আশরাফ উদ্দীন আহমদ

  • গোলামালির রস-কিচ্ছা 

    গোলামালির রস-কিচ্ছা 

    আশ্বিনের অপেক্ষা শেষে কার্তিক পড়তেই মন চনমনিয়ে ওঠে। মনের মধ্যে দোলা লাগে। সে-দোলায় বাকবাকুম-বাকবাকুম ডাকটা বেশ টের পায় গোলামালি। কার্তিক-অঘ্রানে হালকা শীত-শীত একটা আমেজ শরীর-মনকে ঠান্ডা রাখে। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুনে তো শীতের জেরবারে কাহিল দশা। ঋতুর এই চড়কানাচন বড় বিচিত্র। লোকমানপুরের আকাশে ভাতের মাড়ের মতো মেঘ লেপ্টে থাকে। গোলামালি হলদিগাছি-চারঘাট-আড়ানী-পিরিজপুর-নন্দনগাছির দিকের প্রায় সব খেজুরগাছের গাছি। তার সাগরেদ আছে দশ-বারোজন। দিন দিন তারাও পাকা শিউলী বা গাছি হয়ে উঠেছে। ওস্তাদকে মান্যও করে বটে তারা। কর্মঠ-ক্লান্তিহীন গোলামালির মতো তারাও পরিশ্রমী।  এবার কার্তিক পড়তেই শীত বেশ জাপটে বসেছে, শীতের কামড় বাঘের দাঁতের চেয়েও মারাত্মক মনে হয়। দুপুরের পরপর শরীরটাকে আর বিছানায় গড়ান না দিয়ে বাপেকার মাডগার্ডহীন ভাঙা সাইকেল নিয়ে বের হতে হয় গোলামালিকে।  অনেক-অনেক দূরে যেতে তার এতটুকু ক্লান্তি লাগে না। সাইকেলের দুই হ্যান্ডেলে এবং পেছনের ক্যারিয়ারে পেল্লাই সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। সঙ্গে দু-চার রকমের হেঁসো, সান দেওয়ার পাতলা পাথর, কোমরে হেঁসো রাখার চোঙা। একগাছা পাকানো দড়াগাছা, লোহার সরু চোঙা, আরো নানা খুঁটিনাটি সরঞ্জাম, একজন পাকা শিউলীর যা লাগে। সাগরেদরাও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যায়, রসের যত জোগান, গুড়ের তত বাড়বাড়ন্ত। গুড়  বেশি-বেশি মানে হলো ব্যবসার উন্নতি। বাতাসে যখন গুড়ের সুঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে মাতামাতি করতে থাকে, তখন গোলামালির মনটাও কেমন আইঢাই করে ওঠে। রসের জ্বাল যত সুনিপুণ হয়, মনটা তখন হারিয়ে যায় কোথায়। ফাল্গুন মাসের একটা হালকা ছোঁয়া এভাবে তাকে উচাটন করে কেন বোঝে না কিছুই সে। পড়ন্ত রেশমি বিকেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোলামালি ভাবে, এবার আরেকটা বিয়ে করবে। ভাবনাটা দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। বিয়ে মানে আরেকটা বিয়ে, আরেকটা বউ। নতুন বউ ঘরে এলে তার ভাগ্যের সঙ্গে বউয়ের ভাগ্য এক হলে ব্যবসার উন্নতি হবে। নতুন-পুরনো দুজনে একসঙ্গে কাজ করলে মন্দ কি! আগেরটা পরিশ্রমী। নতুনটাও তার দেখাদেখি পরিশ্রমী হয়ে উঠতে কদিন আর লাগবে। অতএব বিয়ে তাকে করতেই হবে। সেদিন কথাটা জরিনাকে বলতেই গোখরা সাপের মতো ফণা তোলে। চোখে বিষ থাকলে হবে কী, কাজ তো হয় না। গোলামালি আলগোছে নিজেকে সংবরণ করে।  মনে-মনে বলে, যে সাপের বিষ নেই, তার আবার কুলোপনা … অমন সাপের ছোবল কত সে খেয়েছে জন্ম থেকে। কী হয়েছে? মরেনি আজো। কেন মরবে? ইচ্ছা করলেই কি মানুষ মরতে পারে? মরা তো কারো হাতের মোয়া নয় যে, মরতে ইচ্ছা হলো আর মরে গেলাম। ওপরওয়ালার মর্জি না হলে কেউ মরতে পারে না। সবই তার কারসাজি, দাবা খেলার আসল রহস্য তো তার নিজের হাতে। সে যা করে, তাই হয়। ফাল্গুন মাস এলেই মনটা কেমন উড়ুউড়ু করতে থাকে। কী যেন চাই, কী চাই, তা সে নিজেই জানে না। জরিনার মধ্যে আর সেরকম স্বাদ নেই, দিন দিন কেমন পানসে-পানসে একঘেয়ে লাগে সবসময়। তারপরও মুখ ফুটে তো কিছুই বলা যায় না। বিষ খেয়ে বিষ হজম আর কি! টাকা-পয়সা যতই আসুক না কেন, মনে তৃপ্তি বা শান্তি না হলে তো জীবন বিষণ্ন-বিপন্ন হবেই। জীবনে সখ-সাধ বলে তো একটি বিষয় আছে, জীবন মানে তো শুধু টাকা রোজগার করা নয়, একটু সুখ, একটু আনন্দ, বাকিটা হয়তো গল্পের। সে-সুখ তো জরিনা দিতে পারে না। আগের মতো আর নেই সেই মজা-আনন্দ। লোকমানপুরের স্টেশনের কাছাকাছি এসে পশ্চিমের ঘন সবুজের দিকে একবার তাকিয়ে মন হারিয়ে যায়। একদিন এখানে কত ট্রেন থামতো, আজ সবই পুরনো গল্পকেচ্ছা, মানে ইতিহাস। নামমাত্র স্টেশন, কাঠামো ভেঙে-ভেঙে একশেষ অবস্থা। প্ল্যাটফর্ম-চাতাল সবই ইট বের হওয়া ঘেয়ো নেড়ি কুকুরের দশা। বাদুর-কাকের বাসা, আরো কত কী রয়েছে তার ফিরিস্তি দিতে গেলে বিশাল ফর্দ করতে হবে। রাজ্যের বেজি-শেয়াল আর সব সাপখোপের আস্তানা। কোনো ট্র্রেন আর থামে না। মানুষ যতই এগিয়ে যাচ্ছে সময়ও যেন কেমন ছোট হয়ে আসছে। এপাশে আড়ানী ওপাশে আবদুলপুর, মাঝে লোকমানপুর। কেন থামবে আর আন্তঃনগর, মেইল-কমিউটার ট্রেন। লোকাল ছোটখাটো মাঝারি ট্রেন কি থামে দু-একটা! গোলামালি অনেক চেষ্টা করে দেখার, নিশ্চয়ই কোনো সাক্ষী থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু না, অন্বেষণ করেও কোনো লাভ হয় না। বুকের মধ্যে কেমন একটা হ্যাচড়প্যাচড় শুরু হয় একসময়। বাপজানের মুখে শুনেছে এককালে দূর-দূর শহরের ক্রেতা-বিক্রেতা, ফরিয়া-পাইকাররা শুধু খেজুর গুড়ের বায়না করতে ভাদ্র-আশ্বিন থেকে কার্তিক-অঘ্রান মাস অবধি আসতেই থাকতো লোকমানপুরে। সে-সময় শত-শত গেরস্তবাড়ির গুড়ের জ¦ালে মোহিত হতো আকাশ-বাতাস। সেই সুঘ্রাণে দূর-দূর অঞ্চলের মানুষ কী এক শিহরণে-উত্তেজনায় ছুটে আসতো এই হদ্দগাঁয়ে। অথচ আজ সেই স্টেশনটাই হারিয়ে যেতে বসেছে, কোনোদিন বা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে ওর সর্বশেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু। তখন কেউ জানবে না,…