সৈয়দ শামসুল হক

  • বালক, তুমি একদিন ॥ তৃতীয় পাঠ

    বালক, তুমি একদিন আমাদের কবি হবে, উড়ে যাবে কালের ফুৎকারে – আমি সেই শিরোনাম ছেপে দিচ্ছি আজকের মেঘাবৃত সংবাদপত্রে। দূরপ্রান্ত বালক, তোমাকে স্বাগত এবং শোকের ভেতরে টানটান আমি তোমার ওষ্ঠের ভেতরে উপস্থিত, তোমার অভিষেকে আমি উপস্থিত। এই ঝকঝকে দুরবিন, ওই প্রজ্বলিত নীলাঞ্চল, এই চোখ, ওই নক্ষত্র, এই বিকাশমান দিন, ওই অস্তমান বিস্তার, এ সকলই একদা…

  • বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে

    এই পৃথিবীতে আর আকাশ দেখিনি আমি এত অবনত – ঘুমন্ত শিশুর মুখে যেন চুমো খাবে পিতা নামিয়েছে মুখ; প্রান্তর এতটা বড় যেন মাতৃশরীরের ঘ্রাণলাগা শাড়ি; আদিকবি পয়ারের মতো অন্ত্যমিল নদী এত শান্তস্বর; এতই সজল মাটি কৃষকের পিঠ যেন ঘামে ভিজে আছে; যদিও বৃষ্টির কাল নয় তবু গাছ এত ধোয়ানো সবুজ; দেখিনি এমন করে পাখিদের কাছে…

  • সৈয়দ শামসুল হক :  সৃষ্টিশীল জীবনের ব্যঞ্জনা

    সৈয়দ শামসুল হক : সৃষ্টিশীল জীবনের ব্যঞ্জনা

    তিনি এখন আমাদের সকল চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে!

  • মধ্যরাতে তসিলদার

    সৈয়দ শামসুল হক গল্পপট। পট খুলে যায়। বিস্ময়ের মধ্যে বিস্ময়, আর কারো নয়, জলেশ্বরীর সবচেয়ে হতভাগা গরিবুল্লার মুখ ভেসে ওঠে। আমাদের এ-তল্লাটে সবচেয়ে নিরীহ সবচেয়ে নিরুপদ্রব সবচেয়ে একা মানুষ এই গরিবুল্লা। ছিল তারা এগারো ভাইবোন, বাপ মরার পর ছোট ভাইবোনেরা বলল, তুই তো চাইরের চার বচ্ছর বাপের কোলে একাই উঠিছিস, মায়ের কোলও মুখ রাখি নিন্দও…

  • মনগড়া কুকুরের কনে দেখা

    সৈয়দ শামসুল হক অন্তত এখন ভয়ের এমন একটা রূপ ফুটেছে যে, দিন যত বাড়ে ততই সে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। আমাদের বন্ধুটির নাম ছিল মকবুল। ব্রিটিশ আমল হলে তাকে নকল কুত্তা বলা যেত। কেন? এক – বাঙালি পাদরি এসেছিলেন জলেশ্বরীতে, নলিনীকান্ত। বরিশালের এক বিশেষ স্কুলে তার শিক্ষা শুরু হয়। তার স্ত্রী শ্রীমতী কল্যাণী দাসি আমাদের হাসপাতালের…

  • অপ্রকাশিত আটটি কবিতা

    সৈয়দ শামসুল হক এক সমস্ত দিনের ক্লান্তি লাল নীল জামা সমস্ত রাতের কষ্ট ভয়াবহ বীজ বৃক্ষডালে জামা আমি ঝুলিয়ে রেখেছি কতকগুলো কর্কটবৃক্ষের পায়ে রোপণ করেছি এখন অনেক রাত এক্ষুনি শিশির ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়বে মাটির গভীর থেকে জেগে উঠবে কষ্ট আর ক্লান্তির দু’টি দগ্ধ গাছ আর আমার করোটি জলে সাঁতরাবে খেলা করবে লাল নীল নিষ্পলক…

  • হাওলাতের বহি

    সৈয়দ শামসুল হক আমরা আমাদের বাপো দাদার মুখে শুনেছি দালান তৈরিতে ইট লাগে আর সেই ইট তৈরি হয় ইটের ভাঁটায়। আমরা ইটের ভাঁটা চোখে দেখি নাই। কাগজে ছবি দেখেছি। কাগজেই পড়েছি পরিবেশবিদ নামে নাকি একটা দঙ্গল আছে তারা ইটের ভাঁটি বসাতে দিতে চায় না। আমাদের জলেশ্বরীতে তার দরকারই নাই। বাংলাদেশের আগে মাত্রই দুটো দালান ছিল…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক   \ ৪৫ \   হরিচরণ নামে যে কেউ একজন জলেশ^রীতে এতকাল ছিল, মানুষেরা যেন ভুলেই ছিল, আজ তার মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে সবাই হঠাৎ জেগে ওঠে। হরিচরণের বিষয়ে বাজারে কাছারির মাঠে ইস্টিশানের আড্ডায় কত কথাই না গল্পের ফুলঝুরি হয়ে ওঠে। প্রাচীন কেউ-কেউ বিশেষ একটি কথা স্মরণ করে ওঠে হরিচরণের বাবা রাধাচরণের বিষয়ে। সে-কথা…

  • নদী কারো নয়

    ৪৪রাত এখন কত নির্ণয় নাই, ভোর হতেই বা কত বাকি তারও ঠাহর নাই| মৃত্যু এমনই হয়, আমাদের সময় ধারণাকে গিলে খায়| এই ছিলো, এই নাই! এর চেয়ে ¯^াভাবিক আর কিছু নাই, মানুষ তবু চমকিত হয় মৃত্যু যখন তার কালো চাদরে আমাদের বোধশক্তিকে অকস্মাৎ আচ্ছাদিত করে| ভালো করে তাকিয়ে দেখি জলেশ^রীর আকাশে তখনো দৃপ্ত প্রতাপে তারাসকল…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক \ ৪৩ \   কুসমিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সোলেমান বলে, কেয়ারটেকার বুঝিলেন তো? বোঝেন নাই? সরকার, সরকার, যাকে কয়। কোম্পানিতে যাকে ম্যানেজার বোলায়। এসবের একবর্ণ আর কানে যায় নাই কুসমির। সোলেমান বকবক করে বকেই চলে। – দ্যাখেন তো, দিদি, কপাল ফিরি গেলো তোমার। আর কোনো ভয়চিমত্মা নাই। তোমার ভালোমন্দ সব…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক \ ৪২ \   রাত গভীর অন্ধকারে চারদিকের সত্মব্ধতা হঠাৎ আরো একবার ভেঙে যায়, আবার সেই ধড়াসধস শব্দ ওঠে। পাড় ভাঙনেরই শব্দ কি? ঠাহর হয় না। কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমানের সমুখে সুন্দরী যুবতী হিন্দু বিধবা, কুসমি! মন তাঁর বশে নাই। চোখে তাঁর বিশে^র আর কিছু নাই। কিন্তু ওই যে শব্দটা শোনা গেলো, ওতেই…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক   \ ৪১ \   অদূরে ধড়াস ধস্ একটা শব্দ ওঠে, কিসের শব্দ ঠাহর হয় না, ঠাহরের আগেই কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান চমকে নড়ে ওঠেন, এবং সেটি কুসমি লক্ষ করলো কিনা তাও তিনি ভেবে দেখে ঈষৎ ক্রুদ্ধই হলেন নিজের ওপরে। রাতে এমন শব্দ কত হয়, কত জানা-অজানা পশু শব্দ করে, ডেকে ওঠে, নদীর…