গড়শ্রীখণ্ড ও অমিয়ভূষণ

ক. প্রাক-প্রসঙ্গ

মহামানবদের কিছু কিছু উক্তি কখনো কখনো ভুলে যাওয়াই ভালো। যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুজন মহামানব গড় শ্রীখণ্ড সম্পর্কে যে-দুটি মন্তব্য করেছিলেন, সে-দুটি পাশাপাশি রাখলে গড় শ্রীখণ্ড না-পড়া পাঠক হকচকিয়ে যাবেন। উক্তিদুটি তুলে ধরা যাক। প্রথম উক্তি রাজশেখর বসুর। তিনি গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কি ভাষা! পড়া যায় না।’ অন্যদিকে পূর্বাশা-সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য ১৩৬০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় সার্টিফিকেট দিচ্ছেন এই বলে, ‘তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অমিয়ভূষণ মজুমদারই এমন একজন লেখক যিনি বহুবিধ কোণ থেকে জীবনকে দেখতে জানেন।… গড় শ্রীখণ্ড তাঁর প্রথম উপন্যাস। আমাদের আশা আছে এ-রচনাটি তাঁকে বাংলা উপন্যাসের আসরে সম্মানের আসন দান করবে।’

অতএব আমাদের আপাতত দেরিদাপন্থি হওয়াই ভালো। কে লিখেছেন, সেই লেখা সম্পর্কে কে কী বলেছেন Ñ এসব নিয়ে না ভেবে সরাসরি টেক্সটে প্রবেশের যে-প্রস্তাবনা জাক দেরিদা করেছিলেন, সেটি মেনে চলতে পারলে মনে হয় ভালোই হতো। কিন্তু পুরোপুরি মেনে চলা কোনো পাঠকের পক্ষেই সম্ভব নয়।

আরেকটি জরুরি কথা। বলা হয়ে থাকে যে, অমিয়ভূষণ ছিলেন প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী। হয়তো তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কে কথাগুলো খাটে। কিন্তু শেষ জীবনে তিনি এসেছিলেন আলোকবৃত্তের একেবারে কেন্দ্রে। নিজের সম্পর্কে কথাবার্তা বলেছেন ও লিখেছেন প্রচুর। কাজেই অমিয়ভূষণের জবানি দিয়েই কিংবা তাঁর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই ধাপে ধাপে তাঁর রচনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গেও এ-কথা সমভাবে প্রযোজ্য।সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অমিয়ভূষণের উপন্যাস, গল্প তথা অমিয়ভূষণ-লিখিত যে-কোনো রচনাকেই ক্লাসিক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একশ্রেণির সমালোচক এবং আকাশে নাক বেঁধে রাখা বোদ্ধাপাঠক (!) অমিয়ভূষণের লেখায় যে-অসংগতি থাকতে পারে, তা মেনে নিতে রাজি নন। কোন কোন গুণের সন্নিবেশ ঘটলে কোনো রচনা ক্লাসিকত্বপ্রাপ্ত হয়, তা এই নিবন্ধকারের কাছে পরিষ্কার নয় বিধায় এই রচনাটিতে ‘উক্ত’ শব্দ প্রযোজ্য হবে না। মনে রাখা দরকার, ক্লাসিক উপাধি ছাড়াই অনেক সাহিত্য ‘উৎকৃষ্ট সাহিত্য’ বলে পরিগণিত হতে পারে।

ব্যক্তিগত সমীক্ষায় দেখা গেছে, অমিয়ভূষণের গুণমুগ্ধ ভক্তের সংখ্যা যতটা, অভিনিবেশী পাঠকের সংখ্যা তার চাইতে ঢের কম। তাঁর গুণমুগ্ধরা তাঁর রচনার চাইতে সাক্ষাৎকার, মন্তব্য ও সমালোচনা পড়েই অমিয়ভূষণের অন্ধ স্তাবকতা করে থাকেন। এই রকম কিছু স্তাবকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের একপাশে সোশ্যাল রিয়ালিজম আর অন্যপাশে দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক স্ট্রিম অব কনসাসনেসের চোরাপাহাড়। এই দুটি থেকে অব্যাহতি কামনা করেছিলেন তিনি। তাহলে অন্তত পাঠক হিসেবে রিলিফ পাওয়া যায়। অমিয়ভূষণে এই রিলিফ মিলবে না। বিশেষত স্ট্রিম অব কনশাসনেসের ব্যবহারে নিজের সিদ্ধি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন তিনি। সুতরাং চোরাপাহাড়ে পথ রুদ্ধ দেখলে পাঠকের হতবাক না হওয়াই উচিত।’

খ. উপন্যাস বলতে অমিয়ভূষণ নিজে কী বুঝতেন বা বোঝাতে চাইতেন

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষণ বলেছিলেন, ‘আমি শেষের কবিতাকে উপন্যাস মনে করি না। উপন্যাস ও-জিনিস নয়। গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ Ñ এগুলোকে আমি উপন্যাস বলি। নৌকাডুবিকেও বলি। কিন্তু চোখের বালি Ñ তাকে উপন্যাস বলি না।’ তাহলে তিনি কাকে বলছেন উপন্যাস?

এ-বিষয়ে তাঁর নিজেরই একটি প্রবন্ধ রয়েছে। নাম ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’। আমরা যদি সেই প্রবন্ধের দ্বারস্থ হই, তাহলে কিছুটা সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, উপন্যাস সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ হলে অনেক সমস্যা কেটে যায়। তবে মনে রাখা দরকার, কেউ কোনোদিন কোনো শিল্প সম্পর্কে জলবৎ তরলং স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেনি। পুরো প্রবন্ধ আদ্যোপান্ত পাঠ করার পরে স্বীকার করতে পাঠক বাধ্য হন যে, অমিয়ভূষণও ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’ কোনো স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেননি। ওই প্রবন্ধে উপন্যাস কী Ñ তা না বলে তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন কী কী আসলে উপন্যাস নয়। যেমন, সাধারণ প্রচলিত মত হচ্ছে, নরনারীর নামযুক্ত ঘটনাবলিকেই উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। অমিয়ভূষণ এই সরলীকৃত সংজ্ঞাকে বিদ্রƒপ করেছেন তীক্ষèভাবে।

প্রবন্ধে আরেকটি সরলীকৃত ধারণাকেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। পূর্বসূরি একজন সাহিত্যতাত্ত্বিক উপন্যাসকে পোর্টম্যান্টোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, অর্থাৎ এতে, পোর্টম্যান্টোতে যেমন, তোমার সবকিছু রাখতে পারো Ñ ধোয়া জামা-কাপড়, স্যুট, টুথপেস্ট এবং কন্ট্রাসেপটিভ, ব্যবহার করা মোজা, ছেঁড়া আন্ডারওয়্যার, মায়ের চিঠি এবং শেক্সপিয়র, এমনকি ইকোনোম্যানিয়ার তাবিজকবজ।

তৎক্ষণাৎই অমিয়ভূষণ প্রশ্ন করেন, যদি পোর্টম্যান্টোই হবে উপন্যাস, তবে প্রতিদিনকার সংবাদপত্র কেন পৃথক উপন্যাস হবে না?

এরপরে তিনি উপন্যাস সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে চেয়েছেন। সেগুলোর সংক্ষিপ্তসার করলে উপন্যাসের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন Ñ

১. উপন্যাস একটি কলা এবং সেহেতু তার সংবেদন থাকবে। নাটক ও মহাকাব্যের জ্ঞাতি হওয়ার ফলে চরিত্র ও ঘটনাবলির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সাহায্যে সে একটি জটিল সংবেদন উপস্থাপিত করে থাকে।

২. তার ভাষা আমাদের প্রত্যহের ভাষার অনুকৃতি, তার বর্ণনার অধিকাংশই প্রত্যহের দেখা বাস্তব।

৩. জন্ম থেকেই এক দায় আছে উপন্যাসের যে, তাকে বাস্তবের বিশ্বাস উৎপাদন করতে হয়। রূপকথা, গল্প, মহাকাব্য, নাটক, প্রভৃতির এমন দায় নেই। তারা খুশিমতো বাস্তবের কথা বলে বটে, না বললেও তাদের বেশ চলে। গল্পের গরু গাছে উঠতে পারে, কিন্তু উপন্যাসে গরু থাকলে তাদের ঘাস খেতে হয় মাঠে এবং মুখ নিচু করে। রাবণের দশ মাথা নিয়ে কাব্যে কোনো নালিশ নেই, আর সেখানে আমরা তা বিশ্বাসও করি, কিন্তু উপন্যাসে যদি-বা সে তেমন আসতে চায়-ই, তবে তাকে বলে নিতে হবে একটার বেশি তার কাঁধে যা আছে তা মুখোশ।

৪. উপন্যাস একটি কলা এবং কলা কদাচিৎ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।… সত্য আবিষ্কার আর্টের উদ্দেশ্য কেই-বা কবে ভেবেছে। সত্যের প্রতিষ্ঠা হয় যুক্তি বা বুদ্ধির সাহায্যে। কলায় আমাদের অবলম্বন আবেগ ও অনুভূতি। 

৫. অতি গভীরতার বিপদ সম্পর্কেও তিনি ঔপন্যাসিককে সতর্ক করেন। তাঁর মতে এমন কতগুলো বই আছে যেগুলোতে মনের অতিশয়িতবর্ণনা নরনারীগণকে বিদেহ করে।… মনের এই চরিত্রহানি শুধু বহুবিস্তারের দরুনই হয় না, অতি গভীরতার দরুনও হতে পারে। অতি গভীর করে দেখতে গিয়ে মনের অনেক ফাটল, অনেক দুর্বল অংশ চোখে পড়ে এবং তা উপন্যাসে প্রাধান্য দেওয়ায় বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়।

৬. এই পর্যন্ত পাঠ করে পাঠক আশার আলো দেখতে পারেন। কেননা উপন্যাস সম্পর্কে অমিয়ভূষণের ধারণাসমূহ তাঁর উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে নিলেই তো সমস্যা মিটে যায়। কিন্তু সমস্যা মোটেই মেটে না। ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের যে-সংজ্ঞা উপস্থাপিত করেন, তার সঙ্গে তাঁর লিখিত ছোটগল্পগুলোকে মেলাতে গিয়ে সমালোচকরা যেমন বারবার হোঁচট খান, একই কথা প্রযোজ্য অমিয়ভূষণের ক্ষেত্রেও। এক্ষেত্রে অমিয়ভূষণ মুখ ফুটে যে-কথাটি বলেননি তা হলো, উপন্যাস হচ্ছে উপন্যাস। উপন্যাস কখনোই তত্ত্ব নয়।

তাহলে আমাদের উপায়? উপায় আছে। জীবনানন্দ বলেছিলেন, ‘কবিতা অনেকরকম।’ আমরা জানি, উপন্যাসও অনেকরকম। অমিয়ভূষণের উপন্যাস অন্যরকম হলেও উপন্যাসই বটে। আর উপন্যাসই যখন, তখন তা পাঠ করতে এবং আলোচনার চেষ্টা করতে দোষ কী!’

গ. গড় শ্রীখণ্ড : মননে-অন্বেষণে 

১. যে-কোনো গ্রন্থের আলোচনায় পাঠকদের জন্য গ্রন্থটির সারাংশ কিংবা চুম্বক অংশ তুলে ধরার একটি অলিখিত রীতি রয়েছে। উদ্দেশ্য, গ্রন্থটি যারা এখনো পড়ে উঠতে পারেননি, কিন্তু বর্তমান আলোচনাটি পাঠ করছেন, এমন পাঠককে আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু এখানে সেই সুযোগটি নেই। প্রথম কারণ উপন্যাসের আয়তন। দ্বিতীয় সংস্করণটি ছিল ৫৪২ পৃষ্ঠার। তৃতীয় সংস্করণে এসে কম্পিউটার কম্পোজের কারণে ঠাসাঠাসি করে ৩৯২ পৃষ্ঠায় আঁটানো হয়েছে। আটত্রিশটি পরিচ্ছেদের সেই বিশাল বিস্তারের কোনো তথাকথিত সারমর্ম তুলে ধরা সম্ভব নয়। প্রথম কারণের চেয়ে দ্বিতীয় কারণ আরো জোরালো। গড় শ্রীখণ্ডের কাহিনী একরৈখিক নয়, বরং আবর্তসংকুল। এক পরিচ্ছেদশেষে আরেক পরিচ্ছেদে পৌঁছেও পাঠক বুঝতে পারেন না, অনেক সময়ই, ঘটনা আদৌ এগুচ্ছে কিনা। এই ধরনের উপন্যাসের সারমর্ম তুলে ধরার চেষ্টা করাই বাতুলতা।

সচরাচর উপন্যাসে যেমনটি থাকে এই উপন্যাসেও পাত্রপাত্রী অনেক। মোটা দাগে সবগুলো চরিত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে জমিদার সান্যাল মশাই-অনসূয়া-সুমিতি-নৃপনারায়ণ-রূপনারায়ণ-মনসা-সদানন্দ মাস্টার। অন্যদিকে সুরতুন, মাধাই, কেষ্টদাস, রামচন্দ্র, আলেক, এরফান প্রমুখ। আর যদি কাহিনী-আবর্তনের কথা ধরা হয়, তাহলে লক্ষ করা যাবে তিনটি বৃত্তের কথা। প্রথম বৃত্তটিতে সান্যাল মশাই-অনসূয়া, দ্বিতীয়তে মাধাই-সুরতুন, তৃতীয়টিতে রামচন্দ্র-পদ্ম। 

তবে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করলেও একথা বলা যাবে না যে, চরিত্রগুলো পরস্পরের মুখোমুখি। কারণ গড় শ্রীখণ্ড কোনো জমিদার-প্রজাদ্বন্দ্ব বা দ্বৈরথের কাহিনী নয়। শ্রেণিদ্বন্দ্ব, শ্রেণিহিংসা কিংবা শ্রেণির ধারণাটিকেই অমিয়ভূষণ সবসময়ে সুকৌশলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন, কখনো কখনো অস্বীকারও। গড় শ্রীখণ্ড-ও তার ব্যতিক্রম নয়। উপন্যাস পড়লে পরিষ্কারই বোঝা যায় যে, প্রথম ভাগের ও দ্বিতীয় ভাগের পাত্রপাত্রীরা সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা ভুবনের বাসিন্দা। কিন্তু একের সমৃদ্ধি যে অপরের দুর্গতির ওপর নির্ভরশীল Ñ এই তথ্যটা কোথাও প্রস্ফুটিত হতে দেখি না উপন্যাসে।

তবে কিছু কিছু উপাদান আছে যেগুলো দুই পক্ষেরই মুখোমুখি দাঁড়ায়। অন্য কথায়, দুই পক্ষকেই নিপতিত হতে হয় এইসব অভিন্ন সমস্যায়। পদ্মার ভাঙন, বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল, দাঙ্গার আতঙ্ক এবং সর্বোপরি দেশভাগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় চরিত্রগুলো। 

পদ্মা নদী এই উপন্যাসে প্রায় নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে। উপন্যাস শুরু হয় পদ্মার বিবরণ দিয়ে Ñ ‘বাঙাল নদী পদ্মা এখানে বন্ধনে পড়েছে, ‘বিরিজ’ বলে লোক-ভাষায়। দুর্ধর্ষা গজগামিনী গঙ্গাকে যে কোন তরুণ আদর করে বলেছিল পদুমা-পদ্মা এবং আপন করেছিল তা কেউ বলতে পারে না; সে ভালোবেসেছিল, কিন্তু বন্ধন করার চেষ্টা করেনি। তার সর্বনাশা কূলনাশিনী গতিকে শ্রদ্ধাও করেছিল। এখন ভালোবাসা বংশধরদের রক্তে শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভয়ের সমন্বয়ে সব চিন্তা সব ভাবনার পেছনে ধর্মের অদৃশ্য দৃঢ়ভিত্তি হয়ে আছে।’

উপন্যাস শেষ হয় পদ্মার প্লাবনের ভেতর দিয়ে সুরতুন আর ইয়াজের নবজীবনের প্রতি অঙ্গীকারে। সুরতুনের হাত ইয়াজের হাতে, কিন্তু তার অন্তর আপ্লুত মাধাইয়ের প্রতি অপূর্ণ ভালোবাসায়। উপন্যাস শেষ হচ্ছে এইভাবে –

‘বন্যা নেমে গেলে হয়তো বোঝা যাবে, পদ্মা এবার পাশ ফিরলো কিনা Ñ এটা তার প্রসাদ কিংবা রোষ।

 থেকে থেকে পদ্মার মুখ কালো হয়ে উঠছে তখনো, ফুলে ফুলে উঠছে তার বুক। উপরে ড ড ড করে মেঘ ডাকছে। পুরাণটা যদি জানা থাকে হয়তো কারো মনে হতে পারে, কেউ যেনো কাউকে বলছে দয়া করো, দয়া করো।’

সমগ্র উপন্যাসে পদ্মার জীবন্ত উপস্থিতি। সান্যাল মশাইয়ের তিন হাজার একর জমি লাভ হয় পদ্মার চর জেগে ওঠায়। আবার দেশবিভাগের ঠিক অব্যবহিত পূর্বে পদ্মার করাল গ্রাসে নিপতিত হবার প্রতীকী বিপর্যয়ের মধ্যে তারা প্রায় অন্যদের অগোচরে গড় শ্রীখণ্ড ছেড়ে চলে যান কলকাতায়।

অমিয়ভূষণের কাছে বাংলাদেশের প্রোটাগনিস্ট হচ্ছে পদ্মা। তাঁর মতে, পৃথিবীতে অনেক দেশ থাকতে পারে Ñ যে-দেশে পদ্মা নেই, সেটা তাঁর (অমিয়ভূষণের) দেশ নয়।

 সেই পদ্মাপাড়ের গড় শ্রীখণ্ড, সেই সানিকদিয়ার, চিকন্দি, বুধেডাঙা, দিঘার শাসক সান্যাল-পরিবার হলেও তারা এই মাটির সঙ্গে যোগসূত্রে গাঁথা নয়। তাই তারা অক্লেশে, নিঃশব্দে গড় শ্রীখণ্ড ছেড়ে চলে যেতে পারে। কিন্তু রামকৃষ্ণ মণ্ডলের মতো লোক তা কিছুতেই পারে না। সে বলে যে, মরার পরেও তার আত্মা এখানে থাকবে। সান্যাল মশাইয়ের শ্রেণিটা লেখকের মতে উদ্বাস্তু শ্রেণি এবং এই শ্রেণির মানুষ দিয়েই ভরা কলকাতা শহর।

২. গড় শ্রীখণ্ডের পটভূমির জন্য যে-কাল বেছে নিয়েছিলেন অমিয়ভূষণ, তা মোটামুটি ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। সচেতন ব্যক্তিমাত্রেই জানেন, এই সময়টা আমাদের জাতীয় জীবনের এক উথাল-পাথাল কালপর্ব। অমিয়ভূষণ বলেছেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্রকে ছেড়ে দাও, রবীন্দ্রনাথ যে-পিরিয়ডটা লিখেছেন, তার আগের পিরিয়ড হচ্ছে ‘নয়নতারা’, ‘রাজনগর’। আর রবিঠাকুর যেটা লিখতে পারেননি, লিখতে চেয়েছিলেন ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে, সেটা গড় শ্রীখণ্ড। আমি তাদের কথা লিখেছি।’’ 

জীবনের কথা তুলে ধরে তিনি নাকি হয়েছেন সত্যিকারের ‘আমি তোমাদেরই লোক’। গরিব এবং শোষিতদের কথা লিখলেই নিশ্চয়ই শোষিত শ্রেণির লোক বা তাদের পক্ষের লোক হওয়া যায় না। খুঁজে দেখা দরকার লেখকের মানসিক পক্ষপাত কোনদিকে।

গড় শ্রীখণ্ডে ঝাঁক বেঁধে এসেছে নিম্নবিত্তের মুসলমানদের কথা। যদিও এই মুসলমানদের অমিয়ভূষণ কোথাও মুসলমান বলেননি, বলেছেন সান্দার। সান্দার কারা? লেখকের ভাষায়, এরা স্বভাবদুর্বৃত্ত Ñ সরকারঘোষিত। পুরুষানুক্রমে এরা দুর্বৃত্তই থেকে যাবে। কৃষিকর্মে এরা যতই মগ্ন হয়ে থাকুক, ছোরা-গুপ্তি এদের লাঙলের আড়ালে লুকোনো না-ই থাক, এদের মনের মধ্যে নাকি সভ্যতাবিরোধী হিংস্রতা ধিকিধিকি জ্বলছে।

কিন্তু এত ব্যাপক-বিস্তৃত উপন্যাসের কোথাও সান্দারদের দুর্বৃত্তপনার কোনো ঘটনা নেই। বরং প্রবল প্রতাপের সঙ্গে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে যে-কনক দারোগা, তার মতে, এরা নাকি কোনোকালে বাঙালি নৌ-সৈন্য ছিল। বাঙালির যেদিন নৌসেনা রাখার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল, এদের একদল হয়েছিল জলদস্যু, আরেকদল হলো যাযাবর। কিংবা যখন বাঙালির শানিত ইস্পাতের প্রয়োজন ছিল, তখন এরাই ছিল সান্দার। উপন্যাসের পাত্রপাত্রী সান্দাররা যাযাবর উপগোত্রের লোক। বুড়ো আলতাপ প্রথমে এদের নিয়ে আসে বুধেডাঙার চরে। যাযাবর হলো কৃষক। কিন্তু কৃষিকাজে এদের মন এবং পেট কোনোটাই ভরে না। ফলে দেখা যায়, সান্দারদের মেয়ে সুরতুন-ফতেমাদের যেতে হয় মোকামে চালের কারবারে, টেপিকে বেছে নিতে হয় রক্ষিতার পেশা, টেপির মাকে হতে হয় বৈষ্ণবের সাধন-সঙ্গিনী। তবে দিনযাপনের গ্লানি এবং কাঠিন্যই শুধু নয়, একই সঙ্গে অমিয়ভূষণ তুলে ধরেন এদের কোমল-সুকুমার দিকগুলোকেও। এরা ভালোও বাসতে জানে, কিন্তু তাকে শনাক্ত কিংবা প্রকাশ করতে পারে না। আবার এত কষ্টের মধ্যেও তারা জিইয়ে রাখে মাতৃস্নেহের ফল্গুধারাকে, যা কোনো কোনো সময় দুকূল ছাপিয়ে প্রকাশিত হয়। যেমন ফুলটুসির ছেলেদুটোর আম্মা হয়ে যায় ফতেমা।

অন্যদিকে যে-মাধাই একসময় গরুকে বিষ দেবার মতো জঘন্য পেশায় নিয়োজিত ছিল, সে যখন রেলকোম্পানিতে চাকরি পেল, সে-ই তখন হয়ে উঠল সুরতুন, ফতেমাদের মতো আরো অনেকের ত্রাতা। এক অর্থে বলা যায়, সুরতুন-মাধাইয়ের অব্যক্ত অপ্রকট প্রেম এই উপন্যাসের চালিকাশক্তি। শেষ পর্যন্ত ইয়াজ যে সুরতুনকে লাভ করল সেটাও তাকে মাধাইয়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতিরই ফলাফল।

এই গোত্রেরই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী চরিত্রগুলোর মধ্যে আছে রামচন্দ্র, কেষ্টদাস, ছিদাম, মুঙলা, সনকা, পদ্ম প্রমুখ। এদের মধ্যে রামচন্দ্র এক অসম্ভব জীবন্ত চরিত্র। এই মাটির আদি সন্তান। সে জমির ভাষা বোঝে, সে আকাশের ভাষা বোঝে, বৃষ্টির জন্য জমির আর্তি বোঝে, লাঙলের জন্য জমির আহ্বান শুনতে পায়। সাংসারিক জটিলতা তাকে মাঝে মাঝে ক্লান্ত করলেও সে বারবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নিজের মেয়ের মৃত্যুশোক সে সইতে পেরেছে। তার মনে হয়েছে, ‘মেয়েটা মেয়েদের মধ্যেও নরম ছিল। জামাই মুঙলাকে সে সন্তানস্নেহে কাছে টেনেছে। জামাইয়ের পিতার ভূমিকা পালন করে তাকে আবার বিয়ে দিয়ে ঘরে এনেছে ভানমতিকে। নিজের বিষয়-সম্পত্তি সে উইল করে দিয়েছে মুঙলা ও ভানমতির নামে। নিজের মেয়ের মৃত্যুশোক ভুলতে পারলেও সে সহ্য করতে পারেনি কেষ্টদাসের ছেলে ছিদামের আত্মহত্যার শোক। কেননা তার মনে হয়েছে, ছিদামের আত্মহত্যার জন্য সে-ও অনেকাংশে দায়ী। আত্মগ্লানিতে সে স্ত্রী সনকাকে নিয়ে তীর্থের নামে সংসার ত্যাগ করেছে। নবদ্বীপে থেকেছে। কিন্তু যেইমাত্র ভানমতির চিঠিমারফত জানতে পেরেছে যে,তার সাজানো সংসার তছনছ হওয়ার উপক্রম, তৎক্ষণাৎই সে গ্রামে ফিরেছে এমন সময় যখন দেশবিভাগ আসন্ন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন গ্রাম ত্যাগ করছে। লেখকের ভাষায়, ‘বন্দর দিঘার স্টেশন যেনো ঠান্ডা হিম। শেষরাত্রির এই গাড়িটা থেকে নেমে নিদ্রাবঞ্চিত যাত্রীরা শোরগোল করল না। তারা যেনো এখানে আসতে চায়নি, কী করে এলো তাও বুঝতে পারছে না। ফেরিওয়ালা ঘুমিয়ে রইল। দু-একজন কুলি ঘুমের ঘোরে কুলি বলে মৃদুস্বরে ডাকাডাকি করল। আগের দিন প্রায় এরকম সময়েই পাশের প্লাটফর্ম থেকে অনেক লোকজনের শোরগোলের মধ্যে পাশাপাশি সাজানো কয়েকখানা রিজার্ভ কামরায় সান্যাল মশাই যাত্রা করেছেন। সে-খবর অবশ্য রামচন্দ্রকে কেউ দিল না।’

নিজের গাঁয়ে ফিরে রামচন্দ্র সবাইকে অবাক করল। প্রতিবেশীদের কাছে এমনকি নায়েব মশাইয়ের কাছেও কোনো বরাভয় জুটল না। তার স্ত্রী সনকা দেশভাগ হওয়ার সংবাদ শুনে প্রস্তাব দিয়েছিল আবার নবদ্বীপে ফিরে যাবার। কিন্তু নিজের ধর্ম বলতে তো রামচন্দ্র বোঝে সে চাষি। তাই সে বউকে নিরস্ত করে Ñ ‘বুঝলা না, বউ, ধরো যে তোমার মহাভারতে ক্ষত্রিয়র ধম্ম লেখা আছে, ব্রাহ্মণের ধম্ম লেখা আছে, কিন্তুক আমার ধম্ম কই লিখছে? তাইলে আমি চাষই করবো।’

৩. অশ্রুকুমার সিকদার একটি রচনায় (প্রতিক্ষণ, ১৭ জুলাই, ১৯৮৭) গড় শ্রীখণ্ডের পরিচ্ছেদগুলোর বিন্যাস দেখিয়েছিলেন এইভাবে: আটত্রিশটি পরিচ্ছেদের মধ্যে দশটি পরিচ্ছেদে আছে মাধাই-সুরতুন-ফতেমা-ইয়াজ-ফুলটুসি-ইসমাইল-টেপির মায়ের কাহিনী। নয়টি পরিচ্ছেদে আছে ভূম্যাধিকারী সান্যাল মশাই-অনসূয়া-সুমিতি-নৃপনারায়ণ-মনসা-সদানন্দ মাস্টারের কাহিনী। নয়টি পরিচ্ছেদে রামচন্দ্র-কেষ্টদাস-ছিদাম, মুঙলা-পদ্ম-সনকার কাহিনী। এই তিনটি কাহিনীবৃত্তের গুরুত্ব সমান। বিস্তারও প্রায় সমান। চারটি পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে তালেফ-এরফান-সাদেক-আল মাহমুদের কাহিনী। বাকি ছয়টি পরিচ্ছেদের কাজ এই চারটি কাহিনী-বৃত্তকে যুক্ত করা এবং সমগ্র উপন্যাসটিকে বৃহত্তর বৃত্তের অঙ্গীভূত করে দেওয়া। লেখকের নিজের জবানি যদিও ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে নিজেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃত্তের সঙ্গে অধিকতর যুক্ত বলে দাবি করে, কিন্তু পাঠক হিসেবে মনে হয় প্রথম বৃত্ত অর্থাৎ জমিদারশ্রেণির বর্ণনাতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ।

এই বৃত্তের নর-নারীরা সচ্ছল, পরিশীলিত। দেশ-বিদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্য-শিল্পকলার খোঁজ রাখে। জমিদার সান্যাল মশাই প্রচণ্ড ভালোও বাসেন, শ্রদ্ধাও করেন স্ত্রী অনসূয়াকে। বড় ছেলে নৃপনারায়ণ কংগ্রেসী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। সে জানে ‘শাসনভার যে আমাদের হাতেই আসছে এ-বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ।’

 সে রাজনীতিকে উপজীবিকা করতে চায়। তার বাবা যখন বলে যে, যেহেতু তাদের যথেষ্ট টাকা আছে, সে অনারারি রাজনীতিবিদ হিসেবে থাকতে পারে। কিন্তু নৃপনারায়ণ বলে যে, ‘টাকা আছে, এ আমি অস্বীকার করি না। বরং সেটাই প্রতিযোগীদের তুলনায় আমাকে বেশি শক্তি দিচ্ছে। আমার আদর্শবাদ তাদের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আশা রাখি। আমরা এখনো কিছুদিন ইংরেজি ধারায় চলবো। ইংরেজের দেশেও রাজনীতিওয়ালারা পৈতৃক সম্পত্তিকে অবলম্বন করে কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর প্রফেশনাল হয়।’

অর্থাৎ এখানেও সেই ইংরেজকেই মডেল ধরে অগ্রসর হওয়া। স্বাধীনতার এত বছর পরেও উপমহাদেশের শাসনব্যবস্থা ও শাসনপ্রণালিতে কলোনিয়াল প্রক্রিয়া বহাল তবিয়তে বিরাজ করার মূল কারণ এখানেই খুঁজে পাওয়া যায়। ইংরেজ-বিদায়ের পর যারা শাসনক্ষমতা-অর্জন করে, তারা ইংরেজ-প্রবর্তিত পদ্ধতিই বহাল রাখতে চায়।

অন্যদিকে সান্যাল মশাইয়ের কথাবার্তা, আচরণে ইংরেজি এনলাইটমেন্টের ছাপ প্রচণ্ড। যিনি মনে করেন, তৃতীয় শ্রেণির দার্শনিক হওয়ার চাইতে প্রথম শ্রেণির বাঁচিয়ে হওয়া অনেক ভালো।

এই বৃত্তের নারীরা যেন আমাদের চেয়ে অনেক অগ্রসর। সান্যালগিন্নি অনসূয়া এতবড় বাড়ির সর্বময়ী কর্ত্রী হয়েও কোথাও জোর করে কর্তৃত্ব করেন না। তার আচরণে সবসময়ে ঋজু ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ফুটে থাকে স্নিগ্ধতা। এমনকি ঈশ্বরভাবনার ক্ষেত্রেও তিনি অনেক অগ্রসর। তার ধারণা, ‘ভগবান আছেন, তিনি সর্বত্র বিরাজমান, কিন্তু দলবেঁধে তাঁকে ডাকা যায় না। তাঁর সঙ্গে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে, সেটাকে খুঁজে নিতে হয়।’

পরিবারের কিছু প্রথা তার কাছে রক্ষণশীল মনে হলেও তিনি সেগুলো মেনে চলেন। পুত্রবধূকেও মেনে চলতে বলেন। কেননা, তার ধারণা, এইসব প্রথার মধ্যে শুধু পরিবারেরই নয়, তার এবং তার পুত্রবধূর ব্যক্তিগত মঙ্গলও নিহিত আছে।

সব নারীর মধ্যেই নিজের স্বামী-সন্তান নিয়ে নিজস্ব বলয় রচনা করার স্বপ্ন থাকে। তার পুত্রবধূর মধ্যেও তা থাকবে ধরে নিয়েই অনসূয়া তাকে অপ্রত্যক্ষ বারণ করেন এ-ই বলে, ‘তুমি কি বুঝতে পেরেছো কোনো অসংকীর্ণমনা পুরুষ নিজের পরিজন-বন্ধু বর্গের বাইরে গিয়ে শুধু স্ত্রীকে নিয়ে সবটুকু সুখী হতে পারে না, বিচ্ছিন্ন হলে তার জীবনরস কিছুটা শুকিয়ে যায়?’

আর পুত্রবধূ সুমিতি তো আরো আলোকপ্রাপ্ত, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মেয়ে। তার ব্যক্তিত্বও কম ঋজু নয় Ñ তা অমিয়ভূষণ জানিয়ে দেন কাহিনীবিস্তারের প্রারম্ভেই, ‘শুধু পাল্কি করে আসার ব্যাপার নয়, দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়েছিলেন সান্যালগিন্নি, সুমিতি যখন তার সামনে এসে দাঁড়ালো তখনো সে অনেকদিনের পরিচিতের মতো রূপনারায়ণের একখানা হাত ধরে রেখেছে, হাসছে। একটু বিব্রত হলেও সে-হাসিটি সুন্দর। প্রার্থীর মতো লজ্জার হাসি নয় যে কুণ্ঠিত হতে হবে।’

কিংবা সান্যাল মশাইয়ের ভাইঝি মানসা, যে কোনোদিন স্কুলের চৌকাঠ পেরোয়নি, বাড়িতে লেখাপড়া শিখেছে সদানন্দ মাস্টারের কাছে, সে-ও পর্যন্ত ফরাসি মেয়েদের স্বাধীনতার কথা আলোচনা করে, শিল্পকলার সূক্ষ্ম মোড়গুলো বুঝতে পারে, গ্যঁগার ছবি ও দর্শনের কথা আলোচনা করে।

অমিয়ভূষণ ‘রমণীরত্নের সন্ধানে’ নামক একটি প্রবন্ধে শরৎচন্দ্রকে অভিযুক্ত করেছিলেন এই বলে যে, শ্রীকান্ত উপন্যাসে স্ত্রী-চরিত্রগুলোর নির্মাণে শরৎচন্দ্র একটি মডেলকে অনুসরণ করেছেন। সান্যালবাড়ির নারীচরিত্রগুলো নির্মাণেও কি অমিয়ভূষণ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী হলেও একটি মডেলকেই অনুসরণ করেননি? তাঁর অপরিসীম সযত্ন পরিচর্যা, ভাষায় রৌদ্রছায়ার খেলা সত্ত্বেও সান্যালবাড়ির মহিলাদের যথেষ্ট রক্ত-মাংসের নারী বলে মনে হয় না কখনোই।

তবুও বলা যায়, কাহিনীবৃত্তের এই অংশেই অমিয়ভূষণ সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ, সবচেয়ে সচ্ছলও। সম্ভবত এই শ্রেণিটির সঙ্গেই একমাত্র তার প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল।

ঘ. আবারো শুরুর কথাঅমিয়ভূষণের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী? এককথায় বলা চলে, তাঁর লেখায় সমসাময়িকতার চাইতে দূরবর্তিতার দিকে প্রেষণের অভিলাষ বরাবরই বিদ্যমান। তিনি সাহিত্যেকে যুগের দর্পণ করার চাইতে দূরের দর্পণ করতেই বেশি পছন্দ করেন। দেশী-বিদেশী পুরাণ-অতিকথা অমিয়ভূষণের কাহিনী-বিন্যাসের অঙ্গ হয়ে ওঠে প্রায়শই। খুব সংগত কারণেই এই ধরনের লেখককে পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা করা খুব দুরূহ কর্ম। তার জন্য যে-দক্ষতা, যে-সাহিত্যিক উচ্চমনন, মিথ ও সাহিত্যের মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে যতখানি ধারণা থাকা প্রয়োজন তা এই নিবন্ধকারের নেই। তাহলে এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো, পাঠককে অনুরোধ করা এবং মনে করিয়ে দেওয়া যে, অমিয়ভূষণকে বোঝার একটাইমাত্র পথ আছে। তা হলো অমিয়ভূষণকে পাঠ করা, বারবার পাঠ করা। গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গেও, ফলত একই বক্তব্য।