নূরুর রহমান খান
-
গদ্যশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলী
বিংশ শতাব্দীর পঞ্চম দশকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে সৈয়দ মুজতবা আলীর (১৯০৪-১৯৭৪) আবির্ভাব অনেকটা আকসি¥কভাবেই। দেশে-বিদেশে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মুজতবা আলী পাঠকচিত্ত জয় করলেন এবং শেষদিন পর্যন্ত তাঁর খ্যাতি ছিল অম্লান। আন্তর্জাতিক চেতনায় সমৃদ্ধ এই লেখকের বিশ্বমানবিকতা এবং অননুকরণীয় অনন্য শৈলীতে তাঁর স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে মজলিশি বা আড্ডা-রসের একটি ধারার ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু খোশগল্প তাঁর রচনায় শিল্পসুষমামণ্ডিত হয়ে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত। এবং তাঁর কৃতিত্বের মূলেও রয়েছে মজলিশি রস ও তার বাহন বাক্নৈপুণ্য। বাংলা গদ্যের প্রাথমিক যুগের প্রবল দুটি ধারা – সাধু ও চলিত। চলিত বা কথ্যভাষা আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একটি খাতে হুতোম-দ্বিজেন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ ও তাঁদের অনুসারীদের চলার পথ-নির্দেশিত, অপর সরণিতে রবীন্দ্রনাথ-প্রমথ চৌধুরী-অবনীন্দ্রনাথ ও তাঁদের অনুগামীদের সাবলীল স্বচ্ছন্দ পদচারণ। উভয় সরণির সঙ্গমস্থলে পরবর্তী মাইলস্টোন সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি যে-নৈপুণ্যের সঙ্গে বিদেশী চরিত্র ও আবহ বাংলা সাহিত্যে এনেছেন, তা তুলনারহিত। বাকপ্রতিমায় ব্যবহৃত ধ্বনিসমষ্টিই তাঁর অনন্যতার স্বাক্ষর। সাবলীল বাকভঙ্গিমা ও বিচিত্রশব্দভুবনের বদৌলতে বাংলা গদ্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান অবিসংবাদিত। মুজতবা নাগরিক-জীবনের প্রতিভূ ও রূপকার। তাঁর শব্দের ভুবন নগরচেতনায় প্রদীপ্ত – রচনায় প্রতিফলিত নাগরিক-জীবনের ফেনিল উল্লাস, কখনো কিঞ্চিৎ নোনাজালে সিক্ত। বাংলা গদ্যের বহমান ধারায় মুজতবা আলীর অবদান-নিরূপণে সর্বাগ্রে বিবেচ্য তাঁর রচনারীতি, তাঁর স্টাইল। ভাবের আশ্রয় ভাষা, যার উপাদান শব্দ। প্রকাশিত ভাবনায় সুচয়িত শব্দাবলির যথাযথ প্রয়োগ ও বাক্ভঙ্গিমায় স্টাইলের অনেকাংশ নির্ভরশীল। বিষয়বস্তুকে আশ্রয় করে আপন গতিপথে ধাবমান ভাষায় স্টাইল বা রচনারীতির বৈশিষ্ট্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ফুটে ওঠে। স্টাইলে শিল্পীর স্পর্শে কখনো স্বয়ং প্রকাশ, কখনো বা তার জন্যে প্রয়োজন নৈষ্ঠিক মনন ও কর্ষণ। স্টাইলের বিবিধ গুণাবলির মধ্যে বৈচিত্র্যের সঙ্গে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতা, নাগরিক বৈদগ্ধ্যের সঙ্গে অত্যাবশ্যক সরসতা তথা প্রসাদগুণ, – সহাস্য-রসিকতা এরই অন্তর্ভূত। সার্থক সৃষ্টিতে শুধু রূপকার একা নন, সমগ্র জাতির রূপ প্রতিফলিত এবং সাহিত্যের বাহন ‘গদ্য’ সম্পর্কে এ-বক্তব্য সর্বাধিক প্রযোজ্য। এ-গদ্য আমাদের প্রতিমুহূর্তের অনুধ্যানের বাহন, কর্মপ্রবাহের মাধ্যম – জীবনচেতনার নিত্য অনুষঙ্গী। বাংলা গদ্যস্রোতে সম্মিলিত অন্যতম ব্যক্তিত্ব মুজতবা আলীর ধারাটির স্বাতন্ত্র্য ও অনন্যতার যথাসম্ভব নিরপেক্ষ স্থান-নির্দেশনার প্রয়োজনে বাংলা গদ্যধারার অনুসরণ অত্যাবশ্যক। দুই পুস্তকাশ্রয়ী বাংলা গদ্য একান্তভাবেই আধুনিককালের নিদর্শন। প্রতিদিনের ব্যবহার্য মুখের বুলি নিশ্চয়ই প্রাগৈতিহাসিক এবং তার রূপ যে ঘরোয়া গদ্য, এ-নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আমরা পুস্তকধৃত গদ্যের শরণে মুজতবার কৃতি-কৃতিত্বের মূল্যায়নপ্রয়াসী। পোশাকিভাষা মাত্রই – তা সে গ্রন্থেরই হোক, কিংবা মৌখিকই হোক – ন্যূনাধিক কৃত্রিম হতে বাধ্য। পরিশীলিত মনের অনুশীলনের ফসল আজকের দিনের ললিত-মধুর শ্রুতিসুখকর কথ্য বাংলা গদ্য। বাংলা গদ্যের প্রধান দুটো ধারা – সাধু ও চলিত – প্রথমাবধিই পুস্তকে স্থান পেয়েছে। যদিও প্রাপ্য আসনটির জন্যে চলিত বাংলাকে প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই অতিক্রমণ করতে হয়েছে – রীতিমতো সংগ্রাম করে চলার পথটিকে করেছে মসৃণ। চলিত গদ্যের মূল শক্তি নিহিত আঞ্চলিক শব্দে, লৌকিক প্রবাদ-প্রবচনে, নিত্যব্যবহার্য সুভাষীতে তথা মৌখিক বুলিতে। গ্রন্থিত গদ্য প্রথমাবধিই লোকভাষাকে আশ্রয় করে আত্মপ্রকাশে প্রয়াসী ছিল। কিন্তু একটি কৃত্রিম দুরতিক্রম্য বাধায় বারবার তার গতি হয়েছে শ্লথ। পণ্ডিতদের অতি সতর্কতা সাধু ও চলিতের ভেদরেখাকে করেছে অধিক দুর্লঙ্ঘ্য। ঊনবিংশ শতাব্দ ও বিংশ শতাব্দের চতুর্থ দশক পর্যন্ত সময়সীমাকে বাংলা গদ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাল বলা যায়। প্রত্যেক সৃজনশীল লেখকই নানাভাবে ভেঙেচুরে ভাষাকে নির্মাণ করতে চেয়েছেন, বিষয়ানুগ বাস্তবতা দান করে ভাষাকে করেছেন যুগোপযোগী – কার্যক্ষম ও গতিশীল। আপন প্রচেষ্টায় নিজেদের অতিক্রমণের প্রচেষ্টাও দুর্লক্ষ্য নয়। সাধু ও চলিত – কূলপ্লাবী দুটি সমান্তরাল ধারাই প্রচুর পলিমাটির যোগান দিয়ে বাংলা গদ্যের উভয়কূলকে করেছে সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। চলিষ্ণু ভাষামাত্রই পরিবর্তনশীল ও বৈচিত্র্যানুসন্ধানী। সমাজ, জীবন ও ভাষা অচ্ছেদ্য বন্ধনে অনুস্যূত বলেই সমাজ-পরিবর্তনে ভাষার বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। জীবন-চেতনার ধারাবদলেও ভাষার রকমফের অপ্রতিরোধ্য। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমান হরফে মুদ্রিত মানোএল-দা আস্সুম্সাম-বিরচিত কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ-এ পূর্ববঙ্গের কথ্যরীতি সুস্পষ্ট। সেইসঙ্গে ব্যবহৃত ফারসি ও সংস্কৃত শব্দ সুসংবদ্ধ। এ-ভাষাকেই প্রাকৃত বাংলা হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত বাঙালির প্রথম গ্রন্থটিও সমকালীন কথ্য বাংলার অকৃত্রিম নিদর্শন। পুস্তকটি রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১), গ্রন্থকার রামরাম বসু। তাঁকে বাংলা গদ্য নির্মাণ করতে হয়েছে এবং এ-দুরূহ কর্মে তিনি বাস্তবজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। গদ্য দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বাহক – এ-সত্য তিনি প্রথমাবধিই স্বীকার করেছিলেন। ফলে তাঁর সৃষ্ট ভাষা মৌখিক বুলির অনুগামী। বিষয়ানুরোধে ফারসিতে ওয়াকিবহাল মুনশির লেখা স্বভাবতই ফারসিবহুল। তবে সে-সমস্ত ফারসি শব্দ তখন লোকমুখে প্রচলিত। উইলিয়াম কেরির তত্ত্বাবধানে লিখিত ও তাঁর নামে প্রকাশিত কথোপকথন-এ (১৮০১) বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণির লোকের মুখের ভাষা হুবহু ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ভাষায় তৎসম শব্দের প্রাধান্য ছিল অবশ্যম্ভাবী এবং বাংলা গদ্যে তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রধানত তাঁর হাতেই গদ্য বিদগ্ধ ও নাগরিক হয়ে ওঠে। এ-সময় থেকেই বাংলা গদ্য মুখের বুলি থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে কৃত্রিম শিষ্ট ভাষারূপে পুস্তকে আশ্রয় ও পণ্ডিতজনের প্রশ্রয় লাভ করে। এভাবে আধুনিক গদ্যের জন্মলগ্ন থেকেই তা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে সাধু ও চলিত নামে দুটি ধারার সৃষ্টি করে। সাধুপন্থিরা তখন থেকেই পরিমার্জনার নামে বহুল প্রচলিত বহিরাগত ও লোকজ শব্দসমূহ ভাষা থেকে বিতাড়নের পালা শুরু করেন। তবে বিদ্যালঙ্কারের লেখনী ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতদের মধ্যে ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী এবং তাঁর ভাষাও প্রসাদগুণসম্পন্ন। তদুপরি বিষয়ানুযায়ী ভাষাপ্রয়োগে তিনি যে বিমুখ ছিলেন না তার প্রমাণ তাঁর রচনায় আছে। মোটামুটিভাবে নির্দেশ করা যায় যে, পরবর্তীকালের বাংলা গদ্যের ত্রিবেণী – সাধারণ জনের মৌখিক বুলি,…
