প্রবন্ধ
-

সিংহের নিয়ম
যুবকবয়সে রবীন্দ্রনাথ পদ্মার পাড়ে দাঁড়াতেন, দেখতেন নিসর্গের বিস্তৃতি; পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে খোয়াইর পাড়ে দাঁড়াতেন, দেখতেন নিসর্গের রুক্ষ-কঠিন শ্রী এবং দুক্ষেত্রেই ভাবতেন মানুষ প্রকৃতির বদলে কী তৈরি করেছে – এই ভাবনা তাঁর মধ্যে একটি অপ্রিয় বোধ জাগাত। এই বদল, বদলে দেওয়া তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এই বিচার থেকে তিনি কখনো সরে যাননি। পদ্মার পাড়ে…
-

সাম্রাজ্যবাদ ও রবীন্দ্রনাথ
সাম্রাজ্যবাদ কি আকাশটাকেও বন্দি করে ফেলছে? উত্তরে বলতে হয় ‘হ্যাঁ’। অন্তত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যে সে-পথেই এগোচ্ছে তার প্রমাণ সুস্পষ্ট। ভাষাবিদ-বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘Dominance and its Dilemmas’ প্রবন্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে আকাশ-দখল করে সমগ্র পৃথিবীর উপর তার আধিপত্য স্থায়ী করার চেষ্টা করছে তা আলোচনা করেছেন। (ফ্রন্টলাইন, ২১ নভেম্বর ২০০৩) ঘটতে থাকা বিভিন্ন ঘটনা বিচার করে…
-

রবীন্দ্র-সম্পাদিত বঙ্গদর্শনে হেদায়েতউল্লার প্রবন্ধ
রচনা-পরিচয় : ভূঁইয়া ইকবাল বিশ শতকের প্রথমার্ধের কথাসাহিত্যিক ও ভাবুক প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ হেদায়েতুল্লাহ্ (১৮৮০-১৯৪৬) সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ-পরিচয় ঘটেছিল বঙ্গভঙ্গ-আন্দোলনকালে। হেদায়েতুল্লাহ্ নেকনজর ও তাজিয়া (১৩৪৩) নামে দুটি উপন্যাস এবং প্রদীপ ও চেরাগ (১৩৩২/৩৩) গল্পসংকলন প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সৈয়দ এমদাদ আলী-সম্পাদিত নবনূর (১৯০৩-০৭) পত্রিকা প্রকাশনায় অন্যতম উদ্যোক্তা। বঙ্গদর্শন (নবপর্যায়), নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ও প্রবাসী প্রভৃতি সাময়িকপত্রে তাঁর…
-

পুনশ্চ হরিপ্রভা তাকেদা
কালি ও কলমের দ্বিতীয় সংখ্যায় হরিপ্রভা তাকেদাকে নিয়ে চমৎকার একটি রচনা উপহার দেওয়ার জন্য শুরুতেই ধন্যবাদ জানাতে হয় ঢাকা শহরের অতীত ইতিহাস খুঁজে দেখার নেতৃস্থানীয় গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নের বিভিন্ন সূত্রের আশ্রয় নিয়ে হরিপ্রভা তাকেদার জীবনের না-জানা কিছু কিছু দিকের উপর আলোকপাতে তাঁর প্রয়াস প্রশংসার দাবি রাখে। তবে…
-

আন্তিগোনে: দুঃখদহন ও প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি
হোমরীয় (খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতক) মহাকাব্য দুটির কাহিনী ও ঘটনাপরম্পরা বিশ্লেষণ করে এটা বলা যায় যে, পশুপালন, সীমিত পর্যায়ের কৃষিকাজ ও লুণ্ঠন ইত্যাদি আশ্রয় করে প্রাচীন গ্রিসের আদিম পিতৃপ্রধান সমাজের বিকাশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ইতিহাসে গ্রিকদের উত্থানের কালেই দেখা যায় যে, তারা বিকশিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে আয়ত্ত করেছিল সমৃদ্ধ ভাষা – যা বিচিত্র…
-

কালিন্দীর চরে নজরুলের হারানো গান
‘আমার সাহিত্যিক জীবনে এই রঙ্গমঞ্চের সাহায্য পরিমাণে সামান্য হলেও দুঃসময়ের পাওয়া হিসাবে অসামান্য। সেদিন রঙ্গমঞ্চের সাহায্য না পেলে সাধনার অকৃত্রিম নিষ্ঠা সত্ত্বেও আমার জীবনে এ-সাফল্য সম্ভবপর হতো না। শুধু আর্থিক সাহায্যই করেনি রঙ্গমঞ্চ, নাট্যকার হিসেবে, আমার খ্যাতিকে ত্বরিতগতিতে বিস্তৃত করেছিল। – মৃত্যুর দেড়যুগ আগে এভাবেই আপন মঞ্চজীবনকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)। আগাম-যৌবনের কল্পনায়…
-

বাংলার চিত্রকলার রোমান্টিকতা
বাংলার চিত্রকলার রোমান্টিক ঐতিহ্যের মধ্যে একটা বিভাজন আছে। এই বিভাজনের একদিকে আছে অবনীন্দ্রনাথ থেকে যামিনী রায় থেকে নন্দলাল পর্যন্ত ঈশ্বরময় নিসর্গের অভিজ্ঞতা এবং অন্যদিকে আছে জয়নুল আবেদিন থেকে কামরুল হাসান থেকে সুলতান থেকে কাইয়ুম চৌধুরী পর্যন্ত ঈশ্বরহীন নিসর্গের অভিজ্ঞতা। প্রথম ক্ষেত্রের লাবণ্যময়তা দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়েছে সবল শক্তিময় এক ভিশনের মধ্যে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রের শিল্পীরা নিসর্গের…
-

উচ্চস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের চালচিত্র
রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়েই শুরু করি। ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ’ প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ’। তাঁর এই প্রবন্ধে তিনি – ‘বাংলাভাষার মাধ্যমে সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারিত হোক’১ – এমন প্রত্যাশাও করেছিলেন। এর প্রায় বছর তিনেক আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শিক্ষার বিকিরণ’ নামে এক বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন : এদিকে রাষ্ট্রক্ষেত্রে স্বরাজ পাবার জন্যে প্রাণপণ…
-

আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ : গোরা ও কিম্
রবীন্দ্রনাথ গোরা ধারাবাহিক লেখা শুরু করেন ১৯০৭ সালে। ওই বছরেই নোবেল পান রাডিয়ার্ড কিপলিং। রবীন্দ্রনাথ কিপলিংয়ের চেয়ে চার বছরের বড়। নোবেল পান তাঁর ছয় বছর পর, ১৯১৩-তে। দুজনের মধ্যে কিন্তু বিস্তর ফারাক – কী দেশ ও কাল-চেতনায়, কী সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাঁদের হয়ে-ওঠাও বাস্তব পটভূমির বিপরীত দুই প্রান্ত থেকে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির জাঁদরেল প্রতিনিধি কিপলিং। এতে…
-

রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত ভাণ্ডার পত্রিকায় খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলামের একটি লুপ্ত রচনা
বিশ শতকের সূচনালগ্নে রবীন্দ্রনাথ সম্পাদনভার নিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র-প্রতিষ্ঠিত (নবপর্যায়ে) বঙ্গদর্শনের (১৯০১-০৪)। চট্টগ্রামের কেদারনাথ দাশগুপ্তের (১৮৭৮-১৯৪২) উদ্যোগে প্রকাশিত মাসিক ভাণ্ডার পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব কবির ওপর পড়ে ১৯০৫-এ। ভাণ্ডারের প্রথম সংখ্যা রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ১৯০৫-এর এপ্রিলে (বৈশাখ ১৩১২) প্রকাশ পায়। পত্রিকায় চারটি বিভাগ ছিল : প্রবন্ধ, প্রস্তাব, প্রশ্নোত্তর ও সঞ্চয়। প্রশ্নোত্তর বিভাগের প্রশ্ন তৈরি করতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সম্পাদক নিজে।…
-

কে বুদ্ধিজীবী?
ইংরেজি intellectual শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি চালু হয়ে গেছে। তাই আমি ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটিই ব্যবহার করব। যদিও প্রতিশব্দটি আমার খুব একটা পছন্দ নয়। বিনয় ঘোষ ‘intellectual’-এর বাংলা করেছেন ‘বিদ্বৎজন’। আমার পছন্দ হলেও কথাটি তেমন চালু হয়নি। থাক সে-কথা। ‘কে বুদ্ধিজীবী?’ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেকেই ভাবনাচিন্তা করেছেন। বিষয়টি আমারও খুব প্রিয়। ভীষণ আকর্ষণ করে…
-

এলিয়ট ও এমিলি
উনিশ শ তেরোর সতেরোই ফেব্রুয়ারি এলিয়ট কেম্ব্রিজে এক ঘরোয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই কেম্ব্রিজ্ ব্রিটেনে নয়, যেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্স্ রাজ্যে এই কেম্ব্রিজ্; [ম্যাসাচুসেট্স্ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি ঠাট্টার কবিতা আছে ; দেখুন: খাপছাড়া;] ম্যাসাচুসেট্সেও একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আছে; তার নাম হার্ভার্ড্; এলিয়ট তখন হার্ভার্ডে পড়াশোনা করেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছিল আন্ট্ হিঙ্কলির বাড়িতে।…
