বিংশ শতাব্দীর পঞ্চম দশকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে সৈয়দ মুজতবা আলীর (১৯০৪-১৯৭৪) আবির্ভাব অনেকটা আকসি¥কভাবেই। দেশে-বিদেশে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মুজতবা আলী পাঠকচিত্ত জয় করলেন এবং শেষদিন পর্যন্ত তাঁর খ্যাতি ছিল অম্লান।
আন্তর্জাতিক চেতনায় সমৃদ্ধ এই লেখকের বিশ্বমানবিকতা এবং অননুকরণীয় অনন্য শৈলীতে তাঁর স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে মজলিশি বা আড্ডা-রসের একটি ধারার ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু খোশগল্প তাঁর রচনায় শিল্পসুষমামণ্ডিত হয়ে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত। এবং তাঁর কৃতিত্বের মূলেও রয়েছে মজলিশি রস ও তার বাহন বাক্নৈপুণ্য।
বাংলা গদ্যের প্রাথমিক যুগের প্রবল দুটি ধারা – সাধু ও চলিত। চলিত বা কথ্যভাষা আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একটি খাতে হুতোম-দ্বিজেন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ ও তাঁদের অনুসারীদের চলার পথ-নির্দেশিত, অপর সরণিতে রবীন্দ্রনাথ-প্রমথ চৌধুরী-অবনীন্দ্রনাথ ও তাঁদের অনুগামীদের সাবলীল স্বচ্ছন্দ পদচারণ। উভয় সরণির সঙ্গমস্থলে পরবর্তী মাইলস্টোন সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি যে-নৈপুণ্যের সঙ্গে বিদেশী চরিত্র ও আবহ বাংলা সাহিত্যে এনেছেন, তা তুলনারহিত। বাকপ্রতিমায় ব্যবহৃত ধ্বনিসমষ্টিই তাঁর অনন্যতার স্বাক্ষর। সাবলীল বাকভঙ্গিমা ও বিচিত্রশব্দভুবনের বদৌলতে বাংলা গদ্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান অবিসংবাদিত। মুজতবা নাগরিক-জীবনের প্রতিভূ ও রূপকার। তাঁর শব্দের ভুবন নগরচেতনায় প্রদীপ্ত – রচনায় প্রতিফলিত নাগরিক-জীবনের ফেনিল উল্লাস, কখনো কিঞ্চিৎ নোনাজালে সিক্ত। বাংলা গদ্যের বহমান ধারায় মুজতবা আলীর অবদান-নিরূপণে সর্বাগ্রে বিবেচ্য তাঁর রচনারীতি, তাঁর স্টাইল। ভাবের আশ্রয় ভাষা, যার উপাদান শব্দ। প্রকাশিত ভাবনায় সুচয়িত শব্দাবলির যথাযথ প্রয়োগ ও বাক্ভঙ্গিমায় স্টাইলের অনেকাংশ নির্ভরশীল। বিষয়বস্তুকে আশ্রয় করে আপন গতিপথে ধাবমান ভাষায় স্টাইল বা রচনারীতির বৈশিষ্ট্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ফুটে ওঠে। স্টাইলে শিল্পীর স্পর্শে কখনো স্বয়ং প্রকাশ, কখনো বা তার জন্যে প্রয়োজন নৈষ্ঠিক মনন ও কর্ষণ। স্টাইলের বিবিধ গুণাবলির মধ্যে বৈচিত্র্যের সঙ্গে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতা, নাগরিক বৈদগ্ধ্যের সঙ্গে অত্যাবশ্যক সরসতা তথা প্রসাদগুণ, – সহাস্য-রসিকতা এরই অন্তর্ভূত। সার্থক সৃষ্টিতে শুধু রূপকার একা নন, সমগ্র জাতির রূপ প্রতিফলিত এবং সাহিত্যের বাহন ‘গদ্য’ সম্পর্কে এ-বক্তব্য সর্বাধিক প্রযোজ্য। এ-গদ্য আমাদের প্রতিমুহূর্তের অনুধ্যানের বাহন, কর্মপ্রবাহের মাধ্যম – জীবনচেতনার নিত্য অনুষঙ্গী। বাংলা গদ্যস্রোতে সম্মিলিত অন্যতম ব্যক্তিত্ব মুজতবা আলীর ধারাটির স্বাতন্ত্র্য ও অনন্যতার যথাসম্ভব নিরপেক্ষ স্থান-নির্দেশনার প্রয়োজনে বাংলা গদ্যধারার অনুসরণ অত্যাবশ্যক।
দুই
পুস্তকাশ্রয়ী বাংলা গদ্য একান্তভাবেই আধুনিককালের নিদর্শন। প্রতিদিনের ব্যবহার্য মুখের বুলি নিশ্চয়ই প্রাগৈতিহাসিক এবং তার রূপ যে ঘরোয়া গদ্য, এ-নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আমরা পুস্তকধৃত গদ্যের শরণে মুজতবার কৃতি-কৃতিত্বের মূল্যায়নপ্রয়াসী।
পোশাকিভাষা মাত্রই – তা সে গ্রন্থেরই হোক, কিংবা মৌখিকই হোক – ন্যূনাধিক কৃত্রিম হতে বাধ্য। পরিশীলিত মনের অনুশীলনের ফসল আজকের দিনের ললিত-মধুর শ্রুতিসুখকর কথ্য বাংলা গদ্য। বাংলা গদ্যের প্রধান দুটো ধারা – সাধু ও চলিত – প্রথমাবধিই পুস্তকে স্থান পেয়েছে। যদিও প্রাপ্য আসনটির জন্যে চলিত বাংলাকে প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই অতিক্রমণ করতে হয়েছে – রীতিমতো সংগ্রাম করে চলার পথটিকে করেছে মসৃণ। চলিত গদ্যের মূল শক্তি নিহিত আঞ্চলিক শব্দে, লৌকিক প্রবাদ-প্রবচনে, নিত্যব্যবহার্য সুভাষীতে তথা মৌখিক বুলিতে। গ্রন্থিত গদ্য প্রথমাবধিই লোকভাষাকে আশ্রয় করে আত্মপ্রকাশে প্রয়াসী ছিল। কিন্তু একটি কৃত্রিম দুরতিক্রম্য বাধায় বারবার তার গতি হয়েছে শ্লথ। পণ্ডিতদের অতি সতর্কতা সাধু ও চলিতের ভেদরেখাকে করেছে অধিক দুর্লঙ্ঘ্য। ঊনবিংশ শতাব্দ ও বিংশ শতাব্দের চতুর্থ দশক পর্যন্ত সময়সীমাকে বাংলা গদ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাল বলা যায়। প্রত্যেক সৃজনশীল লেখকই নানাভাবে ভেঙেচুরে ভাষাকে নির্মাণ করতে চেয়েছেন, বিষয়ানুগ বাস্তবতা দান করে ভাষাকে করেছেন যুগোপযোগী – কার্যক্ষম ও গতিশীল। আপন প্রচেষ্টায় নিজেদের অতিক্রমণের প্রচেষ্টাও দুর্লক্ষ্য নয়। সাধু ও চলিত – কূলপ্লাবী দুটি সমান্তরাল ধারাই প্রচুর পলিমাটির যোগান দিয়ে বাংলা গদ্যের উভয়কূলকে করেছে সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। চলিষ্ণু ভাষামাত্রই পরিবর্তনশীল ও বৈচিত্র্যানুসন্ধানী। সমাজ, জীবন ও ভাষা অচ্ছেদ্য বন্ধনে অনুস্যূত বলেই সমাজ-পরিবর্তনে ভাষার বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। জীবন-চেতনার ধারাবদলেও ভাষার রকমফের অপ্রতিরোধ্য।
১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমান হরফে মুদ্রিত মানোএল-দা আস্সুম্সাম-বিরচিত কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ-এ পূর্ববঙ্গের কথ্যরীতি সুস্পষ্ট। সেইসঙ্গে ব্যবহৃত ফারসি ও সংস্কৃত শব্দ সুসংবদ্ধ। এ-ভাষাকেই প্রাকৃত বাংলা হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত বাঙালির প্রথম গ্রন্থটিও সমকালীন কথ্য বাংলার অকৃত্রিম নিদর্শন। পুস্তকটি রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১), গ্রন্থকার রামরাম বসু। তাঁকে বাংলা গদ্য নির্মাণ করতে হয়েছে এবং এ-দুরূহ কর্মে তিনি বাস্তবজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। গদ্য দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বাহক – এ-সত্য তিনি প্রথমাবধিই স্বীকার করেছিলেন। ফলে তাঁর সৃষ্ট ভাষা মৌখিক বুলির অনুগামী। বিষয়ানুরোধে ফারসিতে ওয়াকিবহাল মুনশির লেখা স্বভাবতই ফারসিবহুল। তবে সে-সমস্ত ফারসি শব্দ তখন লোকমুখে প্রচলিত। উইলিয়াম কেরির তত্ত্বাবধানে লিখিত ও তাঁর নামে প্রকাশিত কথোপকথন-এ (১৮০১) বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণির লোকের মুখের ভাষা হুবহু ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ভাষায় তৎসম শব্দের প্রাধান্য ছিল অবশ্যম্ভাবী এবং বাংলা গদ্যে তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রধানত তাঁর হাতেই গদ্য বিদগ্ধ ও নাগরিক হয়ে ওঠে। এ-সময় থেকেই বাংলা গদ্য মুখের বুলি থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে কৃত্রিম শিষ্ট ভাষারূপে পুস্তকে আশ্রয় ও পণ্ডিতজনের প্রশ্রয় লাভ করে। এভাবে আধুনিক গদ্যের জন্মলগ্ন থেকেই তা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে সাধু ও চলিত নামে দুটি ধারার সৃষ্টি করে। সাধুপন্থিরা তখন থেকেই পরিমার্জনার নামে বহুল প্রচলিত বহিরাগত ও লোকজ শব্দসমূহ ভাষা থেকে বিতাড়নের পালা শুরু করেন। তবে বিদ্যালঙ্কারের লেখনী ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতদের মধ্যে ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী এবং তাঁর ভাষাও প্রসাদগুণসম্পন্ন। তদুপরি বিষয়ানুযায়ী ভাষাপ্রয়োগে তিনি যে বিমুখ ছিলেন না তার প্রমাণ তাঁর রচনায় আছে।
মোটামুটিভাবে নির্দেশ করা যায় যে, পরবর্তীকালের বাংলা গদ্যের ত্রিবেণী – সাধারণ জনের মৌখিক বুলি, আরবি-ফারসি শব্দবহুল বৈষয়িক ভাষা এবং তৎসম প্রভাবান্বিত সংস্কৃতানুগ পদ ও বাক্যগঠনরীতির উদ্ভব ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের হাতেই। তবে সংস্কৃতানুগ ভাষার জৌলুসে অন্যদুটি স্রোত প্রায় ক্ষীণকায়া হয়ে পড়ে এবং পণ্ডিতবর্গের বিমাতৃসুলভ আচরণ ও বিধান ছিল তাদের পরিপুষ্টির প্রতিকূল। এমতাবস্থায় নতুন জোয়ার আনলেন প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর। সমকালীন জীবনচিত্র-রচনায় চরিত্রানুগ কথ্যভাষা ব্যবহার করে আলালের ঘরের দুলালে (১৮৫৮) তিনি নবীন প্রাণ সঞ্চার করলেন। তদ্ভব, চলিত, বিদেশী শব্দ এবং কথ্যরীতির ইডিয়ম ও প্রবাদবাক্যের ব্যবহারে প্যারীচাঁদ আলালের ভাষাকে সর্বজনবোধ্য করতে চেয়েছেন।
দীনবন্ধু মিত্র ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসনেও আঞ্চলিক ভাষার সুকৌশলী প্রয়োগ সবিশেষ উল্লেখ্য। অতঃপর বাংলা সাহিত্যে কালীপ্রসন্ন সিংহের আবির্ভাব রীতিমতো বিদ্রোহের নামান্তর। প্রচলিত রীতিনীতি ও তথাকথিত শালীনতাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে শুধুমাত্র দুর্মর প্রাণশক্তির বলে বাংলা গদ্যকে তিনি চাঙ্গা করে তুললেন। খাস কলকাত্তাই উপভাষা হলো হুতোম প্যাঁচার নক্শার (১৮৬১-৬২) বাহন। কথ্যভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যে স্যাঙ্ বা অভব্য শব্দ ব্যবহৃত হলো নির্বিচারে। বিপুল প্রাণশক্তিতে ভরপুর অদম্য এ-ভাষার গতিরোধ দুঃসাধ্য। তবু সমকালে রুচি-শালীনতার ছুঁৎমার্গের দোহাই দিয়ে নবীন-ভীতি ও প্রাচীন-প্রীতিতে নিমজ্জিত গোষ্ঠীবিশেষের সক্রিয়তায় হুতোমী রীতির যাত্রাপথ সুগম হয়নি। তবে হুতোমী ঢেউ যে-আন্দোলন সৃষ্টি করল তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং বাংলা গদ্যের জন্যে কল্যাণপ্রদ। রূপ-রীতি নিয়ে প্রবল মতানৈক্যে দুটি দলের সৃষ্টি। এক গোষ্ঠী তৎসম শব্দ কণ্টকাকীর্ণ সাধুভাষার প্রবক্তা, বিরোধীপক্ষ মুখের বুলিকে যথাসম্ভব পুস্তকে স্থানদানের পক্ষপাতী। প্রথমদিকে ‘সাধুজী’দেরই ছিল প্রবল প্রতাপ এবং সমাজও তাঁদের মান্য করেছে। বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উভয়রীতির মধ্যে ভারসাম্য-আনয়নে সাফল্য অর্জন করলেন। তিনি প্রাচীন সাহিত্যের রসনৈপুণ্যের সঙ্গে যুক্তিনিষ্ঠ পরিমাণবোধ, মার্জিত রুচি ও বিষয়োপযোগী শব্দ-প্রয়োগে ভাষাকে আভিজাত্য দান করে সর্বপ্রকার ভাবপ্রকাশক্ষম করে তুললেন। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের রচনায় আভিধানিক শব্দের প্রচুর সমাবেশের মধ্যে প্রচলিত আরবি-ফারসি ও লোকজ শব্দের সমাহার তাঁর গোঁড়ামিমুক্ত দূরদৃষ্টির পরিচায়ক। বিষয়ানুগ ভাষা তাঁর ইচ্ছায় রীতিমতো নৃত্যপরায়ণ। বেনামিতে বিদ্যাসাগরের বেপরোয়া রচনা আজও তুলনাহীন।
আলালি ও বিদ্যাসাগরি ধারার সুসমন্বয় করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনুপম নিজস্ব গদ্যরীতি উদ্ভাবন করলেন। ভাষায় দার্ঢ্য ও শ্রী মনোহর হয়ে উঠল। প্রাধান্য পেল যুক্তিধর্মী বিশ্লেষণ-প্রবণতা। আবেগ-নিয়ন্ত্রিত মননের প্রাবল্যে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হলো বিচিত্র শব্দসম্ভারে। প্রয়োজনে সংস্কৃত, দেশী-বিদেশী শব্দের অবাধ ব্যবহারের অনুকূলে অভিমত ব্যক্ত করলেন এবং আপনসৃষ্টিতে তা প্রয়োগ করে ভাষাকে করলেন গতিময় ও প্রোজ্জ্বল।
আরো একটি বিতর্ক ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করছিল। সংস্কৃতানুরাগী সাধুপন্থিদের অনুরূপ রামরাম বসু ও তাঁর অনুকারীদের অনুসরণে কিছুসংখ্যক মুসলমান লেখকও দেদার আরবি-ফারসি এস্তেমালে অধিক মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ফলে শব্দ-ব্যবহারেরও একটি ধর্মীয় চেতনা হিন্দুমুসলমান – উভয়সম্প্রদায়ের মধ্যেই মাথাচাড়া দেয়। অবশ্য এর ফল যে শুধু মন্দ হয়েছে এমন বলা যায় না। বরং তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে দুর্বল বাংলা গদ্য ক্রমশ বলিষ্ঠ রূপ লাভ করে। বঙ্কিমের সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুসলমান গদ্যলেখক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধুতে এই শিল্পীরীতিরই অনুসৃতি। প্রসাদগুণ বজায় রাখতে লেখক যেমন ‘ঈশ্বরে’ বিশ্বাসী, তেমনি ‘রোজ-কেয়ামত’-প্রয়োগেও নিঃশঙ্ক।
কিছু সংস্কৃতপন্থি লেখকের বিবেচনা-বিহীন একদেশদর্শিতা ও অনুদারতা কোনো কোনো মুসলমান লেখককে তথাকথিত ‘যাবনিক’ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহারে ইন্ধন যুগিয়েছে। আমাদের সৌভাগ্য, উভয় পক্ষের বিবেকবানদের বাস্তবানুগ সুযৌক্তিক পদক্ষেপ এ-সংকট-উত্তরণে সহায়ক হয়েছিল।
ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের সাধুরূপ ব্যতীত বাংলা গদ্যের চলিত রূপ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, বিনয়কুমার সরকার, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের রচনায় ধারাবাহিত হয়ে এ-রীতিকে বহুমাত্রিকতা দান করে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। বাংলা গদ্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ প্রমথ চৌধুরীর সৃষ্টিতে শিল্পনৈপুণ্যের প্রাধান্য। বক্তব্যের চেয়ে উপস্থাপনা অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে। ফরাসি সাহিত্যের এই রসবোদ্ধা ভাষাকে করতে চেয়েছেন স্বচ্ছ ও গতিময়। প্রকৃতপক্ষে প্রমথ চৌধুরীর মেজাজটিই ছিল ফরাসি ধাঁচের। তাঁর মনন-মানসিকতার আভিজাত্য ও স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় রচনার ছত্রে ছত্রে। মৌখিক ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠ করার লক্ষ্যেই সবুজপত্রের আবির্ভাব ১৯১৪ সালে। এর প্রভাব স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ভবিষ্যৎ বাংলার রূপ-স¤¦ন্ধে কবিগুরুর বিধানই বাংলা গদ্যসংক্রান্ত বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার যবনিকা ঘটিয়েছে, বলা বাহুল্য নয়। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য, স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য স¤¦ন্ধে সম্যক অবহিত রবীন্দ্রনাথ অহেতুক আভিজাত্যের সিন্দাবাদের ভার বহন করেননি। ফলে প্রাকৃত ও ‘যাবনিক’ শব্দের বিপুল সমারোহ তাঁর সৃষ্টিসমুদ্রে। ভবিষ্যৎদ্রষ্টার কিশোর বয়সের রচনা য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র (১৮৮১) হুতোমের পর বাংলা কথ্যভাষার দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথের প্রথম গদ্যগ্রন্থটিই অনাগত দিনের পরিশ্রুত বাংলা গদ্যরূপের স্থায়ী কাঠামোটি বক্ষে ধারণ করেছে। মোদ্দাকথা, গদ্যশিল্পীদের সচেতন সম্মার্জনী সঞ্চালনে বাংলা ভাষা থেকে জাতের ছুঁৎমার্গ বিদূরিত এবং মহাসমারোহে গুরুচণ্ডালী সমর্যাদায় অভিষিক্ত। অকৃত্রিম কথ্যভাষার অন্বেষণে পরবর্তীকালের লেখকরা মৌখিক ভাষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এঁদের সফল প্রতিনিধি সৈয়দ মুজতবা আলী, যিনি বাংলা গদ্যের বিবিধ শৈলীর পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে কথাশৈলীতেই স্থিত হয়েছিলেন।
তিন
আপনসৃষ্টির মধ্যে নিরূপিত লেখকসত্তার স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যই তাঁর স্টাইল, এবং রচনাশৈলীর মধ্যেই মুজতবা আলীর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব বর্তমান। লেখকের সাফল্য সম্পর্কে স্বয়ং মুজতবার ভাষ্য :
‘‘অভিনয় দক্ষতা আপন কলমে স্থানান্তরিত করতে পারলেই লেখকের ‘সকলং হস্ততলং’ – লেখা তখনই হয় ঈড়হারহপরহম; তার বিগলিতার্থ, অভিনয় করার সময় যেরকম প্রত্যেকের আপন আপন ভাষার বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা অপরিহার্য, লেখার বেলাও তাই। …কণ্ঠস্বর দিয়ে বহুৎ বেশী ভেল্কিবাজী দেখানো যায়। অনেকের অনেক রকম ভাষা – কেউবা সাঙ ব্যবহার করে, কারো বা ইডিয়ম জোরদার, কেউ কথায় কথায় প্রবাদ ছাড়ে, কেউ বলে ভবচাযের মত সংস্কৃতঘ্যাঁসা ভাষা, কেউ কিঞ্চিৎ যাবনিক – এ সবকটা করায়ত্ত না থাকলে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর লোকের কথাবার্তা ঈড়হারহপরহম ধরনে প্রকাশ করা যায় না।’’
এবং মুজতবা আলী সর্বদা এই ঈড়হারহপরহম গদ্যেই নিজেকে প্রকাশ করেছেন। ফলে সার্থকতা এসেছে অনিবার্যভাবে। চরিত্র ও বিষয়ানুযায়ী তাঁর ভাষা ও বর্ণন বৈচিত্র্যের সম্ভার। বিশেষ কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না বলেই তাঁর সৃষ্টির স্বাদুতা যেমন তারল্যে পানসে হয়নি, তেমনি নবীনতায়ও মালিন্যের আস্তরণ নির্লক্ষ্য। আমরা পাঠকের দৃষ্টিতেই তাঁর ভাষা ও শৈলীর মূল্যায়নপ্রয়াসী।
আদর্শ সাহিত্য স¤¦ন্ধে মুজতবা আলীর ধ্যান-ধারণার পরিচয় তাঁর রচনাবলিতে রয়েছে। ফারসি এবং ফরাসি – দুটি সাহিত্যই তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। ফারসি আলঙ্কারীকের বক্তব্য, ‘‘ ‘আদর্শ সাহিত্যরস তখনই সৃষ্ট হয় যখন লেখক শনাক্ত করতে পারেন… রচনার সীমা… কোথায়।’ – শানখ্তন্-ই-হদ্দ-ই র্হ চীজ …।’’ আর ‘‘ফরাসি আলঙ্কারীকের মুখে সদাই এক বুলি : ‘র্ক্লাতে র্ক্লাতে – তুজুর লা র্ক্লাতে। … ফরাসি গুণীর আদর্শ ‘স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা – অল্ওয়েজ স্বচ্ছতা’।’’- এই ইষ্টমন্ত্র-রূপায়ণে মুজতবা ছিলেন সদা-সচেষ্ট। ফলে তাঁর ভাষা সোজাসুজি ওষ্ঠের আশ্রয় ছেড়ে কলমের মুখে মুক্তি পেয়েছে। এ-জন্যেই মুজতবা-সাহিত্যে হরেকরকম ভাষা ও বুলির ছড়াছড়ি। তিনি সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যকে কখনো অবহেলা করেননি। চটুল-চঞ্চল চলিত ভাষায়ও প্রয়োজনে সংস্কৃত শব্দসম্পদ ব্যবহার করে ভাষাকে দিয়েছেন দার্ঢ্য ও প্রসাদগুণ। সাহিত্যজীবনের প্রদোষলগ্নেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, – ‘ভাষা বহু তিলিসমাৎ, বহু মিরাকল, বহু অলৌকিক কর্ম করতে পারে।’ ভাষার এই ঐন্দ্রজালিক শক্তির অত্যুত্তম নিদর্শন মুজতবা-রচনাবলি।
সৈয়দ মুজতবা আলীর মধ্যে একজন প্রচ্ছন্ন শিক্ষক সর্বদা জাগ্রত এবং যে-কোনো বক্তব্যের সূত্রে তিনি অলক্ষে আমাদের জ্ঞানের পরিধি-বিস্তারে সহায়তা করেছেন। আশকথা-পাশকথা মূল বক্তব্যে অপূর্ব নৈপুণ্যে বুনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল বলেই অলংকার তথা পাণ্ডিত্য তাঁর সৃষ্টিতে ভার হয়ে ওঠেনি। এবং সর্বত্র তাঁর ভূমিকা কথকের। গুরুত্বপূর্ণ ভাবগম্ভীর বিষয়ও লেখকের অনুপম বাক্স্রোতে লীলায়িত ভঙ্গিতে সপ্রকাশ। সরস বৈদগ্ধ্য এবং চটুল তারল্যের সঙ্গে গভীর জীবনবোধের অপূর্ব সংমিশ্রণে অনন্য সৃষ্টি মুজতবা-সাহিত্যের প্রধান আকর্ষণ তাঁর ভাষা। বিষয়ভেদে ভাষার সুর বদল যেমন স্বাদু, তেমনি শ্রুতিসুখকর। এমন মোহনীয় ভাষার কারুকার বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। দেশে বিদেশের (১৩৫৬) মাধ্যমে গ্রন্থকার হিসেবে তাঁর প্রথম আবির্ভাবেই বিস¥য়-বিস্ফারিত নয়নে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের উপলব্ধি :
‘… চল্তি বাঙলা যে কত জোরদার ভাষা, তা ইনি (মুজতবা) নিজের বিশিষ্ট ভঙ্গীতে বা ঢঙে নতুন করে প্রকাশ ক’রে দিয়েছেন। এই রকম ভাষা পৃথিবীর যে কোনও শ্রেষ্ঠ ভাষার সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারে, তাতে আর সন্দেহ নেই। অন্তর্নিহিত শক্তিকে টেনে বার করাই মুন্শিয়ানা – ডাক্তার মুজতবা আলী সে মুন্শিয়ানার অধিকারী। সহজাত কবচের মত সুন্দর শক্তিশালী ভাষার বর্ম তাঁর লেখার ভাবদেহকে ঘাতসহ ক’রে রেখেছে।’
প্রথম গ্রন্থটির মধ্য দিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে মুজতবা আলীর পদচারণার যে শুভসূচনা – পঞ্চতন্ত্র (১৩৫৯), ময়ূরকণ্ঠী (১৩৫৯) ও চাচা-কাহিনীর (১৩৫৯) প্রকাশনায় তা সুপ্রতিষ্ঠিত। এবং তখন তিনি জনপ্রিয়তায় অপ্রতিদ্বন্দ্বীও বটে। তার সগর্ব স্বীকৃতি অগ্রজপ্রতিম – মুজতবার বিবেচনায় শান্তিনিকেতনের সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক – প্রমথনাথ বিশীর লেখনীতে।
“সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা ভাষায় মজলিশি সাহিত্যের বাদশা। গল্প বলতে গিয়ে, প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে, কথা কইতে গিয়ে আসর জমানো মানে কিনা নিজের ব্যক্তিত্বের ঢিলে আলখাল্লাটা পাঠকের গায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠিন কাজে তাঁর জুড়ি নেই বাংলা সাহিত্যে। এই অভিনবত্বের রসটি নিয়ে প্রথম যখন তিনি দেখা দিলেন দেশে-বিদেশের কাহিনী হাতে, ক্ষণকালের জন্য বাঙালি-পাঠক, বিস্ময়ে নিস্তব্ধ থেকে তারপরেই তাঁর জয়ধ্বনি করে উঠেছিল।”
ভাষা এবং ভঙ্গি – এ-দুটি বলিষ্ঠ উপকরণের উপস্থিতির ফলে মুজতবার সৃষ্টি কালোত্তীর্ণতার দাবি রাখে। গুরুচণ্ডালীর ছুৎমার্গ রবীন্দ্রনাথ অস্বীকার করেছিলেন। আর মুজতবা আলীর রচনায় তারা গাঁটছড়া বেঁধে বসেছে। নবকলেবরে তথাকথিত গুরুচণ্ডালী তাঁর লেখায় গুণাকর বিশেষ। বাংলা গদ্যে আরবি-ফারসি তথা বিদেশী শব্দপ্রয়োগের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। কিন্তু মুজতবার মতো এমন সতেজ সঙ্কোচহীন শব্দব্যবহার অন্যত্র অদৃষ্ট। ‘টেকচাঁদ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী কিংবা অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দ এসেছে পুষ্পবৃষ্টির মতো। নজরুল ইসলামের কালবৈশাখীর মতো।’ আর মুজতবা আলীর লেখায় ‘নিত্যকার সঙ্গীর মতো’। তাই তাঁর ব্যবহৃত বিদেশী শব্দাবলিকে এক মুহূর্তের তরেও অপরিচিত-অনাত্মীয় বলে ভ্রম হয় না। সর্বোপরি হিউমারের আবরণে সেগুলোর আবেদনও পাঠক-হৃদয়ে প্রত্যক্ষ এবং এখানেই আলী সাহেবের অনন্যতা। গদ্যশিল্পী হিসেবে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বপ্রসঙ্গে প্রমথনাথ বিশীর মন্তব্য :
‘বাংলা কবিতায় আরবি-ফার্সি শব্দের যথাযথ ব্যবহার করে এবং ভাবের উদ্দামতায় কাজী নজরুল যেমন নোতুন দিক্ নির্দেশক করেছেন, তেমনি বাংলা গদ্যে মজলিসী রীতির পথ নির্দেশ করে, নোতুন শব্দাবলী ব্যবহার করে মুজতবা নোতুন গদ্যশৈলী সৃষ্টি করেছেন – যা আমি পারিনি। … নোতুন পথ নির্দেশক হিসেবে মুজতবাই শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক।’
তাঁর অবলম্বিত গুরুচণ্ডালীতে শুধুমাত্র সাধু-অসাধু নয়, ‘যাবনিক’ শব্দের সঙ্গে একই পঙ্ক্তিতে সংস্কৃত-জার্মান-ফরাসি-ইংরেজি রাঢ়ী-বারেন্দ্র-বাঙাল শব্দ অতি অবলীলায় আপন আপন স্থান বেছে নিয়েছে। সুতরাং, মুজতবা শুধুমাত্র ‘যাবনিক’ শব্দ নয়, প্রয়োজনে যে-কোনো ভাষার শব্দ আমদানি করেছেন। এবং এ-ক্ষেত্রে তিনি বঙ্কিম-বিবেকানন্দ-হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-প্রমথ চৌধুরীর যোগ্য উত্তরাধিকারী। মুজতবা লিখেছেন, ‘…যাবনিক জিনিস আমি আলিঙ্গন করেছি, পাঠকের সম্মুখে পেশ করেছি তখনই, যখন অনুভব করেছি সে যাবনিকতার মধ্যে বিশ্বজনীন ভাব সঞ্চারিত আছে, যে যাবনিকতা দেশকালপাত্র উত্তীর্ণ হয়ে শাশ্বত হবার অধিকার লাভ করেছে।… বলা বাহুল্য খৃস্টীয়, অখৃস্টীয়, জনপদসুলভ ভাবধারা, আমার আবাল্য পরিচয়ের খাসিয়া সাঁওতাল সভ্যতার প্যাটার্ন আমি ঠিক সেই ভাবেই গ্রহণ করেছি যেভাবে আমি যাবনিক চিন্তামণিকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছি।’ মুজতবার রচনাবলিই তাঁর বক্তব্যের অকৃত্রিমতার বিশ্বস্ততম স্বাক্ষর। তিনি প্রাণবান সজীব ভাষা চেয়েছেন, মানুষের কণ্ঠ যে-ভাষার আশ্রয়। ভাষাশৈলীর প্রশ্নে আলী সাহেব ফরাসি রীতির পানেই বারংবার দৃক্পাত করেন – ‘স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা, অল্ওয়েজ স্বচ্ছতা’। এজন্যেই শব্দচয়নে তিনি সর্বসংস্কারমুক্ত। ভাষা ভাবপ্রকাশের জন্যেই, কিংবা বলা যায় ভাবের সচেতন বাক্সময় অনুভূতিই ভাষা। সুতরাং, এ-অনুভূতির নিরঙ্কুশ প্রকাশের জন্যে প্রয়োজন সর্বোত্তম ভাষা। আর ভাষার নিটোল সুষম নির্মিতির জন্যে চাই শ্রেষ্ঠ শব্দসম্ভার। এ-প্রয়োজনেই শিল্পী মুজতবা দেশী-বিদেশী, সাধুচলিত, গ্রামীণ-শহুরে সর্ববিধ ভাষা থেকে সঠিক শব্দটি নিপুণ জহুরির মতো চয়ন করেছেন। স্বচ্ছতোয়া স্রোতস্বিনীর সঙ্গে জীবন্ত ভাষা তুলনীয়। স্তব্ধগতি জলধারা যেমন ডোবার নামান্তর, নির্জিব ভাষাও তদ্বৎ। ভাষাকে প্রাণবন্ত, চলিষ্ণু রাখার গুরুদায়িত্ব সাহিত্য-শিল্পীর। ভাষার চারুরূপনির্মাণ ও পাঠকের চিত্তবিনোদনের অবকাশে তাঁকে কিছুটা সমৃদ্ধ করে তোলা ছিল মুজতবার অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে ভাষার খেলায় তাঁকে নামতে হয়েছে এবং নবীন-প্রবীণ, দেশী-বিদেশী সর্বপ্রকার শব্দই ব্যবহার করেছেন হাতিয়ার হিসেবে। এ-বিষয়েও তাঁর মানসিক প্রস্তুতি ছিল কৈশোর থেকেই।
শান্তিনিকেতনের নির্মল পরিবেশ এবং ‘গুরুদেব’ ও তাঁর সর্বাগ্রজ দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথের প্রভাব কিশোর মুজতবার হৃদয়ে স্থায়ী আসন পেতেছিল। তাঁদের নির্দেশিত পথ ও পাথেয় তাঁর সাহিত্যজীবনের অক্ষয় সঞ্চয়। সর্বসংস্কারমুক্ত ‘বড়বাবু’ দ্বিজেন্দ্রনাথই মুজতবাকে হুকুম দিয়েছিলেন, গুরুচণ্ডালী ‘আলবত মানবে না’। এবং মুজতবা আলীর সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি – ‘অধীন দ্বিজেন্দ্রনাথের আদেশ বাল্যাবস্থা থেকেই মেনে নিয়েছে…।’ পূর্বসূরিও দু-চারজন দেখা দিয়েছিলেন তাঁদের অমিত শক্তি ও মনীষা নিয়ে। মুজতবার প্রায় সমকালেই আবির্ভূত রাজশেখর বসুও ভাষার ‘তিলিসমাৎ’ দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিস্ময়োৎপাদন করেছিলেন। মুজতবা লিখেছেন : “পরশুরাম’ প্রয়োজন মত কখনো সংস্কৃতঘেঁষা কখনো ফারসী ঘেঁষা বাঙলা লিখে যে অপূর্ব রস সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন, সে রস বাঙলা ভাষার ঐতিহ্যের অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছে। আমরা বাঙলা লিখতে এখন আর এ বিচার করিনে, কোন্ শব্দ আসলে ফারসী আর কোন্ শব্দ সংস্কৃত।” প্রকৃতপক্ষে অকৃত্রিম মুখের লাবণ্যময় ভাষাই ছিল মুজতবার অভীষ্ট, যে-ভাষায় ভাবপ্রকাশে শ্রীরামকৃষ্ণ কিংবা স্বামী বিবেকানন্দ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এঁদের তিনি গুরুর সম্মান দিয়েছেন। সর্বোপরি রয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর ব্যবহৃত শব্দভাণ্ডার মুজতবার রচনায় বিস্তরে বিস্তর। ভাষা যে-কোনো রীতির শরণাপন্ন হতে পারে। শুধু তার সর্ববিষয়বস্তুর প্রকাশক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। ‘সত্যপীরে’র কলমে আলী সাহেবের ভাষ্য, ‘চলিত ভাষা যে রকম দীন-দুঃখীর বেদনা-আনন্দ প্রকাশ করিবে, সেই অনুযায়ী প্রয়োজনানুরোধে গম্ভীর রুদ্র রসেরও অবতারণা করিবে। সাধু ভাষায় যে দার্ঢ্য, যে-কাঠিন্য আছে, তাহাকেও চলিত ভাষায় সঞ্চারিত করিতে হইবে।’ এবং চলিতপন্থিদের সাধুভাষার দার্ঢ্যগুণ গ্রহণ ও সংস্কৃতভাণ্ডার থেকে প্রসাদগুণ সঞ্চয়ের জন্যেও উপদেশ দিয়েছেন। বলিষ্ঠ মনন, বুদ্ধির সতেজ প্রকাশে সমৃদ্ধবান বাংলা গদ্যের ইতিহাসে মুজতবা অনন্য পুরুষ। এক সাক্ষাৎকারে মুজতবা আলীর মূল্যায়নপ্রসঙ্গে শ্রীযুক্ত অমিতাভ চৌধুরীর ভাষ্য, ‘মুখের ভাষায় শুধু বৈদগ্ধ্য নয় – তার সঙ্গে যুক্ত হলো কথকতার অসাধারণ ভঙ্গী, যুক্ত হলো আঞ্চলিক কিন্তু প্রচলিত শব্দাবলী, তার সঙ্গে এলো পরিহাসপ্রিয়তা, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিকতা এবং সর্বোপরি একটা সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক নির্মল স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।’
চার
জনশ্রুতির প্রাবল্যে একটি ভ্রান্তি আমাদের হৃদয়ে সমূল প্রোথিত। মুজতবা আলীর ভাষাশৈলী বলতে তৎক্ষণাৎ আমাদের মনে আরবি-ফারসি শব্দবহুল দোভাষী পুঁথির নাগরিক গদ্য-সংস্করণের একটি প্রতিভাস আসে। মুজতবার মূল্যায়নে এটিই সর্বাধিক প্রামাণিক প্রমাদ। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভাষাকে ‘শানিয়ে’ তার ধার বাড়াতে চেয়েছেন। ফলে বিশেষ কোনো রীতিতে কস্মিনকালেও আবদ্ধ ছিলেন না। এবং নিজেকে অতিক্রমণের একটি প্রত্যয়ী প্রচেষ্টায় তাঁকে দেখি সদা চঞ্চল। মুজতবা স্বয়ং তাঁর অবলম্বিত তিনটি ভাষা-রীতির উল্লেখ করেছেন – ‘গুরুগম্ভীর, হাস্যাত্মক এবং মেশানো’। আরো নানাভাবে তাঁর ভাষাশৈলীর বিন্যাস করা যেতে পারে। তাঁর গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস এবং সংবাদপত্রীয় নিবন্ধের ভাষার বিভিন্ন রূপ। বিষয় এবং চরিত্রানুযায়ী ভাষা নানাদিকে মোচড় খেয়েছে। কখনো সংস্কৃতঘেঁষা বিদ্যাসাগরি রীতি, আবার কখনো হুতোম-প্রমথ চৌধুরীর সম্মিলিত একটি মধ্যগা পন্থা – যাকে যথার্থ অর্থে ‘সৈয়দী ঢঙ্’ বলা যেতে পারে – অবলম্বন করেছেন। কিন্তু যে-পন্থাই অবলম্বন করুন না কেন, উইট-হিউমার, দরদ ও বাগবৈদগ্ধ্যে মুজতবা আলী অনতিবিলম্বে অনন্য মুজতবা হয়েই আত্মপ্রকাশ করেন। আমরা তাঁর রচনার আলোকেই মুজতবার অনুশীলিত ‘স্টাইল’ অনুধাবনের চেষ্টা করব। এ-ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পদ্ধতি, শরৎচন্দ্রের হাস্যরসিকতা-সম্বন্ধে মুজতবা লিখেছেন – ‘আমার বক্তব্য তো স্পষ্টতম হবে, যদি আমি একটি মাত্র বাক্য ব্যয় না করে নিছক উদ্ধৃতির পর উদ্ধৃতি দিয়ে যাই।’ মুজতবা আলীর – এবং যে-কোনো সাহিত্যিকের – ভাষাশৈলীর মূল্যায়নে এটাই আমাদের বিবেচনায় সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।
সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাভঙ্গির প্রধান লক্ষণীয় দিক বৈচিত্র্য। বিষয়বস্তুর মতো উপস্থাপনার পদ্ধতি ও ভাষানির্মাণেও তিনি বৈচিত্র্যপিয়াসী। তাঁর ভাষাশৈলীর তিনটি মুখ্য ‘বিশুদ্ধ’ ধারা – ক. সাধু, খ. চলিত এবং গ. গুরুচণ্ডালী। শুধুমাত্র ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের রূপভেদের ওপর সাধু-চলিতের পার্থক্য নির্ভরশীল নয়। শব্দচয়ন ও ভাষা-ব্যবহারেশরণ নিয়েছিলেন। এ-সমস্ত রচনায় ধার ও মুখরোচকতা সমান মেকদারে ব্যবহৃত। এগুলোই দৈনিক পত্রিকার গণপ্রিয় আদর্শ নিবন্ধ। দৈনন্দিন একঘেয়েমির মধ্যে নীরস তথ্যও সরসরূপে পাঠকের চিত্তভূমি রসার্দ্র করে তোলে। যুদ্ধোত্তরকালের লেখাগুলোতে রাজনীতিই প্রাধান্য পেয়েছে এবং সাধারণ জনের আগ্রহও তখন এদিকে, নিদর্শন :
ক. ‘রুশ বর্গী আসছে। বুলবুলিতে যখন সব ধান খেয়ে ফেলেনি তখন সে ধান পাঠাও… জার্মানীতে। সেখানে জার্মান মুর্গী পোষো। তারপর রুশ দর্গায় জবাই করো, ফাঁড়াগর্দিশ যখন উপস্থিত হবে।’
(সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী, ১১শ খণ্ড)
খ. ‘তারপর গণতান্ত্রিক অস্ট্রিয়া একদিন ডিক্টেটর হিটলারের পেটে গেল – ইংরেজ গণতন্ত্রের অপমৃত্যুর জন্য চোখের জল ফেলল না। তারপর চেকোস্লোভাকিয়ার মত গণতান্ত্রিক দেশের দু’খানা আস্ত ঠ্যাং ইংরেজ স্বহস্তে কেটে হিটলারকে ভেট দিলে – গতিক বুঝে হিটলারও কয়েকদিনের মধ্যেই বাকি দেশটাকেও কপাৎ করে গিলে ফেললে।
… …. …
রাগ হল ইংরেজের যেদিন সে শুনতে পেল জর্মনি হঠাৎ সব্বাইকার পরম দুষমন রুশের সঙ্গে দুম্ করে মিতালি করে বসে আছে। হায়, হায়, এতদিন ধরে যে কুত্তাটাকে দুনিয়ার মাংস খাওয়ালুম চোট্টাকে কামড়াবার জন্য সেই কুত্তাটাই চোট্টার সঙ্গে মিলে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করছে আমার দিকে তাকিয়ে। ইয়া আল্লা, একী নেমক-হারামী, এ কি বে-তমীজ বে-ইমানী।’ (দৈনিক আনন্দবাজার)
চটুল কৌতুকপূর্ণ উপস্থাপনার সমান্তরাল ভাবগম্ভীর বর্ণনাতেও মুজতবা সমান দক্ষ। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার ‘পঞ্চতন্ত্র’ মূলত লঘু নিবন্ধের কলাম। এই কলামেও কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংবাদপত্রীয় নিবন্ধ প্রকাশিত। ভাষাও অপেক্ষাকৃত ক্ষিপ্রগামী ‘যাবনিক’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ও গ্রাম্য শব্দের সংমিশ্রণে লেখা স্বাদুতর, হাস্যরসিকতায় টইটম্বুর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশ-এর ‘পঞ্চতন্ত্র’ কলামে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’ ও ‘উভয় বাংলা’ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশের ‘পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়’ সিরিজও সংবাদপত্রীয় নিবন্ধমালা। এগুলো মুজতবা আলীর শেষ জীবনের রচনা এবং ‘সৈয়দী ঢঙে’র তাবৎ বৈশিষ্ট্য এগুলোতেও জাজ্বল্যমান। যেমন :
ক. ‘- মূল বক্তব্যে কিছুতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ … রাখতে পারিনে।… নাক বরাবর মোকামের দিকে… না এগিয়ে মোকা বেমোকায় আকছারই পথের দু’ পাশে নেমে ফুল কুড়োই, প্রজাপতির স্পন্দন ভ্রমর গুঞ্জনে বারবার মুগ্ধ হয়ে দেখি, তপ্তদিনের শেষে মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গিয়েছে – এবং মন্জিলে মা দূর আস্ত্। পথের পাশেই ঘুমিয়ে পড়ি।… সেই কুড়োনো ফুলের দু’ চারটে পাঠকের সামনে অবরে সবরে পেশ না করতে পারলে আমার মেজাজ খাট্টা হয়ে যায়।’ (পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়)
খ. ‘সচরাচর কাবুলে এগানা-বেগানা কেউ এলেই উচ্চকণ্ঠে সম্বর্ধনা জানানো হয়, “আসুন, আসুন, আসতে আজ্ঞা হোক – ব-ফরমাইদ, তশরীফ আনয়ন করুন – তশরীফ বিয়ারিদ, আপনার কদম মবারক হোক – কদম তান মবারক, আপনার চশম্ রৌশন হোক – চশমে তান্ রওশন।” সম্পূর্ণ পাঠটি বেহদ দরাজ পত্রিকায় গুণ্জাইশ নেহায়েত তঙ্গ। আমি মজবুর হয়ে মখতসরে কাবুলের সিভিল প্রটোকলটি সেরে নিলুম।’ (পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়)
উদ্ধৃতি দুটিতে ফারসি-উর্দু-ইংরেজি শব্দের সঙ্গে ‘খাট্টা’ (হিন্দি) কিংবা ‘এগানা-বেগানা’র মতো একান্তই ঘরোয়া শব্দ নির্বিরোধে সহাবস্থান করছে। এ-ধরনের শব্দের এককালীন জাত-গোত্র যাই হোক না কেন, রূপ পালটে বর্তমানে এগুলো বাঙালি জীবনের সঙ্গে একীভূত। সুতরাং লেখ্যভাষায় এদের আগমন অবশ্যম্ভাবী এবং এ-কাজে বিবেকানন্দ-হরপ্রসাদ-প্রমথ-কেদার বন্দ্যোপাধ্যায়-রাজশেখর-মুজতবাদের মতো দরাজ-দিল্ গুণীর পক্ষেই অগ্রণী ভূমিকা পালন ও সার্থকতা অর্জন সম্ভব।
এবার আলী সাহেবের রস-সাহিত্যের – অবশ্য তাঁর যাবতীয় সৃষ্টিই রস-সাহিত্য – ভাষার ওপর কিছুটা আলোকপাত করবো।
দেশে বিদেশে (১৩৫৬ বঙ্গাব্দ) গ্রন্থে মুজতবা আলীর অনুসৃত প্রায় সবরকম ভাষাশৈলীরই সন্ধান মেলে। সংস্কৃতানুগ ভাষার নিদর্শন :
‘মা ধরণীর বুকের দুধ এদেশে যেন সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছে, কোনো ফাটল দিয়ে কোনো বাঁধন ছিঁড়ে এক ফোঁটা জল পর্যন্ত বেরোয়নি। দিকদিগন্তব্যাপী বিশাল শ্মশানভূমির মাঝখান দিয়ে প্রেতযোনি বর্মধারিণী ফোর্ড গাড়ি চলেছে ছায়াময় সন্তান-সন্ততি নিয়ে। ক্ষণে ক্ষণে মনে হয়, চক্রবাল পরিপূর্ণ মহা-নির্জনতার অদৃশ্য প্রহরীরা হঠাৎ কখন যন্ত্রস্তনিত ধূম্রপুচ্ছ এই মৃতশ্চলশকট শূন্যে তুলে নিয়ে বিরাট নৈস্তব্ধ্যের যোগভূমি পুনরায় নিরঙ্কুশ করে দেবে।’
শব্দনির্বাচন ও কথনভঙ্গিতে বিভিন্ন শ্রেণির চরিত্র স্বশ্রেণির প্রতিনিধিস্থানীয়। পাঠান আহমদ আলীর স্বভাবসুলভ বাক্যস্রোত :
“পাঠান মোগল আমলে তাদের (পাঠানদের) ভাবনা ছিল না। পল্টনের দরওয়াজা খোলা অথচ মোগলপাঠান এই গরীব দেশের গাঁয়ে গাঁয়ে ঢুকে বুড়ার রুটি কাড়তে চায়নি, বউঝিকে বিদেশী হারাম কাপড় পরাতে চায়নি। শাহান্শাহ্ বাদ্শাহ্ দীনদুনিয়ার মালিক দিল্লীর তখ্ৎনশীন সরকার-ই-আলা যখন হিন্দুস্থানের গরম বরদাস্ত না করতে পেরে এদেশ হয়ে ঠাণ্ডা সবুজ মোশায়েম কাবুল শহরে যেতেন পাঠান তখন তাঁকে একবার তসলীম দিয়ে আসত। শাহানশা খুশ, পাঠান র্ত। বাদশাহের মীর-বখশী পিছনের তাঞ্জাম থেকে মুঠা মুঠা আশরফী রাস্তার দুদিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতেন। ‘জিন্দাবাদ
শাহানশা জাহানপনা’ চিৎকার খাইবারের দুদিকের পাহাড়ে টক্কর খেয়ে খেয়ে আকাশ বিদীর্ণ করে খুদাতালার পা-দানে গিয়ে যখন পৌঁছত তখন সে
প্রশংসাধ্বনি লক্ষ কণ্ঠের নয়, কোটি কোটি কণ্ঠের। সে আশরফী আজ নেই, পর্বতগাত্রে প্রশংসারব প্রতিধ্বনিত হয় না, কিন্তু ঐ পাথরের টুকরোগুলো পাষাণ পাঠান আপন ছাতির খুন দিয়ে এখনো স্বাধীন রেখেছে। তাই তার নাম এখনো ‘নো ম্যান্স্ ল্যান্ড’। পাঠান আর কি করতে পারত, বলুন।”
উর্দু-ফারসি সমৃদ্ধ ভাষা :
“তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাবুল শহরে দোস্ত-আশনা নেই? একা একা বেড়ানোতে দিল্ হায়রান হয় না? আমার বিবি বলছিলেন, ‘বাচ্চা গম্ মীখুরদ্ – ছেলেটার মনে সুখ নেই।’ তাইতে আপনার সঙ্গে আলাপ করলুম।’ বুঝলুম ভদ্রমহিলার সৌন্দর্য মাতৃত্বের সৌন্দর্য। নিচু হয়ে আদাবতসলিমাত জানালুম।”
ভাষার বাহাদুরি মুজতবার অন্যান্য গ্রন্থেও সর্বত্র। কিশোরপাঠ্য জলে-ডাঙায় (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ) কিশোর মনোরঞ্জক ভাষা :
ক. “ওদিকে… জাহাজের ভেঁপুর শব্দ – ভোঁ, ভোঁ –
তার অর্থ, যদি সে ছোট জাহাজের প্রতি হয়, ‘ওরে ও ছোকরা, সর না। আমি যে এক্ষুনি ওদিকে আসছি দেখতে পাচ্ছিসনে? ধাক্কা লাগলে যে সাড়ে বত্রিশ ভাজা হয়ে যাবি তখন কি টুকরোগুলো জোড়া লাগাবি গাঁদাপাতার রস দিয়ে?’ আর যদি তোমার জাহাজের চেয়ে বড় জাহাজ হয়, তবে তার অর্থ, ‘এই যে, দাদা, নমস্কারম। একটু বাঁ দিকে সরতে আজ্ঞা হয়, আমি তা হলে ডান দিকে সুড়ুৎ করে কেটে পড়তে পারি।’
আরবি পদ ও বাক্য-সহযোগে সংস্কৃতায়িত বাংলা :
খ. “তবুও তেরিয়া হয়ে বলে গেলুম, ‘আনা উশকুরুকুম’, ‘চোক তশক্কুর এদরং এফেন্দং’, ‘খৈলি তশক্কুর মিদ-মহাতান, কুরবান্’, ‘মহাশয় যে প্রত্যেকেরই কিছুটা স্বাতন্ত্র্য থাকতে বাধ্য। দেশ-কাল, শিক্ষা-দীক্ষা, সামাজিক-পারিপার্শ্বিক-পারিবারিক প্রতিবেশও শব্দপ্রয়োগ ও ভাষাগঠন যথেষ্ট প্রভাবশালী এবং ব্যক্তিচেতনা, শিল্পানুভূতি ও সংবেদনশীলতার স্পর্শে সৃষ্টিশীল লেখকের ভাষা আপন বিশিষ্ট রূপ লাভ করে। আর এ-স্বরূপ থেকেই তাঁর স্টাইল তথা ব্যক্তি-লেখককে শনাক্ত করা সম্ভব।
সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সাধুরূপ অক্ষুণ্ন রেখেও মুজতবা যেমন ভাষায় অবাধে আঞ্চলিক-আরবি-ফারসি কিংবা ইংরেজি বা অন্য যে-কোনো ভাষার শব্দ ব্যবহার করেছেন, তেমনি চলিত কাঠামোতেও করেছেন তৎসম শব্দের যথাবিহিত সুপ্রয়োগ। অর্থাৎ শব্দচয়নে গুরুচণ্ডালীকেই তিনি সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবং প্রয়োজন, শ্রুতিমাধুর্য ও স্বচ্ছতাকে দিয়েছেন সর্বাধিক গুরুত্ব। এ-কারণে একই রচনায় বিভিন্ন শৈলীর প্রকাশ হয়েছে অনিবার্য। ভাষাগঠনে মুজতবা যেমন জার্মান ভাষার অনুরূপ সুদীর্ঘ পদ ও বাক্য সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তাঁর লেখায় ফরাসি কায়দায় ছোট ছোট পদ-সংবলিত কোমল-মধুর বাক্যেরও প্রাচুর্য। তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পের ভাষ্য প্রায় অনুরূপ। ভ্রমণ-কাহিনীতে সম্পূর্ণরূপে আড্ডার মেজাজ বর্তমান। এবং এদিক থেকে লঘু নিবন্ধগুলো এরই সমগোত্রীয়। সংবাদপত্রীয় নিবন্ধে আবার ভিন্ন সুর, ভাষা ও বাচনভঙ্গিতেও পার্থক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর স্বচ্ছন্দ অনুবাদে মূলের রস অক্ষুণ্ন। সৃজনীপ্রতিভা ও ভাষার ওপর অসাধারণ দখলের ফলেই তা সম্ভব। বিষয়বস্তু অনুসারে রচনা কখনো হাস্যমুখর, কখনো অশ্রুসজল, আবার কখনো বা লঘু-গুরুতে সুরের ওঠানামা। শুধুমাত্র বিষয় বা কালের নিরিখে মুজতবার রচনাশৈলীর মূল্যায়ন যথেষ্ট যুক্তিবহ নয়। কেননা একইকালের অভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন ভাষারীতির আশ্রয়ে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর স্টাইলের ধারাবাহিকতা নির্দেশে আমরা কাল ও বিষয়বস্তু – উভয়েরই শরণ নেব।
পাঁচ
অদ্যাবধি প্রাপ্ত মুজতবা আলীর প্রথম মুদ্রিত রচনাদুটি – প্রকাশকাল যথাক্রমে ১৩৩৯ ও ১৩৪১ বঙ্গাব্দ – সাধু ভাষায় এবং ১৩৪২-এ প্রকাশিত তৃতীয়টি চলিতরীতিতে প্রণীত। রচনাত্রয়ের উদ্ধৃতাংশ –
ক. ‘যে-শব্দ আজকাল ভাষায় নেওয়া হইতেছে, সেগুলি কখনো কখনো শুদ্ধভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ উপন্যাস-নাটক বা পপুলার পুস্তকে ঃৎধহংষরঃবৎধঃরড়হ অনুযায়ী লেখা হয় না। তাহার কারণ, অধিকাংশ প্রেসে প্রয়োজনীয় রেখা ও সাঙ্কেতিক চিহ্ন থাকে না। দ্বিতীয় কারণ, অনেক উচ্চারণ যত কষ্ট করিয়া যত সাঙ্কেতিক চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করা হয় না কেন, সে-সব উচ্চারণ কোনো কালে সে-সব দেশের লোক করে নাই বলিয়া উচ্চারণ করিতে পারে না – যে যে-রকম খুশী উচ্চারণ করে।’ (‘বাঙলা ভাষায় আরবী-ফার্সী শব্দ’)
খ. ‘কবিতাতে নজরুল ইসলাম সাহেবের নাম করিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন এই যে, তাঁহার সৃষ্টি পরবর্তী যুগে কতদূর সম্মানিত হইবে। এ-যুগে তিনি আমাদিগকে অনেক কিছু দিয়াছেন, দশ বৎসর পূর্ব্বে তিনি বাঙলা ভাষায় নূতন উদ্দীপনা আনয়ন করিয়াছিলেন। দুই বৎসর পূর্ব্বের লেখা পড়িলে দেখা যায় যে, শব্দের ঝম্ঝমানিতে তিনিও ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছেন – মরমী হিয়ার গুঞ্জন-গান তিনি এখন আমাদিগকে মধুর ভাষায় শুনাইতে চাহেন। পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছি, কিন্তু পাপ মনকে দাবাইয়া রাখিবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও সে জিজ্ঞাসা করে : নূতন কি পাইলে?’ (‘বাঙালী মুসলমানের ভবিষ্যৎ সাহিত্য’)
গ. ‘মিসরী মধ্যবিত্ত ও ধনীরা অনেককাল পূর্ব্বেই তাদের দেশী বেশভূষা ছেড়েছে – একমাত্র তুর্কী-টুপি এখনও তার লাল নিশান চড়িয়ে আছে। ধনী ও মধ্যবিত্তদের জীবনধারণ পদ্ধতি দশআনা বিলিতি। তারা হোটেলে যায়, বায়োস্কোপ দেখে ও তিনটি বিলিতি ভাষায় কথা বলতে পারাকে ফ্যাশান মনে করে। তাদের গবর্নমেন্ট-য়ুনিভার্সিটিতে হরেক রকম তালিম দেওয়া হয়।’ (‘মিসরের বিদ্যায়তন’)
– লক্ষণীয়, রচনাগুলো ক্রমশ বিশ্লেষণাত্মক, সাহিত্যধর্মী এবং মৌখিক ও বিদেশী শব্দের ফোড়নে দ্রুতিশীল। প্রথম উদ্ধৃতির আড়ষ্টতার সঙ্গে পরবর্তী উদ্ধৃতিদুটির তুলনায় ভাষার ক্রমবর্ধমান গতি সম্যক উপলব্ধ এবং প্রথম থেকেই গুরুচণ্ডালীর গণ্ডি অস্বীকৃত। ক্রমেই সরস রসিকতা, বুদ্ধির দীপ্তি, আন্তরিকতা এবং সাহিত্যরসবোধে স্নাত মুজতবার রচনা আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশিষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত দুটি রচনার অংশবিশেষ তারই স্বাক্ষর :
ক. ‘বাংলা সাহিত্যের কোন সেবা আমি এ যাবত করিতে সক্ষম হই নাই। তবুও কেন যে আপনারা আমাকেই (সভাপতিত্ব করিতে) আহ্বান করিলেন সুস্থ মনে তাহার বিচার করিতে গিয়া বুঝিতে পারিলাম যে আপনারা নিরপেক্ষ লোক চান – যে কেহ সাহিত্যের সেবা করেন তিনিই কোন না কোন দলে ভিড়িয়া যান এবং সাহিত্যসেবার কৌলীন্য যাহার নাই সে-ই শুধু নিরপেক্ষ থাকিতে পারে।… আমার মত সাহিত্যসেবা করেন নাই – ভুলেও কবিতা বা গল্প লেখেন নাই এমন ব্যক্তি বোধহয় অদ্যকার সভায় কেহ নাই। আমার নির্গুণ যে গুণে পরিণত তাহা কে জানিত। …সাহিত্যসৃষ্টি, সাহিত্যসেবা সম্বন্ধে আমার চৌকস অজ্ঞতাই আমাকে নিরপেক্ষ রাখিবে।’ (সভাপতির অভিভাষণ)
খ. ‘ভক্তি ও সূফীতত্ত্ব দুইই প্রেমরসাত্মক। শাস্ত্রীয় হিন্দুধর্ম ও শাস্ত্রীয় মুসলমান ধর্মে মিলন হইল না – সে মিলনের চেষ্টা রাজপুত্র দারা শিকূহ্র মত দুই একজন পণ্ডিত করিয়াছিলেন – কিন্তু প্রেমের গঙ্গা-যমুনার মিলন হইল। উত্তর ভারতবর্ষে কবীর, দাদু; মহারাষ্ট্রে সন্তোজী, মুহম্মদ উভয়ধর্মের শাস্ত্রের শাসনকে উপেক্ষা করিয়া মধুর কণ্ঠে প্রেমের গান গাহিলেন। সে-গান মসজিদে মন্দিরে প্রবেশ করিল না কিন্তু ধর্মপিপাসার্ত লক্ষ লক্ষ নরনারীর হৃদয়ে সুধাবর্ষণ করিল।’ (মুসলিম সংস্কৃতির হেরফের)
অতঃপর কলমী নামে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় সৈয়দ মুজতবা আলীর আবির্ভাব ‘সম্পাদকীয় পরবর্তী কলাম’ লিখিয়ে হিসেবে এবং এ-পর্ব থেকে লেখনী-ই হয়েছে তাঁর জীবিকার্জনের বাহন। এ-পর্বের প্রাথমিক অবস্থায় সাধুভাষার ঠাঁটকেই তিনি জিইয়ে রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সক্রিয় সাংবাদিকের বিশ্লেষণী ক্ষুরধার যুক্তিধর্ম এবং পাঠক-লোভন বর্ণনভঙ্গি। সমাজচেতনা ও জাতিক-আন্তর্জাতিক রাজনীতি সংবাদপত্রীয় নিবন্ধাবলির মুখ্য বিষয়।
সাধুভাষার কাঠামোতে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ-শ্লেষ এবং দুর্বল নিপীড়িতের প্রতি লেখকের অকৃত্রিম স্নেহধারা লেখাগুলোকে জনপ্রিয় করেছিল এবং এ-জনপ্রিয়তার মূলে তাঁর অনন্য বর্ণনভঙ্গি। সংবাদপত্রের সাধারণ পাঠক সংবাদের সঙ্গে রসাস্বাদনেরও পক্ষপাতী। মুজতবার রচনায় সেই রসের অণুমাত্র ঘাটতি নেই। যুদ্ধাপরাধী জার্মানের ‘বিচার’ প্রসঙ্গে লিখেছেন :
‘হেস্, গ্যোরিঙ, শাখট্, রিবেনট্রপ… ইত্যাদিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিয়া নুরেনবের্গের পূজামণ্ডপে, এই নবমীর হিড়িকেই লইয়া যাওয়া হইয়াছে। কামারের আপশোষের অন্ত নাই যে, তিনটা জব্বর পুরুষ্টু পাঁঠা বেড়া ভাঙিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে, হিটলার, গ্যোবেলস্ ও হিমলার।’ (দৈনিক আনন্দবাজার)
ওইসব নিবন্ধের স্টাইলে আলী সাহেব ক্রমশই স্বব্যক্তিত্বে প্রকাশমান। প্রথম পর্যায়ে ‘সত্যপীর’ নামে আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘হযবরল’ কলাম ও অন্যান্য লেখায় তিনি সাধুভাষায় সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে ‘রায় পিথৌরা’ নামে ‘দেহলি-প্রান্তে’ ও ‘সপ্তপর্ণী’ কলামে এবং দৈনিক সুমতীতে লিখিত নিবন্ধসমূহে মুজতবা চলিত রীতিকেই অবলম্বন করেন। অবশ্য ‘দেহলি-প্রান্তে’র কয়েকটি লেখায় ‘সাধুপন্থার’ সৌজন্য দেখাইলেন, তাহা ভারতবর্ষের ইতিহাসে যুগ-যুগান্তব্যাপী অবিস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। কিন্তু হাল্ফিন্ আমরা লৌহবর্ত্মশকটে আরোহণ করিতে অক্ষম যেহেতুক আমাদের পরম মিত্র চরমসখা শ্রী শ্রীমান আবুল আস্ফিয়া নূরুদ্দীন মহম্মদ আবদুল করীম সিদ্দীকীকে পরিত্যাগ করিয়া দেশান্তর গ্রহণ করিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।”
ভ্রমণকাহিনীর ভাষাবৈচিত্র্য আরো বিচিত্র বর্ণে রঞ্জিত উপন্যাস-ছোটগল্পে। বিভিন্ন পরিবেশে সৃষ্ট চরিত্রসমূহের বাঙ্ময় উপস্থিতি এবং পারিপার্শ্বিকতা ও পরিপ্রেক্ষিত-চিত্রণে লেখকের ভাষা-শিল্পের বিচিত্র বিকাশ। শব্নম্ (১৩৬৭) গ্রন্থটি তো ভাষার সোনালি স্বপ্ন। গদ্যের কতো বিচিত্র সুরই না এতে ধ্বনিত। মুজতবার সহজ-সরল ভাষার ঘরোয়া রূপ :
ক. ‘বিদেশে বর্ষাকাল আমার কাল। কাবুল কান্দাহার জেরুজালেম বার্লিন কোথাও মনসূন নেই। ভাদ্দোর মাসের পচা বিষ্টিতে মা অস্থির। তাঁর নাইবার শাড়ি শুকোচ্ছে না, ভিজে কাঠের ধুঁয়োয় তিনি পাগল, আর আমি দেখছি হুড়মুড় করে বৃষ্টি নেমে আসছে, খানিকক্ষণ পরে আবার রোদ। আঙ্গিনার গোলাপ গাছে, রান্নাঘরের কোণে শিউলি গাছে, পিছনের চাউর গাছের পাতায় পাতায় কী খুশীর ঝিলিমিলি।’
যাবনিক শব্দমিশ্রিত শব্নমের ভাষা :
খ. “ ‘জানেমন্ কে?’
‘আমার জিগরের টুকরো, কলিজার আধা, দিলের খুন্, চোখের রোশনাই, জানের মালিক – আমার জ্যাঠামনি।’ ”
সংস্কৃতসিক্ত গদ্য :
গ. ‘আমাদের মাথার উপর পূর্ণচন্দ্র।… দেখি, প্রখর চন্দ্রালোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে শব্নমের সিত ভাল্লে, স্ফুরিত নাসিকারন্ধ্রে, ঈষাতার্দ্র ওষ্ঠাধরে, সমুন্নত কঞ্চুলিকা শিখরাগ্রে। বেলাতটের নীলাভ কৃষ্ণাম্বুর মত তাঁর চোখের তারায় গভীর নৈস্তব্ধ্য।’
বহুরূপ ভাষার নিদর্শন শহ্র্-ইয়ার (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ) উপন্যাসও। উর্দু-ফারসির আওতায় বর্ধিত ডাক্তার জুলফিকার আলী খানের মিশ্রভাষার স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ :
‘যদি ইজাজৎ দেন তবে একটা র্আজ্ আছে। শুনলুম, কলকাতায় আপনি এক দোস্তের বাড়িতে উঠবেন। তার চেয়ে এবারে আমাদের একটা চান্স্ দিলে আমরা সেটা মেহেরবানী মেনে বড় খুশি হব। আমাদের বাড়ীতে প্রচুর জায়গা আছে। যদি হিম্মত দেন তো বলি, আপনার কোনো তকলীফ হবে না।’
কথার তোড়ে ফরাসি-জার্মান-ইংরেজির মতো হিন্দি-হিন্দুস্থানি শব্দ এবং বাক্যেরও মুজতবার গদ্যে হরদম যাতায়াত। ‘বিধবা-বিবাহ’ গল্প থেকে তারই কিঞ্চিৎ নমুনা : ‘হাব্শি-রাজও কিছু নিকৃষ্টি মনুষ্য নন। সয়াজীরাও-এর দিল্-তোড় মহব্বতের বদলে তিনি কি সওগাত দেবেন সে বাবদে বহুৎ আন্দিশা করেও তিনি কোনো ফৈসালা করে উঠতে পারলেন না। …
সে-বৎসর গরম পড়েছিল বেহদ্। লু চলেছিল জাহান্নামের হাওয়া নিয়ে, আর আকাশ থেকে ঝরেছিল দোজখের আগুন। … শুকনো গরমের জুলুমে আমার দাড়ি গোঁফ পর্যন্ত যখন পটপট করে ফেটে যাচ্ছিল এমন সময় শহরময় খবর রটলো, হাবশি বাদ্শাহ্ হাইলে সেলাস্সি মহারাজ সয়াজীরাওকে এক জোড়া সিংহ-সিংহী তোফা পাঠিয়েছেন,- তার মুল্লুকের সবচেয়ে বড় জানোয়ার। ‘হিজ হাইনেস সয়াজিরাও মহারাজ, সেনা-খাস-খেল বাহাদুর, ফরজন্দ-ই-দৌলত-ই-ইন্কলিসিয়া, শমসের জঙ্গ বাহাদুরের কদমের ধূল্লো হবার কিস্মৎ এদের নেই, তবু যদি মহারাজ মেহেরবানী করে এদের গ্রহণ করেন, তবে হাবশি বাদশাহ বহুৎ বহুৎ খুশ হবেন।”
‘রসগোল্লা’য় বর্ণনা প্রায় চিত্ররূপ পেয়েছে : ‘হঠাৎ বলা-নেই-কওয়া নেই, ঝাণ্ডুদা তামাম ভুঁড়িখানা কাউন্টারের উপর চেপে ধরে ক্যাঁক করে পাকড়ালেন চুঙ্গীওলার কলার বাঁ হাতে, আর ডান হাতে থোড়ে দিলেন একটা রসগোল্লা ওর নাকের উপর। ঝাণ্ডুদার তাগ সব সময়েই অতিশয় খারাপ।’
প্রকৃতির বর্ণনায় সর্বত্র মুজতবার কবিজনোচিত শিল্প-চেতনার প্রকাশ। প্রকৃতি-বর্ণনার সামান্যতম সুযোগকেও তিনি অবহেলা করেননি। যেমন,
‘ভানুমতী দিকে দিকে কাজলধারা বইয়ে দিয়েছে। চতুর্দিক অন্ধকার।
শুধু ফুটে উঠেছে অন্ধকার-ঘাসের উপর লক্ষ লক্ষ বিজলি-বাতির ফুল। আকাশের ফরাশেও দেবতারা জালিয়ে দিয়েছেন অগুণতি তারার মোমবাতি। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, পাহাড়ের উপরের দিকে যে আলোগুলো জ্বলছে সেগুলো মানুষের প্রদীপ না দেবতার তারা। মানুষ স্বর্গের দিকে ধাওয়া করে উঠেছে পাহাড়ে, আর দেবতারা নেমে এসেছেন পৃথিবীর দিকে ঐ পাহাড়ের চূড়ো পর্যন্ত – একে অন্যকে অন্ধকারের এপার ওপার থেকে সাঁঝের পিদিম দেখাবার জন্য।’ (বিদেশে)
সহানুভূতি ও দরদ মুজতবা আলীর রচনাবলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নিষ্পৃষ্ট বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে একাত্ম লেখকের অনুভূতি :
‘… ’৭১-এর ন’ মাস যেন বন্যার মত পূব-বাংলার লোককে হত্যা করে, ইতস্তত নিক্ষিপ্ত করে, গৃহহীন অন্নহীন আত্মীয়-আত্মজনহীন করে দিয়েছিল, কিন্তু, কিন্তু এখন? এখন দিনের পর দিন – কত দিন ধরে চলবে তৃষ্ণার্তের এক আঁজলা পানির তরে আকূতি? যে বন্যা কুল্লে মুল্লুক ভাসিয়ে ছয়লাপ করে দিয়েছিল সেই বন্যাই যাবার বেলা নিয়ে গেছে তৃষ্ণাতুরের শেষ জলকণাটুকু! কিস্মৎ! কিস্মৎ!! কিস্মৎ!!!’ (ভাষা-বাঙলা)
রম্যরচনায় ব্যবহৃত মানবিক শব্দে ‘সৈয়দি-রীতি’র দ্যুতিময় গদ্য :
“এবারে শোনা গেল এক পদস্থ অশ্বারোহীর কটুবাক্য আর তীব্র চিৎকার – ইনি অন্ততপক্ষে ফৌজদারই হবেন। ‘ওরে সব না-মর্দ, বেওকুফ, বেকার নাকম্মার দল। এই এখ্খুনি বেরিয়ে আয়, কাম খতম্ করে। নইলে হজরৎ আলীর ঝাণ্ডার কসম খেয়ে বলছি, তোদের কিয়ামতের শেষ-বিচারের দিন এই লহমাতেই হাজির হবে। আল্লাহর গজব, আল্লার লানৎ তোদের উপর, তোদের বাল-বাচ্চার উপর।’
আজব সেই লড়াই তাজ্জবভাবে ফৌরন থেমে গেল। দোস্ত দুশমন কোনো পক্ষের কেউ মারা গেল না, হার মানলো না, ধরা দিল না, – আচানক সবকুচ্হ্ বিলকুল ঠাণ্ডা!” (অদৃষ্টের রঙ্গরস)
সৈয়দ মুজতবা আলীর গদ্যশৈলীর আরো কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ্য। যথা –
১. বক্তব্য রসগ্রাহী ও লক্ষ্যভেদী করার মানসে মুজতবা-রচনায় উইট-হিউমার বিশেষ শস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত।
২. সমার্থক বা প্রায়-সমার্থক শব্দ, প্রবাদ ও সমাসের পুনঃপুনঃ এবং পরপর ব্যবহারে বক্তব্য জোরদার ও ভাষার জৌলুস বেড়েছে। ব্যবহৃত মিশ্র শব্দ ও পদের অধিকাংশ স্থলেই অপরিচিত শব্দের পরে কিংবা পূর্বে বাংলা অথবা পরিচিত শব্দ বসিয়ে বক্তব্য সুবোধ্য করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধ্বনিমাধুর্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, আবার কোথাও বা পাঠকের মনের গভীরতর স্তরে তা’ গেঁথে দেওয়ার মানসেই সমার্থক বিভিন্ন ভাষার শব্দ প্রয়োগ এবং এ-রীতিতে মুজতবা আলী কার্যকর সন্ধি-সমাসও করেছেন।
৩. মুজতবা আলীর রচনায় পুরাণ ও ঐতিহ্যের ব্যবহার ব্যাপকতর এবং ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে তিনি ভারতীয় ও ইসলামি তথা মধ্যপ্রাচ্য – উভয় স্রোতকেই সমগুরুত্বে ব্যবহার করেছেন। উভয় ঐতিহ্যের সম্মিলনের প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়।
৪. সৈয়দ মুজতবা আলী দেশী তথা আঞ্চলিক শব্দ ও বুলি পরিপূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে আপন সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, যথাসম্ভব মুখের ভাষা ও লেখার ভাষার দূরত্বমোচন অর্থাৎ উভয়ের নৈকট্যস্থাপন। এজন্যে বারবার তাঁকে মৌখিক ভাষার দ্বারস্থ হতে হয়েছে এবং কোনো অঞ্চলবিশেষেও নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ফলে অনিবার্যভাবে তাঁর লেখায় কলকাতা-বীরভূম-বর্ধমানের সঙ্গে ঢাকা-বরিশাল-সিলেট-ময়মনসিংহের মৌখিক ভাষার ঘন ঘন সাক্ষাৎ মেলে।অনুভূতি-অনুষ্ঠানের স্বচ্ছতর প্রকাশের জন্যেই ভাষা। আপন চেতনার বাঙ্ময় রূপদানের উদ্দেশ্যেই শিল্পী শব্দসন্ধানী। বিষয়বস্তু, চরিত্র ও পারিপার্শ্বিকতার নিটোল চিত্রায়ণের নিমিত্ত শিল্পীর ভাষাও বর্ণালি হয়ে ওঠে এবং শ্লথ একঘেয়েমির কবল থেকে মুক্তি পেয়ে পাঠকচিত্তে পুলক জাগে। ভাষানির্মাণে লেখকের শিল্পীমনের অনুভূতি, শিক্ষা-দীক্ষা, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিক মন-মেজাজ অনেকখানি নির্ভরশীল। ভাষাবৈচিত্র্যের এক অপূর্ব রত্নাকর মুজতবা-রচনা সম্ভার। সংস্কৃত-আরবি-ফারসি-হিন্দুস্থানি-ইংরেজি-ফরাসি-জার্মান, সাধু-চলিত, আঞ্চলিক – সর্ববিধ শব্দসমন্বয়ের ফসল তাঁর লঘু-গুরু সাহিত্যের ভাষা-মিনার এবং সৈয়দ মুজতবা আলী একক না হলেও বাংলা গদ্যের অনন্য কারুকার।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.