ছোট গল্প
-
ফাঁদ
আহমাদ মোস্তফা কামাল বউয়ের কাছে ক্রমাগত অপদস্থ হতে হতে একসময় জামানের মনে হতে থাকে – এই ভোগান্তির জন্য সে নিজেই দায়ী, কিংবা তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপটুতা দায়ী। সিদ্ধান্তটি ছিল শায়লাকে বিয়ে করা। তার দূরদৃষ্টি নেই, ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে সে-সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা করতে অসমর্থ, ফলে বিয়ের আগে থেকে শায়লাকে চিনলেও এবং বহু ঘটনায় তার…
-
নিমগাছের নিচে ছয়জন
আনোয়ারা সৈয়দ হক ছয়জনই দাঁড়িয়ে থাকে দাদার আমলের নিমগাছের নিচে। তারা শুধু দাঁড়িয়ে থাকে না, মাঝে মাঝেই ওঠবস করে, মাঝে মাঝে পায়চারি; অস্থিরতায় মাঝে মাঝেই নিজেদের হাতের আঙুল মটকায়, মটকানো আঙুলে মটমট শব্দ ওঠে, শব্দগুলো যেন হে আল্লা, আল্লাহু করে, প্রকৃতপক্ষে যাকে বিলাপ বলা যায়। তাদের বুকের ভেতরে যেন পাথরের ভার নেমে আসে, নিঃশ্বাস নিতে…
-
জীবনানন্দের খোঁজে
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বনপথের প্রান্তে যার সঙ্গে দেখা সে যদি আবারো চলে যায় ওই বনপথের গভীরেই, কারো কিছু বলার থাকে না। আমারও ছিল না। শুধু ভাবনা, বরং বলা যাক, সামান্য অস্বস্তি – বনপথে দিশা হারাবেন না তো তিনি? এই সেই বনপথ নয়, বনদেবী এখানে পথ দেখায় না, খেলাও করে না। দেখা যাবে না বনমাঝে কোনো কুমারী…
-
চাষাভুসো মানুষের স্বপ্ন
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আমার বাবা অদ্ভুত, নম্র স্বভাবের চাঁদে পাওয়া মানুষ। চাঁদ উঠলে বাবা বাইরে চলে যেতেন, একা একা মাঠে ঘুরতেন, আর কবিতা বানাতেন। বাতাস উঠলেও তাই, বাবা বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়–তেন, আর কবিতা বানাতেন। বাবা অদ্ভুত স্বভাবের মানুষ। বাড়ির সামনে, রাস্তার পাশে, সুপারির বাতা দিয়ে তৈরি নামাজের স্থান। বাড়ি থেকে দূরে গাছগাছালি নেই,…
-
জলজাঙাল
আবুবকর সিদ্দিক নাও এখন! ভোরবিহানের এই উঠতি বেলায় অপয়া হ্যাপাটা সামলায় কে বলোদিকিনি? ভিনগাঁওয়ের সেই পোঁদে পোক পড়া মর্কুটে কুত্তাটা মরে চিতিয়ে আছে বাঁশতলায়। কে যাবে ওটাকে বিলভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসতে? রোদ্দুর চড়তে না চড়তেই গন্ধ ছাড়তে লাগবে; তার বেলা? কাদুবিধবা নাকে আঁচলচাপা দিয়ে বলে, মরণ! ছাদুমুন্শি বিড়বিড় করে, অস্তাগফের…! আলামত নাজুক! দুই মাসটা কী,…
-
মনে করি এই গল্পটি গার্সিয়া মার্কেজের
পিয়াস মজিদ মহিমান্বিত আপনাদের আমি একান্ত গাবো। জ্যোতিঃপ্রভাময় সময়ে আমি লিখতে চেয়েছি তমসলেখা কারণ সূর্যের চেয়ে বেশি মালঞ্চে আমি অস্ত যেতে দেখেছি গোলাপগুচ্ছর। মাকোন্দোর ছলে আমি তো শুধু মাকোন্দোর কথাই বলিনি বরং আমার মাকোন্দো ছড়িয়ে আছে হাভানা থেকে হাতিয়া অবধি। যেখানেই ক্ষুধা, লুটপাট, মাফিয়া, স্বৈরাচার, গুণ্ডাপান্ডা, দুর্নীতি, সেখানেই অনিবার্য মাকোন্দো। ফি-সন মঙ্গা আর বন্যায় ভাসা…
-
দুপুর রাতের দিন
পারভীন সুলতানা কী দ্রুতই না পার হচ্ছি শহর-নগর-গঞ্জ, গ্রাম, হাট-বাজার, নদী-খাল আর সারবাঁধা ক্ষেতিখলা। সবকিছুই ঘুমন্ত এখন। মাঝরাতের ট্রেন ঘুমকাতর আধবোজা স্টেশনে কিছু কিছু মানুষ নামাচ্ছে বা তুলছে। ট্রেনের ভেতর যাত্রীরাও ঘুমে লতোপতো। ছুটে-চলা অধৈর্য ট্রেনটার ওপর রাগ হয় আমার। কাকচোখ জ্যোৎøায় ভেসে যাচ্ছে বাইরের দুনিয়া। কিন্তু দেখার উপায় কই! দুরন্ত গতির তোড়ে কী নদী,…
-
প্রফেসর পিটার এবং…
মালেকা পারভীন পিটার উইলিয়ামস বা এরকম কিছু একটা নাম-টাম হবে হয়তো। আমার ভালো মতো মনে নেই। তবে যদি কখনো তার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করি, নামটা ঠিকভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করবো নিশ্চিত। এখন ততটুকুই বলি যতটুকু ঘটেছে। অবশ্য বলার মতো আসলেই কি কিছু ঘটেছে? বুঝতে পারছি না। বাট, দ্যাটস অ্যান ইন্টারেস্টিং এনকাউন্টার, আই মাস্ট অ্যাডমিট। গতকাল…
-
দিল্লি বহু দূর
বদরুন নাহার আমার পা ক্রমশ শ্লথ হয়ে আসে, অথচ এতক্ষণ রেজওয়ানের আগে আগে হাঁটছিলাম। থেমে যাওয়ায় ও পেছন ফিরে এক ঝলক দেখে কোনো প্রশ্ন না ছুড়েই একা একা এগিয়ে গেল জামে মসজিদের অসংখ্য সিঁড়ি পেরোতে। সাধারণত এসব স্থানে থেমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক জেনে এসেছি। সেই ছেলেবেলায় আমপারা পড়তে ঢুকেছিলাম মসজিদের বারান্দায়। ছোট হুজুর পড়াতেন আলিফ ……
-
জন্মান্ধ দিনের শেষে
ইমতিয়ার শামীম ভরআশ্বিন গ্রামে অরিত্র কোনোদিন যায়নি। কিন্তু কবে যেন সেখানে সে যেতে চেয়েছিল। এমন নয় তা কথার কথা, সত্যিই সে চেয়েছিল তখনি রওনা হতে। যদিও পকেটে টাকা-পয়সা ছিল না তেমন (তখন তো টাকা-পয়সা থাকার বয়সও নয়!), তাছাড়া কেন যেন রেল-বাসও চলছিল না কোনো রুটে। তবে সত্যিই যেতে চেয়েছিল সে – মনে হয়েছিল, ভরআশ্বিন গ্রাম…
-
আবদুল আহাদের মুখ
স্বকৃত নোমান চৌত্রিশ বছর পর ক্যাপ্টেন সৈয়দ ওয়াসেত আলি করাচি জুমা মসজিদের অজুখানায় অজু শেষে সাদা লম্বা দাড়িতে হাত বুলিয়ে পানি ঝরাতে ঝরাতে তারই মতো সাদা লম্বা দাড়িওয়ালা, গায়ের রং বাঙালিদের মতো কালো, বেঁটেখাটো, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি ও পরনে সাদা লুঙ্গি পরা, দেখতে অনেকটা ডিসি আবদুল আহাদের মতো, বুড়ো লোকটাকে দেখে চমকে ওঠে। চেহারার মিল…
-
সত্য যখন মিথ্যাকে আলিঙ্গন করে
মাসউদুল হক তখনো আমাদের আকাশে সূর্য ওঠেনি। অন্য কোনো আকাশে ওঠা সূর্যের দু-একটা দুর্বিনীত রশ্মি আমাদের আকাশের অন্ধকারের সঙ্গে কাটাকুটি খেলায় মত্ত হয়েছে মাত্র। বড় আলস্যের সময় তখন। এমন সময় প্রচণ্ড গতিতে দুটি গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ শুনে, আমাদের যাদের ঘুম পাতলা তারা, একটু নড়েচড়ে উঠলেও অন্য সময়ের মতো জানালা দিয়ে মাথা বের করি না।…
