ছোট গল্প
-
একটি মৃত্যু – তার পরের অথবা আগের কথন
নাসরীন জাহান বারান্দার সামনে থেকে আচমকা বাতাসে খাটিয়ার ওপর ঢেকে থাকা শাদা কাপড়টা কেঁপে মাথার কাছ থেকে মৃদু শব্দে সরে গেলে জেসমিনও ক্ষীণ নড়ে দৃষ্টি প্রসারিত করে। এক দুর্মর নিষিদ্ধ কৌতূহলে ভেতরটা চায় মুখটার এক ফালি হলেও দেখতে, যা এতক্ষণ তাকে কেউ দেখতে বলেনি, তার নিজেরও সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই হয়নি। বজ্রাহতের মতো কিছুদূরে বসে…
-
দলেবলে এবং বিলবোর্ডেও হুমায়ুন
হুমায়ুন মঞ্জু সরকার বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ির রাস্তা বত্রিশ নম্বরে ঢোকার মুখে ফুটপাতে নতুন এক বিলবোর্ড দেখে ভোরবেলা একটি কাক তার উপরে উঠে বসে। রাস্তার ধারে বড় বড় বিলবোর্ড ও আলো-ঝলকানো হরেকরকম বিজ্ঞাপন দেখে কাকটি অভ্যস্ত। কিন্তু এ-জিনিসটার ওপরে বসেও বুঝতে পারে না, কোত্থেকে এবং কেনই-বা এটা এখানে উঠেছে। মাথা নিচু করে বিলবোর্ডের বুক দেখে সে।…
-
অলীক রাতের গল্প
জাকির তালুকদার আমাদের এলাকার বরকত আলীর বড়লোক বনে যাওয়ার কাহিনি আলাদা বয়ানের কোনো প্রয়োজন পড়ছে না এই কারণে যে, স্বাধীন সোনার বাংলায় যারা যারা বড়লোক হয়েছে, তাদের সবার গল্প প্রায় একই রকম। প্রত্যেকেরই একটা করে আলাদিনের জিন পাওয়ার ঘটনা রয়েছে। তবে বড়লোক হওয়ার পরে কেউ আর একরকম থাকে না। তাই তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা আলাদা…
-
পোস্টমাস্টার ২০১০
আনিসুল হক ৬২ বছর বয়সে ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হোসেন সাহেব আবিষ্কার করলেন, বালিকা রতন আর বালিকা নেই, রমণী হয়ে গেছে। এটা আবিষ্কার করবার জন্য তাকে সেই অপরাহ্ণের জন্য অপেক্ষা করতে হলো, যখন তিনি দোরঘণ্টি বাজিয়ে নিজবাড়ির দরজা খোলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন, আর রতন স্নানঘরে ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছিল, হঠাৎ কলবেল বেজে ওঠায় তড়িঘড়ি করে…
-
যুধিষ্ঠিরের সহোদর
পূরবী বসু না, অবুঝ বালক সে নয়। হঠাৎ করে বা তাৎক্ষণিকভাবে মন-উচাটনের কারণে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়বার মতো তরুণ বয়সও তার নেই। সে খুব ভালো করেই জানে নিজের অবস্থান। যথেষ্ট সজাগ প্রতিটি পদক্ষেপে। কর্মকাণ্ডে। সে জানে, তার চিন্তার কিংবা লেখার পরিধি এটা নয়, যেখানে কল্পনাকে সে আকাশের অন্য পাড়ে পৌঁছে দিতে পারে। পারে…
-
বেগম জাহানারার আব্র“
ওয়াসি আহমেদ শেষ পর্যন্ত সতর্ক পাহারা সত্ত্বেও বেগম জাহানারা যখন খানিকটা সন্তর্পণেই চোখ বন্ধ করলেন, তখন কেউ জানুক না জানুক, তিনি জানতেন এক নাছোড় লজ্জার জ্বালাপোড়া থেকে রেহাই পেলেন। তখন সকাল। পর্দামোড়া জানালার কাচে কুয়াশাহীন শেষ ডিসেম্বরের কিছুটা স্থবির রোদ। পর্দার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঘরের ভেতরেও খণ্ড-বিখণ্ড আলো। বিছানায় টানটান শুয়ে বেগম জাহানারার মনে হলো, এই…
-
যাত্রার শেষ সীমানা
রেজাউর রহমান ইবাদুরের যতদূর মনে পড়ে, তিনি অমার্জিত ও অশোভনভাবে, অসুন্দর ইঙ্গিত-তাড়িত হয়েই কথাগুলো বলে ফেলেছিলেন সুখনকে। আজ প্রায় ১০-১৫ বছর পর, সেই মুহূর্তকে চোখের সামনে তুলে ধরতে গেলে ইবাদুর নিশ্চিতভাবে দেখেন যে, তিনি ক্রুর-নিষ্ঠুর আক্রমণ করার জন্যই এভাবে কথাগুলো বলেছিলেন তাঁকে। তিনি বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা ছোট-বড় প্রতিটি প্রাণীর দেহাঙ্গিকের প্রতিটি অংশ, প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশেষ প্রয়োজনে,…
-
‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’
সেলিনা হোসেন প্যারিসের প্রবাস জীবনে যে-কটি জায়গা রুমানার পছন্দ তার একটি ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের লাইব্রেরিটি। শুধু পুরনো বই নয়, জায়গাটিতেও পুরনো গন্ধ পাওয়া যায়। সরু-চাপা সিঁড়ি বেয়ে লাইব্রেরির দোতলায় উঠলে পাওয়া যায় পুরনো বইয়ের বেশ বড় সংগ্রহ। বসার জায়গা আছে, সোফা কিংবা চেয়ার। সবই রং-ওঠা-বিবর্ণ। পছন্দের বই র্যাক থেকে নামিয়ে পড়া যায়। যতক্ষণ খুশি…
-
যমের সঙ্গে সংলাপ
বুলবন ওসমান সন্ধ্যা হয় হয়। ইফতারের হুটিং বেজে গেছে। রাস্তা একেবারে ফাঁকা। এই সময় শিল্প-সমালোচক রহমান ধানমণ্ডিতে অবস্থিত গ্যালারিতে প্রবেশ করে। যা ভেবেছিল তাই। গ্যালারি দর্শকশূন্য। একা শিল্পী দীপা নিজের ছবির দর্শক। পরিচয় হলো। দীপা এসেছে কলকাতা থেকে। আলাপে রহমান জানতে পারে ওদের পৈতৃক ভিটে যশোরে…। ঝিনাইদহের শৈলকূপায়। ওর ঠাকুরদা কলকাতায় চাকরি করত। বাড়ি-ঘরদোর এখনো…
-
বামাক্ষী
আনোয়ারা সৈয়দ হক আমার চেম্বারে আজ বেশ ভিড়। সাধারণত এত ভিড় থাকে না রোজ। হতে পারে আমি কিছুদিন দেশের বাইরে ছিলাম সে-কারণেই। সুতরাং বিকেল তিনটে থেকে রোগী দেখতে দেখতে আজ একটু রাতই হয়ে গেল। সবশেষের রোগীটা যখন চেম্বারে ঢুকল তখন রাত প্রায় নটা বেজে গেছে। আমার শেষ রোগীটি একজন বোরকা-পরিহিত মহিলা। বস্তুত আমার রোগীদের রোগী…
-
ঘোর
আবদুশ শাকুর বেরুনোর মুখে মায়ের চোখের স্থিরদৃষ্টির মুখোমুখি এক যুগ তাকিয়ে থাকল ইশরাত, অতঃপর মুখ খুলল : ‘আমি তোমাদের সৃষ্টি ঠিকই, তবে ঘটনাচক্রে। সুতরাং আমার ওপর কর্তৃত্ব করতে চেও না।’ ‘তার মানে?’ ‘মানে তোমাদের চান্স-মিটিংয়ের ফসল আমি – ’ ‘তার মানে?’ ‘মানেটা গভীর, নিগূঢ় -’ ‘তবু আমার জানতে হবে – এত বড় একটা আদেশ দিয়ে…
-
বিনির সঙ্গে দুপুর
হাসনাত আবদুল হাই রবি সিএনজিতে বসে ঘামছে, তার ভেতরের গেঞ্জি ভিজে জবজব করছে, শরীরে সেঁটে আছে সেই কখন থেকে। মাথা থেকে কপাল বেয়ে ঘাম নামছে, গলায় বিজবিজে ঘাম, উটকো গন্ধ ছড়াচ্ছে। একটু পরপর সে হাতের ঘামে ভেজা তালু মুছে নিচ্ছে হাঁটুর কাছে প্যান্টের কাপড়ে। শার্টের বোতামগুলো খুলে দিয়েছে অনেক আগেই কিন্তু বাতাস নেই, ভেতরে ঢুকছে…
