ছোট গল্প

  • শুধু একজন জানে

    এই বাড়িতে দুটো পুজোর ঘর আছে, একটা বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। শুধু ওপার বাংলার দিদা এসে এই বাড়িতে থাকলে সেটা খোলা হয়। সেই ঘরটাতে কোরান রাখা থাকে বারোমাস, ওইপারের দিদা ঠাট্টা করে বলে, ‘এ কি নারায়ণশিলা যে তুলে নিয়ে যাবো আবার না থাকলে ফেলে রাখা যাবে না।’ আজ সেই বিখ্যাত গায়ক মানুষটি মারা গেছেন,…

  • সহমরণ

    সুশান্ত মজুমদার  রোজ একঘেয়ে কয়েক কিসিমের কাজ সেরে ঘুণ-জর্জর শরীর টেনে ছলেমান টিনের ছাপরায় যখন ফেরে, হাঁটুর জোর তখন নস্যাৎ হওয়ার উপক্রম। পেরেশানের চাপে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মুহূর্তে যেন গুঁড়ো হবে সে। কাঁহাতক আর সহ্য হয়, দুদন্ড জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসত কই! সময়-অসময় নেই, দৌড়াও বাজারে, ব্যাপার কী, মাছ-গোশত-তরকারি হেন কিছু বাকি নেই, সদ্য সে কিনে…

  • দেশে বিদেশি

    সুদর্শন সাহা  একটা আধবুড়ো লোক, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, গায়ে চাদর জড়ানো, জবুথবু হয়ে পুলুর সামনে দাঁড়িয়ে। ওকে দেখে কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছে, আমি পুলুকে বললাম, হ্যাঁ রে, ও দয়াল না? পুলু অবাক হয়ে বলল, হ্যাঁ, তুই কী করে চিনলি? আমি বললাম, কেন চিনব না, ওকে তোদের বাড়িতে এতো দেখেছি, তখন ও হাফপ্যান্ট পরত, সদ্য…

  • ধনেখালিতে একদিন

    বুলবন ওসমান  আচ্ছা, সাহানার বর্তমান চেহারাটা কেমন হবে? কিছুতে মিলিয়ে উঠতে পারে না ফজল। ওকে শেষ দেখেছে সেই মুক্তিযুদ্ধের কালে, ১৯৭১ সালে যখন ইয়াহিয়ার গণহত্যার তাড়া খেয়ে ওরা হুড়মুড় করে এক কোটি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবেশ করেছিল। বড়খালার ছেলেমেয়েরা তখন প্রায় সবাই বড়। সাহানাটা সবার ছোট, স্কুলে পড়ছিল। তখন কত হবে ওর…

  • পরি-দর্শন

    নীহারুল ইসলাম মাইকে ধর্মীয় জলসার ঘোষণা শুনে পানুকে আমার স্মরণ হয়। পানু আমার দোস্ত লাগে। কিছুদিন আগে পানুদোস্ত চুপ করে আমাকে বলেছিল, আমি জোড়পুকুরে জলসা শুনতে গেলে সে আমাকে পরিদর্শন করাবে। পানি-থইথই জোড়পুকুরে যে এককালে পরি গোসলে নামত, সে-কথা আমি জানি। সেই কোন জন্মকাল থেকে মা-খালার মুখে শুনে আসছি! কিন্তু এদিকে আজ ক-বছর জোড়পুকুরে পানি…

  • লব্ধ ভিক্ষুকসমগ্র

    মহীবুল আজিজ শহরে হঠাৎই ভিক্ষুকহীনতা দেখা দিলে সাদি খুব বিপন্ন বোধ করতে লাগল, কারণ তার একশ একজন ভিক্ষুক দরকার। এখন একদিনে এত ভিক্ষুক সে কোথায় পায়! অথচ ভিক্ষুক না পেলে তার সমূহ সংকট। তার মায়ের মনোবাঞ্ছা থেকে যাবে অপূর্ণ এবং এর পরিণামে হয়তো তার এবং তাদের সকলের জীবনের ভবিতব্য হয়ে পড়বে কালগ্রস্থ। এমন অবলম্বনহীনতার বোধ…

  • মা ও মেয়ে

    মীনাক্ষী সেন মা ক্রমাগত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলেন। মেয়ের বাড়ি ফেরার সময় হলো, অথচ সে বাড়ি ফিরছে না। স্কুল ছুটি হয় চারটের সময়, পুলকার ঠিক করা থাকে, মেয়ে বাড়িতে এসে নামে ঠিক সাড়ে চারটের সময়। কোনোদিন, ক্বচিৎ হঠাৎ, চারটে পঁয়ত্রিশ কি চলি�শ হয়। তারচেয়ে দেরি মানে কোনো গোলমাল। হয়তো পুলকারটি স্কুলে পৌঁছাতে দেরি করেছে। কখনো কখনো…

  • অদ্ভুত ক্ষমতা, নমনীয় অহঙ্কার

    আবুল মোমেন সূর্যাস্তের বেশ কিছুক্ষণ পরও শ্রাবণের বর্ষণক্লান্ত ছিন্ন মেঘে আচ্ছন্ন গোধূলির ফিকে লালিমায় চারিদিক অলৌকিক আলোয় ভাসছে। তাতে চেনা মানুষটা অন্যতর ব্যঞ্জনায় অচেনা হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাতে নাতাশার মনে কোনো খটকা লাগে না। বরং মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গান – অচেনাকে ভয় কী আমার ওরে? শহরের এক ধারের এই পাহাড়ের ঢালে সে আগেও…

  • জোসনা ভাসান

    লীসা গাজী  রুহ্ যাওয়ার মুহূর্তটা জোসনা স্পষ্ট টের পায়। এক-ঝটকায় আকাশে উঠে গেল শূন্যে আর শরীরটা পড়ে থাকলো মাটিতে। কী যে উঠে গেল আকাশে ঠাহর পায় না জোসনা। বাতাসের চাইতেও পলকা; দৃষ্টি-অগ্রাহ্য, শ্রবণ-বধির। ছুঁতে চাইলো, কিন্তু ছোঁবে আর কি দিয়ে! শুধু একটা বোধ, একটা জ্ঞান টনটন করে বাজতে থাকে। আম্মা যেমন সবসময় বলতো, ‘জ্ঞান তো…

  • আমাদের বাসায় কয়েক ঘণ্টা পানির কল বন্ধ আছে

    মাহবুব তালুকদার  ভোরবেলা মাওলানা ফজলে খোদা অজু করতে গিয়ে কল ছেড়ে দেখলেন এক ফোঁটাও পানি আসছে না। মাঝেমধ্যে এমন হয়। রাতে যে-গার্ড সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করে, শেষরাতে মেশিন ছেড়ে ওপরের ট্যাংকে তারই পানি তোলার কথা। নিশ্চয়ই সে ওই সময়ে ঘুমিয়েছিল এবং পরে পানির মেশিন ছাড়তে ভুলে গেছে। মেজাজ বিগড়ে গেলেও নিজেকে একটু শান্ত রাখার চেষ্টা…

  • দুনিয়াদারি

    হামীম কামরুল হক কোনোমতেই রেহাই মিলছিল না। নতুন কোনো রোগ হলো নাকি? গরমকাল চলে গেছে সেই কবে। তারপরও এক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিকভাবে সে ঘামছিল। দিনরাত্রি। অবিরাম। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েছে। সে-মতো প্রস্রাব কিন্তু হয়নি। সারা শরীরে অদ্ভুত জ্বলুনি আর ঘাম। ভাগ্যিস এ কয়েকটা দিন সায়েকা আর ছেলেমেয়েরা বাড়ি ছিল না। দোহার গেছে। নানাবাড়িতে শীতের…

  • হারমোনিয়াম

    নলিনী বেরা  আমাদের গ্রামে এখন এক-আধটা নয়, ফোন আছে চল্লিশ-পঞ্চাশটা। তাও আবার যে সে ফোন তো নয়, রীতিমতো ‘সেলফোন’। অর্থৎাৎ মোবাইল ফোন। বিদ্যুৎ নেই, তাই ল্যান্ড-ফোনের প্রশ্নও নেই। অন্ধকার সান্ধ্যরজনীতে ঝোপে-ঝাড়ে এখন যত না জোনাকির আলো জ্বলে তার চাইতে সেলফোনের আলোই জ্বলে বেশি। মানুষ যত না ঘরের লোকের সঙ্গে কথা বলে, কানে মোবাইল চেপে তার…