প্রবন্ধ

  • ‘স্বপ্ন’ ও ‘বনলতা সেন’

    সনৎকুমার সাহা বাংলা কবিতা যাঁরা খুঁটিয়ে পড়েন, তাঁদের অনেককে বলতে শুনি, জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ রবীন্দ্রনাথের ‘স্বপ্ন’ কবিতাটির অনুসরণে লেখা। ‘স্বপ্ন’ আছে কল্পনা কাব্যগ্রন্থে। ১৮৯৭ সালের রচনা। কল্পনার প্রকাশকাল অবশ্য ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ। ছাপা অক্ষরে ‘বনলতা সেনে’র প্রথম আবির্ভাব ১৯৩৫ সালে। দেখা পাই বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায়। ১৯৪২ সালে ওই কবিতাভবন থেকে তাদের ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থমালায়…

  • আড় ভাবুকের কড়চা

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত গেয়র্গ ট্রাক্ল্ থেকে থেকে ফিরে আসো তুমি, বিষণ্ণতা, নিঃসঙ্গ সত্তার তুমি আনম্র বিন্যাস। পরিশেষে প্রজ্বলিত স্বর্ণময় দিন। সহিষ্ণুর যন্ত্রণায় সমর্পণখানি স্বরসাম্য ও কোমল মত্ততায় ভরা। ঐ দেখো! প্রদোষ ঘনাল জানি জানি। রাত্রি ফিরে এল, এক নশ্বরের পরিতাপে কাঁপে যন্ত্রণার অংশীদার আরো একজন। শরতের নক্ষত্রের নিচে শিউরে উঠে বছরে-বছরে শুধু আরো বেশি ঝুঁকে পড়ে…

  • আপনি তুমি রইলে দূরে

    রফিক কায়সার কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে কবি-প্রয়াণের পর থেকেই। তাঁকে নিয়ে কবির জীবৎকালেও ব্যক্তিবিশেষের নেতিবাচক মতামত বা মন্তব্যকে কবি যথেষ্ট গুরুতব দিয়ে খন্ডন করেছেন বা জবাব দিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের মন্তব্য বা মতামত কবির জীবৎকালে সামাজিক পরিবাদ বা শান্তিনিকেতনে রথীন্দ্রনাথবিরোধী জনমত তীব্রতা পায়নি। কবি-প্রয়াণের পর থেকেই রথীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন নিয়ে শান্তিনিকেতনের বাসিন্দাদের জনরব তৈরি হতে…

  • ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন ও সংগীত

    সুধীর চক্রবর্তী ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন সম্পর্কে খুব বড়মাপের কাজ বাংলা ভাষায় এখনো হয়নি। তার প্রধান কারণ, ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের যাঁরা ঋত্বিক, যাঁদের গান এই আন্দোলনকে শাখায়িত করেছে, তাঁরা ভিন প্রদেশীয় বলে তাঁদের অনেকের ভাষা আমরা জানি না। ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন সূচিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে, দক্ষিণ ভারতে এবং যে-সম্প্রদায় এই আন্দোলনের সূচনা করেছিল, তাদের বলা হয়…

  • প্রসঙ্গ আধুনিকতা, আধুনিক কাব্য

    উজ্জ্বল সিংহ আধুনিকতার প্রসঙ্গ সবসময়ই আধুনিক, তা কখনই পুরনো হওয়ার নয়। যতদিন মানবসভ্যতা থাকবে, শিল্পকলা-কাব্য-সাহিত্য ইত্যাদির অস্তিত্ব থাকবে, ততোদিন আধুনিকতাও থাকবে। সমকালে সকলই আধুনিক, বর্তমানে যা আধুনিকতা হিসেবে গণ্য, পঁচিশ-পঞ্চাশ-একশ বছর পর তা-ই হয়ে ওঠে অনাধুনিকতা। অতএব, সময়ের বিচারে আধুনিকতার বিচার করা উচিত নয়। সময়ের মতোই আধুনিকতা একটি কল্পিত বা পরাবাস্তব ধারণা, দুটোই সতত প্রবহমান।…

  • ‘বাঙালি পাঠকসমাজের কাছে আমি কৃত¬জ্ঞতাপ্লুত’

    ফাদার পল দ্যতিয়েন গুরুদেবের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বহু সাহিত্যপ্রেমী জনকয়েক ভিনদেশি পুরস্কার পেয়েছেন। ওঁদের মধ্যে অধিকাংশই অনুবাদক কিংবা গবেষক, কিংবা ওই ধরনের কিছু। পান্ডিত্যপূর্ণ পাঁজিপুঁথির প্রকাশনে ওঁরা বদ্ধভূমির বাইরে আপন আপন বহুদেশে, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসারসাধন করে ধন্য হন। অসংকোচে স্বীকার করি যে, ওঁদের অভিজাত দলের আমি আদৌ সদস্য নই। অনুবাদ করেছি কম, গবেষণা করেছি…

  • কথাসাহিত্যের জল-হাওয়া

    কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর কথার সাহিত্য হয়, সাহিত্যেরও কথা হয়; এর আবার জল-হাওয়াও থাকে। কথা সে তো ভাবের মাধ্যম; এমনকি আনন্দ-ক্রোধ-লজ্জা-ঘৃণা, জীবন আদান-প্রদানেরও মাধ্যম। কথা যখন থাকে তখনো মানবজীবনের বিকাশ বা ক্ষয় থাকে, যখন কথা ছিল না বা থাকে না, নির্জনতা দিয়েই অনেককিছু মাপা যেত, তখনো তাতে জীবন ছিল। কথার জীবন থাকে, কথ্যগল্প হয়। মুদ্রিত কথায় তো…

  • কলকাতা এক ঝলক

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত  খেলাচ্ছলেঁ হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্তর দশকের শুরুর দিকেও প্রত্ন ভারততত্ত্বের দাপট ছিল অব্যাহত। কে না জানে নাৎসি ফুরারের ব্যক্তিগত অভীপ্সায় গোটা জার্মানিজুড়ে তেরোটি – বলা বাহুল্য একটি অমাঙ্গলিক সংখ্যা – চেয়ারে অধিষ্ঠিত ছিলেন ইন্ডোলজির বাঘা-বাঘা দিগ্গজ পন্ডিত যাঁরা পরস্পরের সঙ্গে সংস্কৃতেই সংলাপ চালাতেন। এই ভয়াবহ আবহ এক ঝটকায় সরিয়ে দেওয়ার মন্দ্রণায় যখন আমরা দুই…

  • নতুন অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    মোহীত উল আলম  ফকরুল আলম এবং রাধা চক্রবর্তী রবীন্দ্র-সাহিত্য নতুনভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করার জন্য একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তাঁরা দ্য এসেনশিয়াল টেগোর শিরোনামে আটশো উনিশ পৃষ্ঠার কলেবরে এক খন্ডে সমাপ্ত রবীন্দ্রনাথের বিভিন্নধর্মী রচনার ইংরেজি অনুবাদ সম্পাদনা করেছেন। শক্ত মলাটে বাঁধাই এ অমনিবাস খন্ডটি প্রকাশ করেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের পক্ষে বেলন্যাপ প্রেস। প্রকাশকাল ২০১১। গ্রন্থটির…

  • বাংলাদেশের উপন্যাস : একটি সরল পাঠ

    মোস্তফা তারিকুল আহসান উপন্যাস প্রত্যয়টির সঙ্গে পরিচিত সবাই জানেন, ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের পর, ব্যক্তি মানুষ যখন জেগে ওঠে অর্থাৎ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জন্মের পর উপন্যাসের আবির্ভাব হয়।  সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মহাকাব্যের বিশাল পটভূমিতে ব্যক্তিজীবনের অনুভূতি-ক্লেদ পাঠক ঠিকমতো খুঁজে পেত না। মহাকাব্যের যুগ শেষ হওয়ার পরই সে-কারণে উপন্যাসের যুগ বোধহয় শুরু হয়। অসম্ভব এক সম্ভাবনাকে মানুষের সামনে প্রতিভাত…

  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আমাদের সাহিত্য

    রফিকউল্লাহ খান বাঙালি জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা বৈপ্লবিক যুগান্তরের সম্ভাবনায় তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসন-বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের অনিঃশেষ চেতনা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের মতো শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের গণজাগরণ ও বৈপ্লবিক চেতনার স্পর্শে এক অপরিমেয় সম্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে আমাদের সাহিত্যলোক। সেই উজ্জীবনী…

  • গড়শ্রীখণ্ড ও অমিয়ভূষণ

    ক. প্রাক-প্রসঙ্গ মহামানবদের কিছু কিছু উক্তি কখনো কখনো ভুলে যাওয়াই ভালো। যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুজন মহামানব গড় শ্রীখণ্ড সম্পর্কে যে-দুটি মন্তব্য করেছিলেন, সে-দুটি পাশাপাশি রাখলে গড় শ্রীখণ্ড না-পড়া পাঠক হকচকিয়ে যাবেন। উক্তিদুটি তুলে ধরা যাক। প্রথম উক্তি রাজশেখর বসুর। তিনি গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কি ভাষা! পড়া যায় না।’ অন্যদিকে পূর্বাশা-সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য ১৩৬০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় সার্টিফিকেট দিচ্ছেন এই বলে, ‘তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অমিয়ভূষণ মজুমদারই এমন একজন লেখক যিনি বহুবিধ কোণ থেকে জীবনকে দেখতে জানেন।… গড় শ্রীখণ্ড তাঁর প্রথম উপন্যাস। আমাদের আশা আছে এ-রচনাটি তাঁকে বাংলা উপন্যাসের আসরে সম্মানের আসন দান করবে।’ অতএব আমাদের আপাতত দেরিদাপন্থি হওয়াই ভালো। কে লিখেছেন, সেই লেখা সম্পর্কে কে কী বলেছেন Ñ এসব নিয়ে না ভেবে সরাসরি টেক্সটে প্রবেশের যে-প্রস্তাবনা জাক দেরিদা করেছিলেন, সেটি মেনে চলতে পারলে মনে হয় ভালোই হতো। কিন্তু পুরোপুরি মেনে চলা কোনো পাঠকের পক্ষেই সম্ভব নয়। আরেকটি জরুরি কথা। বলা হয়ে থাকে যে, অমিয়ভূষণ ছিলেন প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী। হয়তো তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কে কথাগুলো খাটে। কিন্তু শেষ জীবনে তিনি এসেছিলেন আলোকবৃত্তের একেবারে কেন্দ্রে। নিজের সম্পর্কে কথাবার্তা বলেছেন ও লিখেছেন প্রচুর। কাজেই অমিয়ভূষণের জবানি দিয়েই কিংবা তাঁর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই ধাপে ধাপে তাঁর রচনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গেও এ-কথা সমভাবে প্রযোজ্য।সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অমিয়ভূষণের উপন্যাস, গল্প তথা অমিয়ভূষণ-লিখিত যে-কোনো রচনাকেই ক্লাসিক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একশ্রেণির সমালোচক এবং আকাশে নাক বেঁধে রাখা বোদ্ধাপাঠক (!) অমিয়ভূষণের লেখায় যে-অসংগতি থাকতে পারে, তা মেনে নিতে রাজি নন। কোন কোন গুণের সন্নিবেশ ঘটলে কোনো রচনা ক্লাসিকত্বপ্রাপ্ত হয়, তা এই নিবন্ধকারের কাছে পরিষ্কার নয় বিধায় এই রচনাটিতে ‘উক্ত’ শব্দ প্রযোজ্য হবে না। মনে রাখা দরকার, ক্লাসিক উপাধি ছাড়াই অনেক সাহিত্য ‘উৎকৃষ্ট সাহিত্য’ বলে পরিগণিত হতে পারে। ব্যক্তিগত সমীক্ষায় দেখা গেছে, অমিয়ভূষণের গুণমুগ্ধ ভক্তের সংখ্যা যতটা, অভিনিবেশী পাঠকের সংখ্যা তার চাইতে ঢের কম। তাঁর গুণমুগ্ধরা তাঁর রচনার চাইতে সাক্ষাৎকার, মন্তব্য ও সমালোচনা পড়েই অমিয়ভূষণের অন্ধ স্তাবকতা করে থাকেন। এই রকম কিছু স্তাবকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের একপাশে সোশ্যাল রিয়ালিজম আর অন্যপাশে দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক স্ট্রিম অব কনসাসনেসের চোরাপাহাড়। এই দুটি থেকে অব্যাহতি কামনা করেছিলেন তিনি। তাহলে অন্তত পাঠক হিসেবে রিলিফ পাওয়া যায়। অমিয়ভূষণে এই রিলিফ মিলবে না। বিশেষত স্ট্রিম অব কনশাসনেসের ব্যবহারে নিজের সিদ্ধি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন তিনি। সুতরাং চোরাপাহাড়ে পথ রুদ্ধ দেখলে পাঠকের হতবাক না হওয়াই উচিত।’ খ. উপন্যাস বলতে অমিয়ভূষণ নিজে কী বুঝতেন বা বোঝাতে চাইতেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষণ বলেছিলেন, ‘আমি শেষের কবিতাকে উপন্যাস মনে করি না। উপন্যাস ও-জিনিস নয়। গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ Ñ এগুলোকে আমি উপন্যাস বলি। নৌকাডুবিকেও বলি। কিন্তু চোখের বালি Ñ তাকে উপন্যাস বলি না।’ তাহলে তিনি কাকে বলছেন উপন্যাস? এ-বিষয়ে তাঁর নিজেরই একটি প্রবন্ধ রয়েছে। নাম ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’। আমরা যদি সেই প্রবন্ধের দ্বারস্থ হই, তাহলে কিছুটা সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, উপন্যাস সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ হলে অনেক সমস্যা কেটে যায়। তবে মনে রাখা দরকার, কেউ কোনোদিন কোনো শিল্প সম্পর্কে জলবৎ তরলং স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেনি। পুরো প্রবন্ধ আদ্যোপান্ত পাঠ করার পরে স্বীকার করতে পাঠক বাধ্য হন যে, অমিয়ভূষণও ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’ কোনো স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেননি। ওই প্রবন্ধে উপন্যাস কী Ñ তা না বলে তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন কী কী আসলে উপন্যাস নয়। যেমন, সাধারণ প্রচলিত মত হচ্ছে, নরনারীর নামযুক্ত ঘটনাবলিকেই উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। অমিয়ভূষণ এই সরলীকৃত সংজ্ঞাকে বিদ্রƒপ করেছেন তীক্ষèভাবে। প্রবন্ধে আরেকটি সরলীকৃত ধারণাকেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। পূর্বসূরি একজন সাহিত্যতাত্ত্বিক উপন্যাসকে পোর্টম্যান্টোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, অর্থাৎ এতে, পোর্টম্যান্টোতে যেমন, তোমার সবকিছু রাখতে পারো…