ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে দেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতা

লেখক:

খায়রুল আনাম. এম. এম

[এ-রচনা ওই সময়কার আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ব্যাপার। এর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য সম্ভবত নেই। এই স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে আমার নিজের কতখানি স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছে তার একটা পরিমাপ হয়ে যাবে, এই ভরসা]

১৯৭০ সালের শেষ দিক। সারা পাকিস্তানে গণভোট হয়ে গেছে ৭ ডিসেম্বরে। জাতীয়ভাবে শেখ মুজিব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেও ভুট্টো সাহেব কিছুতেই ছাড় দিতে রাজি নন। তাঁর বক্তব্য খুব সোজা, শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের  প্রায় একচেটিয়া ভোট পেলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট তো ভুট্টো সাহেবই পেয়েছেন। অতএব মুজিব সাহেব টেকনিক্যালি দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেও প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানে তিনি আদৌ পপুলার নন। পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয় না হওয়া মানে, পুরো দেশের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স, বেসামরিক বিমান, মিডিয়া, ক্রীড়া সংস্থা, সমগ্র বিজনেস ও ফাইন্যান্স কমিউনিটি, এমনকি পররাষ্ট্র দপ্তর – সবাই তাঁর সঙ্গে প্রথম দিন থেকে অসহযোগিতা শুরু করবে। কারণ এসবের ৯০ শতাংশ তখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা কন্ট্রোল করত। ফলে শেখ মুজিব মন্ত্রিসভা গঠন করার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ভীষণ অরাজকতার সৃষ্টি হয়ে দেশটা একেবারে রসাতলে যাবে। ভুট্টোর মতে, তার মতো একজন দেশপ্রেমী, উচ্চশিক্ষিত, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ঝানু রাজনীতিবিদ কী করে চোখের সামনে দেশের এই চরম অরাজকতা সৃষ্টি বা দেশকে রসাতলে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারেন!

১৯৭০ সালের শেষ থেকে ১৯৭১ সালের প্রথম দিকটায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভুট্টো, ইয়াহিয়া ও অন্য নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সমঝোতায় আসা যায় কিনা, এই নিয়ে উচ্চপর্যায়ে বিসত্মর আলাপ-আলোচনা করেন। তাঁরা ঘনঘন পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান করতে থাকেন। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হয় না। শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারীরা ছয় দফা ভেঙেচুরে নিদেনপক্ষে তিন দফা আদায় করতে না পেরে ত্যক্ত-বিরক্ত হন। আর কোনো পথ খোলা না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন জনপ্রিয় প্রবীণ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনিই প্রথম (পশ্চিম) পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে ‘জ্বালাও-পোড়াও’ আন্দোলন শুরু করেন এবং একের পর এক সরকারবিরোধী ধর্মঘট, সভা-সমিতি করে জনসাধারণের মধ্যে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো মনোবল, শক্তি ও সাহস জুগিয়ে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করা শুরু করেন। অন্যরাও আন্দোলন করেন, তবে তিনিই এর হোতা।

ব্যক্তিগত দিক থেকে, সে-সময় আমার বিয়ের কথা পাকাপাকি পর্যায়ে এসেছিল। আমি তখন চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে চাকরিরত। প্রতি বছর শেষে ‘রেস্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন’-এর জন্য সারা দেশের যে-কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার জন্য কোম্পানি থেকে ফ্রি এয়ার টিকিট দিত। আমরা সাধারণত প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি যেতাম ও লাহোর হয়ে ঢাকা ফিরতাম। পরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরতাম। সে-সময় কক্সবাজার এত উন্নত হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানে বেড়ানোর জায়গা আর তেমন ছিল না। পেস্ননের টিকিটটা পুরোপুরি ব্যবহার করা যেত না। তাছাড়া হাজার মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তানে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হারিয়ে, মানে করাচি-লাহোরের জৌলুস ছেড়ে কক্সবাজারে সমুদ্রের ঢেউ গুনতে আর কতবার যাওয়া যায়, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাসিন্দা হয়ে! তাছাড়া এবার পাকিস্তানে তো শুধু বেড়ানোই নয়, সঙ্গে বিয়ের বাজারটাও করা হয়ে যাবে। বিশেষ করে শাড়ি ও গহনা তখন ঢাকার থেকে করাচিতে অনেক সস্তা ছিল, ভ্যারাইটিও ছিল অনেক রকম। যেমন তখন ঢাকায় সোনার ভরি ছিল ২০০ টাকা, যা করাচিতে ছিল ১২০ টাকা। করাচির মেহবুব মার্কেটে অপেক্ষাকৃত কম দামে বহু ধরনের উৎকৃষ্ট শাড়ি পাওয়া যেত। গহনারও অনেক ভ্যারাইটি ছিল।

আমি ব্যাচেলর, শাড়ি-গয়নার কী জানি! একটা উপায় বের হলো। কর্ণফুলী পেপার মিলে কাজ করার সময় সেখানকার চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট, মিস্টার ড্যাস ড্যাস খানের সঙ্গে আমাদের খুব ভাব হয়। তিনি আদতে ভারতের মধ্যপ্রদেশের লোক ছিলেন। খুবই সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন মানুষ। ভাবি রাজপুতানার। খুব নামকরা নাচিয়ে। করাচিতেই ভাব-ভালোবাসা থেকে বিয়ে। তাই কর্ণফুলী পেপার মিলে আমাদের গান-বাজনার ছোট্ট ঘেঁটু পার্টির বৈঠকটি ওনার বাড়িতেই বসত। মুর্শিদাবাদ থেকে আসা এক ওস্তাদ আমাদের গান শেখাতেন। ওনাদের বড়-মেয়েটিকেও দু-একটা রবীন্দ্রসংগীত শিখিয়েছিলেন। একদিন সভায় ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ গানটা গাইতে বলায় সে খুশি হয়ে চিৎকার করে ‘ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা’ না বলে ‘ঝড় যে তোমার পায়ুধ্বজা’ বলে গেয়ে দিয়েছিল। ইলেকশন নিয়ে গ-গোল পাকিয়ে উঠছে দেখে, করপোরেট ফাইন্যান্স ডিরেক্টর হিসেবে প্রমোশন নিয়ে ড্যাস ড্যাস ভাই সপরিবারে করাচিতে দাউদ গ্রম্নপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের হেড কোয়ার্টা‌র্স ‘দাউদ সেন্টারে’ চলে যান। যাওয়ার সময় ভাবি বলে গিয়েছিলেন, আমরা করাচিতে গেলে যেন অবশ্যই ওনাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা করি। না হলে উপায় থাকবে না।

তো করাচি গিয়ে শাড়ি-গয়না কিনে দিতে সাহায্য করার জন্য ভাবির কাছে কেঁদে পড়লাম। ভাবি বললেন, ‘মেরে বেওয়াকুফ দেবার, তুঝে মালুম হ্যায়, ভাবি কিছ লিয়ে হোতা? ইস্সে বহুত বড়া কাম কারনেকা, ইয়ে তো মামুলি চিজ হ্যায়। চল, আগে বাড়।’ তিনি শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন এবং নিয়েও এসেছিলাম ঠিকই। খুবই পছন্দের দামি-গহনার সেটটা রেডিমেড পাওয়া যায়নি, অর্ডার দিতে হয়েছিল। ভাবি বললেন, ‘ফিকর মাত করনা। তুম অ্যাডভান্সকে বাদ বাকি প্যায়সা মেরে পাস ছোড় কে যাও। তেরা ভাই এক হাপ্তে কে বাদ দাউদ পেট্রোলিয়াম সাইট ভিজিট কে লিয়ে চিটাগাং জায়েগা। তুমহারা জেওবর উনকে সাথ ভেজ দুঙ্গা।’ অনেক সস্তায় মনের মতো কাজ করা সুন্দর একটা গহনার সেট কিনতে পেরেছি। বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ির লোকেরা খুব খুশি হবে ভেবে মনে-মনে পুলকিত ছিলাম। বলা বাহুল্য, সে গহনা ভাই আর কখনো নিয়ে আসেননি।

ইলেকশনের ফলাফল ও মন্ত্রিসভা গঠনে মতভেদ নিয়ে ঢাকায় তখন বেশ জোরেশোরে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। প্রায় রোজ দোকানপাট, বাস, রিকশা, স্কুল-কলেজ, কোর্ট-কাছারি, এমনকি সরকারি অফিসও বন্ধ থাকছিল। যে-কোনোদিন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। তাই লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, লান্ডিকোটালের পেস্নন বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি চট্টগ্রাম ফিরে আসতে পেরে যেন ধড়ে জান পেলাম। এরপর একটা বিশেষ কাজে আমাকে বারবার ঢাকা যেতে হতো। ওইরকম এক ট্রিপে, অনেক ভাগ্যক্রমে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণের একজন প্রত্যক্ষ দর্শক-শ্রোতা হতে পারার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়।

শেখ সাহেবের ভাষণ দেওয়ার আগে দুজন চারণ কবি ও গায়ক, বাংলা ভূখ–র ওপর রচিত দেশাত্মবোধক গান ওই মঞ্চে গান। এতে দেশপ্রেম জাগরণের একটা পূর্বসুর বা আমেজ তৈরি হয়। তারপর শেখ সাহেবের উদাত্ত কণ্ঠে সেই বাণী, ‘ভায়েরা আমার’ দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেই বজ্রকণ্ঠ শুনে তৎক্ষণাৎ গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছিল। উপস্থিত সবার মনে হয়েছিল কোনো রাজনৈতিক নেতা নয়, যেন তাদের আপন ভাই শত্রম্নর হাত থেকে নিজেদের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য পরিবারের সব সদস্যের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছে, তাদের সর্বশক্তি দিয়ে শত্রম্নকে প্রতিহত করতে। ‘প্রত্যেক ঘরে-ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবিলা করতে হবে, আমাদের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, আমাদের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, বাংলার মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আলস্নাহ’ – এই সুউচ্চ স্বরে, এই দৃপ্ত ভঙ্গিতে, এই ভাষায়, সর্বশরীর শিউরে-ওঠা এই কথা বাঙালিরা এর আগে আর কখনো শোনেনি।

কোনো স্ক্রিপ্ট ছাড়া মাত্র ১৯ মিনিটের ইলেকট্রিফায়িং এই ভাষণ দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ তিন-চারটি ভাষণের অন্যতম বলে আজ বাঙালিরা মনে করে। অর্থাৎ এটাকে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ স্পিচ, দ্বিতীয় বিশ্ব মহাযুদ্ধের সময় স্যার উইনস্টন চার্চিলের স্পিচ ও অভিষেকের সময় জন এফ কেনেডির স্পিচের সমকক্ষ বলে তারা মান্যগণ্য করে। এই ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি হাজার বছর পর প্রথম তার আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হয়। এই প্রথম সে ‘স্বাধীনতা’ কথাটা শুনল আর তা পাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করল। মনে হলো, যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জাদুমন্ত্রটা মাদুলি করে কেউ অভাগা বাঙালি মায়ের গলায় পরিয়ে দিলো। সেদিন থেকে বাঙালি জাতিকে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে এসে ইস্টার্ন রিফাইনারির ইঞ্জিনিয়ারিং কাজে আবার মনোনিবেশ করলাম। গন্ডগোল আর থামল না, যদিও উভয়পক্ষের আলোচনা অব্যাহত থাকল। অফিসের গাড়ি নিয়ে প্রায়ই পতেঙ্গা থেকে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হতো। শহর থেকে পতেঙ্গার রিফাইনারিতে কর্ণফুলী নদীর তীর ধরে যাওয়ার পথে প্রথমে নেভাল বেস, তারপর স্টিল মিল, তারপর সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ফেলে রিফাইনারির রাস্তা। একদিন হঠাৎ দেখলাম, ‘বাবর’ নামে খুব বড় একটা নেভি শিপ ঠিক নেভাল ইয়ার্ড বরাবর নদীতে কিছুদিন ধরে নোঙর করে আছে। আমরা কিছু সন্দেহ করিনি। বলা যায় সন্দেহ করার মতো জ্ঞান আমাদের ছিল না, কেনই-বা ওটা খামোকা ওভাবে নোঙর করে আছে দিনের পর দিন। এদিকে আমরা যত রকমের ঢিল, নুড়ি, ছড়ি, ডালপালা, বাঁশের লাঠি জোগাড় করে চলেছি। কারণ, বঙ্গবন্ধুর আদেশ, আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবিলা করতে হবে। তাছাড়া বাঙালির হাতে তখন এর বেশি ছিলই বা কী?

অসহযোগ আন্দোলন তখন ভালোমতো দানা বেঁধেছে। সেই ডাকে আমরা রিফাইনারিতে ডেইলি যাচ্ছি বটে, তবে প্রোডাকশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, অন্য আর পাঁচটা কারখানা ও অফিস-আদালতের মতো। পাক সরকার চট্টগ্রাম রেডিও অফিসও বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে বিদ্রোহের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। আমরা বাড়ি থেকে যে যার শর্টওয়েভ রেডিও নিয়ে যেতাম অফিসে। সারাদিন ধরে কলকাতার আকাশবাণী, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা শুনতাম। পরে আসেত্ম-আসেত্ম আমরা জেনে ছিলাম, ওই ‘বাবর’ জাহাজে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও প্রচুর রাইফেল, মেশিনগান ইত্যাদি আনা হয়েছিল। রাত গভীর ও রাস্তা নির্জন হলে রাস্তা বন্ধ করে ওই অস্ত্রশস্ত্র জাহাজ থেকে নেভাল বেসে ঢোকানো হতো।

দেখতে-দেখতে সেই অমোঘ ২৫ মার্চ এসে গেল। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের পথে পাড়ি দেন। বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকায় ২৫ মার্চ নৃশংস হত্যাকা–র কথা পরের দিন ২৬ মার্চ সারা দেশে পাগলা আগুনের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের মানুষ রাগে-দুঃখে ফেটে পড়ছে। হাত-পা নিশপিশ করছে, কিন্তু কীভাবে কী তারা করতে পারে তা না বুঝতে পেরে অসহায়ের মতো ছটফট করে বেড়াচ্ছে।

ঠিক এমন পরিবেশের মধ্যে ২৭ মার্চ অফিসে রিফাইনারির কন্ট্রোল রুমে আমার কাজের টেবিলের ওপরে রাখা শর্টওয়েভ রেডিওতে শুনতে পেলাম, ‘আমি মেজর জিয়া। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর অবর্তমানে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম। আজ থেকে সারা দেশ জুড়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে।’ জিয়ার বাক্যগুলোর প্রতিটি শব্দ বা অক্ষর ঠিক-ঠিক মনে নেই। তবে ভাষণের সারমর্ম তাই ছিল। স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক বঙ্গবন্ধু না মেজর জিয়া – এই নিয়ে একটা বিতর্ক চালু আছে। বঙ্গবন্ধু নাকি ঢাকা ত্যাগের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছে দিয়ে

যান এবং সেটা টেলিগ্রাফ করে নাকি চিটাগাংয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তখন সাধারণ মানুষ সে-ব্যাপারে কিছুই জানত না। মুজিবহীন পুরো জাতি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। মেজর জিয়ার বেতারে ওই ঘোষণাটি যেন সারা জাতির দেহ-মনে একটা বিদ্যুতের চমক ছড়িয়ে দিলো। এই ভাষণের পর তখনকার পূর্বপাকিস্তানের নাম বাসত্মবিকই ‘জয় বাংলা’ হিসেবে চালু হলো। হঠাৎ একজন মিলিটারি নেতার কাছ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা শুনে ও তাঁর পরিচালনায় যারা ‘জয় বাংলা’ ছিনিয়ে আনতে উদ্যোগী, তারা প্রথমে ‘মুজিব বাহিনী’ ও পরে ‘মুক্তিবাহিনী’ নামে শত্রম্নর ওপর সত্যি-সত্যি ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পুরোদমে মাঠে নেমে পড়ার সাহস ও দিশা পেল। ‘জয় বাংলা’ কথাটি প্রথমে শেখ সাহেব তাঁর ৭ মার্চের ভাষণের শেষে উচ্চারণ করেন। সে-পর্যন্ত সেটা আদর্শ বা থিওরি ছিল। আর তা প্রকৃত অর্থে কার্যকর হয় বা তার প্র্যাকটিক্যাল অ্যাপলিকেশন শুরু হয় মেজর জিয়ার বেতার ভাষণের পর থেকে। এ যেন গুড পস্নানিংয়ের পরে প্রপার একজেকিউশনের একটা চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। যাহোক এই দুই ঐতিহাসিক ভাষণ ও ঘোষণা নিজ কানে শুনতে পারার বিরল সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি।

ওই রাতে আমার ইভিনিং শিফটে ডিউটি ছিল, মানে বিকেল দুটো থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। পস্ন্যান্ট বন্ধ, কোনো কাজ ছিল না বলে রেডিও
ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে নানা জায়গা থেকে খবর শোনার চেষ্টা করছিলাম, বিশেষত বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও কলকাতার চ্যানেল থেকে। একজন অপারেটর ও একজন সিকিউরিটি গার্ড এসে বলল, ‘স্যার আমরা খবর পেয়েছি, বাবর জাহাজ থেকে যেসব  সৈন্য নেমে নেভাল ইয়ার্ডে জমা হচ্ছিল, তারা নাকি আসেত্ম-আসেত্ম বের হচ্ছে আশপাশের ফ্যাক্টরি এলাকায়। আমাদের এখানেও আসতে পারে।’ মনে হলো, তা তো পারেই। আমাদের তাহলে কী করা উচিত? একটু চিমত্মা করে বললাম, ‘তোমাদের হাতে যখন কোনো কাজ নেই, তখন সব অপারেটর, সিকিউরিটি গার্ড ও ফায়ার ফাইটার মিলে রিফাইনারি আসার রাস্তাটা তিন জায়গায় চওড়া করে কেটে ফেল, আর ওই কাটা মাটি দিয়ে উঁচু করে ব্যারিকেড দাও, যাতে ওদের জিপগুলো এখানে আসতে না পারে। এবং এই রাতের মধ্যেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে।’ আর সবাইকে সাবধান করে দিলাম যেন আগামীকাল তারা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্তত মাসখানেক চলার মতো ক্যাশ টাকা উঠিয়ে রাখে। কারণ কোনো গোলযোগ শুরু হলে যে-কোনো সময় হঠাৎ ব্যাংক বন্ধ হয়ে টাকা আটকা পড়ে যেতে পারে। ওইসব নির্দেশ দিয়ে রাত সাড়ে এগারোটার সময় পতেঙ্গার রিফাইনারির কোয়ার্টারে ফিরে আসি।

ভোর সাড়ে চারটায় দরজার কড়া নাড়া ও দরজা ধাক্কানির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আর খুব নিচু ও গভীর গলায় ‘স্যার, স্যার’ আওয়াজ আসছে। দরজা খুলে দেখি দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন অপারেটর, সঙ্গে একজন সিকিউরিটি গার্ড, হাঁপাচ্ছে। আশ্বসত্ম করে বললাম, ‘কী হয়েছে একটু ধীরেসুস্থে গুছিয়ে বলো।’ ওরা বলল, ‘স্যার, কাল রাতে, আপনি চলে আসার প্রায় এক ঘণ্টা পর, চারটে মিলিটারি জিপ নিয়ে আটজন সোলজার রিফাইনারিতে জোর করে ঢুকে পড়ে। এসেই তারা চার জায়গায় পজিশন নিয়ে নেয় – মেইন গেট, মেইন অফিস, মেইন পস্ন্যান্ট ও মেইন ট্যাঙ্কফার্ম। তারপর তারা ক্যান্টিনে এসে সব খাবার খেয়ে নেয় আর বলে, খবরদার, কেউ এখান থেকে যাবে না।’

ক্যান্টিনের পাশে আমাদের একটা ক্লিনিক ছিল। আটটা-পাঁচটায় ডাক্তার আর তিন শিফটে তিনজন কম্পাউন্ডার। ওই দিন ওই শিফটের কম্পাউন্ডার ছিলেন এক হিন্দু ভদ্রলোক। তিনি ভয় পেয়ে পালাতে শুরু করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে এক গুলিতে তাঁকে ধরাশায়ী হতে হয়। পাক সেনারা আধঘণ্টার মধ্যে সেখানেই তাকে কবরস্থ করে। নাম মনে নেই, তবে ওই কম্পাউন্ডার সাহেবই চট্টগ্রামে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম শহিদ। ওরা বলল, ‘আমরা অন্ধকার থাকতে-থাকতে আপনাদের গোপনে বলতে এসেছি যে আপনারা কেউ আর রিফাইনারিতে কাজের জন্য যাবেন না। গেলেই আটকে দেবে। আমাদের কাছ থেকে ওরা লিস্ট নিয়েছে ইঞ্জিনিয়ারদের। কে কোন শিফটে আছেন, তাও এখন ওদের জানা।’ খবরটা দিয়ে তারা আবার অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

সকাল হতেই আমাদের পতেঙ্গার হাউজিং কলোনির সবাইকে ডেকে বিষয়টার গুরুত্বের কথা জানালাম, এবং কী করা যায় সবাই মিলে ভাবনাচিমত্মা করতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো এখানে থাকলে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যাবে। অতএব বাঁচতে হলে এখান থেকে বিভিন্ন দলে ভাগে হয়ে পালাতে হবে। কোথায় যাব তা তো জানি না, কারণ, শহর ছাড়া কিছুই চিনি না। দেখলাম দলে আমরা চারজন হয়েছি। রাস্তায় যদি সেনারা আমাদের ছাত্র, প্রফেসর বা শিক্ষিত চাকরিজীবী মনে করে ধরে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আমরা সবাই চাকরদের মতো পুরনো লুঙ্গি, পুরনো শার্ট ছিঁড়ে বানানো ছেঁড়া শার্ট ও পুরনো গামছার মধ্যে একটা খুব পুরনো শার্ট-প্যান্ট, দাড়ি কামানোর বেস্নড ও দাঁত মাজার ব্রাশ ও টুথপেস্ট ঢুকিয়ে গাঁটরি বানিয়ে বগলদাবায় নিয়ে রওনা হলাম। হাঁটতে-হাঁটতে আমরা কর্ণফুলী নদীর মোহনায় চলে এলাম। এখন কোথায় যাব, নদী পার হবই বা কী করে? ভাগ্যক্রমে দেখা গেল একটা নৌকা কয়েকজন যাত্রী নিয়ে নদীর ওপারে যাচ্ছে। অনেক অনুনয়-বিনয় করে শেষ পর্যন্ত ওপারে যেতে পারলাম। শুনলাম সামনের গ্রামটার নাম নাকি আনোয়ারা। আমরা না থেমে চলতেই থাকলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা বিকট চিৎকার শুনে পেছনে তাকালাম। দেখি প্রায় ৫০-৬০ জন লোক লাঠি, সড়কি নিয়ে, ‘ধর, ধর’ বলে আমাদের দিকে তেড়ে আসছে। বিপদ দেখে আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। গাঁয়ের লোকগুলো আমাদের ভদ্র চেহারা দেখে ভাবল আমরা পাঞ্জাবি। গুপ্তচর হয়ে গ্রামে বেরিয়েছি হেড কোয়ার্টারে খবর পাঠানোর জন্যে। তাদের অনেক বোঝালাম, ভাই আমরা মানুষের বাড়িতে চাকরের কাজ করে খাই। এই দেখ গাঁটরি। অফিস-ঘাট বন্ধ বলে সাহেবরা সব দেশের বাড়িতে চলে গেছে। আমাদের চাকরি নেই বলে দেশের বাড়িতে ফিরছি। ওরা বলল, ‘চাকর হলে দাঁত অত সাদা হয় কী করে? তাছাড়া বইয়ের ভাষায় কথা বলো। চাকর না, তোমরা অবশ্যই পাঞ্জাবি, চলো আমাদের সঙ্গে।’

উপায়ান্তর না দেখে বললাম, ‘ভাই, তোমাদের গাঁয়ের মোড়ল কে? তাকে একটু ডেকে নিয়ে এসো। কথা শেষ হতে না হতে দেখলাম দূর থেকে একজন মধ্যবয়সী লোক ‘এই থাম থাম’ বলতে বলতে দৌড়ে এদিকে আসছেন। ওরা বলল,  ‘উনি হচ্ছেন আমাদের চেয়ারম্যান’।  উনি এলে আমরা সব কথা খুলে বললাম, ‘ভাইসাহেব, আমরা রিফাইনারির ইঞ্জিনিয়ার, কেমিস্ট ইত্যাদি। পাক সেনারা আমাদের রিফাইনারি দখল করে, আমাদের ডেকে পাঠিয়েছে। সেই ভয়ে আমরা জান নিয়ে যেদিকে দুচোখ যায়, বেরিয়ে পড়েছি। এখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কতদূরে বা কোথায় যেতে পারব জানি না। শুনে উনি খুব সহানুভূতিশীল হয়ে বললেন, ‘কারো বাড়িতে আপনাদের চারজনের জায়গা দেওয়া মুশকিল। তার চেয়ে আপনারা পরবর্তী গ্রাম বাঁশখালীতে যান। ওখানে একটা নতুন কলেজ হয়েছে, অবশ্য মাটির দেয়াল। তবে কলেজ বন্ধ বলে ছেলেরা বাড়ি চলে গেছে। ওখানে বেঞ্চের ওপর আপনারা ঘুমাতে পারবেন। ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার একটু আগে আমরা বাঁশখালীর মাটির কলেজে গিয়ে উঠলাম। দেখলাম হোস্টেলের একজন বাবুর্চি আছে, তবে ছেলেরা চলে যাওয়ায় তার বাজার করা ও খাওয়া-দাওয়ার রাস্তা বন্ধ। আমাদের পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। আর কারা-কারা পালিয়ে এ অঞ্চলে এসেছে খবর নিয়ে জানা গেল যে, চিটাগাং ইউনিভার্সিটির ইকোনমিক্সের এক প্রফেসর নাকি এসেছেন। আমরা চারজন ফেয়ারলি গণ্যমান্য লোক কলেজে বাস করছি – এই খবরটা খুব শিগগির আশপাশে ছড়িয়ে পড়ল। খবর পেয়ে ওখানকার বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা খোদ প্রফেসর আহসাবুদ্দিন সাহেব আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। দেখলাম হাতে চারটে  ঢেঁড়স নিয়ে এসেছেন। বললেন, ‘যুদ্ধ চলাকালীন একসময় সব খাবার ফুরিয়ে যাবে। তাতে কী হয়েছে? ভাতের বদলে একটা কিছু খেলেই হলো। এই দেখুন আজকে আমি শুধু ঢেঁড়স খেয়ে আছি। বলে গেলেন, আগামীকাল কলেজের মাঠে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকও ওখানে বক্তৃতা দেবেন। বক্তৃতার পর এখানকার লোকাল মুক্তিবাহিনী গঠন করা হবে। আপনারা অবশ্যই আসবেন।’

কয়েকদিন পরে একজন লোক আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলো। সে বলল, সে নাকি রিফাইনারির একজন সিকিউরিটি গার্ড আর  সে বাঁশখালীরই লোক। আমরা এখানে আছি খবর পেয়ে সে দাওয়াত করতে এসেছে। আমরা যেতে তার পুকুরের মাছ ও বাড়িতে পালা মুরগি জবাই করে আমাদের ভূরিভোজন করাল। খাওয়ার পর বলল, ‘স্যার, আপনারা যে এখানে আছেন, সে খবর সেনাবাহিনীর লোকেরা জানে। তারা রিফাইনারি আবার চালু করতে চায়। তাই আপনাদের ফিরে যাওয়ার জন্য আমাকে বলতে পাঠিয়েছে। যুদ্ধ চালাতে হলে মিলিটারি ট্যাঙ্ক, ট্রাক, জিপগাড়ির ও বয়লার চালানোর জন্য ডিজেল লাগবে, গাড়ির জন্য পেট্রল, পেস্নøনের জন্য জেট ফুয়েল লাগবে, রান্নার জন্য কেরোসিন লাগবে ইত্যাদি। একবার ওদের নজরে যখন পড়ে গেছেন, পালানোর আর কোনো উপায় নেই স্যার। যেখানেই পালাবেন সেখান থেকেই ওরা ধরে আনবে। তারপর কোর্ট মার্শাল করে মেরে ফেলবে। তার চেয়ে নিজে থেকে ফিরে যাওয়াই ভালো। এখন আপনাদের মতো দক্ষ লোকদের ওদের খুবই দরকার। কোনো ভয় নেই স্যার, ইনশা আলস্নøvহ আপনাদের কিছু হবে না। আমি আপনাদের সঙ্গেই থাকব। আমি আবার কাল আসব স্যার, এসে আপনাদের নিয়ে যাব।’

এই প্রত্যন্ত গ্রামে এসে এভাবে ধরা পড়ে যাব ভাবিনি। এখন উভয়সংকট। গেলেও মারা পড়ব, না গেলেও মারা পড়ব। তাই আমরা চারজন পরামর্শ করে যাওয়াই ঠিক করলাম। সেভাবেই যুদ্ধের নয় মাসের প্রায় সাড়ে সাত মাস আমরা প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে রিফাইনারির পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ও ফার্নেস অয়েল বানিয়েছি ও পতেঙ্গার রিফাইনারি কোয়ার্টারে থেকেছি। কোয়ার্টারে ঢুকেই আমরা রেডিওর ভলিউম খুব নিচু করে দিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে অনুষ্ঠান শোনার জন্য রেডিওটার মধ্যে কান গুঁজে রাখতাম। পনেরো মিনিট থেকে আধঘণ্টা অন্তর জিপগাড়িতে করে তিন-চারজন সেনা আসত আমাদের চৌকি দিতে। বিশেষ করে রাতে পাহারার ট্রিপটা বেড়ে যেত। আমাদের জেনারেল ম্যানেজার বাঙালি হলেও তাঁর স্ত্রী ছিলেন পাঞ্জাবি। তাই ওনাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে ওনার জায়গায় করাচির পাকিস্তান রিফাইনারির টেকনিক্যাল ম্যানেজারকে আনা হয় আমাদের রিফাইনারি পুনরায় চালু করার জন্য। তিনি আদতে হায়দরাবাদের লোক ছিলেন। খুবই করিৎকর্মা। তাঁর দু-একটা ছোট-ছোট মন্তব্য থেকে বোঝা যেত, তিনি এই আগ্রাসন নীতিটা একেবারেই পছন্দ করেননি। কিন্তু মুখে কিছু বলতেন না। আমাদের সব সময় কাজের মধ্যে ব্যসত্ম রাখতেন, যেন অন্য কোনো চিমত্মা মাথায় না আসে।

নভেম্বরের শেষে ও ডিসেম্বরের শুরুতে আকাশপথে ভারতীয় পেস্ননে করে রিফাইনারির ওপর ‘এয়ার স্ট্র্যাফিং’ শুরু হয়। বিশেষ করে তেলের ট্যাঙ্কগুলোতে। উদ্দেশ্য, ট্যাঙ্কের মজুদ পেট্রল-ডিজেল ইত্যাদি জ্বালিয়ে শেষ করা ও রিফাইনারি অপারেশন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া। রিফাইনারির কোনো ক্ষতি হয়নি। দু-তিনটে ট্যাঙ্কে আগুন লেগেছিল। কয়েকটা পাইপলাইনেও আগুন লেগে সেগুলো অকেজো হয়ে গিয়েছিল। তবে পাকিস্তানের ‘অ্যান্টি এয়ারক্র্যাফট’ গান (কামান) গুলো একটাও পেস্নন ফেলতে না পারলেও বেশ ভালো প্রটেকশান দিয়েছিল। এই এয়ার স্ট্র্যাফিংয়ের মধ্যেই জীবন হাতে নিয়ে আমরা কাজ করেছি ও রিফাইনারির আগুন নেভাতে গিয়েছি খুব ভালো করে জেনে যে ওই স্ট্র্যাফিংয়ের কয়েকটা এমনকি একটা বুলেট আমার মাথায় বা শরীরে পড়া মানে সব শেষ, যবনিকা পতন। পেস্ননগুলো যখন রিফাইনারির দিকে আসত, আমরা আশ্রয় নিতাম তথাকথিত নিরাপদ স্থানে। পেস্নন সরে গেলেই আগুন নেভাতে দৌড়ানো।

একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করে আমরা বাঙালিরা লুকিয়ে-লুকিয়ে হাসতাম। একটা এয়ার স্ট্র্যাফিং করে যখন সমুদ্রের দিকে পেস্ননটা ফিরে যাচ্ছে এবং অ্যান্টি এয়ারক্র্যাফট গান কিছু করতে পারল না, তখন নিজেদের সাহস দেওয়ার জন্য অবাঙালিরা বলত, ‘গান সে দো গিরা’, কেউ বলত,‘তিন গিরা, ম্যায়নে আপনা আঁখো সে দেখা।’ অথচ আমরা পাশেই দাঁড়িয়ে আছি, দেখছি পেস্নøনের কিছুই হয়নি।

নয় মাসের লড়াই শেষে পাকিস্তান হেরে গিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন জেনারেল নিয়াজি ভারতের জেনারেলের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, তখন তিনি তাঁর সেনাদের আর যুদ্ধ না করে অস্ত্রশস্ত্র ভূমিতে অর্পণ করে আত্মসমর্পণ করার আদেশ দেন (টু লে ডাউন দেয়ার আর্মস অ্যান্ড সারেন্ডার)। ওই সময়টা আমদের জীবনের এক চরম রুদ্ধশ্বাসের মুহূর্ত। আমরা ভেবেছি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করার ঠিক আগে আমাদের ফাইল করে মানে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে সবাইকে একসঙ্গে গুলি করে সাবাড় করে দেবে। তাই আমরা সবাই অজু করে ওই মুহূর্তটির জন্য কাঁপতে-কাঁপতে কলমা পড়ে প্রতিটি পল গুনছিলাম। দেখলাম শেষ পর্যন্ত কেউ আর আমাদের দিকে এলো না। অতঃপর ‘জয় বাংলা’ বলতে-বলতে আমরা সবাই একসঙ্গে
আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। r

(শিকাগো )

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার