অদ্ভুত এক রাতের গল্প

লেখক:

ই ম দা দু ল  হ ক  মি ল ন

এই বাড়িকে লোকে বলে রাজবাড়ি।

সেটাই বলার কথা। চৌধুরী সাহেব তো রাজাই। এলাকার সবচাইতে ধনী, সবচাইতে নামকরা লোক। বিলে-মাঠে জমি যা আছে সবই তাঁর। হাজার হাজার বিঘা। পশ্চিমে পদ্মার চর। চর পুরোটাই তাঁর। অর্থাৎ আমাদের।

আমি চৌধুরী সাহেবের স্ত্রী। দেবর-ননদরা আমাকে বলে ‘মহারানী’। ঠাট্টা করে বলে না, সমীহ করেই বলে, শ্রদ্ধা-সম্মান করেই বলে। এলাকার লোকে বলে ‘রানীমা’। চৌধুরী সাহেবকে বলে ‘রাজাসাহেব’।

এলাকার লোকজনের প্রায় সবাই আমাদের প্রজা। একটা কলেজ আছে। চৌধুরী সাহেবই প্রতিষ্ঠা করেছেন। একটা মেয়েদের স্কুল, একটা ছেলেদের স্কুল। প্রাইমারি স্কুল করেছেন একটা, মাদ্রাসা করেছেন। স্টেশনের ওদিকে বাজার করে দিয়েছেন আমাদের জমিতে। ওদিকটা বেশ জমজমাট। ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় ভালো রকমের সাড়া পড়ে।

আমাদের বাড়িটা রাজবাড়ির মতোই। পাকা রাস্তার ধারে বাড়ি। বাড়ির সামনে বিশাল চত্বর। সবুজ ঘাসের যেন বড় একখানা মাঠ। তারপর কাছারি ঘর, বাড়িতে ঢোকার গেট। পশ্চিমদিকে দিঘির মতো বাঁধানো ঘাটলার পুকুর। পুকুরের দক্ষিণ পারে পারিবারিক কবরস্থান। পুবদিকে ওরকম আরেকটা বিশাল পুকুর। মাঝখান দিয়ে বাড়িতে ঢোকার সিংহদুয়ার। বাড়ির সামনে যেমন বহু পুরনো কয়েকটা শিরীষ গাছ, পেছন দিককার বাগানেও তেমন কয়েকটা আছে। তবে বাগানে শিরীষ গাছের সঙ্গে ফল-ফলাদির গাছেরও কোনো অভাব নেই। বাঁশঝাড়ের অভাব নেই। ঝোপজঙ্গল আছে নানারকম। বাড়ির বউঝিদের জন্য বাঁধানো ঘাটলার বড় একটা পুকুরও আছে। পুকুরের চারপারেই আছে গাছপালা আর ঝোপঝাড়। বছরভর কোনো না কোনো ফল ফলছেই, ফুল ফুটছেই। হাওয়ায় ফুলের সুবাস। বাঁশবন শনশন করছে। পাখি ডাকছে দিনভর। দারুণ একটা পরিবেশ।

সিংহদুয়ার দিয়ে ঢুকে অনেকখানি খোলা জায়গা। তারপর তিনদিকে তিনখানা দোতলা অতিকায় বিল্ডিং। চোদ্দো-পনেরোটা করে রুম একেকটা বিল্ডিংয়ে। ওপর-নিচ মিলিয়ে। বড় বিল্ডিংয়ের পুবপাশে রান্নাঘর। তাও একখানা একতলা, লম্বা অনেক বড় দালান। আট-দশজন মহিলা-পুরুষ রান্নাবান্নার কাজ করে।

করবেন না কেন?

বাড়িতে একেক বেলায় আশি-একশজন লোক খাওয়া-দাওয়া করে। কোনো কোনোদিন দেড়-দুশো লোকও খায়। গরিব চাষিরা জমিজমার কাজে এলে রাজাসাহেব তাদের ভরপেট খাইয়ে দেন। এটা এই বাড়ির রীতি।

দাসী-বাঁদি, জমাদার-জমাদারনি, মালি-ভুঁইমালি, বাজার সরকার এরকম লোক আছে সতেরো-আঠারোজন। কাছারি ঘরে খাতাপত্র লেখার কাজ করে দশ-বারোজন। রাজাসাহেবের পাইক-পেয়াদা আছে জনাতিরিশেক। লাঠিয়াল বাহিনীতে আছে শতিনেক লোক। তাদের থাকার জন্য এই তো আমাদের পাশের গ্রামটাই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরদুয়ার তুলে দেওয়া হয়েছে বাড়িতে, চাষবাসের জমি দেওয়া হয়েছে। পুরনো আমলের রাজাদের মতো অবস্থা।

আমিও জমিদারবাড়িরই মেয়ে। তবে চৌধুরীদের মতো এতো বড় জমিদারি না আমাদের। তাঁদের তুলনায় ছোট। তারপরও পাঁচ-সাত হাজার একর জমি আমাদের আছে। প্রজা-চাষি মিলিয়ে আমাদেরও লোকজন কম নয়।

জমিদারবাড়ির মেয়ে বলেই এই বাড়ির বউ হয়ে আসতে পেরেছি। কারণ জমিদারবাড়ির মেয়ে না হলে, জমিদারি রীতিনীতি, প্রথা না বুঝলে মানসম্মান থাকে না। অন্দরমহলের লোকজন পরিচালনা করতে না পারলে সে কেমন ধারার জমিদারকন্যা? প্রজাদের বউঝি আর তল্লাটের মহিলাদের দুঃখ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ না শুনলে, না বোঝার চেষ্টা করলে, তাদের সাহায্য-সহযোগিতা না করলে মহিলারা যাবে কার কাছে? পুরুষরা আসবে রাজাসাহেবের কাছে, মহিলারা আসবে রানীসাহেবার কাছে, এই তো নিয়ম। সেই নিয়ম মানতে হবে, বুঝতে হবে।

মা আমাকে ভালোভাবেই এসব শিখিয়েছেন। মা-বাবার একমাত্র মেয়ে বলে আমি বড় হয়েছি রাজকন্যার আদরে। আদর মা-বাবা যেমন দিয়েছেন, সে সঙ্গে জমিদারি রীতিনীতি এবং প্রকৃত জমিদারদের মানবিক গুণাবলিও শিক্ষা দিয়েছেন। আর এমনিতেই আমার মধ্যে দুটো ধারা কাজ করে। মানুষকে যেমন দুহাতে দান করতে পারি, সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারি, কৃপণতা বলে কিচ্ছু নেই চরিত্রে, পাশাপাশি অন্যায়-অপরাধ করে আমার কাছ থেকে কেউ নিস্তার পাবে না। অন্যায়ের শাস্তি দিতেও আমি সমান পারদর্শী। অর্থাৎ সোহাগ-শাসন দুটোই আমি তীব্রভাবে করি। ছলচাতুরী-মিথ্যার-প্রশ্রয় আমার কাছে কেউ পাবে না।

এসব কারণে এলাকার মহিলাদের কাছে আমার বেশ সুনাম। আমার গুণগান যেমন তারা গায়, আমাকে ভয়ও পায় যমের মতো। রাজাসাহেব যেমন তাঁর প্রজাদের খুবই পছন্দের মানুষ, আবার ভয়ও পায় বেদম, আমি ঠিক তেমন নারীসমাজের কাছে। এজন্য চৌধুরী সাহেব খুবই খুশি। বলেন, আমরা দুজন প্রায় একই রকম মানুষ। স্বামী-স্ত্রী একরকম হলে সংসার এবং চারপাশ ভালো থাকে।

আমরা ভালো আছি, খুব ভালো আছি।

যখনকার কথা বলছি, তখন মাত্র এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছি। দেবর-ননদদের বিয়ে হয়নি। শাশুড়ি বেঁচে আছেন। আমি থাকি উত্তর দিককার দালানের দোতলায়। বলা উচিত প্রাসাদের দোতলায়। দেবর-ননদ-শাশুড়ি থাকেন দুপাশের দুই প্রাসাদে। রান্নাঘরের লাগোয়া আরো দুটো লম্বা ধরনের একতলা দালান আছে। সেখানে থাকে কাজের লোকজন। কোনো কোনো পুরো পরিবারই কাজ করে আমাদের বাড়িতে। বাপ-মা, ছেলেমেয়ে। তাদের জন্যও ঘরদুয়ারের ব্যবস্থা আছে। আর সিংহদুয়ারের ওদিকটায়, বাড়ির পেছন দিকটায়, ডানপাশে, বাঁপাশে দূরে দূরে আছে একতলা, ছড়ানো-ছিটানো লম্বা লম্বা দালান। ওই দালানগুলোতে থাকে বাড়ির পাহারাদাররা। বন্দুকধারী লোকজন।

বড় দালানের দোতলায় থাকি রাজাসাহেব আর আমি। দাসী-বাঁদিরা কয়েকজন থাকে নিচতলায়। ওপরেও থাকে একেবারে খাস চারজন দাসী। জরুরি কাজে ডাকলেই যেন তাদের পাওয়া যায়।

এই দালানের পেছন দিকটায়, অর্থাৎ উত্তর দিকটায় বাগান আর মেয়েদের পুকুর। এতো বড় বাগান, এতো গাছপালা, দিনের বেলাও, বিশেষ করে দুপুরশেষে, যখন লোকজন দুপুরের খাবার খেয়ে একটু জিরাবার চেষ্টা করে, তখন বাগানের দিকটা এমন নির্জন, পাখি ডাকে, হাওয়া বয়, তারপরও গা কেমন ছমছম করে। এতো লোকজন চারদিকে তারপরও মনে হয় কেউ যেন কোথাও নেই। ওদিকটা যেন এক মৃতপুরী। ওদিকটা যেন এক অচেনা গভীর অরণ্য। যেন কাছে-পিঠে মানুষজন বলতে গেলে নেই।

সেই রাতেও ঘুম ভাঙার পর এমনই লাগল আমার।

তখনো মা হইনি। মাঝরাতে ঘুম ভাঙল। রাজাসাহেব গভীর ঘুমে। ঘরের ভেতর মৃদু একটা আলো। কোণের দিকে হালকা আলোয় জ্বলছে লণ্ঠন। কাক-জ্যোৎস্নার মতো একটা ভাব ঘরে।

সন্ধ্যাবেলা দেখেছিলাম পুবদিককার পুকুরের ওপারে বিশাল একখানা চাঁদ উঠেছে। পশ্চিমে ডুবছে কমলা রঙের সূর্য, পুবে উঠছে রুপার থালার মতো চাঁদ। তার মানে আজ পূর্ণিমা। বৈশাখ মাস চলছে। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা মানে বৈশাখি পূর্ণিমা, চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাওয়া পৃথিবী।

ঘুম ভাঙার পর মনে হলো বারান্দায় গিয়ে একটু চাঁদের আলো দেখি। এই প্রাসাদের চারদিকেই চওড়া, টানা লম্বা বারান্দা। বাগানের দিককার বারান্দায় যাই। ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখি, জ্যোৎস্না দেখি।

বাগানের দিককার বারান্দায় এলাম।

যা ভেবেছি তাই। চাঁদের আলোয় চারদিক একেবারে ভেসে যাচ্ছে। চাঁদটা দাঁড়িয়ে আছে বাঁধানো পুকুরটার একেবারে ঘাটলা বরাবর। যেন অনেকটা নিচের দিকে নেমে এসেছে। দূর আকাশে চাঁদ যতখানি দেখায়, আজকের চাঁদটাকে, এখনকার চাঁদটাকে দেখাচ্ছে তারচে’ অনেক বড়।

আগেও বলেছি, ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ভরা বাগান। বাড়ি, বাগান, পুকুর মিলিয়ে এগারো-বারোশো বিঘার ওপর জমি। বাগানটাই হবে পাঁচ-সাতশো বিঘার। গাছপালা, ঝোপঝাড়ের ওপর পড়েছে চাঁদের মোলায়েম আলো। ঝাপড়ানো গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে তলায় পড়েছে চাঁদের আলো। ছেঁড়া ছেঁড়া, টুকরো-টাকরা সাদা ধবধবে কাপড়ের মতো দেখাচ্ছে সেই আলো।

কিন্তু এমন নিস্তব্ধ নির্জন কেন?

হাওয়া যেন বইছেই না। কীটপতঙ্গ, ঝিঁঝিপোকারা যেন ডাকছেই না। চাঁদের আলোয় ওড়াউড়ি করে কোনো কোনো পাখি। ডাকাডাকি করে। তেমন একটা পাখিও নেই। ভুলেও ডাকে না কোনো পাখি। একেবারেই যেন মৃতপুরী। একেবারেই যেন নির্জন, প্রাণহীন গভীর অরণ্যভূমি। এতো লোকজন বাড়িতে, কারো কোনো সাড়াশব্দই নেই।

এমন কেন পরিবেশ?

বাড়ির সব লোক গভীর ঘুমে?

পাখি-কীটপতঙ্গরা গভীর ঘুমে?

হাওয়াও কি ঘুমিয়ে পড়েছে চাঁদের এরকম আলোয়?

আশ্চর্য ব্যাপার!

এ-সময় চাঁদের আলো একটু যেন ম্লান হলো। যেন রুপার থালায় একটুখানি আস্তর পড়েছে ছাইয়ের। একটু যেন কালচে দেখাচ্ছে চাঁদ, একটু যেন ময়লা হয়েছে।

আমার এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে ঘটল অদ্ভুত এক ঘটনা। পুকুরঘাটে উঠে দাঁড়াল একজন মানুষ। এতোক্ষণ যেন বসেছিল ঘাটলার বেঞ্চে। আমি তাকে দেখতেই পাইনি।

মানুষটা পুরুষ মানুষ না, মহিলা। ধবধবে সাদা শাড়ি পরা। এই এতোদূর থেকেও পরিষ্কার তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি। মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। চাঁদের আলো আর তার শাড়ির রং মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

ঘাটলায় দাঁড়িয়ে মহিলা তার ডানহাতটা বাড়ালো চাঁদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সে লম্বা হতে লাগল। তার হাত লম্বা হচ্ছে, পা লম্বা হচ্ছে, পুরো শরীর লম্বা হচ্ছে।

লম্বা হচ্ছে তো হচ্ছেই।

পুকুরধারের বাঁশঝাড় ছাড়িয়ে উঠল তার মাথা।

শিরীষ গাছগুলো ছাড়িয়ে উঠল।

আমাদের প্রাসাদ ছাড়িয়ে উঠল।

উঠছে তো উঠছেই।

বড় হচ্ছে তো হচ্ছেই।

একসময় দেখি তার মাথাটা একেবারে চাঁদ বরাবর। আকাশের চাঁদ যেখানে স্থির হয়ে আছে সে একদমই সেখানে। তার মাথা চাঁদের লাগোয়া, আকাশে।

আমি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছি। কেমন যেন ঘোর লেগে গেছে। নড়াচড়ার শক্তি নেই, শব্দ করার শক্তি নেই। আমি যেন মানুষ না, আমি যেন মানুষের মতো দেখতে এক পাথর, এক মূর্তি। শরীরে প্রাণ নেই। শুধু চোখদুটো কাজ করছে। চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার। স্পষ্ট দেখছি সবকিছু।

তারপর দেখি মহিলা তার ডানহাত দিয়ে চাঁদটা মুছে দিচ্ছে। ধুলো-ময়লা বা ছাই লেগে ময়লা হওয়া চাঁদ হাতের তালু দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। ম্লান হয়ে যাওয়া চাঁদ মহিলার হাতের তালুর ঘষায় একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে। ম্লান আলো ধীরে ধীরে প্রখর হচ্ছে। একসময় একেবারে ঝকঝকে চাঁদ, গলা রুপার মতো তরল জ্যোৎস্নায় ভাসতে শুরু করেছে চারদিক।

মহিলা তখন ছোট হতে শুরু করেছে। ছোট হতে হতে উধাও হয়ে গেল। পুরো ব্যাপারটা ঘটল চোখের পলকে।

আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। চোখে পলকও পড়ছে। কিন্তু দেহে যেন প্রাণ নেই। আগের সেই অবস্থা। মানুষ নই আমি, আমি এক পাথর। প্রাণহীন মূর্তি। ডর-ভয়-আতঙ্ক ইত্যাদি কোনো অনুভূতিই নেই আমার। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। নড়াচড়ার শক্তিই নেই।

কিছুক্ষণ পর ঘটল আরেক ঘটনা।

বাগানে ঢোকার মুখে অদ্ভুত একটা ঝোপ হয়েছে। গোল সুন্দর হয়ে ছড়িয়েছে ঝোপ। লম্বা লম্বা পাতাগুলো গাঢ় সবুজ। সাদা সাদা ফুল ফোটার পর এক ধরনের গোটা ধরে ঝোপে। দেড়-দুই ইঞ্চি পরিমাণ লম্বা গোটা। নিচের দিকটা সরু, ওপর দিকটা খেয়াল করে দেখলে মনে হয় একটু যেন মানুষের মুখের আদল। নাক-মুখ-চোখ বা কপাল-কান এসব না, বুকের ওপর থেকে কেটে নিলে মানুষের মুখ মাথাটা যেমন দেখায় অনেকটা যেন তেমন।

আমার ছোট ননদ সায়রাকে একদিন বলেছিলাম কথাটা। সায়রা, দেখো, এই গোটাগুলো না মানুষের কেটে নেওয়া কল্লার মতো দেখতে। মুখ-চোখ নেই, নাক-কান নেই কিন্তু মানুষের কল্লা যেন।

সায়রা হাসতে হাসতে অস্থির। কী যে বলেন ভাবি? কই মানুষের কেটে নেওয়া কল্লা আর কই এই গোটা?

তুমি দেখো খেয়াল করে।

সায়রা অনেকক্ষণ ধরে দেখে বলল, ঠিকই তো। একটু খেয়াল করে দেখলে ওরকমই মনে হয়। মানুষের কল্লা কেটে নেওয়া একটা আকৃতি।

কী ঝোপ এটা?

তা তো জানি না।

কতদিন হলো আছে এখানটায়?

তাও বলতে পারব না। কবে হয়েছে খেয়াল করিনি। মালিকে বলব কেটে ফেলতে?

সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্র একটা অনুভূতি হলো আমার। আমি যেন পরিষ্কার শুনলাম ঝোপটা মানুষের ভাষায় না না করল।

কথাটা আমি আর সায়রাকে বললাম না। বললাম, না না। কাটবার দরকার কী? ঝোপের পাতাগুলো খুব সুন্দর। দেখতে ভালো লাগে।

কিন্তু গোটাগুলো যে কাটা কল্লার মতো?

থাক না, ওই নিয়ে আর কে মাথা ঘামাচ্ছে?

আজ রাতে তারপর আমার চোখ গিয়েছে সেই ঝোপটার দিকে। চাঁদের আলো পড়েছে ঝোপের ওপর। হঠাৎ দেখি সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে সেই ঝোপের সামনে।

এ তো সেই মহিলাই। খানিক আগে লম্বা হয়ে চাঁদের কাছে চলে গিয়েছিল। হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে ময়লা হওয়া চাঁদ চকচকে করে দিলো। তারপর ছোট হয়ে ঘাটলার ওদিকটায় উধাও হয়ে গেল।

এখন আবার এলো কোত্থেকে?

ঝোপের কাছটায় এলো কখন?

আমি যে দেখতেই পাইনি?

কেন দেখতে পাইনি?

আমার অবস্থা আগের মতোই। নড়াচড়ার শক্তি নেই, কথা বলবার শক্তি নেই। আমি আছি পাথর হয়ে।

চারদিককার পরিবেশও আগের মতোই। একেবারেই নির্জন-নিঝুম। কোথাও কোনো শব্দ নেই, হাওয়ার চলাচল নেই। রাতপোকা, ঝিঁঝি কিচ্ছু ডাকে না। পুরো বাড়ি যেন মৃত্যুপুরী। বাড়ির কোথাও যেন বেঁচে নেই কেউ। প্রাণের অস্তিত্ব বলেই যেন কিছু নেই।

মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথায় এমনভাবে ঘোমটা দেওয়া, কিছুতেই মুখ দেখা যায় না। ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে সে আস্তে আস্তে ঝোপের ডাল-পাতায় হাত বোলাতে লাগল।

আশ্চর্য ব্যাপার!

অতি আশ্চর্য ব্যাপার!

ঝোপের একটি করে গোটায় সে হাত দেয় আর গোটাগুলো সত্যি সত্যি একটা করে কাটামু-ু হয়ে যাচ্ছে। মানুষের কাটামু-ু। গলা থেকে কেটে নেওয়া। এই এতোটা দূর থেকে চাঁদের আলোয় পরিষ্কার আমি কাটামু-ুগুলো দেখতে পাই। মুখ-নাক, চোখ-কান, কপাল-মাথা, এমনকি মাথার কালো কালো চুল পর্যন্ত দেখতে পাই। ঝোপটাও যেন কোনো ফাঁকে বড় হয়ে গেছে। অনেক বড়, অনেক ছড়ানো। শক্ত ডালপালা। ডালে ডালে ঝুলছে মানুষের কাটামু-ু। কোনো কোনোটা থেকে যেন রক্তও ঝরছে।

রক্তের রং চাঁদের আলোয় বোঝা যায় না। কাটা কল্লার তলার দিক থেকে কিছু একটা ঝরছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ওটা রক্তই।

আমি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

কতক্ষণ, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। একসময় দেখি ঝোপটা কোন ফাঁকে যেন ঠিক আগের মতো হয়ে গেছে। কোথায় সেই সাদা থানপরা মহিলা আর কোথায় ঝোপের ডালে ডালে মানুষের কাটামু-ু, কিচ্ছু নেই। সব আগের মতো। আমিও স্বাভাবিক হয়ে গেছি। নড়াচড়া করতে পারছি, চাইলেই শব্দ করতে পারব, কথা বলতে পারব। পাথরে যেন প্রাণ ফিরেছে।

কাছারি বাড়ির ওদিককার মসজিদে তখন ফজরের আজান হচ্ছে।

ঘটনা আমি নাশতার টেবিলে বসে রাজাসাহেবকে বললাম। শুনে তিনি এমন হাসাহাসি করলেন। আমি লজ্জাই পেলাম। বললেন, আমাকে বলেছ ঠিক আছে, আর কাউকে বলো না। কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই হাসবে। তুমি লজ্জা পাবে।

লজ্জা পাব কেন?

সবাই ভাববে মহারানী ভূত দেখেছেন। ভূতে বিশ্বাস করেন। ভূত বলে আসলে কিচ্ছু নেই। ওই নিয়ে তুমি যখন কথা বলবে, লোকে হাসবে না?

কিন্তু আমি যা দেখেছি তা তো সত্য! আমার চোখ ভুল দেখেনি।

রাজাসাহেব আমার কথা পাত্তা দিলেন না, হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন।

দু-তিনদিন ঘটনা আমি চেপে থাকলাম। তারপর বললাম সায়রাকে। শুনে সায়রা কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করলাম। কারণ…

কারণ?

ঝোপে কাটামু-ু আমি দেখিনি। তবে পূর্ণিমা রাতে সাদা শাড়ি পরা মহিলা ঘাটলা থেকে সোজা চাঁদের কাছে উঠে গিয়ে যে-হাত বুলিয়ে চাঁদ পরিষ্কার করে তা আমি দেখেছি। এই তো, গত বছর বৈশাখি পূর্ণিমাতেই দেখেছি।

কাউকে বলোনি কেন?

সবাই হাসাহাসি করবে, এ-কারণে। বাড়ির কেউ এসব অলৌকিক কা-কারখানা বিশ্বাস করে না। এতো লোকজনের মধ্যে নাকি অলৌকিক কিছু ঘটা বা ওরকম কিছু দেখা সম্ভব না।

কিন্তু তুমি আর আমি যে দেখলাম?

এসব তাদের কে বোঝাবে? r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার