ছোট গল্প
-
দেহ ও দেহাতীত
হুমায়ূন মালিক ড্রইংরুমে বসে ও বোঝে শোভনা অদ্ভুত এক রাফ ভঙ্গিতে ওয়্যারড্রব খুলছে – তা খোলার শব্দে তার দিকে তাচ্ছিল্য ছুড়ে মর্দানি ফলাচ্ছে। মাহিনকে স্কুলে পাঠিয়েই সে বেরিয়ে যাওয়ার এমন এক প্রস্ত্ততি খেলায় মাতে। এখন ও তার পার্মিশন নেওয়া দূরে গায়ে-গতরে কামত্রুুদ্ধ হুলোবিড়ালের ভঙ্গি নিয়ে তারই সামনে দিয়ে বেরোবে। ঠিক আছে, একটা মেয়ে, তা একটু…
-
খসড়াজীবন
ইমতিয়ার শামীম পুকুরের পাড়ে সজনে গাছওয়ালা দালানের পাশে টিনশেডের ঘরটায় সাজেদা যখন মেঝের ওপর বিছানা পাততে থাকে, একটা রিকশা তখন টুংটাং বেল বাজিয়ে নর্থ রোডের দিক থেকে এসে ছুটতে ছুটতে চলে যায় হাতিরপুলের দিকে। পুরানা খবরের কাগজ মাপতে মাপতে বেলের শব্দে কান তুললেও চিপা দোকানটার মধ্যে থেকে লোকটার আর চোখে পড়ে না সে রিকশার পেছনে…
-
দয়ালহরির আত্মরক্ষা
পাপড়ি রহমান সেই গন্ডগোলের বছর দয়ালহরির বয়স ছিল চৌদ্দো। সদ্য কৈশোরে দাঁড়ানো দয়ালহরির চোক্ষের সামনে এমন ধুরমার গন্ডগোল লেগেছিল যে, সে-দৃশ্য এখনো সে ভুলতে পারে নাই। দয়ালহরির মা শৈলবালা একমাত্র সন্তানকে সেই গন্ডগোলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কত চেষ্টাই না করেছিল! আর সে-গন্ডগোলেরও কি এমন-তেমন গন্ডগোল ছিল নাকি? দয়ালহরি একটু বুঝদার হওয়ার পর বুঝেছিল –…
-
এই জীবনে
নুরুল করিম নাসিম গত রাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। এরকম কখনো হয় না। হয়নি জীবনে কখনো। কাল রাতে হয়েছিল। কেন হলো এরকম? অনেকক্ষণ বিছানায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। আর অনেক প্রশ্ন এলো। সারাটা মন কী রকম ফাঁকা ও উদাস হয়ে গেল। বিষণ্ণতায় ভরে গেল সারাটা ঘর। মনের ভেতর কীরকম হাহাকার হতে লাগলো।…
-
লতায়পাতায়
ধ্রুব এষ লতাপাতা আসবে ৩টায়। অধীর হয়ে আছেন। লতাপাতা। আসলে নাম কী মেয়েটার? লতা, না পাতা? একদিন বলেছে লতা। একদিন বলেছে পাতা। এরকমই বলে এরা। আজ কী বলবে? লতাপাতা? তৃতীয় দিন আজ। বেজায় বৃষ্টি হয়েছে সকালে। বাতাসে সেই বৃষ্টির ঘ্রাণ আছে এখনো। তবে আর বৃষ্টি হবে না। আকাশে মেঘ নেই, রোদ এবং নীল রঙের দাপট।…
-
ভালোবাসার নাম
রফিকুর রশীদ আমি তার নাম রেখেছিলাম মেঘনীল। স্কুল-কলেজের খাতায় তোলা ভালো নামের পাশাপাশি খুব ছোট্ট একটা আটপৌরে ডাকনামও ছিল তার। বেশ মিষ্টি। খানিকটা আদুরে-আদুরে শব্দ – নীপা। কিন্তু ওই আদুরে নামে আমার মন ভরেনি। পরিচয়ের পর থেকে আমি তাকে ওই নামে ডাকিনি বললেই চলে। ‘নীপা’ শব্দের অর্থ কী? এই নাম যে বয়ে বেড়াচ্ছে এতদিন ধরে,…
-
আমাদের শিউলিমালার
জাকির তালুকদার তখনো, আসব-আসব করলেও, আমাদের ঘরে-ঘরে ডিশ অ্যান্টেনা আসেনি। মুম্বাই-নায়িকাদের ঊরু-ভুরু-শরীর দেখিয়ে প্রতিরাতে তখনো বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার ডলার কামিয়ে নিতে শুরু করেনি ভারতের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো। আবার এসব নায়িকাকে দেখে-দেখে সেসব ডিজাইনের জামা-কাপড় বানাতে শেখেনি আমাদের শহরের মেয়েরা। তখনো আমাদের মেয়েদের কামিজগুলোর বুকে-পিঠে এতটা উদোম জায়গা থাকত না, বুকের কাছে এতটা টাইট থাকত না…
-
বলি
শাহ্নাজ মুন্নী শেফালির মসৃণ কিন্তু ঈষৎ ভারী তলপেটের কোমল খাঁজ থেকে হঠাৎ নিজের লাঙলচষা শক্ত হাতটা সরিয়ে এনে হিম-শীতলচাপাগলায় আবুল বাশার বলে, ‘বিয়ার আগেই তোর পেটে বাচ্চা আছিলে, ঠিক না!’ একমাস আগে বিয়ে করা নতুন বউকে ঠিক প্রশ্ন নয়, তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া বা জবাবদিহিতাও নয় যেন, বরং বাশারের কণ্ঠে একধরনের হতাশ বিস্ময়। ক্ষোভ নয়,…
-
একগুচ্ছ বেলিফুল অথবা শিরোনামহীন গল্প
আহমাদ মোস্তফা কামাল সেনাকুঞ্জে বন্ধুর শালির বিয়ের বিলাসবহুল চোখ-ধাঁধানো আয়োজন থেকে বেরিয়ে হারুনের মনে হলো – নিজে গরিব হয়ে বড়লোকদের বন্ধু হওয়ার মতো বিপজ্জনক ব্যাপার আর নেই। এদের নানারকম বাহানা থাকে, বায়নাও থাকে, গরিব বন্ধুদের সেসব মেটাতে গিয়ে অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। এই যেমন আজকের ব্যাপারটাই ধরা যাক। তোর শালির বিয়ে, ভালো কথা, তুই যত…
-
শত্রু কিংবা শত্রুসম্পত্তি
রাশেদ রহমান উৎসর্গ : মাহবুব আলম, আমার গল্প-কবিতার মুগ্ধপাঠক মঠের সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে যতু পাল। ‘বাবা, তুমিই বলো, লোকে এইসব কী বলে – আমরা নাকি দ্যাশের শত্রু? তোমার দেহ এখানে, ঠাকুরদার হাড়মাংস মিশে গেছে জয়শ্রীর মাটিতে; তারপরও আমরা দ্যাশের শত্রু! বাবা, বাবা গো…।’ প্রতিদিন সকালে স্নান-আহ্নিক করার মতো পুকুরপাড়ে মঠের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জল…
-
সে এক আদিম অন্ধকারে
হামিদ কায়সার রাত ঠিক ২টার সময় বাসটা তেঁতুলিয়া স্টেশনে থামল। অচিন ভেবেছিল বাকি রাতটা ও বাসে বসেই কাটিয়ে দেবে। মাত্র তো তিন-চার ঘণ্টার ব্যাপার, ভোরের আলো ফুটলেই ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয় উঠবে। কিন্তু ড্রাইভার গাড়ির কাজ গুছিয়ে বাস থেকে নেমে যাওয়ার মুহূর্তে জিগ্যেস করল, ‘কী ভাই নামবেন না?’ অচিন উনার গলা শুনেই বুঝল বিশেষ সুবিধা…
-
গোপাল মেকারের অন্তর্ধান
সালেহা চৌধুরী হিলির রেললাইনের ওপারে ভারত, এপারে পাকিস্তান। আর গোপাল মেকার সাইকেল সারাই করে। পাকিস্তান হয়ে গেলে গোপাল মেকারের সব আত্মীয়পরিজন ওপারে চলে গেল। মামা, মাসি, দাদা, দাদার ছেলেমেয়ে, এমনকি ওর বউ কমলা পর্যন্ত। ও গেল না। বললো – এইডা আমার দেশ। আমি দেশ ছেড়ে কেমন করে যাই? বউ মুখ ঝামটা দিয়ে, নথ নেড়ে বলে…
