ছোট গল্প
-
শঙ্কা
বদরুন নাহার দেশের জনগণ একবার এক মহাআবুলকে চিহ্নিত করে তার পদত্যাগ দাবি করে বসল। অতঃপর নিজেরাই আবুল বনে গেল! সরকার ক্যাছলিং করে মন্ত্রীর রদবদল ঘটালেন। সাপও মরল আবার লাঠিও ভাঙল না! আসলে সাপও মরেনি, কেবল ফণা তোলার বদলে হিস-হিস করে চলতে লাগল। এই হিসহিসানির সময় ফিসফিস করে মানুষ কেবল যানবাহনের হিসাব কষতে লাগল। গরুর গাড়ির…
-
তেরোতম ভুল
মালেকা পারভীন ‘সাগুফতা…’ বলে স্যার চুপ হয়ে গেলেন। আমি তাঁর ঘনঘন নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। যেন কেউ ড্রাম পেটাচ্ছে। যেন আফ্রিকার জেম্বে ড্রামিং রিদম। এত জোরে, কারো নিশ্বাস পড়ার আওয়াজ আমি আগে কখনো শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। আমার ভেতরে কেমন একটা শিহরণ টের পেলাম। সেটা ভয় না অন্য কিছু ঠাহর করতে না পেরে…
-
আদিগন্ত ধূলিঝড়
আবু হেনা মোস্তফা এনাম প্যারালাইজড ওউল্ড হ্যাগার্ডের মৃত্যুসংবাদে চিত্রার্পিত মাছের নির্বাক চোখে চৈতালি প্রজাপতি বিভ্রম সৃষ্টি করলে আলো অথবা রঙের বিক্ষিপ্ত বিন্যাসে মৌমি বিষণœ হয়ে ওঠে। অতঃপর সহসা সমস্ত আলো, রং ও কান্নার ক্রাউডি বিষাদের মধ্যে নীরবতা নামে। তখন ছড়ানো রংপেনসিল, কাগজ, ম্যাজিক মাউন্টেনের উড্ডীন হরিদ্রাভ পৃষ্ঠা, সেলাইয়ের লাল-নীল-আসমানি-হলুদ সুতা এবং এলোমেলো বালিশের মধ্যে তন্দ্রা…
-
নিদ্রামেঘের নদী
পাপড়ি রহমান তরুরাগ শেষ চৈত্রের হাওয়া তখন সামান্য গোলমেলে হতে শুরু করেছে। আর এই গোলমেলে হাওয়া হঠাৎ হঠাৎ ঝাপটা মেরে বৃক্ষরাজির মরাধরা-শুকনা পত্রশাখাকে লোপাট করে দিতে চাইছে। রোদ্দুরের ভয়ানক তেজে মাটি ফেটে চৌচির। ওই ফাটন্ত মাটিতে খালি পা ফেললে আর রক্ষা নাই। তক্ষুনি ছ্যাঁকা লেগে পায়ে ফোস্কা পড়ো-পড়ো ভাব। মাটির এমন রকমসকম আর অদ্ভুতুড়ে বাউকুড়ানির…
-
যখন বৃষ্টি নেমেছিল
আহমেদ মুনির কতদিন একটানা বৃষ্টি হয়েছিল এখন আর মনে নেই। জুলাই মাসের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যায় আমি তখন গুলশান লেকের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হাসপাতালটাকে অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজতে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম। লেকের পাড়ে বড় একটা গাছের নিচে বসে আমি দেখছিলাম হাসপাতালটা কী নির্মমভাবে ভিজে যাচ্ছে। বড় বড় কাচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এক একটা রেখায়…
-
পিতৃত্ব
রাজীব নূর মা¬লতিপাড়া মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ আবদুল মোতালেব আলী হাজতে। নিজের মেয়েকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তাকে। হাজতে আনার একদিন পরই তাকে আদালতে হাজির করিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল। আদালত সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আজ তার হাজতবাসের ষষ্ঠদিন, রিমান্ডের পঞ্চমদিন। এর মধ্যে ওর নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কেউ তাকে দেখতে আসেনি। আজ প্রথমবারের…
-
কবরস্থানের লেবুপাতাগুলো
ইমতিয়ার শামীম খুপরি দোকানের কোণে বাঁশের খুঁটিতে বসানো হাত-আধেক লম্বা কুপিবাতিটার আউল-বাউল আলোর ছাইকালো ধোঁয়া বাতাসকে ঝামটা দিতে শুরু করলে লোকটা এবার সরে বসে। স্টেশনঘরের ঢালু পেরোনো সমতলে বেড়ে উঠেছে একটি ছাতিমগাছ। তার ডালপালা থেকে নেমে আসছে কবরস্থানের অন্ধকার। তারপর তা স্থির হচ্ছে লোকটার লালচে চিবুকজুড়ে, কী এক অদৃশ্য আকর্ষণে গালের দুধার থেকে জুলফি গিয়ে…
-
কষ্টে আছে আইজুদ্দিন
আন্দালিব রাশদী ঢাকা শহরের দেয়ালের লিখন যদি বিপ্লব ছড়াতে পারে, স্বাধীনতার আগুন জ্বালাতে পারে, ফাঁসির দাবি জানাতে পারে, ভোট ভিক্ষা চাইতে পারে, সরকার উৎখাতের হুমকি দিতে পারে, জনৈক বাবুল মিয়া এবং অজ্ঞাত এক লাইলির মাঝখানে যোগচিহ্ন বসিয়ে তাদের ভালোবাসার ডঙ্কা বাজাতে পারে, নিরাপদ এমআর এবং ডিঅ্যান্ডসির গ্যারান্টি দিতে পারে, তাহলে তার কষ্টের কথা কেন শহরবাসীকে…
-
চালককে সরিয়ে দেওয়ার পর
হামিদ কায়সার আমাদের বাসটা যখন যাত্রার প্রারম্ভ ধকল কাটিয়ে মাত্র চলতে শুরু করেছে, পেয়ে গেছে সবটুকু স্বতঃস্ফূর্ততা, তখনই লোকটির আগমন Ñ ছোটখাটো শরীর, জলপাই রঙের অদ্ভুুত বেমক্কা পোশাক পরনে Ñ চকিতে একবার মনে হচ্ছিল আরব-জোব্বা আরেকবার লাগছিল টেক্সাসীয় ওভারকোটের মতো, টাইট হয়ে লেগে আছে চিমসানো শরীরে, অ্যাশ কালারের বিশাল বোতামগুলো যেন তাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিল। মাথায়…
-
কী কথা তাহার সনে…
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর শান্তা আর সজল মিলে যে ওরা হয়, এই ওরা কি কখনো, কোনো একদিন, একদা বা কোনো এককালে বন্ধু ছিল? কী জানি থাকতেও পারে। শান্তা কখন থেকে তার ফেসবুক ফ্রেন্ড হয় তা সৌভিক সজল অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারে না। নমিতা রহমানের কথাই তার মনে পড়ে – সে-ই বোধকরি তাকে এমন কিছু সাজেস্ট…
-
ঢেউটিন পাকা বারান্দা বদনা চিলমচি মাছালো পুকুর
সালেহা চৌধুরী যখন ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাবছে না আম্বুরি আর গফুর হঠাৎ করে জানা গেল আম্বুরি পোয়াতি। গত শীতে মরিবুজানের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মাঠের মাঝখানে একটা বড় গাছে নানা অং-এর তেনা ঝুলে থাকতে দেখেছিল। Ñ এগলা কেংকা তেনা? প্রশ্ন করেছিল আম্বুরি। Ñ তোর মতো বানজা বেটিছোল যারা কোনোদিন পোয়াতি হবার পারে না, যার কেরে জরায়ুত তালাচাবি…
-
বসন্তদিনে
মোস্তফা কামাল মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল রাস্তার পাশে, হয়তো পার হওয়ার অপেক্ষায়। কেবলই কৈশোর পেরিয়েছে সে Ñ দেখে তেমনই মনে হচ্ছিল Ñ মুখজুড়ে এখনো কৈশোরের লাবণ্য ছড়ানো। চোখে কৌতূহল, হয়তো খানিকটা চপলতাও, ঠোঁটে মৃদু-মায়াময় হাসি। অথচ সিঁথিতে আঁকা গাঢ় সিঁদুর, আর কপালের লাল টকটকে টিপটি তার বিয়ের চিহ্নটিকেই প্রকাশ করছে যেন! এত অল্প বয়সে বিয়ে! চকিতে একবার…
