ছোট গল্প

  • সন্নিধান : অনন্ত খনিজ

    হাসান হাফিজ   সুরলোকে আলোর মূর্ছনা আছে আত্মলয়ও আছে এ বন্দিশ কোনোদিনই ফুরাবার নয় রাগমালা ভুল (?) করে তোমাতে মজেছি, ভজন সাধন সিদ্ধি সে-কারণে হলো না হলো না! ধ্রম্নপদ সংগীতে আছে অনন্ত খনিজ সূক্ষ্ম মিহি অন্তরীণ বেদনাদহন ঐশিতার ধীরলয় ওঠানামা তান মর্মের মরমে পশে নতুন চরের মতো সুরলোক আবিষ্কার করি, মৃত্যুস্বাদ করি পান তারিয়ে তারিয়ে…

  • অরিন্দম বসু পিউদের বাড়ির বেড়ালটা ছেলে কিন্তু ওরা তাকে সোনা মা, লক্ষ্মী মা বলে ডাকে। এমনিতেই ওদের বাড়িটা আমার ছিটিয়াল মনে হয়। চার বোন। কারো বিয়ে হয়নি। বড় তাপসীদি – ঘুরে-ঘুরে কমিশনে আলতা-সিঁদুর বিক্রি করে। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ তো হবেই। মেজ তনিমাদি ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ। বাজারে যায়, মুদি সামলায়, রেশন তোলে, কেরোসিন ধরে, রান্না করে। মেজ খেয়ালি তিরিশ-একত্রিশ। অ্যাডহেসিভ…

  • দুয়ারে প্রস্তত গাড়ি

    আফসানা বেগম জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে দেখলাম ভাড়া করা মাইক্রোবাসটা গেটের সামনে দাঁড়ানো। দোতলা থেকে গাড়ির ছাদটা পরিষ্কার দেখা গেল। দুটো-তিনটে স্যুটকেস সেখানে এঁটেই যাবে, বাকি আমরা দুজনসহ ভেতরে। বড় আসবাবগুলো ট্রাকে ভরে পাঠিয়ে দিচ্ছিলাম তিনদিন ধরে। রাস্তার মাথায় একটা ছোট্ট সাইনবোর্ডে লেখা, ‘ট্রাকে ট্রাকে মালামাল পাঠানো হয়’। যেমন বারবার ট্রাকের কথা লিখেছে, তেমনই বারবার…

  • বাঁশরি আর ওরা

    অর্ণব রায় সুয্যি উঠে পড়েছে। বাঁশরিও উঠে পড়ে। না উঠে উপায় আছে? ওদের মধ্যে অনেকে সকাল হতে-না-হতেই উঠে পড়ে যে। কেউ-কেউ অবশ্য বেলা দুপুর গড়িয়ে দেয় উঠতে-উঠতে। কেউ আবার উঠে পড়ে, তবে ঘণ্টাদুয়েক যেতে-না-যেতে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায় আবার। বাঁশরি চেষ্টা করে সারাদিনে অন্তত একবার হলেও সকলের কাছে যেতে, সকলকে দেখা দিতে। শুধু গেলে তো…

  • ফণীন্দ্র

    মাদ্রাসার ভিটেয় উঠতে গিয়ে সিঁড়িতে এক পা রেখে থমকে থেমে যায় ফজল। ভবনটি ছিল একতলা। এখন দোতলা ভবনে সবলসিংহপুর সিনিয়র মাদ্রাসার নামফলকটি শোভিত। সে যখন দেখেছে তখন ছিল জুনিয়র মাদ্রাসা; স্থাপিত ১৯২৬। একতলার রূপটি ছিল হালকা-পাতলা ছিমছাম। এখন ভার বেড়েছে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে। একটু অচেনা মনে হয়। এখানে সে পড়েনি। গুরুত্বটা বেশি বাবা পড়েছেন বলে।…

  • মধ্যরাতে তসিলদার

    সৈয়দ শামসুল হক গল্পপট। পট খুলে যায়। বিস্ময়ের মধ্যে বিস্ময়, আর কারো নয়, জলেশ্বরীর সবচেয়ে হতভাগা গরিবুল্লার মুখ ভেসে ওঠে। আমাদের এ-তল্লাটে সবচেয়ে নিরীহ সবচেয়ে নিরুপদ্রব সবচেয়ে একা মানুষ এই গরিবুল্লা। ছিল তারা এগারো ভাইবোন, বাপ মরার পর ছোট ভাইবোনেরা বলল, তুই তো চাইরের চার বচ্ছর বাপের কোলে একাই উঠিছিস, মায়ের কোলও মুখ রাখি নিন্দও…

  • মনগড়া কুকুরের কনে দেখা

    সৈয়দ শামসুল হক অন্তত এখন ভয়ের এমন একটা রূপ ফুটেছে যে, দিন যত বাড়ে ততই সে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। আমাদের বন্ধুটির নাম ছিল মকবুল। ব্রিটিশ আমল হলে তাকে নকল কুত্তা বলা যেত। কেন? এক – বাঙালি পাদরি এসেছিলেন জলেশ্বরীতে, নলিনীকান্ত। বরিশালের এক বিশেষ স্কুলে তার শিক্ষা শুরু হয়। তার স্ত্রী শ্রীমতী কল্যাণী দাসি আমাদের হাসপাতালের…

  • হাওলাতের বহি

    সৈয়দ শামসুল হক আমরা আমাদের বাপো দাদার মুখে শুনেছি দালান তৈরিতে ইট লাগে আর সেই ইট তৈরি হয় ইটের ভাঁটায়। আমরা ইটের ভাঁটা চোখে দেখি নাই। কাগজে ছবি দেখেছি। কাগজেই পড়েছি পরিবেশবিদ নামে নাকি একটা দঙ্গল আছে তারা ইটের ভাঁটি বসাতে দিতে চায় না। আমাদের জলেশ্বরীতে তার দরকারই নাই। বাংলাদেশের আগে মাত্রই দুটো দালান ছিল…

  • পাকা বন্দোবস্ত  

    প্রদীপ আচার্য রোববার দুপুর গড়িয়ে বিকাল আসার সবুর সয়নি, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে প্রতাপের মেয়ে-জামাই সুদেষ্ণা আর সুপ্রতিম। ওদের আর তর সইছে না। এদিকে পাড়ায় একেবারে ঢিঢি পড়ে গেছে। পড়বে না? প্রতাপ রায়ের মতো মানুষের যদি এই ভীমরতি হয়! সে তো নাকি হয় বাহাত্তরে! কিন্তু প্রতাপ রায়ের এখন বাষট্টি। অবশ্য কেউই তা বলবে না। একেবারে…

  • চুম্বন

    আফসার আমেদ জয়নাল বলল, ‘মায়ের জর্দার প্যাকেটগুলো ব্যাগে তুলতে ভুলে যাওনি তো?’ শ্রীপর্ণা বলল, ‘আরে খুলে দেখে নাও না।’ ‘দেখতে হবে না, নিয়েছ বললেই যথেষ্ট। আর সাবান-জর্দার প্যাকেট বিস্কুট আর বাদামের প্যাকেটের সঙ্গে মিশিয়ে নাওনি তো? শ্রীপর্ণা বলল, ‘কখন ট্রেন ছাড়বে? এই ফাঁকা ট্রেনটায় উঠলে কেন?’ শ্রীপর্ণা আঁচল দোলায় মুখের সামনে। ‘গ্রামে যাবার ট্রেনের ব্যাপার-স্যাপার…

  • ঠিকানা  তোমার  হারিয়ে  ফেলেছি 

    সালেহা চৌধুরী লিলিকে অয়ন প্রথম দেখেছিল ভিনসেন্ট বুলাভার্ডে। একটি ফুলের দোকানে ফুল কিনছিল লিলি। অয়ন তখন পড়াশোনা করত প্যারিসে। অয়নের পরীক্ষা হয়ে গেছে। দুদিন পরে সে দেশে ফিরে যাবে। ঠিক তখনই।  চমৎকার ফরাসি মেয়ে। ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি বলে। একরাশ লম্বা চুল। আর একটি কিউট মুখ এবং অড্রে হেপবার্নের মতো হাসি। সেই হাসি থেকেই কাছাকাছি আসা। অয়ন…

  • বিভ্রান্তি অথবা বাস্তবতা অথবা কাকতালীয়

    নকিব ফিরোজ ট্রেনটা রাত দশটায় স্টেশন ছাড়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আশ্বিনের ঠান্ডা হাওয়ায় যাত্রীরা ঝিমুতে শুরু করে। ঘুমোনোর পরিকল্পনা করেই যেন এসব যাত্রী রাতের ট্রেনে রওনা হয় দূর-দূরান্তের পথে। তাই কামরার একদিকে একটা হলুদ আলো ছাড়া আর সব আলো নিভিয়ে দেওয়া। লোকজনের কথাবার্তাও কমে এসেছে। শুধু কানে বাজছে একলয়ে ছুটে চলা ট্রেনের ধাতব শব্দটা। শরীরে একরাশ…