ছোট গল্প
-
এক শতাংশ পুত্র
পূরবী বসু প্রথম প্রথম এ-ব্যাপারটা অতো খারাপ লাগতো না। কেননা, এমন একটা সময় ছিল, যখন বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না আমার। তারপরও বেঁচে যে আছি সে তো তার দয়াতেই। সন্দেহ কী? তাহলে? তাহলে তার প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতাবোধ থাকাই তো স্বাভাবিক। তাই নয় কি? আর কৃতজ্ঞতার এই বহিঃপ্রকাশ হলো, তাকে তার পুত্রের জীবিত অংশটুকু,…
-
চলন্ত বাসের কিচ্ছা
রেজাউর রহমান ভরদুপুরের ভরারোদে শাহজাহান সাহেব দাঁড়িয়েছিলেন আসাদ গেট বাসস্ট্যান্ডের আধা আলো, আধা ছায়ায়। পুরো ছায়ার জায়গা তিনি খুঁজে পেতে জোগাড় করতে পারেননি। ছায়া-সন্ধানী লোকের বড় ভিড় আজ। বৈশাখের মাঝামাঝি। এ-সময়ে কমপক্ষে দু-চারবার বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ হয়নি। পারদকলাম উঠছে তো উঠছেই। তা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই। শাহজাহান সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন বাসের অপেক্ষায়। হাতে…
-
খুন
মাহবুব তালুকদার এ-অঞ্চলে খুন কিংবা গুম নতুন কিছু নয়। মাঝেমাঝেই ঘটে এমন ঘটনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চরের জমিজমা ও পারিবারিক রেষারেষি নিয়ে বিরোধ হয়। বিরোধ গড়িয়ে যায় হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত। হত্যাকাণ্ড হলে পুলিশের পকেট ভারী হয়। তারা দায়ী ব্যক্তিকে ধরে আদালতে চালান করে দেয়। আবার পয়সাও খায় তার কাছ থেকে। যে খুন বা গুম হয়, তার স্বজনের…
-
পঞ্চাশ বছর পরে সবলসিংহপুরে
বুলবন ওসমান অন্তরের তাগিদটা ঘণ্টাখানেক আগেই হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছে ফজলকে। যাত্রীছাউনিতে অপেক্ষা। সঙ্গে আছে পঞ্চাশোর্ধ্ব দূরসম্পর্কের ভাগনা সামাদ। একটি ডেকোরেটর সংস্থার ম্যানেজার। পাশাপাশি গ্রামে বাড়ি। প্রায়ই ঢাকা থেকে দেশে ফেরে। সব পথঘাট চেনা, তাই তাকে সঙ্গে নেওয়া। মনে পড়ে পঞ্চাশ বছর আগে দশ বছরের এক বালক এই স্টেশন দিয়ে শেষবার গেছে, আর কোনোদিন এখানে…
-
তোরাপের তমসুক
হাসনাত আবদুল হাই দেখতে দেখতে সূর্য মাথার ওপরে উঠে এসেছে, দুরন্ত ছেলের নষ্টামি করার মতো। কিন্তু তার মুখে দুষ্টুমির হাসি তো নেই, রয়েছে গনগনে আগুনে পুড়িয়ে মারার করাল ভ্রুকুটি। চৈত্রের সূর্যের তাপে মাঠঘাট, গাছপালা ঝলসে যাচ্ছে। মাঠ ফেটে ফুটি-ফাটা, গাছের পাতা নেতিয়ে পড়েছে ক্লান্ত জন্তুর জিভের মতো। জলাশয় শুকিয়ে চিমসে, বুদ্বুদ ওঠে শেষ নিশ্বাসের মতো।…
-
উদ্গত অথবা অচরিতার্থ
সাগুফতা শারমীন তানিয়া ‘জেলখানায় কাজ করতে আসবার পর ঠিক কোন সময় থেকে আমার মনে নেই, আমার একরকম আরামের বোধ শুরু হলো। কড়া চেহারার লাইব্রেরিয়ান যেমন ধূসর কাপড় পরে পটভূমিতে বিলীয়মান হতে চায়, আমুর টাইগার যেমন মাঞ্চুরিয়ান পর্বতমালায় – ইঁদুরশ্রেণির প্রাণী যেমন শীতনিদ্রায়… জেলখানার নিশিছদ্র বেষ্টন আমাকে একরকম আরাম দিতে থাকলো – যেন আমার অসংলগ্ন মন…
-
আলো নেই
মোহাম্মদ ইরফান ছাত্রাবাস থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হেঁটে এসে ক্লান্ত ছেলেটি বাসে উঠেই ধপাস করে বসে পড়ে তার জানালার ধারের সিটে। কাঁধের ব্যাগটি কোলের ওপর নামিয়ে রাখে আপাতত। ছেলেটি বসে যেতেই হন্তদন্ত হয়ে পাশের আসনে এসে বসে একজন ভদ্রলোক। বসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার উঠে পড়ে ভদ্রলোক। ছেলেটির কোল থেকে হাতব্যাগটি তুলে নেয়। বিস্মিত ছেলেটিকে কিছু বলার…
-
শ্মশানবন্ধু
মণীশ রায় সহসা চারপাশের শব্দগুলো থমকে দাঁড়ায়। কতগুলো পরিচিত-অপরিচিত মুখাবয়বের অন্তহীন পুতুলনাচ মুখ থুবড়ে পড়ে; শব্দহীন। কালো ভূতের মতো ঠ্যাং-ওলা ক্যামেরাকটি হঠাৎ স্থির হয়ে যায়; মাথার ওপর চুন-সুড়কির ছাদ ফুঁড়ে যে-রংচটা ফ্যানটা ঘরঘর শব্দে অবিরাম ঘুরছিল একটু আগে, আপাতত সেটিও মুখবন্ধ কয়েদির মতো বাতাসে কিছু নিঃশব্দ আঁকিবুকি ছাড়া আর কিছুই করছে না; চারপাশ জুড়ে এবড়ো-খেবড়ো…
-
এই আমি নই আমি
আফসানা বেগম আজ তেত্রিশ দিন হলো আমি ফেসবুকে ‘ফারহা সিমি’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছি। ‘ফারহা’ বা ‘সিমি’, কোনো নামেই আমি কাউকে চিনি না। তবে এটা জানি যে, এই নামগুলো শোনা যায় এর-ওর মুখে। তাই হয়তো কোনো কথোপকথনের স্মৃতি ফুঁড়ে নামদুটো আমার সামনে ভেসে উঠেছিল। দুটো নামকে কেবল সন্ধি করে আমি অ্যাকাউন্টটি খুলে ফেললাম। এরকম একটি…
-
মোনাজাত
অর্ণব রায় মাতালের কান্ড, পাগলের খেয়াল, বজ্জাত ছেলেপিলের বাঁদরামি – সবরকম ভাবা হয়ে গেলে বোঝা গেল আওয়াজটা আসলে কান্নার। কেউ গলা ফাটিয়ে তারস্বরে সুর করে কাঁদছে। পুরুষের গলা। কতকটা বাঁধপুল বাজারের কাদেরের মতো শুনতে। এশার নামাজের পর থেকেই আওয়াজটা সকলের কানে আসতে থাকে। প্রথম প্রথম, যেমন হয়, কে না কে কাঁদছে মনে করে কেউ সেরকম…
-
এখন তোমার যেমন দরকার
জিয়া হাশান সকালেই অ্যাডটা চোখে পড়ে। পত্রিকার দুটো পাতা ওলটাতেই সে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু লুবনা তাতে থিতু হতে পারে না। তার ওপর নজরের একটু ছোঁয়া দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। মনোযোগের জোয়ারি জলে তারে আর ডোবানো হয় না। তবে একনজরেই বোঝে - অ্যাডটার দাবি-দাওয়া ভিন্ন ধাঁচের, চেহারা-সুরত আলাদা ধরনের। ক্লাসিফায়েড গোত্রের, পাত্র-পাত্রী চাই গোছের কিন্তু…
-
বীরেন স্যারের চেহারার শেষ পরিণতি
ইকবাল আজিজ বীরেন স্যার আমার শৈশবের হিরো, আমার দেখা জীবিত মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রূপবান। বীরেন স্যারের সঙ্গে আমার শৈশবের শিল্পচেতনা ও সৌন্দর্যচেতনার অনেকখানি জড়িয়ে আছে; তাঁর কথা কি আমি ভুলতে পারি? তাঁর চেহারা ছিল অতি বিস্ময়করভাবে নায়ক উত্তমকুমারের মতো। সেই আমলে ষাটের দশকের শুরুতে উত্তমকুমার ছিলেন যে-কোনো বিখ্যাত জননেতার চেয়েও অনেক বেশি জনপ্রিয়। আর নায়িকা…
