বুলবন ওসমান
-
উত্তর-প্রজন্ম
বুলবন ওসমান শান্তিনিকেতনে বসন্ত একটু দেরিতে আসে। ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহ তাই শীতময়। চৈত্রে বসন্ত-উৎসব। সব গেস্ট হাউস হয় পূর্ণ। তাই কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন যাত্রার আগে ফজল সাংবাদিক-বন্ধু রাতুলের শরণাপন্ন, একটা পরিচিত কোনো গেস্ট হাউস বুকিংয়ের জন্যে। রাতুল জানায় যে, এখন অতটা চাপ পড়বে না। নিশ্চিন্তে যেতে পারে। তবু ফজল বিশ্বভারতীর প্রাক্তন অধ্যাপক-বন্ধু জনককে ফোন করে।…
-
উপহার
বুলবন ওসমান মেলামাইনের কোয়ার্টার প্লেটটা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছে ফজল। থাকে ফ্ল্যাটবাড়িতে। বাড়িটা শহরের মাঝখানে, খুব একটা অভিজাত এলাকা বলা যায় না, আবার চারিদিকে যোগাযোগের ব্যবস্থাটা ভালো বলে অনেক অভিজাত এলাকার চেয়ে সে পছন্দ করে এই সেগুনবাগিচা। কখন এখানে সেগুনগাছ ছিল কে জানে! তবে নামটি রয়ে গেছে। রমনা পার্কের পাশে টেনিস কমপ্লেক্সে বেশকটা গাছ…
-
কালিকাপুর : দিশারী এক্সটেনশন
বুলবন ওসমান সকাল সাড়ে আটটা। বৈশাখের প্রবল হলকা দিনদুয়েক কিছুটা পশ্চাৎপদ। ফজল খাবার টেবিলে। পশ্চিমের জানালা খোলা। ঘরে পাউরুটি নেই। অগত্যা দুটো ক্রিম ক্র্যাকার আর নিউটেলার কৌটোটা খুলে বসেছে। দশতলা ফ্ল্যাট নীরব। বাসায় কেউ নেই। সেগুনবাগিচার ফ্ল্যাট থেকে দূরের উদ্যান নজরে পড়ে। আগে মাঠটা ফাঁকা ছিল। ছিল ঘোড়দৌড় মাঠ, এখন বাগান। গাছপালা বড় হয়ে যাওয়ায়…
-
দেশভাগের দলিল
বুলবন ওসমান শিরোনাম বেশ দীর্ঘ হয়ে গেল। আসলে ব্যাপারটির গুরুত্ব অনুযায়ী তা হতে বাধ্য। শিল্পকলার ক্ষেত্রে কথাই তো আছে, ‘ফর্ম’ ফলোজ ফাংশান – তেমনি সাহিত্যে আছে ‘কনটেন্ট ফলোজ ফর্ম’। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট ভারত ত্রিখন্ডিত হয়ে গেল। পূর্ব এবং পশ্চিমের খন্ডদুটি পাকিস্তান, মুসলিমদের দেশ – আর বাকি ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান। সঙ্গে সঙ্গে কি দুটি দেশ…
-
লিফট-ভূত
বুলবন ওসমান কুড়ি তলা উঁচু বাড়িটা সকালের রোদকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে পশ্চিমমুখী বলে বিকেলটা বেশ আলোময়। ন-তলায় ভাইবোন রহিস ও রুবি দুটি ফ্ল্যাট কিনেছে। পাশাপাশি। পশ্চিমেরটা রহিমের। বয়স প্রায় চল্লিশ। গরমের ছুটিতে পুরো পরিবার গ্রামের বাড়িতে। রহিম একা। ছোট বোনের একমাত্র মেয়ে রীতা, বছর সাত বয়স। মামাভক্ত। সন্ধ্যার পর দুই সার ফ্ল্যাটের মাঝের করিডোর ধরে…
-
কাইয়ুমভাইয়ের প্রয়াণ
বুলবন ওসমান তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি গানের সুরে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর না, জাগতে হলো না শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন, চিরনিদ্রায় – ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবমঞ্চে। আমরা চাই আর না চাই, এমন মৃত্যু বড় ভালো। কাউকে দীর্ঘ জীবনের বিড়ম্বনা দিয়ে গেলেন না, কোনো তিরস্কার দেখে যেতে হলো…
-
শিল্পকলার পুরোধা জয়নুল
বুলবন ওসমান চলচ্চিত্রের রোলটি খুব দ্রুত ধাবমান। এই তো সেদিন ১৯৭৬ সালে জয়নুলের প্রয়াণ। আজ তা ৩৮ বছরের প্রাচীন। কোথা দিয়ে কালের এই যাত্রা? ধারণা করার আগেই তা দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। সময়কে ধরার কোনো কৌশল বা হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়নি। ভেবে অবাক লাগে এই তো সেই ১৯৬৬ সালে ঢাকা চারুকলায় শিক্ষকতায় নিয়োগ পেলাম। হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন…
-
আবু সালেকের কনফেশান
বুলবন ওসমান সামনে কোনো গির্জা নেই, ফাদারও নেই, আবু সালেক ক্রিশ্চানও নয়, করেনি কোনো অপরাধ বা পাপ যে তাকে কনফেশান করতে হবে। তবু ফজল যখন তাকে প্রশ্নটা করে বসে, তার মধ্যে অকারণ একটা অস্বস্তি কাজ করতে থাকে। সেটা ঠিক অপরাধবোধ নয়, পাপবোধও নয়, তবু একটা ঊনতা মনকে অস্বস্তিতে ভর দেয়। ব্যাপারটা যে কী, সে নিজেও…
-
পঞ্চাশ বছর পরে সবলসিংহপুরে
বুলবন ওসমান অন্তরের তাগিদটা ঘণ্টাখানেক আগেই হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছে ফজলকে। যাত্রীছাউনিতে অপেক্ষা। সঙ্গে আছে পঞ্চাশোর্ধ্ব দূরসম্পর্কের ভাগনা সামাদ। একটি ডেকোরেটর সংস্থার ম্যানেজার। পাশাপাশি গ্রামে বাড়ি। প্রায়ই ঢাকা থেকে দেশে ফেরে। সব পথঘাট চেনা, তাই তাকে সঙ্গে নেওয়া। মনে পড়ে পঞ্চাশ বছর আগে দশ বছরের এক বালক এই স্টেশন দিয়ে শেষবার গেছে, আর কোনোদিন এখানে…
-
ক্যালোট্রপিস জায়গানটিয়া
বুলবন ওসমান কদিন থেকে সকালটা খুব ফাঁকা যাচ্ছে রাশেদের। কাজের ছেলেটা আসবে আটটার দিকে। বিদুষী স্ত্রী গেছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করতে যুক্তরাজ্য। এই মাঝবয়সে একা একা নিঃশব্দ ঘরে বেশ অস্বস্তি বোধ করে। মেয়েটাও গেল হোস্টেলে। স্থাপত্যবিদ্যার মডেল করতে দিন-রাত লেগে যায়। ফলে সে গৃহত্যাগী। মা নেই, মেয়ে নেই, কাজের ছেলেটা নেই, আছে শুধু সে একা, সকালের…
-
ধনেখালিতে একদিন
বুলবন ওসমান আচ্ছা, সাহানার বর্তমান চেহারাটা কেমন হবে? কিছুতে মিলিয়ে উঠতে পারে না ফজল। ওকে শেষ দেখেছে সেই মুক্তিযুদ্ধের কালে, ১৯৭১ সালে যখন ইয়াহিয়ার গণহত্যার তাড়া খেয়ে ওরা হুড়মুড় করে এক কোটি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবেশ করেছিল। বড়খালার ছেলেমেয়েরা তখন প্রায় সবাই বড়। সাহানাটা সবার ছোট, স্কুলে পড়ছিল। তখন কত হবে ওর…
-
জার্নিটা মনে থাকবে
বুলবন ওসমান কলকাতায় শীতটা তেমন ছিল না। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শান্তিনিকেতনে বিকেল থেকেই শীতটা টের পায় আসাদ। বন্ধু মানস শ্যামবাটিতে রেস্ট হাউস ঠিক করে রেখেছিল বলে কোনো অসুবিধা হয়নি। আর কদিন পর পৌষমেলা, তখন কোথাও জায়গা পাওয়া মুশকিল। এখনো তেমন ট্যুরিস্ট জমেনি। শীতকালটা শান্তিনিকেতনের পর্যটনকাল। বাংলার ও ভারতের নানা প্রান্ত থেকে জনসমাগম হয়। বিদেশ থেকেও…
