কার্ল ওভে ক্লাউসগর
-

পিতৃত্ব
অনুবাদ : আলম খোরশেদ তৃতীয় কিস্তি স্টকহোমে একবার এক পার্টিতে গিয়েছিলাম আমি, সেখানে একজন বক্সার উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিচেনে বসেছিলেন, তার শারীরিক উপস্থিতি দেখার মতো ছিল, এবং তিনি আমাকে এক সুনিশ্চিত কিন্তু নিরানন্দ হীনম্মন্যতাবোধে ভরিয়ে তুলছিলেন। এমন একটা অনুভূতি যে, আমি তার চাইতে অধমর্ণ। অদ্ভুতভাবে সেই সন্ধ্যাটা আমি যে সঠিক, সেটাই প্রমাণ করেছিল। পার্টির আহ্বায়ক ছিল লিন্দার এক বন্ধু, কোরা, তার ফ্ল্যাটটা ছোট ছিল, ফলে লোকেরা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। লিভিংরুমে একটা যন্ত্র থেকে গান ভেসে আসছিল। বাইরে রাস্তাগুলো তুষারে সাদা হয়ে আছে। লিন্দা খুব ভারিক্কিরকম অন্তঃসত্ত্বা, সেটাই সম্ভবত বাচ্চা হওয়ার আগে আমাদের শেষ কোনো পার্টি ছিল, বাচ্চা হওয়ার পর সব পালটে গিয়েছিল, তাই সে ক্লান্ত থাকলেও সেখানে যেতে ও কিছুক্ষণ সময় কাটাতে চেষ্টা করেছিল। আমি একটু ওয়াইন খেয়ে টমাসের সঙ্গে গল্প করছিলাম, যে ছিল আলোকচিত্রী ও গাইয়েরের বন্ধু; সে তার পার্টনার ম্যারির মাধ্যমে কোরাকে চিনত, যে কি না একজন কবি এবং বিশপস আর্নো ফোক স্কুলে কোরার শিক্ষক ছিল। লিন্দার ভারি পেটের জন্য সে টেবিল থেকে ছুটিয়ে আনা একটা চেয়ারে বসে ছিল, সে হাসছিল ও খুশি দেখাচ্ছিল তাকে, এবং আমিই বোধহয় একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম, যে লক্ষ করেছে গত কয়েকমাসে তার মধ্যে এক চাপা দীপ্তি ও অন্তর্মুখিতার ছোঁয়া লেগেছে। কিছুক্ষণ পরে সে উঠে দাঁড়ায় ও বাইরে যায়, আমি তার দিকে চেয়ে হাসি এবং আমার মনোযোগ ফেরাই টমাসের দিকে, সে লালচুলো লোকদের জিন বিষয়ে কিছু একটা বলছিল, যাদের সংখ্যা সেই সন্ধ্যায় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ একজন দরজা ধাক্কাচ্ছিল। ‘কোরা!’ আমি শুনি। ‘কোরা!’ সেটা কি লিন্দা ছিল? আমি উঠি এবং হলরুমের দিকে যাই। দরজা ধাক্কানোর শব্দটা বাথরুমের ভেতর থেকে আসছিল। ‘লিন্দা?’ আমি জিজ্ঞেস করি। ‘হ্যাঁ,’ সে বলে। ‘আমার মনে হয় দরজার তালাটা আটকে গেছে। তুমি কি কোরাকে ডাকতে পারো? এটা খোলার নিশ্চয়ই কোনো কৌশল রয়েছে।’ আমি লিভিংরুমে গিয়ে কোরার কাঁধে টোকা দিই। সে এক হাতে একটা খাবারভর্তি প্লেট ও অন্য হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস ধরে রেখেছিল। ‘লিন্দা বাথরুমে আটকে গেছে,’ আমি বলি। ‘হায় হায়!’ সে বলে, তারপর গ্লাস ও প্লেটখানি নামিয়ে রেখে দৌড়ে যায়। তারা কিছুক্ষণ আটকে যাওয়া দরজার মধ্য দিয়ে আলাপ-পরামর্শ করে। তাকে যে-নির্দেশগুলো দেওয়া হয় লিন্দা তা অনুসরণ করে, তবে তাতে কোনো কাজ হয় না, দরজাটা আটকেই থাকে। এতক্ষণে ফ্ল্যাটের সবাই এ-পরিস্থিতি বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে, তাদের মনোভাব একাধারে হাসির ও উত্তেজনার, পুরো এক বাহিনী লোক হলরুমে থেকে লিন্দাকে উপদেশ দেয়, আর কোরা উদ্বিগ্ন ও বিব্রতভাবে বলতে থাকে যে, লিন্দা ভীষণরকম অন্তঃসত্ত্বা, আমাদের এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একজন তালার মিস্ত্রিকে ফোন করার। আমরা যখন তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লিন্দার সঙ্গে কথা বলি, বিব্রতকরভাবে সচেতন যে, সবাই আমার কথা শুনতে পাচ্ছে এবং আমার অসহায়তাকে অনুভব করছে। আমি কি স্রেফ লাথি মেরে দরজাটা ভেঙে তাকে বের করে আনতে পারি না? সহজ ও কার্যকর সমাধান?…
