মোহরআলি তখনো ভূতগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখের সামনে প্রায় মরো মরো জলাশয়। তাতে কচুরিপানার দঙ্গল কালো মেঘের মতো জমাট বেঁধে ছিল। ফলে জল আছে কী নেই, বোঝা মুশকিল।
অথচ খানিক আগে এই আছে কী নেই জলে ইফু খলবল তুলেছে! মোহরআলির দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে পাতালি বরাবর হেঁটে গেছে। মোহরআলি বাধা দেবার ফুরসত পায়নি। আর বাধা দিলেই কি ইফু তা মানতো?
মাঘের বিদায় সমাসন্ন বলে খালবিলের কাহিল দশা। জল নিংড়ে নিংড়ে একেবারে তলানিতে জমেছে। অবশ্য জল তলানিতে পৌঁছালেই কী! মাছ বা সাপের সম্ভাবনা মাথায় না এলেও জোঁকের বিষয়টা একেবারে ফেলনা নয়।
ইফু যখন জলাশয়ের পাতালি বরাবর হেঁটে গেছে তখন দু-চারটা জোঁক রক্তলোভে তাকে কি আঁকড়ে ধরেনি? ইফু যতই সাপ-মন্তর বলুক মোহরআলি ওর কথা কস্মিনকালেও বিশ্বাস করবে না। দু-চারটা জোঁক ইফুর নরম ঊরুর সন্ধানে নির্ঘাৎ পা বেয়ে উপরে উঠেছিল। ইফু এ-বিষয়ে যতই ধুনফুন বুঝাক, তা অন্য কেউ বিশ্বাস করলেও করতে পারে, কিন্তু মোহরআলিকে কিছুতেই বিশ্বাস করানো যাবে না। কারণ মোহরআলি
এ-জলাশয়ের আগ-পাছ-তলার সকল বৃত্তান্তই জানে।
আজ যে মোহরআলির কী হলো? ইফুর রকমসকম দেখেমতো ভ্যাবাচ্যাকাতে পড়ল। দু-চারটা কাজের কথা পাড়তেই তো সে ইফুর পথ আগলেছিল। কিন্তু হোক-না-হোক ইফু যে অমন মারমুখী হয়ে উঠবে তা কে জানত!
নিজের বউ, যার সঙ্গে পাঁচ পাঁচটা বছর ঘর করল, সে কিনা তাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করল না! মোহরআলির কোনো কথাকে একেবারে আমল না দিয়ে দুদ্দাড় জলাশয়ে নেমে পড়ল! তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে ছপছপ শব্দ তুলে পাতালি বরাবর দিল হাঁটা। ফলে মোহরআলির ভূতগ্রস্ত হওয়া ছাড়া উপায় কী?
ইফুর কাজ-কারবারে মোহরআলি যতই বিরক্ত হোক না কেন, তাকে দু-চারদিন না দেখলে কোথায় যেন তার খালি খালি লাগে! মোহরআলি অনুভব করেছে পুরানো কাঁথার মতো নরম এক মায়া তাকে কেমন আচ্ছন্ন করে ফেলে। দিন নাই রাইত নাই বুকের ভেতর ছটফটানো ভাব। মোহরআলি তখন সদ্য ডাঙায় তোলা কই মাছের মতো ঝাপটাঝাপটি করে। এই যে একটু আগে ইফুর রণমূর্তি – যেন সাক্ষাৎ মা কালি। সামান্য সুযোগ পেলেই মোহরআলিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। মোহরআলি তখন মনে মনে ভয়ানক ভড়কেছিল বটে। ইফুর এমন চণ্ডালমূর্তি মোহরআলি কিনা কালেভদ্রেই দেখেছে। ইফু তো আগাগোড়াই শান্তপ্রকৃতির। নিজের মাঝে জবুথবু হয়ে থাকা মানুষ। কিন্তু মোহরআলি হাসনাকে নিকে করার পর সব কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল! বাওকুড়ানি যেন এক ঘূর্ণিতে ইফুকে ঘরের বের করে দিল। তার আগ পর্যন্ত মোটামুটি সে ঘর-দুয়ার করেই কাটিয়েছে। নয়া বউ হয়ে মোহরআলির ঘরে যখন সে এলো, তখন কী চমৎকার গিন্নিবান্নিই না ছিল। তখন তাদের নিকানো ঘরদোর, পরিপাটি জীবন। নুন-তেল-পেঁয়াজ-মরিচের হিসাব সামলে-সুমলে ইফু তো সূচিকর্মেও কম যেত না।
আতাগাছে তোতাপাখি গুনি মনে মনে
সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে!
মোহরআলির চক্ষের মণিতে এখনো সেসব দিন কিরকম রঙিন হয়েই না ভেসে বেড়ায়! ইফুর হাতে বানানো রসের পিঠা, মোয়ামুড়কি, পায়েস। চৈত্রমাসে তালের পাখার হাওয়া।
জবারং ফিতা দিয়ে ইফুর কলাবেণি, এক প্যাঁচ দিয়ে পরা জাফরানি নয়তো ধানি সবুজ শাড়ি। একরত্তি মেয়েটা দেখতে-না-দেখতেই ফিতা-শাড়িতে কেমন ভারি সারি হয়ে উঠল। ওসব কথা মনে হলে মোহরআলির এখনো কিরকম ধান্দা লাগে!
এই যে খানিক আগে, আছে কি নেই জলে খলবল তুলে যাওয়া ইফু – তার সঙ্গে আতাগাছে তোতাপাখির ইফুকে মেলায়, সে সাধ্যি কি কারো আছে?
ইফুকে দেখলে মোহরআলি নিজেই কিরকম ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কলাবেণির ইফু এখন মাথাভর্তি রুখু চুলের জঞ্জালে উকুনের বংশবিস্তার করে চলে।
পরনের শাড়িখানার ঝলমলে জরির আলো কত আগে যে নিভে গেছে! তবু নিত্যদিন কিনা ইফুর গতরে এই শাড়িখানা শোভা পায়! মোহরআলি স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায় – এই শাড়িখানা তো সে হাসনাকে নিকে করার সময় দিয়েছিল। হাসনার কাছ থেকে শাড়িটা ইফু নাকি প্রায় জোর করে কেড়ে নিয়েছে। তারপর রোজ একবার না একবার এই শাড়িখানা তার পরা চাই। চা-ই। তা সতীনের নিকের শাড়ি এরকম করে আগলে রাখার কারণ কী? মোহরআলির আন্ধা মগজে কিচ্ছু ঢোকে না। ঢুকবে কী? মোহরআলির মাথার কলকব্জায় ইফুর কারণে মরচে
ধরে গেল।
আঁতুড়ঘরে প্রথম বাচ্চাটা মেরে ফেলার পর থেকেই ইফু ভয়ানক উদাস। ইফুর চক্ষের দিকে তাকালে মনে হয় যেন ত্রিভুবনের বাইরের কিছু দেখে চলেছে। অন্যমনস্কতা আর ক্লান্তি উসকে দিতে দিতে বহুদূর চলে গেছে। ইফুর এরকম চাহনি দেখে মোহরআলি প্রথম প্রথম ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিল। অবশ্য মনের ভেতর ক্ষীণ আশাও ছিল, হয়তো তার দেখার ভুল। হয়তো ইফু ঠিকই আছে। অথবা নিজেকে এই ভেবে সান্ত্বনা দিয়েছিল, বাচ্চার শোক সামলে উঠলে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আদতে কিছুই ঠিক হয়নি। তহিরণ দাই আঁতুড় থেকে বেরিয়ে মোহরআলিকে সংগোপনে বলেছিল, ‘মোহরমিয়া তুমার বউডার দুষে এমুন সুনার টুকরা ছাওডা শ্যাষ হইলো।’
মোহরআলি পুরুষমানুষ। প্রসব-জটিলতার কিই-বা সে বোঝে? তবুও লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে দাইকে প্রশ্ন করেছিল, ‘তা কীবা অইলো এই কাম?’
‘তুমার বউডা কেমুন বেদিশা – কথা শুনলোই না। কতই না বুঝালাম।’
এটুকু বলেই তহিরণ দাই হাঁটা দিয়েছে বাড়ির পথে। মরা বাচ্চার বাড়িতে সময়ক্ষেপণের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তার নাই। মুখচোরা মোহরআলি আর কিছু বলতেও পারেনি। ফলে সবকিছু খোলাসা করে জানাও হয়নি।
মোহরআলির সামনে তখন ইফুর খরখরে চোখ। কালোমণিজুড়ে স্থিরতা। ছাওয়ালডা আঁতুড়েই মরলো, তা দেখেও ইফু একবিন্দু কাঁদেনি। না কেঁদে মরা ছাওয়ালডা কোলের মধ্যে নিয়ে বসে ছিল। আর খানিক পরপর বুকে-পিঠে কান পেতে পরখ করছিল। হয়তো তার মনে গোপন আশা ছিল যদি সামান্য ধুকপুক শোনা যায়। কিন্তু ইফুর কানপাতাই সার হয়েছে। মরা বাচ্চাটা মায়ের হাতের তীব্র উত্তাপে একবারও নড়ে ওঠেনি।
মোহরআলি যখন চোখের জলে ভাসতে ভাসতে নিজের ছাওয়াল গোর দিতে গেল, ইফু তখন উদাস। চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ্দুর যেন ইফুর দুই চক্ষু পুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তাতে আর বিন্দুমাত্র জল নেই। এতটুকু শীতলতা নেই। যেখানে কেবল ধুলোমেশা বাতাসের আছাড়িবিছাড়ি। মোহরআলি তখন মনে মনে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছে। প্রথম সন্তানের মৃত্যুবেদনা ভুলতেও তো মানুষের সময় লাগে।
ঠিক পরের বছরই ইফু ফের পোয়াতি হয়েছে এবং পুনর্বার সে একই দৃশ্য দেখেছে! নিথর ছাওয়ালডা সত্যি সত্যিই একটা পুতলা যেন। কী তার সৌষ্ঠব! টিকালো নাক, টানা ভ্রƒ, ধবধবে রং আর একমাথা কালো চুল। দেখতে দেখতে ইফুর অন্তর পুড়ে খাক হয়েছে। সে মনেপ্রাণে চেয়েছে পুতলাটা একবার নড়ে উঠুক। অন্তত একবার ট্যাঁ ট্যাঁ করে কেঁদে উঠুক। কিন্তু তার আশা পূরণ হয়নি। মোহরআলি ফের চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তাকেও গোর দিয়েছে। তখন ইফুর তেমনি এলানো দৃষ্টি। আর তাতে চৈত্রমাসের ধুলোমেশা বাতাসের ঝাপটা।
তহিরণ দাইয়ের ওইসব কথার পর ইফুর প্রতি মোহআলির অন্ধটান কেমন যেন আলগা হয়ে গিয়েছিল। আপন সন্তানকে কোনো নারী মেরে ফেলতে পারে শুনে মোহরআলির কাছে কেমন ধান্দাই লেগেছিল। মোহরআলির বিক্ষিপ্ত মন শান্ত হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। বরং উলটো সে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল ইফুর নানা কিসিমের পাগলামিতে।
দুই
হাসনার হিলহিলে গতরে গত কয়েকমাসে এক-আধটু চেকনাই জমেছে। ফলে তার লম্বাটে মুখটা হাঁসের ডিমের আদল পেয়েছে। মোহরআলি তাজ্জব মানে – গায়ে-গতরে চর্বি-মাংসের পরত পরলে মেয়ানুক কেমন আমূল বদলে যায়!
চর্বি-মাংসের জেল্লায় হাসনা যেন হঠাৎ সোমত্ত হয়ে উঠেছে। আলগা সৌন্দর্য এসে তার সারা অঙ্গ ভরিয়ে দিয়েছে। হাসনাকে কেমন অচেনা, অন্যরকম লাগে। মোহরআলির মাঝে মাঝে ভ্রম হয়, এই মেয়ানুককেই সেদিন সে নিকে করে এনেছে! ছোটমোট মেয়েটি আজকাল রান্নার খড়ি-জাবরা-পাতা যোগাড় থেকে শুরু করে পচা ডোবায় মাছ ধরা পর্যন্ত সমান তালে চালাতেপারে। একটু অবসর পেলেই ছিপ নিয়ে বসে যায়। মোহরআলির ঘরে আসা অব্দি হাসনার কোনো কাজে আলস্য নেই। কিন্তু হলে কী হবে, মন তার খাঁখাঁ করে। মনে তার একফোঁটা শান্তি নেই। মোহরআলি তাকে ত্যক্ত বিরক্ত করে মারে, এমন নয়। তবুও হাসনার মনে শান্তি নেই। হাসনা জানে সুখের চেয়ে শান্তি বড়। হাসনার এই অশান্তির মূলে মোহরআলির প্রথম পক্ষ! ইফুর সঙ্গে মোহরআলির এখনো ছারকাট হয়নি। ফলে ইফু যখন-তখনই চলে আসে মোহরআলির ঘরে। হাসনাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তার ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে ওঠে। এই হাসি বিদ্রƒপ না তাচ্ছিল্য না অবজ্ঞার – হাসনা ধরতে পারে না। তবে ইফুকে নিয়ে যতই অস্বস্তি হোক হাসনা তা প্রকাশ করে না। বরং সতীনকে সে ভালোই খাতির-যত্ন করে। হেঁসেলে শাকান্ন যখন যা থাকে ইফুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘বড় আফা খাইয়া লন।’
‘না, না, তুমার ঘরে খামু না।’
‘আমার ফির ঘর কী? আমার ফির বাইর কী? অহনো আফনেরই সব। আমি খালি হের দেখভাল করি। কাজকম্ম করি। আমি যুদি না রানধি তয় হে উপোস থাহে।’
হাসনার কথা শুনে ইফু সর্বাঙ্গে ঢেউ তুলে হাসে। চোখদুটো সরু করে কী যেন ভাবে, তারপর মুখ গম্ভীর করে বলে, ‘উপুস! উপুস! হেয় থাহে! না, না, উপুস তো আমি থাহি।’
‘তাহলে বড় আফা খাইয়া লন দুগা।’
হাসনার কথামতো ইফু লক্ষ্মীমেয়ের মতো ভাতে হাত দেয়। কিন্তু এক লোকমা ভাতও সে মুখে তোলে না। বরং দাওয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে দেয়। ভাতের গন্ধ পেয়ে হাঁস-মুরগি ছুটে আসে। শালিক-চড়াই বাঁশ গাছের আড়াল থেকে ঝাপটে নামে। হাঁস, মুরগি, শালিকের খাওয়া দেখে ইফু স্বস্তির হাসি হাসে। শুধুমাত্র এই সময়ে তার চোখের উত্তপ্ত জমিনে ঘন মেঘের ছায়া দেখা যায়। হাঁস-মুরগি-শালিকের খাওয়া শেষ হলে ইফু তৎক্ষণাৎ উঠে পড়ে। হাসনা অবাক নয়নে সতীনের কাণ্ডকারখানা দ্যাখে! মনে মনে ভয় পায়, তাকে একলা পেয়ে ইফু যদি কোনোদিন ঝাঁপিয়ে পড়ে! বলা তো যায় না, নিজের দুটো সন্তান যে আঁতুড়েই মেরে ফেলেছে – তার পক্ষে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। ফলে মনে মনে ভয়ানক অসন্তুষ্ট হলেও ইফুকে ঘাটাতে সাহস পায় না। ইফুর মনের গতিক ধরা হাসনার কম্ম নয়। ইফু কখনো রাতে থাকে না – থাকতে চাইলে কী করবে হাসনা ভেবে দ্যাখেনি। ইফুকে বিশ্বাস কী! কখন যে কোন বেতাল ঘটিয়ে ফ্যালে? এরই মধ্যে সে নানা অনাসৃষ্টি ঘটিয়েছে। একদিন দুপুরের রোদ মাথায় করে হাসনার দাওয়ায় নির্ভাবনায় বসে থেকেছে। তারপর বলা নেই কওয়া নেই, মোহরআলির সদ্য কিনে আনা চারখানা হাঁস ছেড়ে দিয়ে এসেছে বিলের ধারে। বাড়ির পথঘাট অচেনা বলে তারা আর ফিরে আসতে পারেনি। কোথায় কোন হাঁসের দঙ্গলের সঙ্গে ভিড়ে গেছে কে জানে!
বিল থেকে ফিরে এসে ইফুই হাসনাকে বিস্তারিত বলেছে, ‘বুঝলা তুমার হাঁস চারডা বিলে ছাড়্যা দিয়া আসলাম। বাড়িত খালি ভাত কুড়্যা খায়। ওহানে গুগলি শামুক খায়্যা পেট ভরাক।’
একটু দম নিয়ে ফের বলেছে, ‘পানি হইলো হাঁসের জেবন। পানিত না দিয়া সেগুলা ডাঙায় রাখলে গুনাহ হয় বুঝলা? তাই আমিই দিয়া আসলাম পানিতে।’
ইফুর হাঁস-বৃত্তান্ত শুনে হাসনা কাঁদবে না হাসবে বুঝতে পারেনি।
আরেকদিন আরেক ভজঘট বাধিয়েছে। দুপুরের রান্না সেরে হাসনা ছিপ ফেলে বসেছে পচা ডোবায়। ইত্যবসরে হাসনার রান্না করা সব সালুন ঢেলে দিয়েছে নেড়ি কুত্তার সামনে। দুপুরে খেতে এসে মোহরআলি দ্যাখে এই কাণ্ড! রাগে সে ইফুকে জোরে ধমক দিয়েছে। কিন্তু ইফু তাতে দমেছে বলে মনে হয় না। কারণ তার পরের হপ্তা সে ফের একই কাণ্ড ঘটিয়েছে।
মোহরআলির মাঝে মাঝে সন্দেহ জাগে, এইসব উলটা-পালটা কাজ ইফু হয়তো ইচ্ছে করেই করে। আর ইফুর কথাবার্তা শুনে কে বলবে এসব অনাসৃষ্টি সে ঘটায়! কথা বলার সময় এমন তালতুলে কথা পাড়ে যে মোহরআলির টাসকি লেগে যায়। হাসনাও অবাক হয়, এরকম অঘটন যে নিত্য ঘটায় সে এমন তালের কথা বলে কী প্রকারে?
হাসনা আরেকটা বিষয় খেয়াল করেছে, মোহরআলির বিছানাটা ইফু তীক্ষè নজরে দ্যাখে। চৌকির চারপাশে ঘুরে ঘুরে সর্বদা কী যেন বিড় বিড় করে। হাসনা থাকতে না পেরে কতদিন জানতে চেয়েছে, ‘বড় আফা কী কইন আপন মনে?’
ইফু যেন হাসনার কথা শুনতে পায়নি, এমনি ভাব করে বিড়বিড় করে গেছে। হাসনা ফের জিজ্ঞেস করেছে, ‘বড় আফা আমারেই কি কিছু কন কিনা?
‘না, না, তুমারে কী কবো?’
ইফু এড়িয়ে গেলেও হাসনা বিষয়টা নিয়ে ভেবেছে। হাজার হোক মোহরআলি এখনো তার সোয়ামি। এই ঘর-দোর একদিন ইফুই তো আগলে ছিল। এই বিছানা ইফুর জন্যই পাতা ছিল। ইফুকে কেউ চলে যেতে বলেনি। হাসনাকে নিকে করার পর ইফু স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে চলে গেছে। তবু পুরানো টানেই হয়তো সে দু-একবার ঘুরানি দিয়ে যায়। হাসনা জানে না, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বা স্রেফ কৌতূহলের বশেই ইফু এখনো এ-বাড়িতে আনাগোনা করে কিনা?
তিন
অসময়ের বৃষ্টি-বাদলা হাসনার কাছে বরাবরই ঘ্যানঘ্যানে মনে হয়। গত কদিন ধরে এরকম বর্ষণ হচ্ছে তো হচ্ছেই। থামার নাম নেই। সামান্য বিরতি দিয়েছে কী আকাশ ভয়ানক মুখ বেজার করে রাখে। এদিকে মেঘের দলও কম বেতাল করে না। এ-গাছ তো সে-গাছ বট-কড়ই, সুপারি না নারিকেল যা হোক এক গাছের মাথায় ঝুলে থাক। তা না। যখন-তখন ছিট্টিছান হয়ে উঠে যাচ্ছে। তা যাবি তো যা, কিন্তু ফ্যাৎ করে কেন কেঁদে ফেলিস ছিঁচকাঁদুনে মেয়ের মতো! যখন-তখন এরকম করে নাকের জল আর চোখের জল এক করলে ভজঘট না ঘটে কি পারে? আর এরকম হলে হাসনা পড়ে যায় বেকায়দায়। তার রান্নার খড়ি-জাবা ভিজে একসা। আধখান টিন দিয়ে কোনোমতে বানানো হেঁসেলে জলকাদা প্যাচপ্যাচ করে।
আর বাদলার সময় উনুনের পেটের ক্ষিদেও কেমন মিইয়ে থাকে। তখন ফুঁকনি দিয়ে হাজারবার ফুঁক ফুঁক করলেও পেট তার চাঙ্গা হয় না।
হাসনা এমনিতেই শীতকাতুরে। তদুপরি হঠাৎ করে ঝড়-জল নামলে তার শরীরটা একেবারে বিগড়ে যায়। একটু সামলে সুমলে না চললে জ্বরজারি বাঁধতেও সময় লাগে না। অবশ্য এই বিনবিনানো জ্বরজারি খুব-একটা পাত্তা দিতেও পারে না। একা মানুষ – বিছানায় একবেলা ঢললেই সবদিক আন্ধার। আর মোহরআলিও ইদানীং বড় চড়চড়ে মেজাজের হয়েছে। পাতের ভাত ঠিকমতো না পেলে সারাবাড়ি মাথায় তুলে ফ্যালে। মোহরআলি খিদের মুখে লাগাম কশতে জানে না। এ-ই তার বদদোষ। ফলে শীতের সকালে আরেকটু জবুথবু করে বৃষ্টি ঝরতে থাকলেও হাসনাকে গতর খাটাতে হয়। ওদিকে ঝড়-জলে কাকভেজা হলেও ইফুর আসা-যাওয়ার কমতি নাই। হাসনা এক প্রকার ঈর্ষা নিয়েই তার দিকে তাকায়। একে তো শীত, তার উপর বাদলা – মেয়েলোকটা বৃষ্টিজলে দিনরাতই ভিজে, এতে করে তার নাকেও একটু ফোতফাত হয় না! হাসনার ভেতরটা চাপা রাগে চিড়বিড় করে ওঠে, ‘দেহ একখান! কিমুন তরতাজা। বিষ্টি মাথায় দিনভরই ঢইঢই করে, তবুও রোগ বালাইয়ের আছর নাই।’
হাসনা এখনো ইফুর রকমসকম বোঝে না। আর তার মরদটাও কিমুন! সে কেন এখনো ইফুকে ছারকাট দেয় না! অথচ দু-দুটো ছাওয়াল মেরে ফেলার দুঃখে এখনো সে গভীর রাতে চোখের জল মোছে।
এদিকে হাসনাও অফলা। মোহরআলি মাসের এ-মাথায় তে-মাথায় খবরের আশায় থেকে থেকে হতাশ। হাসনা প্রতিমাসে রক্তের ঢল নামিয়ে দেয়। তার তলপেটে কিছুই গুটিবেঁধে ওঠে না! মোহরআলি কী করবে দিশা পায় না। তার নসিব কত মন্দ! ইফু যাহোক তাকে অন্তত বাবা না হওয়ার অপবাদ থেকে বাঁচিয়েছে। আজকাল ইফুকে দেখলে তার কেমন যেন সব উলটা-পালটা লাগে। মনে হয়, ইফু যেন সব দেখতে পায়। ইফুর দৃষ্টি এতটাই ধারালো যে, বুকের তল পর্যন্ত সে যেন ছেঁকে তুলতে পারে।
হাসনাকে নিকে করে আনার পর ইফু এ-নিয়ে মোহরআলিকে কিছুই বলেনি। শুধু নীরবে তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এমনকি মোহরআলিকে দুটো ভালোমন্দ কথা বলার সুযোগও সে দেয়নি। মোহরআলি অবশ্য ইফুর সঙ্গে ভাবজমানোর নানান কায়দা করেছে। কিন্তু ইফু যেন তা বুঝেও না বোঝার ভান করেছে। ফলে মোহরআলির সন্দেহ হয়েছে ইফুর ওরকম উলটা-পালটা কাজ-কারবার কি তবে ইচ্ছাকৃত? ইফু কি ইচ্ছাকৃতভাবে ওসব ঘটিয়ে লোকজনকে বিভ্রমে রাখতে ভালোবাসে? এসব নিয়ে তার মনে নানা প্রশ্ন জট বাঁধলেও কোনো সুরাহা হয়নি। ইফু তার কোনো কথাই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। হাবে-ভাবে বুঝিয়েছে মোহরআলির সঙ্গে ভালো বা মন্দ আর কোনো কথা বলতে সে আগ্রহী নয়। পাগলের কাণ্ড ভেবে মোহরআলি বিষয়টা এড়াতে চেয়েছে। কিন্তু কোনো কোনোদিন তার মনে হয়েছে ইফু হয়তো তার প্রতি বিতৃষ্ণ। একথা মনে করে মোহরআলি খানিকটা বিষণ্নও হয়েছে। কখনো কখনো ইফুর ওপর ভয়ানক রাগ জন্মেছে। ভোলাভালা উদাস চোখে তাকিয়ে থাকা মেয়েমানুষটির জ্ঞানের নাড়ি টনটনে দেখে। কে বলে ইফু পাগল!
মোহরআলি মনে মনে এ-ফন্দি এঁটেছে, ইফুকে একদিন বাগে পেলে হয় – ওর পাগলামির ভূত নামিয়ে ছাড়বে।
…
শীতের শেষে বর্ষণ সবকিছু কেমন লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। ফলে শীত যাচ্ছি-যাবো করেও যেন বিদায় নিতে পারছে না। এবারের বৃষ্টি যেন চামড়া-মাংস ভেদ করে হাড়ের কন্দরে হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে।
গত দুইদিন খুব ঝাঁপাঝাঁপি ঝড়-জল বলে মোহরআলি ঘর ছেড়ে বেরোয়নি। অথচ এই ঝুম বৃষ্টিতে ইফু এসে হাজির। তার সর্বাঙ্গ জলে ভেজা। চুলের ডগা বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে জল। ইফুকে দেখে মোহরআলির বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচর খেয়ে ওঠে। আহা! এই বউটাই কিনা দুদুটো ছাওয়ালকে যমের মুখে ঠেলে দিয়েছে!
ইফু আর মোহরআলি দুজনে মুখোমুখি হলেই হাসনার তীব্র অস্বস্তি হয়। কিন্তু কোনোভাবেই সে তা প্রকাশ করে না। বরং ইফুর দিকে একখানা শাড়ি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘আফা ভিজা কাপড়ডা বদলায়া লন।’
‘না, না, লাগবো না। আমি এহনি চইলা যাবো।’
‘তা যাইবেন যান। কাপড়ডা বদলায়া লন।
‘না, না, থাউক। আমি তো অহনই চইলা যাবো।’
‘অহনই চইলা যাবো’ বলে ঠিকই, কিন্তু চলে যাবার উদ্যোগ নেয় না। হাসনা তখন মোহরআলির ভাবগতি লক্ষ করে। মোহরআলিও কি চায় ইফু আজকের রাত্রিটা এখানেই কাটাক! এই সমস্ত তালগোলের ভেতর বৃষ্টি ফের ঘন হয়ে নামে। আর ইফুও বারকয়েক যাই-যাবো করে, কিন্তু ওঠার কোনো ইচ্ছা দেখায় না। ফলে বৃষ্টির ঝুলে থাকা পর্দার ভেতর দিয়ে রাত কখন গাঢ় হয় তিনজনের কেউই বুঝতে পারে না।
বস্তুত বৃষ্টি আরো ঝেপে নামে। হাসনা না-আলো না-অন্ধকারের মাঝে ভাত-সালুন সাজিয়ে দেয়। মোহরআলি গোগ্রাসে ভাত খেয়ে নেয়, কিন্তু ইফু হাত গুটিয়ে থাকে। কোনোরকম ক্ষুধা-তৃষ্ণাতেই যেন সে কাতর নয়! ইফু ভাত খাওয়ার কোনো আগ্রহ দেখায় না। বরং লম্বা হাই তুলে জড়ানো গলায় বলে, ‘ঘুম ধইরা গেল কেমতে!’
‘তা আফা শুইলে শুয়া পড়েন।’
‘তা কইবা শুই? তুমারে মুছিবতেই ফেললাম।’
‘আমার ফির মুছিবত কী? আফনে চকিডার উপর শুইয়া পড়েন। আমি দপে ঘুম যামুনি।’
ইফু সত্যি সত্যি চকির ওপর শুয়ে পড়ে। শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত নারীটিকে দেখে কে বলবে যে সে ছিটগ্রস্ত! কে বলবে, এই ঘর বা বিছানায় তার আর কোনো অধিকার নেই!
মোহরআলি কোথায় শোবে সেটাই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ‘এহনো ছারকাট হয় নাই’ – একথা মনে করে হাসনা তাকে ইফুর কাছেই ঠেলে পাঠায়। কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর, শীত-বাদলার রাতে হাসনা নির্ঘুম চোখ মেলে রাখে।
খানিকসময় পর হাসনার কাঁথার নিচে ঢুকতে ঢুকতে মোহরআলি রাগে গরগর করে, ‘মাগির জব্বর দেমাগ। গতরে হাত দিলেই য্যান ফোসকা পইড়া যায়।’
কিন্তু হাসনা এ-নিয়ে কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখায় না। ফলে মোহরআলিও পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে।
….
পরদিন সকাল ভালো করে ফুটে ওঠার আগেই মোহরআলির ঘুম ভেঙে যায়। তাকিয়ে দ্যাখে দরজা খোলা। ইফু বিছানায় নেই। ইফু কি তবে ভোর না হতেই চলে গেছে! ভাবতে ভাবতে চকির পাশে দাঁড়ালে ঝাঁঝাল গন্ধে মোহরআলির শরীর ঘুলিয়ে ওঠে। বিছানার ভেজা অংশ দেখে তার বুঝতে বাকি থাকে না ইফু কী অপকর্ম করে গেছে।ইফু মোহরআলির বিছানা মূত্রজলে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। ইফু কি স্বেচ্ছায় এ-কাজ করেছে? কে জানে!

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.