কবিতা

  • মেগাসিটি

    সুজন হাজারী ভোরের সূর্যের দুয়ার খুললে মেগাসিটির ট্রাফিক মোড়ে সিগন্যাল স্ট্যান্ডে সংকেতবাতি জ্বলে ওভারব্রিজের আন্ডারগ্রাউন্ড সিঁড়ির নিচে ব্যথাতুর চাতুর্যে গেঁথে ফেলা অন্ধকার আড়ালে যাপিত জীবন রাত্রির নিষিদ্ধ কাব্য লেখে। অন্ধকার সুবর্ণ আলোর মিছিলে ঢ্যামনার সোহাগ মুছে যায় রমনা পার্কের বেঞ্চিতে বসে উঠতি যুবতীরা খদ্দেরের প্রত্যাশায় চিনাবাদাম চিবায় ভেংচি কেটে বেহায়া পথিকের দৃষ্টি কাড়ে কাছে ডাকে…

  • আনন্দ উড়ান

    মৃণাল বসুচৌধুরী তোমার প্রশ্রয়ে যখন অলস মেঘ আকাশরেখার পাশে জমে থাকা স্বপ্নকণা ছুঁয়ে নেমে আসে আমাদের আয়ুহীন চোখে যখন নিসর্গ থেকে বিন্দু বিন্দু সুখ নিয়ে উড়ন্ত পায়রাগুলো নেমে আসে অন্ধকার ছাদে পরিশ্রান্ত বিমর্ষ শরীরে যখন বৃষ্টির শব্দ ছদ্মবেশী মারীচের তীব্র ছোটাছুটি নির্জন দালান জুড়ে পাখির পালক স্মৃতিজলে অভিমানী ম্লান যখন আপসহীন বিষণ্ন কপালজুড়ে বালিয়াড়ি মরুঝড়…

  • চোখে অনাদি জল

    শিহাব সরকার বিজন পাহাড়ে হেমন্তের হিমকুয়াশা বনপথে একা হাঁটি, দূরে আলোঝলমল সার্কাসে ধুন্ধুমার বাদ্যব্যান্ড অরণ্যমন্দিরে নিভু-নিভু লণ্ঠন, সমস্বর স্তবগান। শুনছো না ঝোপেঝাড়ে পিশাচের কানাকানি ডিস্কোতে মুখোশের আড়ালে দৈত্যদানো, শহরে চলছে খুব সান্ধ্যভাষা, গূঢ় সংকেত ভিড়ের মধ্যে অচেনা মুখ এই জাগে, হারায়। বনের ভিতর জমাট ঠান্ডা, তার চেয়ে ভয় আগুনের পটে রক্তের পিচকিরি অন্ধকারে ক্ষুধার্ত কালো…

  • রেলব্রিজে একা

    হারিসুল হক আস্তে আস্তে কমে আসছে চোখের জোর। বাঁ-চোখে অত আর ভালো দেখতে পাই না ক্রমে ক্রমে ডানটাও যাবে হয়তো বা (যাবার কি কোনো রোডম্যাপ, দিনক্ষণ ঠিকঠাক থাকে) আর অত দেখেই কী লাভ সুনীলদা – শুধু কষ্ট শুধু কষ্ট সহস্র বঞ্চনার নদী আমাদের ঘিরে বসতবাড়ির উঠোন জুড়ে খালি উইঢিপি অরণ্যে একাকী কাক মগডালে ঠোঁট  ফাঁক…

  • লসঅ্যাঞ্জেলেসের পথে

    কাইয়ুম চৌধুরী কুয়াশা কেটে যাওয়া রোদ মাখা শস্যক্ষেত যতদূর চোখ যায় দ্রুত অতিক্রম করে যাই জলপাই বাগান হেমন্ত হাওয়ায়। দূর পাহাড়ের সারি সোনালি তৃণে ঢাকা মুক্ত আকারে নীলাভ সবুজে জল টলটল তুলির ডগায় স্বচ্ছ রঙেতে আঁকা। সারি তোলা দ্রাক্ষাকুঞ্জ সমান্তরালে অপস্রিয়মাণ তৈরি করে উল্লম্বরেখা সিঞ্চিত জলধারা ঘূর্ণায়মান। বাড়িঘর, নদীনালা বিদ্যুৎ টাওয়ার, গোলাবাড়ি দিগন্তছোঁয়া চারণভূমি হলুদ…

  • না, শোকগাথা নয় (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উৎসর্গিত)

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত কখনোই তুমি চাওনি তোমার মৃত্যুসংবাদ চৌদিকে চাউর হয়ে যাক, সেজন্যেই বুঝি তোমার চলে-যাওয়ার সময়টায় পর-পর চারদিন জুড়ে কলকাতায় কোনো কাগজ বেরোয়নি, বেরোলেও বিলি হয়নি, আর হকারের সেই অপ্রত্যাশিত ছুটির উল্লাসে সুন্দরবনের আশেপাশে সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছিল সবুজে সুনীলে পিকনিকের মহানন্দে Ñ তুমি যেরকম চেয়েছিলে। আমি তখন এলাহাবাদে প্রবাসী বাঙালিদের পূজার মণ্ডপে তোমার কবিতা নিয়ে…

  • প্রিয়ভাষিণীর টিয়ে

    মারুফ রায়হান একটা নিষ্পত্র গাছে বসেছিল কি মিষ্টি টিয়েটি উজাড় বৃক্ষের দেশে কবিমন সবুজরহিত বীজ বন্ধ্যা হলে বুঝি মৃত্যুথাবা, বিস্তৃত বিপন্ন সুগন্ধে ভরুক মৃতপুষ্প – চেয়েছিল বৃক্ষসখা বাতাস বিনষ্ট হলে, বিষ মিশ্লে স্নেহার্দ্র মাটিতে মুছে যাবে উদ্ভিদের সুপ্রকাশ – জন্মইতিহাস মেঘে মেঘে ডানা মেলা পাখির ঠিকানা দৃঢ় ডাল বাঁচে যদি প্রাজ্ঞ গাছ, সুরও জাগে টিয়ের…

  • স্বপ্নের সূর্যটা যেন মুক্ত হয়

    নাসির আহমেদ স্বপ্ন সমাহিত! সব শেষ? বাঁশঝাড়ে জ্বলছে শোকার্ত জোনাকিরা। স্তব্ধতার অন্ধকারে ঝিঁঝিরাও নীরবতার শয্যায় ক্লান্ত মেঘের ভারে নুয়ে পড়েছে আকাশ। হয়তো কান্নার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। দুঃখের সমুদ্র ফুলে উঠছে আমার বুকের মধ্যে। অথচ তোমার জন্য, হ্যাঁ স্বপ্ন, শুধু তোমার আমন্ত্রণেই আসা এতটা কণ্টকাকীর্ণ পথ। তোমার দ্যুতিতে ঝলসে উঠেছিল সমস্ত পরিপাশ^র্, তীব্র স্বপ্নের উপমা যদি বাঁধভাঙা…

  • পরদেশি

    পিনাকী ঠাকুর পেটে লাথি মারল তবু বলতে হবে, ‘দোয়া করো পির’! শহর-বাজারে ঘুরছি পরদেশি ব্যর্থ মুসাফির। কামান, নাগরিভাষা, সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ, তাপ্পি মারা আলখাল্লা, এই দেহে ফকিরের সাজ মনে আজ বেঁধে রাখছি করুণ সংলাপ, জারিগান ‘কল্যাণের দিকে এসো’ – মুয়াজ্জিন দিচ্ছেন আজান এই দিল্ মরুস্বর্গ, কারবালায় আজও ঝরছে খুন আশরফি ছুড়ে দিলে আমাকেই, জুলেখা খাতুন?

  • দেখা

    আশিস সান্যাল দেখা হলো পুনর্বার বরাকের পাশে তখন নদীর জলে ছড়ায়েছে গোধূলি রোদ্দুর ঘরে ফেরা পাখিদের শোনা যায় চারদিকে নিবিড় কূজন। বললাম মৃদু হেসে : আবার এখানে তুমি? তার চেয়ে ভালো এই বেঁচে থাকা পৃথিবীর দুই দিকে আমরা দুজন। শীর্ণা হীরার মতো হাত তার মুখে তার অপরূপ উদ্ভাসিত রোদের প্লাবন, চোখে তার স্বচ্ছ আভা যেন…

  • কেন যে তোমার সঙ্গে

    হায়াৎ সাইফ কেন যে তোমার সঙ্গে দেখা হলো এমন অনুর্বর দিনে বৃষ্টির মৌসুম চলে গেছে বহুদিন শুষ্ক বাতাসে চামড়াও ফেটে যায় রক্ত ঝরে সর্বত্র শরীরে, কেন যে তোমার সঙ্গে দেখা হলো এমন বেমক্কা দিনে চারদিকে যখন মন্বন্তরের মতন সমূহ রণন খেলা করে, তবু কেন প্রতিটি অঙ্গে তোমার অরণ্যের মাদকতা, সবুজের চিকন আভাস লাবণ্যের দৃপ্তি ঝরে…

  • কূজন

    পিয়াস মজিদ মেঘ ও রৌদ্রের গ্রন্থিমূলে বয়ে যায় কত কবরদ্যোতনা। সে হাওয়ার কূলেই তো যাবতীয় কৃষ্ণ জাগরী, স্বপ্নের দ্গি¦লয়। এমন ঈমনকল্যাণ-বসন্তভৈরবী! তবু রাত্রি দুপুরের রাগ ওই তো আমার অনন্ত নিদ্রাবেদিতে। কাননে কাননে জলকরবীর ঢেউ; পুষ্পবহ্নি বেজে ওঠে কারো সুবাসিত করতলে। বন্দরে ভিড়ল রক্তমুখী চাঁদনী।