে-আধুনিকতা তাকে প্রত্যাখ্যান করে হয়তো কলকাতা থেকে বহুদূরে সন্ধ্যায় মনসামঙ্গল বা ইউসুফ জুলেখা পুথির ঘরোয়া আসর বসেছে খোলা উঠানে। ইংরেজ-সৃষ্ট নকশার সকল চাপ সহ্য করে দিন শেষে অদ্ভুত পুথির আনন্দে মেতেছে তারা। অন্য একটি পক্ষ বাঙালির হৃদয়কে আরোপিত আধুনিকতা থেকে রক্ষা করে সঞ্জীবিত রেখেছিলেন, এরাই বাংলার প্রথম উত্তর-আধুনিক। এক্ষেত্রে নর্দমার মধ্যে মাথা গোঁজা’ বা ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ অথবা নানাবিধ যৌনগন্ধী সংলাপ ওই আধুনিকতার অনেকটা ব্যর্থ অনুকরণ বলে উত্তর-আধুনিকগণ মনে করেন। তাঁদের বিচারে যে-সূত্রে গোবিন্দচন্দ্র দেব, যতীন্দ্রমোহন বাগাচী, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদকে ঈষৎ আধুনিক ভাবা হয়েছে, সেই সূত্রেই তাঁরা ‘উত্তর-আধুনিক’।১১ বাংলার গ্রামীণ ও লোকজীবন অংকনে সিদ্ধহস্ত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দুটি উপন্যাস মূল্যায়নেও ক্ষেত্রবিশেষে তাঁকে ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে মনে করা অবান্তর নয়।  আবু ইসহাক তাঁর তিনটি উপন্যাসেই কাহিনি উপস্থাপনের প্রথানুগ বৃত্তবদ্ধ রীতিটি গ্রহণ করেছেন। তিনি direct method ধরেই অগ্রসর হন, এ-পদ্ধতিতে লেখক সর্বজ্ঞ,…

  • জ্যোৎস্নাবিভ্রম

    জ্যোৎস্নাবিভ্রম

    শফিক মোটরবাইকটা সিঁড়িঘর থেকে বের করে উদ্বিগ্ন চিত্তে যখন গ্রিলে তালা দিচ্ছিল তখন আশপাশে কোথাও একটা রাতজাগা পাখির কাতর কণ্ঠ শোনা গেল। সে-সময় সে মনস্থ করে এবার বাসাটা বদলে শহরের ভেতর নিতে হবে। প্রায় এক বছর আগে এখানে যখন বাড়িভাড়া নেয় তখন একবারও ভাবেনি রাত-বিরাতে এমন বিপদ হানা দিতে পারে। সবচেয়ে ভালো হতো এই মুহূর্তে…

  • নির্জন হেমন্তে একজন

    নির্জন হেমন্তে একজন

    প্রায় চার মাস হলো কার্যকরী একটি শব্দও লিখতে পারিনি আমি। অন্তত আটাশ বছরের লেখক-জীবনে এমন নিষ্ফলা বিষণ্ন দিন আগে কখনো দেখতে হয়নি। ১২-১৪ বছর ধরে ল্যাপটপেই হয় সব লেখাজোখা। গত জুলাই থেকে এই বন্ধ্যত্ব রোগ – ল্যাপটপ নিয়ে বসলে একই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় প্রতিবার। লেখার জন্য পরিচিতজনদের তাগিদ আসে, তাদের জিজ্ঞাসার কোনো সদুত্তর…

  • কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়

    কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়

    ঘরের উত্তর দিকের রাস্তামুখী দরজাটা খুলে তিনি অনুভব করেন হেমন্ত এসে গিয়েছে। বাতাসে হিম ভাব, গাছের পাতায় শিশিরের মৃদু শব্দও শোনা যাচ্ছে। চারটে কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শান্তভাবে পৌরসভার ল্যাম্পপোস্টের নিচে শুয়ে আছে। ওদের মধ্যে একটা হলদে কুকুরের শরীরে কোনো লোম নেই, সম্ভবত বার্ধক্য। ভোর হতে আরো দু-ঘণ্টার বেশি সময় বাকি। আজকাল প্রায়ই রাত তিনটা কি…

  • অন্য ভুবন

    অন্য ভুবন

    লাল আর ময়ূরকণ্ঠী রং-মেশানো বিরল বৈশিষ্ট্যের মোরগটার প্রতি এই তিন-চারদিনে দুর্নিবার এক আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে রোহানের। অফিসে বা ঘরে যেখানেই থাক, তার মন পড়ে থাকে বাড়ির চিলেকোঠায় মোরগটার কাছে। এই প্রাণীটার সূত্র ধরেই তার জীবনে অভাবনীয় এক পরিবর্তন আসবে, বৃহস্পতিবার বিকেল  থেকে মনে এমন একটা স্বপ্ন ও বোধ অঙ্কুরিত হয়েছে। সন্ধের চা শেষ করে সে…

  • অতলান্তিক

    অতলান্তিক

    রুবিনার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে একান্ন বছর বয়সী শাফায়েত হোসেন অনেকটা জড়মূর্তির মতো বসে থাকেন। প্রায় দু-মিনিট সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি চায়ের কাপে ঠোঁট স্পর্শ করাবার পরিবর্তে বারান্দার বাইরে শেষ বিকেলের এক চিলতে উজ্জ্বল বর্ণময় আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবেন। ব্যাপারটা গুরুতর কিছু নয় অথচ হঠাৎ এমন কেন হলো! সম্ভবত মাঝে মাঝে হয়,…

  • ছায়ার সমান্তরাল

    ছায়ার সমান্তরাল

    নীলপাড় মেরুন শাড়ির কুঁচির দোলাচল আর একটি মিষ্টি নারীকণ্ঠ – এই দুইয়ের আবেদন উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না বলে কুয়াশার মতো ঘোলাটে মাথাব্যথা নিয়েও সাজিদ বাঁদিকে ঘুরে তাকায়। সে-সময় সে নিজেকে মৃদু তিরস্কার করে, কারণ সাজিদ জানে এই কাজটি তার স্বভাববিরুদ্ধ হয়েছে। পথ চলতে ঘাড় ঘুরিয়ে যেসব পুরুষ বুভুক্ষু চোখে মেয়েদের রূপ দেখে, তাদের সে…

  • এই যে আঁধার

    এই যে আঁধার

    পশ্চিম আকাশের লালিমা মিলিয়ে অচিন্ত্যপুরে অন্ধকার নেমেছে একটু আগেই। সেখানকার একটি বাড়ির উঠোনজুড়ে তখনো একজোড়া পথভুলো চামচিকা বিক্ষিপ্ত উড়ে বেড়াচ্ছে। উঠোনের এক কোণে ঘ্যাচর ঘ্যাচর শব্দ করে সবিতা টিউবওয়েল চেপে কাদামাটি-মাখা পা ধুতে-ধুতে বারান্দায় বইপত্র ছড়িয়ে বসে-থাকা আট বছরের বোনঝি ছটুকে বলে, ‘ইট্টু পড়ে নে মন দিয়ে তারপর ভাত দেব।’ আজকে হাঁটাহাঁটিটা বড্ড বেশি হওয়ায়…

  • নাসরীন জাহানের ছোটগল্পে মৃত্যুচিন্তা

    নাসরীন জাহানের ছোটগল্পে মৃত্যুচিন্তা

    আশির দশকের বাংলা ছোটগল্পে এক স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত নাম নাসরীন জাহান (জন্ম ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ)। কৈশোর থেকে তিনি বিশ্বসাহিত্য মন্থন করে তিলে তিলে নিজেকে প্রস্তুত করেন। তাঁর পাঠস্পৃহা, শ্রম-নিষ্ঠা এবং সহজাত বিরল সৃজনক্ষমতা অল্প বয়সেই তাঁকে এক বিস্ময়কর পরিপক্ব লেখকের মর্যাদা দিয়েছে। তাই রূপমের সম্পাদক আন্ওয়ার আহমদ কিশোরী নাসরীনের লেখা পড়ে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার পুরুষ গল্প অনেক…

  • বিমূর্ত চেতনায় রক্ত-আঙুল

    বিমূর্ত চেতনায় রক্ত-আঙুল

    হাসান অরিন্দম আমি জানতাম কোনো-না-কোনো দিন এমন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটবে। কয়েক দিন তীব্র জ্বরে ভোগায় অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়েছিল। শেষরাত থেকে ঘোর-ধরানো দুঃস্বপ্নের মতো জ্বরের সেই উত্তাপটা আর নেই। রুটি-ডিম ভাজি দিয়ে সকালে নাস্তা করার পর মাথাটা বেশ হালকা বোধ হওয়ায় ল্যাপটপ নিয়ে পুবের বারান্দায় বসি অফিসের পেন্ডিং কাজগুলো করব বলে। খানিক পর…

  • দগ্ধ চাঁদ ও অচেনা উপগ্রহের গল্প

    দগ্ধ চাঁদ ও অচেনা উপগ্রহের গল্প

    সাতাশ বছর বয়সী সুদর্শন ও চৌকস যুবক শাকিল রাইয়ান একটি ভালো স্পন্সর পেয়ে প্যারিসের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ৩০ মিনিটের শর্টফিল্মটা নিয়ে গিয়েছিলেন অনেকটা শখের বশেই। তার মানে এই নয়, ফিল্ম নিয়ে তার কোনো উচ্চাশা ছিল না। ভারতের এক ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে দু-বছরের একটি কোর্সও করা আছে। কিন্তু এই সামান্য জ্ঞান আর অভিজ্ঞতায় নির্মিত তার লাইট…

  • আমি আসছি ব্রহ্মময়ী

    আমি আসছি ব্রহ্মময়ী

    যন্ত্রণাকাতর স্ত্রীর পাশে শুয়ে গিরিশচন্দ্রও সারারাত ঘুমাতে পারেননি। রাত ত্রিপ্রহর থেকে অস্থির অপেক্ষায় ছিলেন কখন সূর্যের আভাস দেখা যায়। বাইরে কোনোরকমে আলো ফুটে উঠলে তিনি ধুতির ওপর পাতলা নীল ফতুয়া চাপিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন, বিলম্ব করার কোনো মানে নেই। দু-তিন মিনিট হাঁটতে হাঁটতে দিবালোক আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের আলোকোজ্জ্বল প্রভাতে চারিদিকে শালিক, চড়ুই, শ্যামা,…

  • মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন : নারী প্রসঙ্গ

    মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন : নারী প্রসঙ্গ

    মা হমুদুল হকের জীবন আমার বোন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস হলেও এর নায়ক-চরিত্র দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেকটা নিস্পৃহ, যুদ্ধকে সে এড়িয়ে চলতে চেয়েছে। মার্চের ১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতি উদ্বেগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে জাহেদুল কবির খোকা; কিন্তু নিজে চলেছে গা বাঁচিয়ে, ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানেও যায়নি। এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে টাকা…

  • ঘাসের নিচে মাটির ঘ্রাণ

    ঘাসের নিচে মাটির ঘ্রাণ

    পুরনো রংচটা একটা জিনসের প্যান্ট আর ছাই রঙের টি-শার্ট পরে বউয়ের চোখ ফাঁকি দিয়েই সেমিপাকা রান্নাঘরের খড়ির মাচার কাছ থেকে ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে উঠোন পেরিয়ে সন্তর্পণে পাটক্ষেতের ভেতর ঢুকে পড়ল সে। দৃশ্যটা প্রতিবেশী দু-একজনের চোখে পড়লেও পড়ে থাকতে পারে, তবে তা আমলে নেওয়ার মতো কিছু নয়। শ্রাবণ মাস এসে যাওয়ায় পাটগাছগুলো লকলকিয়ে দেড়-মানুষ সমান…

  • প্রেম ও পটভূমি

    প্রেম ও পটভূমি

    জীবনের বিভীষিকাময় রূপই দেখেছে, সেই সময়ের দিকে তাকালে এখনো সে ঘরজুড়ে দুরাত্মা প্রেতের ছায়া দেখতে পায়। বিষের ভেতর অমৃত যেটুকু ছিল তা গাঢ় ও বিস্তৃত অন্ধকারে পথ-হারানো নিঃসঙ্গ