হাসান অরিন্দম
-

আবু ইসহাক : গ্রামীণ জীবনের রূপকার
আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩) প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।তিনি পাঁচ দশকের বেশি সময় সাহিত্যজগতে বিচরণ করলেও তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র আটটি। এ-লেখকের গ্রন্থসংখ্যা কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা। আবু ইসহাক যথেষ্ট লিখতে পারেননি বলে তাঁর মধ্যে ‘আক্ষেপ’১ ছিল। উপরন্তু জীবনের শেষ এক যুগেরও বেশি সময় তিনি প্রধানত অভিধান সংকলনের কাজে…
-

জ্যোৎস্নাবিভ্রম
শফিক মোটরবাইকটা সিঁড়িঘর থেকে বের করে উদ্বিগ্ন চিত্তে যখন গ্রিলে তালা দিচ্ছিল তখন আশপাশে কোথাও একটা রাতজাগা পাখির কাতর কণ্ঠ শোনা গেল। সে-সময় সে মনস্থ করে এবার বাসাটা বদলে শহরের ভেতর নিতে হবে। প্রায় এক বছর আগে এখানে যখন বাড়িভাড়া নেয় তখন একবারও ভাবেনি রাত-বিরাতে এমন বিপদ হানা দিতে পারে। সবচেয়ে ভালো হতো এই মুহূর্তে…
-

নির্জন হেমন্তে একজন
প্রায় চার মাস হলো কার্যকরী একটি শব্দও লিখতে পারিনি আমি। অন্তত আটাশ বছরের লেখক-জীবনে এমন নিষ্ফলা বিষণ্ন দিন আগে কখনো দেখতে হয়নি। ১২-১৪ বছর ধরে ল্যাপটপেই হয় সব লেখাজোখা। গত জুলাই থেকে এই বন্ধ্যত্ব রোগ – ল্যাপটপ নিয়ে বসলে একই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় প্রতিবার। লেখার জন্য পরিচিতজনদের তাগিদ আসে, তাদের জিজ্ঞাসার কোনো সদুত্তর…
-

কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়
ঘরের উত্তর দিকের রাস্তামুখী দরজাটা খুলে তিনি অনুভব করেন হেমন্ত এসে গিয়েছে। বাতাসে হিম ভাব, গাছের পাতায় শিশিরের মৃদু শব্দও শোনা যাচ্ছে। চারটে কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শান্তভাবে পৌরসভার ল্যাম্পপোস্টের নিচে শুয়ে আছে। ওদের মধ্যে একটা হলদে কুকুরের শরীরে কোনো লোম নেই, সম্ভবত বার্ধক্য। ভোর হতে আরো দু-ঘণ্টার বেশি সময় বাকি। আজকাল প্রায়ই রাত তিনটা কি…
-

অন্য ভুবন
লাল আর ময়ূরকণ্ঠী রং-মেশানো বিরল বৈশিষ্ট্যের মোরগটার প্রতি এই তিন-চারদিনে দুর্নিবার এক আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে রোহানের। অফিসে বা ঘরে যেখানেই থাক, তার মন পড়ে থাকে বাড়ির চিলেকোঠায় মোরগটার কাছে। এই প্রাণীটার সূত্র ধরেই তার জীবনে অভাবনীয় এক পরিবর্তন আসবে, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে মনে এমন একটা স্বপ্ন ও বোধ অঙ্কুরিত হয়েছে। সন্ধের চা শেষ করে সে…
-

অতলান্তিক
রুবিনার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে একান্ন বছর বয়সী শাফায়েত হোসেন অনেকটা জড়মূর্তির মতো বসে থাকেন। প্রায় দু-মিনিট সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি চায়ের কাপে ঠোঁট স্পর্শ করাবার পরিবর্তে বারান্দার বাইরে শেষ বিকেলের এক চিলতে উজ্জ্বল বর্ণময় আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবেন। ব্যাপারটা গুরুতর কিছু নয় অথচ হঠাৎ এমন কেন হলো! সম্ভবত মাঝে মাঝে হয়,…
-

ছায়ার সমান্তরাল
নীলপাড় মেরুন শাড়ির কুঁচির দোলাচল আর একটি মিষ্টি নারীকণ্ঠ – এই দুইয়ের আবেদন উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না বলে কুয়াশার মতো ঘোলাটে মাথাব্যথা নিয়েও সাজিদ বাঁদিকে ঘুরে তাকায়। সে-সময় সে নিজেকে মৃদু তিরস্কার করে, কারণ সাজিদ জানে এই কাজটি তার স্বভাববিরুদ্ধ হয়েছে। পথ চলতে ঘাড় ঘুরিয়ে যেসব পুরুষ বুভুক্ষু চোখে মেয়েদের রূপ দেখে, তাদের সে…
-

এই যে আঁধার
পশ্চিম আকাশের লালিমা মিলিয়ে অচিন্ত্যপুরে অন্ধকার নেমেছে একটু আগেই। সেখানকার একটি বাড়ির উঠোনজুড়ে তখনো একজোড়া পথভুলো চামচিকা বিক্ষিপ্ত উড়ে বেড়াচ্ছে। উঠোনের এক কোণে ঘ্যাচর ঘ্যাচর শব্দ করে সবিতা টিউবওয়েল চেপে কাদামাটি-মাখা পা ধুতে-ধুতে বারান্দায় বইপত্র ছড়িয়ে বসে-থাকা আট বছরের বোনঝি ছটুকে বলে, ‘ইট্টু পড়ে নে মন দিয়ে তারপর ভাত দেব।’ আজকে হাঁটাহাঁটিটা বড্ড বেশি হওয়ায়…
-

নাসরীন জাহানের ছোটগল্পে মৃত্যুচিন্তা
আশির দশকের বাংলা ছোটগল্পে এক স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত নাম নাসরীন জাহান (জন্ম ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ)। কৈশোর থেকে তিনি বিশ্বসাহিত্য মন্থন করে তিলে তিলে নিজেকে প্রস্তুত করেন। তাঁর পাঠস্পৃহা, শ্রম-নিষ্ঠা এবং সহজাত বিরল সৃজনক্ষমতা অল্প বয়সেই তাঁকে এক বিস্ময়কর পরিপক্ব লেখকের মর্যাদা দিয়েছে। তাই রূপমের সম্পাদক আন্ওয়ার আহমদ কিশোরী নাসরীনের লেখা পড়ে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার পুরুষ গল্প অনেক…
-

বিমূর্ত চেতনায় রক্ত-আঙুল
হাসান অরিন্দম আমি জানতাম কোনো-না-কোনো দিন এমন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটবে। কয়েক দিন তীব্র জ্বরে ভোগায় অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়েছিল। শেষরাত থেকে ঘোর-ধরানো দুঃস্বপ্নের মতো জ্বরের সেই উত্তাপটা আর নেই। রুটি-ডিম ভাজি দিয়ে সকালে নাস্তা করার পর মাথাটা বেশ হালকা বোধ হওয়ায় ল্যাপটপ নিয়ে পুবের বারান্দায় বসি অফিসের পেন্ডিং কাজগুলো করব বলে। খানিক পর…
-

দগ্ধ চাঁদ ও অচেনা উপগ্রহের গল্প
সাতাশ বছর বয়সী সুদর্শন ও চৌকস যুবক শাকিল রাইয়ান একটি ভালো স্পন্সর পেয়ে প্যারিসের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ৩০ মিনিটের শর্টফিল্মটা নিয়ে গিয়েছিলেন অনেকটা শখের বশেই। তার মানে এই নয়, ফিল্ম নিয়ে তার কোনো উচ্চাশা ছিল না। ভারতের এক ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে দু-বছরের একটি কোর্সও করা আছে। কিন্তু এই সামান্য জ্ঞান আর অভিজ্ঞতায় নির্মিত তার লাইট…
-

আমি আসছি ব্রহ্মময়ী
যন্ত্রণাকাতর স্ত্রীর পাশে শুয়ে গিরিশচন্দ্রও সারারাত ঘুমাতে পারেননি। রাত ত্রিপ্রহর থেকে অস্থির অপেক্ষায় ছিলেন কখন সূর্যের আভাস দেখা যায়। বাইরে কোনোরকমে আলো ফুটে উঠলে তিনি ধুতির ওপর পাতলা নীল ফতুয়া চাপিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন, বিলম্ব করার কোনো মানে নেই। দু-তিন মিনিট হাঁটতে হাঁটতে দিবালোক আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের আলোকোজ্জ্বল প্রভাতে চারিদিকে শালিক, চড়ুই, শ্যামা,…
