কবিতা
-
বুদ্ধ বললেন, তবু…
সৌম্য সরকার একদিন ছিল যেদিন বুদ্ধের শরীরে দেশলাই ঠুকে দিলে জ্বলে উঠতো আগুন : কষ্টগুলো হামলে পড়লে কুঁকড়ে যেতেন তিনি, বেদনায় নীল, কামে-ঘামে বেগুনি হয়ে উঠতো শরীর – তারপর আবার একদিন অন্য এক আগুনে পুড়ে যখন শুদ্ধ হলেন তিনি, দীর্ঘ উপবাসের পর সুজাতার হাতে দগ্ধ একবাটি পায়েস খেয়ে প্রথম বললেন, ‘জগতের সব প্রাণী সুখী হোক’…
-
অন্ধ হতে পারিনি
সোহরাব পাশা আমাকে বিশ্বাস করো কেবল তোমার জন্যে অন্ধ হতে পারিনি আজো বহুকাল আগেই পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আমার সকল নিঃস্ব জেনে ভালোবাসা যেখানে ব্যাকুল ডাকে একা অধিক উজ্জ্বল দিগন্তের শেষ প্রান্তে ঝরে প্রার্থনার শুদ্ধজল আমি কোনো গ্রহবৃক্ষ নই ধু-ধু নির্জন ভাঙা সাঁকোর এপারে দাঁড়িয়ে আছি মাঝখানে ডেকে ওঠে দীর্ঘ ভয় অথই জলঘূর্ণি পেছনে…
-
দাঁড়াও পথিকবর
বীথি চট্টোপাধ্যায় [ফ্রান্সের মার্সাই শহরে অভুক্ত থেকেছেন কবি মধুসূদন ও তাঁর সংসার] এস্টেট থেকে টাকা আসছে না হাতে বাচ্চারা প্রায় কিছুই খায়নি রাতে, না-পেলে খাবে কী? শুধু কটা বাসি রুটি… পড়ে আছে দেখে, শুতে গেছে গুটিগুটি। রাত শেষ হয়ে সূর্য ওঠার পরে কী করে উনুন জ্বলবে কবির ঘরে? তারা ঝিকমিক করে ফ্রান্সের রাতে…
-
অধরা
জরিনা আখতার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছ বললে ভুল হবে – আজীবন তুমি আমার স্বপ্নে বসবাস করছ বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে, সেই দূর শৈশবে জেগে উঠেছিলাম তোমাকে পাবার সাধনায় – আলপথে হাঁটতে হাঁটতে একাকিত্বের বেদনা যখন বিস্ময়কর আনন্দে রূপায়িত হলো সেই থেকে শুরু – শস্যক্ষেতে অধীর অপেক্ষায় একটি নিঃসঙ্গ বক জলের আরশিতে একটি হিজল গাছের অকৃত্রিম…
-
অগ্রবিজ্ঞান
রবিউল হুসাইন প্রকৃতির শিক্ষায় শিক্ষিত ওরা অক্ষরজ্ঞান ছাড়াই অভিজ্ঞতার বৈদগ্ধে উন্নত ব্যক্তিক উৎকর্ষতায় ওরাই এখন প্রজ্ঞাবান জিজ্ঞাসু পরিপূর্ণ ধর্মতলার অতলে ম্লান নিগূঢ়তা অসম্পূর্ণ ধর্মান্ধের তীব্র নেশায় জলসাপ সব নড়ে জংলিফুলের কৃষ্ণছায়ায় জলপরীরা ওড়ে ধর্মজলে খুব আবেগে সন্তরণ করে হঠাৎ আমি উঠি জেগে অনেক দিনের পরে তখন বিলম্বকাল সময় তমোময় সবকিছু…
-
দুটি কবিতা
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত অজ্ঞেয় এবার যে-নৌকো এসে কূলে ভিড়ল আমি জানি ফেরার উজানি স্রোতে আমি তার একাকী সওয়ার। লোডশেডিংয়ের মোম জ্বেলে ধরে লক্ষ করি তার মাপ অবিকল আমারই দেহের সম্পূরক। তবে কি কফিন সেটা? অথবা কাঠের জামা বুঝতে পারি না। গলুইয়ে যে বসে আছে সে কি অন্ধ নাকি তার চোখে বাঁধা আমারই কাফন? আমি তার জায়গায়…
-
শহর দখলের পূর্বলেখ
কামরুল হাসান বাঁধরাস্তা থেকে নেমে গেল চারজন গ্রামমুখো মানুষ মিয়ানো আলোর ভেতর তাদের তেরচা শরীর সুস্পষ্ট বাঁকালো দূরে কুয়াশা আর তোরসা একাকার। বালি, ঘাস আর মাটির জুড়নে যে মাঠ তারা সেই মাঠের ভেতরে গিয়ে নামে, একটি সরলরেখার দাঁড়ায়। অস্পষ্টতার ভেতর বিলীন সাদা পথ, ওরা সেই পথের শরীরে নামে, সাদা ও সরল। কয়েকটি…
-
সূর্যোদয়ের পথ
মোসলেম উদ্দীন পাঠ করো একবার কেন থেমে আছি নির্বাক মননের কথা নিয়ে শারীরিক ভাষায়, এ-পাঠে ভুল করলেই ভুল তোমার আমার চোখের ভাষা মনন থেকে সরে না একচুল। জীবনটারে দেখতে হচ্ছে ধরে রেখে কায়ক্লেশে চলছে ক্ষীণগতির শকটে ছদ্মবেশে নয় বটে। ছন্দে চলতে চাই সবাই তোমার কী যে মতি বাড়াও না আরো গতি বাড়িয়েই ছুঁতে হয় ছন্দময়…
-
তুমি বলো
ধ্রুব দে আমি ভাবি আমি তুমি বলো গড়ো তুমি মাঝখানে তিরতির নদী দিন যায় রাত যায় বছরও কত পার ঘটি ভাসে বাটি ভাসে তুমি বলো আমি ভাঙি আমি বলি মাঝে থাকে পূর্ণতোয়া নদী
-
ত্রিমাত্রিক অঙ্কনের মতো
তমিজ উদ্দীন লোদী ঝুলবারান্দা থেকে দেখছি তুমি ঝুলে আছ তোমার কার্নিশে টলোমলো পা তোমার, দুহাত ডানার মতো স্ট্যাটোস্ফিয়ার ঘেঁষে যাওয়া কুয়াশার মতো মেঘ ছুঁয়ে আছে। যেন বহুরঙা ঘুড়ি, সুতোছেঁড়া, উড়ছে স্বাধীন ইচ্ছের মতো জলো কি ঠান্ডা বাতাসের ঘোর এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তোমার আঙুল আর ঈষৎ লিপস্টিক-ছোঁয়া ঠোঁটের কম্পন। ত্রিমাত্রিক অঙ্কনের মতো যেন ক্যানভাসে…
-
চৈতন্য
তপন গোস্বামী খাঁ-খাঁ পড়ে থাকে বিকেল এখন নদীতীর সুনসান বাতাসও এখন ভারি হয়ে আছে দম ধরে আসে প্রাণ। এদিকে-ওদিকে শরৎ শিশির হিম জমা হয় হাড়ে তবুও নিমাই, পথে কত ভাই, কেউ কেউ বাড়ি ছাড়ে। মাথা ন্যাড়া করে পথে না নামলে সন্ন্যাসী তুমি নয় অথচ ভেতর পুড়ে পুড়ে খাক্ সংসারে বড়ো ভয়। নওল কিশোর কোথা…
-
জলজ জীবন
খোরশেদ বাহার দিনের আলো, ধ্যুৎ ছাই লাগে না ভালো নামুক অন্ধকার পৃথিবীজুড়ে রাত্রির আবাস টুংটাং রিকশার শব্দ ধোঁয়ার কুন্ডলী ভেসে যাক আপন ঠিকানায় চায়ের কাপ পড়ে থাক খদ্দেরহীন। খিল-আঁটা দরজায় না পড়ুক ভোরের টোকা জানালার গ্রিলে জমে থাক অন্ধকারের বরফ আর শীত সমুদ্রের তরল হাওয়ায় বেশ পালটে যাই জলজ জীবনে মীন রাশির এই জাতক।…
