সৈয়দ শামসুল হক

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক ৩০ বুড়ির চরে রাত তখন কাঁথার মতো পুরু, হালকা শীতের দিনে পুরনো কাঁথার মতোই আরামে জড়িয়ে ধরে আছে বুড়ির চরের কুটিরে কুটিরে মানুষের ঘুমশরীর। নারী তার শিশুসন্তানের মুখে স্তন গুঁজে দিয়ে অকাতর হয়ে আছে ঘুমে, স্বামীটি তার কতকাল বৃষ্টি নাই সেই দুঃস্বপ্নের তাড়কা মাছিগুলো তাড়িয়ে চলে, বাপোদাদার সমৃদ্ধকালের স্বপ্ন দেখার চেষ্টায় কেবলই…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক   \ ২৯ \   নখের আঁচড়ের মতো নদীর চিকন একটানা একটি রব চরাচরের ওপর দাগ কেটে চলে, আঁকের পর আঁক মকবুলের মনে তার মেয়েটির উদ্ভ্রান্ত মুখ রচনা করতে থাকে, নক্ষত্রের আগুন রেখায় যেন বিন্যস্ত হয়ে ওঠে প্রিয়লির মুখ, রাতের সম্মোহিত গভীরে নদী নয় প্রিয়লিরই কান্না শুনে ওঠে মকবুল। কতকাল সে মেয়েটিকে…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক \ ২৮ \   নদী কেঁদে চলেছে, একটানা তার সিঁ সিঁ কান্নার শব্দ মকবুল হোসেনকে বধির করে দিতে থাকে। সে নির্ণয় করতে চেষ্টা করে, কেন নদী কাঁদছে। তার মনে হয় তার বাবা মইনুল হোসেন মোক্তারের জন্যে কাঁদছে। আধকোশার পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর। কেন তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আধকোশার উন্মত্ত খলখল পানিতে? এই…

  • নদী কারো নয়

    \ ২৭ \   মকবুল হোসেনের ঘুম ভেঙে যায়। রাত এখন কত? নির্ণয় তার নাই। কোথায় সে আছে তারও কোনো নির্ণয় নাই। প্রথমে সে মনে করে চাটগাঁয়ে বোধহয় আছে, সার্কিট হাউসের কামরায়, চাটগাঁয় সে এসেছে একটা সাহিত্যসভায় যোগ দিতে। পরমুহূর্তেই ঘোরটা ভেঙে যায় – এই চাটগাঁ থেকে ফিরেই তো সে বুয়ার কাছে জানতে পেয়েছিলো তার…

  • বৃষ্টিনরোম রেলপথে

    সৈয়দ শামসুল হক রাত খুব বেশি নয়, বড়জোর সাড়ে ৮টা, এ-সময় আকাশভরে তারা থাকবার কথা, কী গোল একটা চাঁদে প্রান্তর ধবধবে আলোয় ভেসে যাবার কথা, কিন্তু দুপুর থেকে ঘন মেঘ। রংপুর থেকে জলেশ্বরী পর্যন্ত আকাশটা থমথমে হয়ে আছে। মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া দিচ্ছে আর ছিপছিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। আমরা বৃষ্টিমাথায় ট্রেনে উঠেছি রংপুরে। এখন বাড়ির প্রায়…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক \ ২৬ \ আমরা এতদূর এসে অবধি ধারাবাহিক একটি গল্পের জন্যে যদি এখনো অপেক্ষা করে থাকি তাহলে স্মিতমুখ হয়ে উঠব। দেখাই কি যাচ্ছে না যে, আমরা এখন গল্পের ভেতরেই বাস করছি? আমাদের চারদিকেই এখন গল্পের অণু, কণা ও পর্বত এবং সমুদ্র। সৃষ্টির আদিতে যেমন – জল, বিশাল জল, পরে সংক্ষুব্ধ সেই জল,…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক ॥ ২৫ ॥ মানুষের মন এমন, ভেতরের সব শক্তি দিয়ে শূন্যের ভেতরে সত্য ছবি তৈরি করতে চায়, এমন ছবি যা হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যাবে। নদীর বুকে নৌকো। নৌকোয় পা রাখবেন দেবী। মানবীর ছদ্মবেশে দেবী আজ। এভাবেই দেবী দেখা দেন মানুষের কাছে। তার ভেজা পায়ের ছাপ পড়ে নৌকোর পাটাতনে। পাটাতন তো নয়, জীবন!…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক ॥ ২৪ ॥ চা আনতে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমানের সমুখ থেকে উঠে যায় কুসমি। – আপনে বইসেন খানিক, চা নিয়া আসি। বিস্কুট কি দেমো? তিনি হাত নেড়ে অস্পষ্ট একটা ভঙ্গি করেন, যার অর্থ দিতেও পারো, নাও পারো। সাইদুর রহমানকে আজ গল্পে পেয়েছে। কুসমি তাঁর দিকে খানিক নজর ফেলে দেখে নেয়। মনে হয় অনেকক্ষণ…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক ॥ ২৩ ॥ আধকোশার জল বড় শীতল মনে হয় বালক মুকুলের, চোখেমুখে সে জলের ঝাপট মারে, তারপর আঁজলা ভরে পান করে, তার ভেতরটাও শীতল হয়ে যায়। ভোরে জলখাবার তার জোটে নাই, মা আজ হেঁসেলে প্রবেশ করে নাই; আধকোশার জল তাকে ক্ষুধার মুখে তৃপ্তি দেয়, সে উদ্গার তোলে। দূরে দাঁড়িয়ে আছে মইনুল হোসেন…

  • বালক, তুমি একদিন / দ্বিতীয় পাঠ

    বালক, তুমি একদিন কবি হবে, আমি সেই দিনের জন্যে শোক করছি। আমি এই ধনুক থেকে ছুড়ে দিচ্ছি তীর, নৌকো থেকে দিয়ে দিচ্ছি গতি, নদী থেকে জালের টানে তুলে ফেলছি মহাশোলের সিঁদুরপরা মুড়ো, আছড়ে ফেলছি তোমার তকতকে নিকোনো উঠোনে, বালক, এই শোক। অবিরাম তোমার কণ্ঠ থেকে এখন উচ্চারিত হচ্ছে যে শব্দসকল, আমি তার ভেতরে এখন পুরে…

  • বালক, তুমি একদিন

    দূরপ্রান্ত বালক, আমি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, একদিন কবি হবে তুমি। বাইচের নৌকোর টান তোমার শরীরে এখন তরতর করে উঠছে, বীজতলার সবুজ তোমার চুলে এখনই, তোমার শাপলা এখনি লাল, সরল স্বচ্ছ জল এখন নালার ওপর দিয়ে বহে যাচ্ছে, তুমি পা ডুবিয়ে, মাছের বা নক্ষত্রের ঝাঁক চঞ্চলতাই যেন এখন তোমার করোটিতে, গুঞ্জন করছে অরুণ পতাকা হাতে ভোর…