ছোট গল্প

  • নীল কষ্টের বয়ান

    দেলোয়ার হোসাইন বিড়ম্বনা পোহাতে হবে বলে আমি আমার মুখের লাগাম টেনে রাখি বেহায়া সন্দেহ আমাকে তবু আটকে রাখে অস্থির কানাঘুষায়, বেহুঁশ বাতাসে ভেসে আসে নীল কষ্টের বয়ান। আমি দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরি, তবু মন ভাঙার শব্দ আমাকে দুমড়ে-মুচড়ে কাত করে রাখে বেদনার উঠানে। আমি বেদনার গালে শেষ চুম্বন দিয়ে নিজেকে নাইতে নিয়ে গেলাম…

  • এখানে নিদারুণ শীত

    সৌভিক রেজা কাজে লাগবে জেনেই পাতাঝরা দিনগুলো চাইতে না-চাইতেই ডাকে পাঠিয়েছিলাম; তা-ও আবার ক্যুরিয়ারে… তাতে পয়সাও লাগলো বেশি; এখন বেশ বুঝতে পারি এই বৃদ্ধ বয়সে টাকা-পয়সার কথা ভুলে-যাওয়াটা আহাম্মকি; কথা ছিল দিনগুলো এক মাসের মধ্যে ফেরত পাবো; এদিকে মরুঝড় বন্যা ভূমিকম্প হিমযুগ – সব পার করে বিছানায় একা বসে আছি। যা দিয়েছি, হেনাদি, তা ফেরত…

  • সবুজ আকাশ

    পারভীন সুলতানা বাজারের ধোঁয়া ওঠা চায়ের উষ্ণতায় জমিরউদ্দীন টের পায় না – বাইরে শীতের রাত জুতমতো জমাট বেঁধেছে। ইলেকট্রিসিটির হলদে আলো টপকে সে যখন পথ সংক্ষিপ্ত করার তাগিদে ক্ষেতের আল ধরে সামনে অগ্রসর হয়, তখন আসমান-উপচানো চাঁদের পশর থাকে একমাত্র ভরসা। পর্যাপ্ত সার আর ডিপ টিউবওয়েলের পানি খেয়ে-খেয়ে আমন ক্ষেতগুলোর এখন ভরা যৌবন। সবুজ চিকন…

  • বন্ধুল

    শচীন দাশ থমকে দাঁড়াল এসে ইরাবান। এইমাত্রকালে, প্রভাত হয়েছে সবে নগরীর বুকে; কিন্তু নবীন সূর্যের আলো এখনো প্রসারিত হয়নি সেভাবে। বৃক্ষে বৃক্ষে এখনো কলরবরত নানা প্রকারের পক্ষী। রাজপথেও একজন-দুজন করে পথচারী। ভিস্তিওয়ালারা শূন্য ভিস্তি-কাঁধে চলেছে এক্ষণে নদীর দিকে। নদী থেকে জল এনে তারপর রাজপথ ধোয়াবে তারা। জনজীবনে জোয়ার লাগবে তারপরেই। হাঁটতে হাঁটতে দ্যূমণির কুটিরের কাছে…

  • জিরোভাই

    আবুল মনসুর ধানমণ্ডি ২৮ নম্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি পান্থপথের মুখের দিকে। ওখানে সার-সার এসি বাসের টিকিট-বিক্রিঘর। পরীক্ষার কাজে চাটগাঁ যেতে হবে, বাসের টিকিট কিনব। শীতের সকাল, ধুলোময়লায় ঝাপসা হলেও মৃদু রোদটা মিষ্টিই বলা চলে। বেলাটা সকাল সাড়ে নটা, তাতে কী, ঢাকা শহরে সকালই বা কী, বিকেল অথবা রাত বারোটাই বা কী। গাড়ির…

  • অলিম্পিকের পথে

    সপ্তর্ষি হোড় চোখ দুটো সুখপানিতে থইথই করছে মুমুতাজের। ভারতে ক্রীড়াজগতের প্রশিক্ষকদের সেরা সম্মান দ্রোণাচার্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ডক্টর সাবির আলি খান মাত্র দেড় হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন! তাঁর তীক্ষè চোখ দুটো থেকে জ্যোতি বেরিয়ে এসে মুমুতাজের পায়ের ক্ষতে আরোগ্যের প্রলেপ লেপে দিয়েছিল। তেজি ঘোড়ার চিঁহির মতো তীব্র ও বিদ্যুতের তরবারির মতো ধারালো তাঁর কণ্ঠস্বর মুমুতাজের চেতনাকে সম্পূর্ণ…

  • বেড়া

    মোহাম্মদ ইরফান তোক কইছি লালীর ন্যাজে ন্যাজে থাকপি। তুই ওক পানিত নামালি কেন হারামজাদি। আমি এখন কেঙ্কা করি? এত টাকা দিয়া কিনলু? ওর দুধ বেচি আমরা খাই, কিনার টাকা শোধ দিই। এহন আমি কী করি?’ করিমের চিৎকারে ছুটে আসে নসিমন। মেয়ে করিমনের চুলের মুঠি ধরা করিমের হাতে। একনাগাড়ে বকাবকি করে যাচ্ছে করিম। করিমনের পাংশু মুখ…

  • জলভাজা উপাখ্যান

    শ্যামল ভট্টাচার্য কাঁঠালগাছের তলা অবধি হেঁটে এসে দেখি ভবানন্দ আর নেই। এ কী অবাস্তব ব্যাপার! নিরূপমা চোখ কচলান। জ্বলজ্যান্ত মানুষটা হাঁটুর ওপর ওঠানো ধুতি আর ওঁর পছন্দের আকাশি রঙের ফতুয়া গায়ে হেঁটে আসতে আসতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন! আগের দিন বিকেলে গোবর ও আঠামাটি দিয়ে লেপা ঘরের দাওয়া তখনো শুকোয়নি। অথচ পিঁপড়েরা ইতোমধ্যেই সারি-সারি ব্যস্তসমস্ত। লাল-লাল,…

  • একজন নির্গুণ মানুষের গল্প

    আহমদ বুলবুল ইসলাম প্রতিদিনের ভোর আমার একইরকম। কর্কশ আর নিরানন্দ। জীবনধারণের গ্লানি আর দুর্ভাবনায় ভরা। তবু ভোর আসেই শান্ত-সজীবতায়। আহা বেঁচে থাকা! ক্লান্ত, ক্লিষ্ট ভোর। তবু কী মধুর! দুঃখের দিনার দিয়ে গাঁথা, ঠুনকো সুতোয় তারা ঝুলে থাকে। বাড়িওয়ালার গম্ভীর, ক্রুদ্ধ মুখ, সহকর্মীদের ধূর্ত চোখ ব্যঙ্গে বাঁকা, পাওনাদারদের বিদ্রুপ ভরা রাগী চেহারা আমার প্রতিদিনের পাথেয়। তবু…

  • মাংস

    বদরুন নাহার রুদ্রপুর গ্রামের কিশোর মোস্তফা কোনো ভিক্ষুক বা ফকির নয়, তবে সে কোনো ছাত্রও নয়। কারণ সে কোনো স্কুল বা মাদ্রাসায় পড়তে যায় না। সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়ানো, গ্রামের অন্যদের সঙ্গে ডাংগুলি খেলা বা গাছে উঠে ফলটল পাড়া কোনো কাজের কাজ না। এক কাঁদি নারকেল পাড়তে পারলে দুইটা নারকেল মেলে। অতএব মোস্তফা মোস্তফাই,…

  • বিপ্লবের শ্বেতপত্র

    আবুবকর সিদ্দিক হ্যাঁ  দাদু! তোমাকে চিঠি লিখেছিল মাওদাদু, তাই না? – আরে দূর! সব কাগজঅলাদের গুলপট্টি। খবর আর পায় না তো খুঁজে! – এই দ্যাখো! তুমি কিন্তু স্লিপ কেটে যাচ্ছো দাদু। আচ্ছা এবারে হলপ করে বলো তো, চারুদাদুর সঙ্গে তোমার কী কথা হয়েছিল? জোতদারদের গলা কাটতে অর্ডার দিয়েছিল তো? – আরে দূরো! দ্যাখাই হয়নি তার…

  • নষ্ট সময়

    পারভেজ হোসেন ওরা আমাকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে। সম্ভাব্য এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে ওদের ছায়া পড়েনি। মির্জাদের পোড়োবাড়ি, আমতলির জঙ্গল, পুলিশের দাবড়ানি খেয়ে পালিয়ে বেড়ানোর গোপন সব আস্তানা, সন্ধ্যায় বিলে জলের মধ্যে ভেসে থাকা ছোট ছোট গ্রামের কোনখানে নয়! কিন্তু পেলো না ওরা। কী করে পাবে? এক উদ্দেশ্য এক আদর্শ আর একই শিক্ষণে বেড়ে উঠেছি…