ছোট গল্প
-
চতুষ্কোণ
রেজা নুর সকালবেলার এই সময় জানালা খুলে বাইরে তাকায় মিনি। ছোট্ট জানালা। বাইরের খুব সামান্য দৃশ্য ভেসে ওঠে। ওপরে তাকালে আকাশটার এক কোনা চোখে পড়ে। সেই কোনায় আকাশ নীল ঘুড়ি হয়ে ঝুলে থাকে যেন। মাঝে-মাঝে মিনির ওড়নার মতো একটুকরো মেঘ এসে দাঁড়ায়। সরে যায়। আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর চোখ যায় পাশের সরু গরুগাড়ির রাস্তার…
-
জিনের মোহর ও ল্যালহা
নীহারুল ইসলাম ল্যালহা ভোর-ভোর কালিপালের ডিহিতে ঝাড়া-ফিরতে আসে। গাঁ ছেড়ে মাঠের আল ধরে একটু হাঁটতে হয় ঠিকই, তবে জায়গাটা নির্জন। ঝোপঝাড় আছে। নানা ধরনের পাখি দেখা যায়। তাদের কলরব ভেসে আসে। এখানে এলে শরীরের সঙ্গে তার মনটাও বেশি খোলসা হয়। তেমন খোলসা শরীর-মন নিয়ে সে হেঁটে বেড়াচ্ছে ডিহির ওপর। গেল রাতে কখন বৃষ্টি হয়েছে, টের…
-
বিহঙ্গ পুরাণের অন্তিম পরিচ্ছেদ
হুমায়ূন মালিক দীপ্রর খুব পাখি ধরার সাধ; কিন্তু সে না পারে পাখি ধরতে, না পাখি তারে ধরা দেয়। আসলে ও পাখি ধরতে চায় না পাখির ওড়াউড়ি নাকি ওদের বুনো জীবন! কারণ তার জন্য একটা গাড়ি কিনে আনা হলে প্রথমে সে দেখে চাকা ঘুরে ছুটছে গাড়ি, তারপরই সে একে একে গাড়ির চাকা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুলে খোঁজে কোথায়…
-
হত্যা বা আত্মহত্যা
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় একটা লোক জলে ডুবে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল। এমন সময় সে একটা ডাক শুনল : থামো। – লোকটা পেছন ফিরে দেখল, দাড়িওলা মুখের আর একটা লোক তার হাত ধরে টানছে। দ্বিতীয় লোকটা বলল, ‘তুমি কী করতে যাচ্ছো, আমি জানি; কিন্তু কেন তুমি মরতে চাও?’ আত্মঘাতী-হতে-যাওয়া লোকটা বাধা পেয়ে বেশ বিরক্ত হয়েছিল। নিজের হাতটা ছাড়িয়ে…
-
এক টাকার মুদ্রা
ঝর্না রহমান মরস ক্যান রুজিনা? লগে-লগে বাইজা গেল নাহি? বিটকাল পেতিœর মতো একটা হিহিহিহি হাসির ঝাপটার ভেতর দিয়ে টুকরো-টুকরো হয়ে কথাকটি বের হয়। রোজিনা পেট চেপে ধরে পাতাবাহারের ঝোপের আড়ালে বসে পড়ে। কথাটা শুনে একঝলক চেয়ে দেখে। একটু দূরে কোমরে দুহাত রেখে নাটুকে কায়দায় দাঁড়িয়ে আছে রানী। রাক্ষুসে দুটো ব্যাঙাচির মতো মাথা উঁচিয়ে টং ধরে…
-
ঝিঁঝি পোকার জীবন
নলিনী বেরা আচমকা আমাদের বাবা ধুলোপায়ে কোত্থেকে প্রায় দৌড়–তে দৌড়–তে এসে মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করে বলে বসলেন, ‘এখানে আর একদণ্ডও থাকাটা নিরাপদ নয়, আঁকাড়া বিপদ চারধার থেকে ধেয়ে আসছে ধাঁইধাঁই করে! সবকিছু ছেড়েছুড়ে এক্ষুনি পালাতে হবে। কই, ডাক তোর মাকে!’ জানি, বাবার মা অন্তপ্রাণ, তাই বলে আমি ও আমার বোন নাকফুঁড়িও…
-
একজন খারাপ লোকের গল্প
বুলবন ওসমান স্বাধীনতা দিবসটা মফস্বলে কাটাতে হবে আলমকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কাজে ঢাকা ছাড়তে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্টহাউসে ওঠেনি, এক বন্ধু তাকে একটা নিরিবিলি রেস্টহাউস পছন্দ করে দিয়েছে – এটা সায়েন্স ল্যাবরেটরির। মির্জাপুর মৌজায় – চৌদ্দপাই মোড়ে ফায়ার ব্রিগেডের বিপরীতে। প্রায় ৫০ একর জায়গাজুড়ে ল্যাবরেটরির চৌহদ্দি। উঁচু পাঁচিলঘেরা। রেস্টহাউসটা প্রায় মাঝখানে। খোলা জায়গায়। পাশে আমবাগান ও…
-
শব্দ-হরিণ
কিন্নর রায় অন্ধচোখে জল, বালি, আকাশ – কোনো কিছুকেই আলাদা করে বোঝা যায় না। অথচ স্পর্শে জল অথবা বালি – সবটাই আলাদা করে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না দৃষ্টিহীনের। এমনকি যদি বৃষ্টিও নামে, সেই আকাশজল ছুঁতে-ছুঁতে কী এক অলীক শিহর, মাথায়, গায়ে, ঠোঁটে – সর্বত্র জলেরই ছিটে। স্বাদ। বর্ধমান থেকে গো-গাড়িতে বীরভূম আসতে গেলে অজয়…
-
প্রলাপ
তারক রেজ হাতের তালুতে এক টাকার কয়েন। কখন থেকে যে ধরা আছে কে জানে! অনেকক্ষণ ভেবেছে। কে দিয়েছে মনে নেই। শুধু একটাই প্রশ্ন, ভিখিরি মনে করে দিলো নাকি! খুব রাগ হচ্ছিল। জটা-ধরা মাথাটা এককালে বোতাম ছিল, এখন গিট্টি দেওয়া। উদোম গা। এগুলো কি সব ভিখিরির চিহ্ন! এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল, আইববাস…
-
সর্বনাম
জফির সেতু লোকটা সত্যিই আচানক। পোশাকের মতোই তার কথাবার্তা অসংলগ্ন, ছেঁড়াছেঁড়া। যেমন তামুকে চুমুক দিতে দিতে বলল, আসলে আমরা গতকাল ছিলাম নির্বোধ, বিবেচনাহীন আর নীচ! লোকটার দার্শনিকতা ও কালচেতনা আমাকে ভাবিত করে তুলল। আমি বললাম, আর আজ? জয় আমাকে বাধা দিলো, প্রশ্ন করছিস কেন? শুনতে থাক। তারপর লোকটাকে অনুরোধের স্বরে বলে, কাকা, আপনি বলে যান।…
-
মাহবুবের কুটিরশিল্প
মোস্তফা তারিকুল আহসান ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েও মাহবুবের চাকরি হয়নি। তখন ওর আবার ছানাপোনাও হয়েছে একখানা, তো তিনখানা মুখের আহার সে জোগায় কী করে? এতদিন তবু আশা ছিল। এখন তো কিছুই নেই। প্রিয় একজন শিক্ষক বুদ্ধি দিলেন, তুমি বরং এমফিল বা পিএইচ-ডি কোর্সে ভর্তি হয়ে যাও। কিছু মাসোয়ারাও পাবে, আর পরেরবার চাকরি পাওয়ার জন্য…

