ছোট গল্প

  • বর্ণপরিচয়ের গোপাল

    শচীন দাশ এই একটা জায়গা, ওদের ভারি পছন্দের। দুদিকে দুটো দেয়াল আছে। দেয়ালের ওপরে টিনের চালা। চালাটা পুরনো। পুরনো ও ভাঙা। ওই ভাঙা চালারই নিচে একফালি জায়গা। ভ্যাপসা ও অন্ধকার। গাদাগাদি করে ওই অন্ধকারেই তখন দুই ভাই। গোপাল ও ভূপাল। গপু ও ভেপু। তাদের মা বড়ো আদর করে ডাকত। একদিন কী যে হলো! মা পালাল…

  • সান ফ্রান্সিসকোতে ফাঁস

    ওয়াহিদা নূর আফজা রুমমেট মেরি লি আর আমার সমস্যাটা এক। অথচ দুজন এর সমাধান চাচ্ছি দুরকম পথে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের মিলের থেকে অমিল বেশি। প্রথম এবং প্রধান মিলটার কথা আগে উল্লেখ করি। আমরা সমবয়সী। আমার বয়স চবিবশ। মেরি লি আমার থেকে দুবছরের ছোট। অমিল অনেক। সে বেশ সুন্দর। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় তাকে একজন প্রথমসারির…

  • দশ জানুয়ারি ১৯৭২

    মনি হায়দার আফসানা খানম কাঁদছেন। সাত মাস ধরে তিনি নিয়মিত কাঁদছেন। না, তার কান্না কেউ শুনতে পাচ্ছে না। মনের ভেতরে গুমরে গুমরে কাঁদছেন। না কেঁদে উপায় কী? তার চারদিকে ভীষণ বিপদ। একমাত্র ছেলে বাড়ি নেই। স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে জানেন না। আদৌ বেঁচে আছে কি-না…। আর ভাবতে চাইছেন না। কিন্তু কোত্থেকে ভাবনা আর মনকান্না…

  • এই কবিতাটা কতোভাবে লিখি

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর লিরিক কবিতার অন্তর্ঘাতী চরিত্র নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতে মধ্যরাত পার করি, কিংবা কফি খেতে খেতে আমরা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অসম্ভব খিদের কথা বলতে বলতে ভোরবেলায় পৌঁছে যাই, কিংবা সুরাইয়া তোমার কি মনে আছে গুন্টার গ্রাসের কথা, কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন একদিনের সফরে, তাঁকে আমরা ধরে এনেছিলাম আমাদের সেন্টারে, তাঁর মুখে টিন…

  • ছুঁচোর কেত্তন

    নীহারুল ইসলাম স্বাভাবিক নিয়মেই আমার মৃত্যু হয়েছিল। তবে আমার ইচ্ছানুসারে আমাকে দাহ করা হয়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিসাধনে মেডিক্যাল কলেজে আমার দেহটা উৎসর্গ করা হয়েছিল। তারপর কত দিন! কত রাত! কত অন্ধকার পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ছুঁচো জন্ম পেয়েছি। নিজেকে ধন্য মনে করেছি। যদিও নিজেকে ধন্য মনে করার পেছনে আরেকটা কারণ আছে, ছুঁচো জন্ম পেলেও আমার অবস্থান হয়েছে…

  • বইপোকা

    কানাই কুন্ডু অঞ্জনকে সবাই বইপোকা বলে। কিন্তু অঞ্জন বই খায় না, পড়ে। মানুষের নানা অভ্যাস থাকে। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, গান গায়। নাচে, কেউ গপ্পো-কবিতা লেখে, নাটক করে। কেউ অভিনেতা, পরিচালক, আবার কেউ গুছিয়ে ঘর-সংসার করে। অঞ্জন এসব করে না। পড়ে। যত পুরনো, ততো আগ্রহ। এই অভ্যেসে সে বাংলাবাজারের পুরনো বইপাড়ায় ঘোরে। ইউনিভার্সিটির চত্বরে, আড়ংয়ের ফুটপাতে…

  • ক্যালোট্রপিস জায়গানটিয়া

    বুলবন ওসমান কদিন থেকে সকালটা খুব ফাঁকা যাচ্ছে রাশেদের। কাজের ছেলেটা আসবে আটটার দিকে। বিদুষী স্ত্রী গেছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করতে যুক্তরাজ্য। এই মাঝবয়সে একা একা নিঃশব্দ ঘরে বেশ অস্বস্তি বোধ করে। মেয়েটাও গেল হোস্টেলে। স্থাপত্যবিদ্যার মডেল করতে দিন-রাত লেগে যায়। ফলে সে গৃহত্যাগী। মা নেই, মেয়ে নেই, কাজের ছেলেটা নেই, আছে শুধু সে একা, সকালের…

  • ক্ষুধা ও প্রেম

    হুমায়ূন মালিক   তারেক দরজার কাছে এসে থামে, বলে, ওই যে বেঞ্চে, মেরুন রং শাড়ি… এই… তারেকের কথা কাট করে হাঁক, দেখি ভাই… হাতে হাতকড়া পরা মধ্যবয়সী এক আসামিসহ দুই-তিন পুলিশ। বউ আর বউয়ের লাঙ্গরে প্রেকটিকেলে পাইয়া শালায় জোড়া খুন ঘটাইছে। তার পাশ থেকে কেউ বলে। আসামিসহ পুলিশ আদালত কক্ষে ঢোকার পেছন পেছন রায়হানও। ঢুকে…

  • কে আসে অন্ধকারে

    ইমদাদুল হক মিলন এনামুলের মৃত্যুশোক তখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমরা। বিশেষ করে রওশন একদমই মেনে নিতে পারছে না ভাইয়ের মৃত্যু। সে আর এনামুল যমজ। যমজ ভাইবোনদের একজন আরেকজনকে ছেড়ে গেলে অন্যজন সেই শোক সামলাতেই পারে না। রওশন সারাক্ষণ কাঁদে, কথাবার্তা প্রায় বলেই না। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ছেলের শোক সামলে মা এখন রওশনকে নিয়ে ব্যস্ত। যেভাবে…

  • আমাদের চার বন্ধুর গল্প

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ঢাকা, ২০১০-এর শেষদিক। দুই পাপেভরা ইউরোপ এবং জাঁকালো আমেরিকার মধ্যে আমার চলাফেরা। আবার জাঁকালো ভারত এবং পাপেভরা বাংলাদেশের মধ্যে আমার আনাগোনা। একসময় আমরা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা নিয়ে আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আমরা : ঢাকার আমি, মুম্বাইয়ের গৌরী, প্যারিসের সুজান এবং আমেরিকার অ্যাবি। আমাদের সেইসব দিন ছিল উদ্দাম হাসির, ক্ষণিক প্রেমে পড়ার,…

  • প্রাকৃতিক

    সমরেশ মজুমদার পঁচাত্তরে পড়তে আর তিনমাস; কিন্তু স্বপ্নেন্দুর মাথার  একটি চুলও সাদা হয়নি। দাড়ি কামাবার সময় আয়নার সামনে বসে নিজেকে লক্ষ্য করেন তিনি। দুদিন দাড়ি না কামালে (সেটা খুব কম হয়) গালে সাদা ছোপ লাগে। কিন্তু না জুলপি, না কানের ওপাশে একটি রুপোলি চুল দেখতে পান না। একদা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে ঠেস দেওয়া প্রশ্ন…

  • কানার হাটবাজার

    সৈয়দ শামসুল হক কিছুদিন থেকে এক কিশোর আমাদের সাথ লয়েছে। পাছ ছাড়ালেও সে পাছ ছাড়ে না। আমরা যেখানে যাই, আমরাই তো যাই, সেও যে সাথে আছে ঠিকই ঠিক পাই, পাশ ঘুরলেই দেখি তাকে। মাথায় নারীর মতো লম্বা কেশ, লালিয়া তার রঙ, বুঝি তেল পড়ে নাই বহুদিন, সময়তে বটের ঝুরি ছিঁড়ে তাই দিয়ে বেঁধে কেশ পিঠের…