আদনান জিল্লুর মোরশেদ
-

চারুকলা ভবন : বৈশ্বিক বাঙালির আত্মানুসন্ধানের রাজনীতি
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় মাজহারুল ইসলাম (১৯২৩-২০১২) স্থপতি হিসেবে তাঁর জীবন কিভাবে শুরু করেছিলেন? কী ছিল তাঁর জীবনদর্শন? স্থাপত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে তিনি কী ভাবতেন? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ মাজহারুল ইসলাম এমন একসময়ে আমেরিকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসেছিলেন, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি এবং ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলন তুঙ্গে। সেই পটভূমিতে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যচেতনা আর রাজনৈতিক দর্শনের সংযোগ কি ঘটেছিল? আর যদি ঘটেই থাকে, সেটা কিভাবে, তা জানা জরুরি। ১৯৫২ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগন, ইউজিন, থেকে মাজহারুল ইসলাম স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর বয়স তখন ঊনত্রিশ। এর আগে ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ শিবপুর থেকে পুরকৌশলে পড়াশোনা শেষ করেন। ইউজিন পর্ব সমাপ্ত করে তিনি বেশ কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরে বেড়ান – বিশাল দেশটাকে যেন বোঝার চেষ্টা করেন নবীন স্থপতির দৃষ্টিকোণ থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে মাজহারুল ইসলাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিল্ডিংস, কমিউনিকেশন্স, অ্যান্ড ইরিগেশন (সিবিআই) বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সরকারি বিভাগে তখনো স্থপতির পদ সৃষ্টি হয়নি। দেশে স্থাপত্যশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। মাজহারুল ইসলামই একমাত্র স্থানীয় স্থপতি, তাও আবার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের নির্মাণশিল্প ছিল আমলাতান্ত্রিক এবং তার নিয়ন্ত্রণকারী ছিল সিবিআই-এর সার্ভেয়ার, ড্রাফটসম্যান ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। তাঁদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন কলকাতা আর বোম্বের (মুম্বাইয়ের) কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। ১৯৪৮ সালে, দুজন ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড হিক্স (Edward Hicks) এবং রোনাল্ড ম্যাককোনেল (Ronald McConell) সিবিআই-এ স্থপতি হিসেবে যোগ দেন। এই দুজন ঢাকার নগর পরিকল্পনা প্রণয়নসহ বেশ কয়েকটি বড় স্থাপনার কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের চিন্তাভাবনা এবং কাজের ধারা, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্থাপত্যশিক্ষায় উদ্দীপিত মাজহারুল ইসলামকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। কাজে যোগদানের পর (১৯৫৩-৫৬) স্থপতি ম্যাককোনেল মাজহারুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন শাহবাগে গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ একটি জমিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চারুকলা শিক্ষাভবন অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমানে ফ্যাকাল্টি অফ ফাইন আর্টস) ডিজাইন করার জন্য। দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক স্থাপত্যের উৎস নিয়ে যতদূর গবেষণা হয়েছে সেখানে সাধারণত চারুকলা ভবনকে চিহ্নিত করা হয় এদেশে নান্দনিক আধুনিকতার সূচনাকারী হিসেবে। কিন্তু এই ভবনটির বিমূর্ত আধুনিকতার সঙ্গে দেশভাগ-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ওতপ্রোত সম্পর্ক ছিল – সেটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। অর্থাৎ, পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাজহারুল ইসলামের নান্দনিক আধুনিকতার অর্থ কী ছিল? সেই আধুনিকতার উৎসটাই বা কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যেতে পারে চারুকলা ভবন বিন্যাসের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মধ্যে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আধুনিক স্থাপত্যজগৎ কেমন ছিল তা খোঁজ করলে জানা যায় যে, মাজহারুল ইসলাম যখন ১৯৫৩ সালে চারুকলা ভবন ডিজাইন করা শুরু করেন, তখনো ফরাসি-সুইস স্থপতি ল্য কর্বুসিয়ের (Ronald McConell)-এর বিখ্যাত রনসাম্প চ্যাপেল (Ronchamp Chapel) তৈরি হয়নি। ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট (Frank Lloyd Wright, 1867-1959)-এর গুগেনহাইম মিউজিয়াম…
