এক জীবন বহু গল্প

লেখক:

মাসুদা ভাট্টি

ওরা দুজনে হাঁটেন পার্কে। এখানেই পরিচয়।

পরিচয়-পর্বটা খুব মজার। একদিন ভোরে, বেশ ভোরই বলতে হবে, তখনো কেউ আসেনি পার্কে। দু-একজন সবে আসতে শুরু করেছেন কি করেননি। রেবেকা ভাবছিলেন, এতো ভোরে আসাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। যদিও তিনি ভয় পাচ্ছিলেন বলে মনে হচ্ছিলো না। এমনিই চারদিকে তাকাচ্ছিলেন শুধু।

আর কাওসার ভাবছিলেন, যাক, আজকে একটু দ্রুত হাঁটা যাবে, অন্যদিন দ্রুত হাঁটতে গেলেই সামনে কেউ না কেউ পড়বেই আর তাতে হাঁটার গতি ব্যাহত হয়। ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ নয় তার। তাই ভেতরে ভেতরে একটু আনন্দই হচ্ছিলো।

ঠিক সে-সময়ই খুব কাছেই ধপ্ করে একটা শব্দ হলো, বেশ জোরেই। শব্দটা দুজনেরই কানে গেলো।

দুজনের কেউই কাউকে দেখেননি। পার্কটায় ঝোঁপমতো বেশ কিছু গাছগাছালি। কিন্তু আওয়াজটা দুজনেই শুনেছেন। দুজনেই যেদিক থেকে আওয়াজ শোনা গেছে সেদিকে এগিয়েছেন। একবারে কাছাকাছি গিয়ে রেবেকাই প্রথম দেখতে পেলেন, একটা তাল পড়েছে। তিনি তালগাছের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন, তখনো অন্ধকার, তালগুলো তেমনভাবে ঠাহর হচ্ছে না। আর তখনই দেখতে পেলেন কাওসারকে। এর আগেও এখানে হাঁটতে দেখেছেন, কিন্তু কখনো কথা হয়নি। কাওসারই বললেন, ‘ওহ্ তাই বলুন, তাল পড়েছে। আমি ভেবেছি, এতো সকালে এই পার্কে আবার কী হলো? নিয়ে নিন, তালটা নিয়ে যান। নারকেল দিয়ে তাল রেঁধে চালভাজা দিয়ে খাবেন, দেখবেন দারুণ লাগবে।’

রেবেকা অবাক হয়ে যান, আরে এই ভদ্রলোক কী করে জানলো যে, তাল নারকেল দিয়ে রান্না করে চালভাজা দিয়ে খেতে দারুণ লাগে? তিনি বলেই ফেললেন, ‘আপনি কি পদ্মার ওপারের মানুষ?’

হ্যাঁ, পদ্মার ওপারের না হলে আর এই খাবার কোথায় পাবো বলুন? অনেককাল খাই না, তাল পড়তে দেখে মাথায় এলো, স্মৃতি খুব বাজে জিনিস, মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে পাহারা দেয়। আপনিও কি পদ্মাপাড়ের?

হুম। প্রায়ই দেখি আপনাকে হাঁটতে, কথা হয় না কখনো। আমি এই কাছেই থাকি।

আমিও তাই। আপনাকেও দেখি, কথা বলা হয় না। এদেশে তো ওসবের চল নেই। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা। কথা বলতে চাইলেই হয়, যার সঙ্গে কথা বলতে চাওয়া হয়েছে তিনি রেগে যাবেন, নয় তার আশেপাশের কেউ এসে মার দেবেন।

রেবেকা হেসে ফেললেন। বললেন, আমি ওসব মানি-টানি না। কথা বলতে অসুবিধে কিসে?

তাইতো, কথা বলাতে তো কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এখানে তো হয়। মানুষের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। নিন, তালটা উঠিয়ে নিন। আবার না গো-তালা হয়?

এবারও চমকালেন রেবেকা। এ তো তার দেশের বাড়ির মানুষের ভাষা। গো-তালা মানে যে তাল তেতো হয়। দেখতে হলুদমতো। তাল যদি কালচে আর বড় না হয়, সে-তাল খেতে নেই। ওদের বাড়িতে আর জমির আলে অনেক তালগাছ ছিলো এক সময়। সেগুলো থেকে বেছে বেছে মাত্র কয়েকটি গাছের তালই খেতেন ওরা। বাবা খুব যত্ন করে সেসব তালগাছ লাগিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে বড় হয়েছিল সেগুলো, তাও একেকটি বড় হতে কমপক্ষে আট-নয় বছর তো লেগেইছিল। কিন্তু ওর জন্মের আগে থেকেই তাল ধরা যে-গাছটি ওদের পুকুরপাড়ে, সে-গাছের তাল দিয়েই পিঠা কিংবা তালের হালুয়া আর নারকেল দিয়ে রান্না করে সকালে চালভাজা দিয়ে খাওয়া হতো। এই খাওয়ারও নিয়ম ছিল একটা, প্রথমে আঙুলে তাল ভরিয়ে নিয়ে কুলোয় রাখা চাল ভাজার ওপর লাগিয়ে বুলালে তালের সঙ্গে চালভাজা জড়িয়ে যেতো, তারপর আঙুল মুখে পুরে খাওয়া।

ছোটবেলায় খাবারটা দারুণ লাগতো রেবেকার। আর বারবার তাল জ্বাল দিতে দিতে একেবারে কালচে ক্বাথমতো হয়ে যেতো। এবং তখন আরো সুগন্ধ ছড়াতো। আরেক রকম তালও রেবেকার ভালো লাগতো। প্রথমে পানি মিশিয়ে তালের গোলা জ্বাল দেওয়া হতো, তারপর গামছায় বেঁধে রেখে পানি ঝরিয়ে ফেলা হতো। বেশ কয়েকবার এরকম করে একপাতিল তালের গোলাকে একবাটি করা হতো। তারপর দুধের খিরসার সঙ্গে মিলিয়ে রান্না করা হতো, হালকা চিনি দিয়ে। দীর্ঘদিন থাকতো সে-হালুয়া। এখনো নাকে গন্ধ লেগে আছে তার। এক লহমায় রেবেকার সব মনে পড়ে যায়। আর এসব মনে পড়তে পড়তে আরো মনে পড়ে যে, একাত্তরে ওদের বাড়িতে যখন আগুন দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা, তখন সেই তালগাছটিও পুড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পরে আর বাঁচেনি ওটা। এখনো চোখ বুজলে তালগাছটি দেখতে পান রেবেকা। আর প্রায় তিন মাইল দূর থেকে ওদের বাড়ি চেনার জন্য তালগাছের দাঁড়িয়ে থাকাটাই ওদের কাছে ছিল চিহ্নের মতো।

পার্কের ঘাসে পড়া তালটি হাতে তুলে নেন রেবেকা। তারপর বলেন, নাহ্ একেবারে হলুদ নয়, একটু কালচে মতো আছে। মনে হয় না গো-তালা হবে। দেখা যাক। আপনি তো প্রতিদিনই আসেন হাঁটতে, তাই না?

হুম, আসি। কেন বলুন তো?

না, এই তালে তো আপনারও ভাগ আছে। রান্না করে আপনাকেও দিতে চাই একটু। চালভাজাও সঙ্গে দেবো, ভাববেন না। বাড়ির গাছেই নারকেল আছে। ভাবছি, আজকেই রেঁধে ফেলবো। তালটাও মজে গেছে বেশ।

আপনাদের বাড়িটা বোধহয় আমি চিনতে পেরেছি। এই এলাকায় এখনো নারকেল গাছওয়ালা বাড়ি একটি বা দুটিই আছে। ধরেই নিচ্ছি সামনের দুটো গলি পরেই যে-গলিটা, তার নয় নম্বর বাড়িটা আপনার, তাই তো?

একদম ঠিক। আপনি দেখি এলাকাটা একেবারে চোখ-বন্ধ অবস্থায়ও চেনেন।

এটা আসলে অভ্যেস। একাত্তরে তৈরি হয়েছিল। আমার খ্যাতি ছিল একবার কোথাও গেলে সেই এলাকার ম্যাপ তৈরি করা। নির্ভুল ম্যাপ করতে পারতাম আমি। এখনো পারি।

আপনি মুক্তিযোদ্ধা?

হুম, মুক্তিযোদ্ধা। ওই একই পরিচয়ই আছে দেবার মতো। বাকি আর কোনোটিই দাঁড়ায়নি। বলতে পারেন ব্যর্থ হয়েছি, কেবল ওই একটি জায়গাতেই সফল। দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি।

এটাই তো আসল ও সত্যিকার পরিচয় হওয়া উচিত। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কিসে বলতে পারেন? – বোধ করি কথাটি রেবেকা একটু জোরেই বলে থাকবেন। কিংবা কথাটির মধ্যে ঝাঁঝও থেকে থাকবে। কাওসার একটু হাসলেন। তারপর বললেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার নিশ্চয়ই কোনো খেদ আছে, তাই তো?

এবার রেবেকা আর দাঁড়ালেন না। কথা বদলে বললেন, কাল-পরশু কোনো একদিন তাল নিয়ে আসবো। তখন দেখা হবে। সেদিনকার মতো হাঁটা বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরলেন তাল হাতে করে। ততোক্ষণে পার্কেও লোকজন আসতে শুরু করেছে। বাড়ি ফিরেই রেবেকা দেখলেন, বারান্দায় হামিদুর রহমান বসে আছেন। অন্যদিন অতো সকালে তিনি ওঠেন না। ওঠা মানে তো ওই চাকা-লাগানো চেয়ারটায় এই সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটটাতে ঘুরেফিরে বেড়ানো আর রেবেকাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা। আজও তিনি রেয়াত দিলেন না রেবেকাকে। বললেন, ‘এতো তাড়াতাড়ি ফিরলে যে? হাতে ওটা কী? কে দিলো? নাকি পয়সা দিয়ে তাল কিনে আনলে? গ্রাম্যতা আর গেলো না তোমার?’

একসঙ্গে এতোগুলো প্রশ্ন, রেবেকা কোনোটারই উত্তর দিলেন না। বললেন, বেলের শরবতটা দিয়েছে বকুল? দেখলেন বারান্দার টেবিলে বেলের শরবতের গ্লাসটি নেই। তিনি রান্নাঘরের দিকে গেলেন বকুলকে ডাকতে। দেখলেন, বকুল শরবত নিয়ে বারান্দার দিকেই যাচ্ছে। দিনটা এভাবেই শুরু হয়। অন্যদিন পার্ক থেকে ফেরার পরে, আরো অন্তত ঘণ্টাখানেক পর। আজ একটু তাড়াতাড়িই। প্রথমে বেলের শরবত, যা না খেলে হামিদুর রহমানের পেট পরিষ্কার হয় না। দীর্ঘকাল ধরেই সারা বছর ঘরে বেল রাখতে হয়। আগে একবারে কিনে রাখা হতো ফ্রিজে, এখন তো ফলের দোকানগুলিতে সারা বছরই পাওয়া যায়।

বেলের শরবতের পর টয়লেট করানো, গা মুছিয়ে দেওয়া এবং তারপর চা, নাশতা। একেকদিন একেক রকম। যখন চাকা-লাগানো চেয়ারে বসার মতো অবস্থা ছিল না, দিব্যি সুস্থ মানুষটি ছিলেন হামিদুর, তখনো সকালটা তটস্থ থাকতে হতো রেবেকাকে। বিয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত এখনো এই তটস্থ হয়ে থাকাটা বদলাতে পারলেন না তিনি। ছোটখাটো ব্যাপারেই রেবেকাকে কথা শোনাতে ছাড়েন না তিনি। এ-জীবনে কোনোদিনও হামিদুরের মুখ থেকে প্রশংসা শুনেছেন বলে মনে করতে পারেন না রেবেকা। বিয়ের পর প্রথম প্রথম স্বামীরা কতো আদর-সোহাগের কথা বলেন বলে শুনেছেন, কিন্তু কই হামিদুর তো কিছুই বলেননি কোনোদিন? এমনকি বিয়ের রাতেও নয়। আসলে বিয়েটাই তো হয়েছিল এক ভয়ংকর অবস্থার ভেতর।

রেবেকাদের গ্রাম থেকে দুটি গ্রাম পরেই হামিদুরদের গ্রাম। হামিদুরের বাবা আবদুর রহমান আর রেবেকার বাবা শওকত আলম একসঙ্গে লেখাপড়া করেছেন। পিটিআই পাশ করে শওকত আলম স্কুলশিক্ষক হয়েছিলেন আর আবদুর রহমান সরকারি চাকরি নেন। রেবেকার তখন কুড়ি বছর বয়স। তখনই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। রেবেকার বড়ভাই মজনু যুদ্ধে গেলো। আর হামিদুর তখন করাচি থেকে পাশ করে ফিরেছে। আবদুর রহমানের সে কী দাপট এলাকায়। মিলিটারি আসার আগেই বহু মানুষ গিয়ে তার কাছে শরণ চাইলো। আত্মীয়-স্বজনদের অভয় দিয়ে শান্তি কমিটিতে নিয়ে নিয়েছিলেন আবদুর রহমান। এলাকার অনেকেই শান্তি কমিটিতে গেলেও শওকত আলমকে নিলেন না তিনি। যার ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে তাকে কীভাবে শান্তি কমিটিতে রাখা যায়। কিন্তু এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব তিনি পাঠালেন শওকত আলমকে। পাকিস্তানি মিলিটারির হাত থেকে রেবেকাকে বাঁচাতে হলে হামিদুরের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব তিনি দিলেন। বাল্যবন্ধুর জন্য এটুকুই তিনি করতে পারবেন, এর বেশি কিছু নয়। গ্রামের মান্যগণ্য অনেকেই শওকত আলমকে বুঝিয়েছিলেন তখন, এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর হয় না। জীবন বাঁচানো ফরজ। এমন ভয়ও দেখিয়েছিলেন যে, বিয়ে না দিলে হয়তো আবদুর রহমানই মিলিটারি দিয়ে মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবেন। তখন? তখন কী হবে?

সেই ভয়াবহ সময়ে আবদুর রহমান ছেলের জন্য কেন রেবেকাকে পছন্দ করেছিলেন, তা আজো রেবেকার কাছে বিস্ময়ের। করাচি থেকে ফেরা ছেলেকে তিনি যেখানে চাইতেন সেখানেই বিয়ে করাতে পারতেন। কেন রেবেকাকে বেছে নিলেন কে জানে? কিন্তু হামিদুর প্রথম দিন থেকেই রেবেকাকে পছন্দ করেনি, আবার বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার মতো ক্ষমতাও তার ছিল না। তবে একটা শর্ত হামিদুর দিয়েছিলেন, রেবেকা আর কোনোদিন বাপের বাড়ি যাবে না, ওই বাড়ির সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না। কারণ, পাকিস্তানের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কই রাখতে চান না তিনি। নিজেদের বাড়িতে রেবেকা জেনেছিলেন স্বাধীনতার আর দেরি নেই, আর ওই বাড়িতে গিয়ে রেবেকাকে বোঝানো হয়েছিল, পাকিস্তান ভাঙা কাছামারা বাঙালির পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হবে না।

শওকত সাহেব মেয়েকে বিয়ে দিয়ে নিজে বাঁচতে চেয়েছিলেন কি-না রেবেকা জানেন না, কিন্তু রেবেকাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা যখন আবদুর রহমানের বাড়ি ঘেরাও করেছিল তখন এই রেবেকার জন্যই হামিদুরের কিছু হয়নি। তবে আবদুর রহমানের লাশ পাওয়া গিয়েছিল ঘোড়াডাঙার বিলের ভেতর। আর শওকত আলম স্বাধীনতার পর আর কথাই বলেননি কারো সঙ্গে, ক্রমশ শুকিয়ে গিয়েছেন, আটকে গিয়েছেন নিজেরই ভেতর। মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই তিনি মারা যান। মজনু তখন সংসারের ভার নিয়েছেন। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রেবেকার সঙ্গে আর যোগাযোগই করেননি। রেবেকা বুঝতে পারেননি, তার দোষ কোথায়? তিনি তো আর নিজের ইচ্ছেয় হামিদুর রহমানকে বিয়ে করেননি? কিন্তু মনকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, প্রবোধ দিয়েছেন এই ভেবে যে, একটা যুদ্ধ কতো মানুষের জীবন যে কতোভাবে বদলে দিয়েছে, তার কি ঠিক আছে? তিনি মেনে নিয়েছেন সবকিছু, এমনকি একটি অসম্ভব অসম্মানের জীবনও।

হামিদুর গ্রামের পাট চুকিয়ে দিয়েছিলেন কিছুদিনের মধ্যেই। সব বিক্রিবাটা করে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। এমনিতেও গুলশানের এই বাড়িটা আগেই বরাদ্দ দেওয়া ছিল আবদুর রহমানের নামে। তখনো বাড়ি করা হয়নি, কিন্তু বাড়ি উঠতেও দেরি হয়নি। রেবেকার দুই ছেলেমেয়ের জন্মই এ-বাড়িতে। এই বাড়ির মতোই তারাও রেবেকার আপন হয়নি এখনো। বাবার মতোই ওরা আজো রেবেকাকেই দায়ী করে দাদার মৃত্যুর জন্য, পাকিস্তান ভাঙার জন্য; হামিদুরের মতোই রেবেকাকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের গালি দিয়ে, তাদের বিরুদ্ধে নোংরা কথা বলে।

আর তখন তো সারা দেশেই মুক্তিযুদ্ধ নির্বাসনে চলে গিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই দুর্বৃত্ত বলে গালি খেতো, তাও প্রকাশ্যেই। আর হামিদুর তো ততোদিনে নতুন রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে গিয়েছিলেন। তাই তো ঘরের ভেতর অসম্মানিত হলেও খুব একটা কষ্ট পেতেন না রেবেকা। মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের জন্য দিনের মধ্যে সতেরোবার তাকে কথা শুনতে হতো। ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত কথায় কথায় খোঁচা দিতো।

কী করতে পারতেন তিনি? চলে যেতে পারতেন? কোথায় যেতেন? কার কাছে যেতেন? লেখাপড়া তো সামান্যই, স্কুল পেরিয়েছিলেন কেবল। মুখ বুজে থাকতেন, ছেলেমেয়েদের আর ওদের বাবার পছন্দ-অপছন্দগুলো প্রাধান্য দিয়ে দিনমান কাজের ভেতরই ডুবিয়ে রাখতেন নিজেকে। তারপর ওরা বড় হলো, মেয়ের বিয়ে হলো, তাও হামিদুরের এক বন্ধুর ছেলের সঙ্গে। ছেলে বিদেশে পড়তে গেলো। মেয়ের জামাই তো আগেই থাকতো বিদেশে, মেয়েকেও নিয়ে গেলো। এক প্রকার ভালোই হয়েছিল ছেলেমেয়েদের বাইরে চলে যাওয়াটা। তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন অপমান আর খোঁচার হাত থেকে। কিন্তু হামিদুরকে নিয়ে পড়েছিলেন বিপাকে। হঠাৎই হামিদুর রহমানের একটা মাইল্ড স্ট্রোক হলো, চলাফেরায় অসুবিধে হতে শুরু হলো। আর তারপর যেন আরো খেপে গেলেন হামিদুর। যেন এর দোষও রেবেকারই। চাকা লাগানো চেয়ারে বসে তাকে অপমান করার সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই হাতও তোলেন রেবেকার গায়ে। এই বয়সে এসে এতোটা সহ্য করার ক্ষমতা রেবেকা কীভাবে অর্জন করেছেন, সেটা ভেবে নিজেই আশ্চর্য হন খুব। এই যে, সকালে হাঁটতে বেরোন তিনি, তার জন্যও তাকে কথা শুনতে হয়। রেবেকার শরীর কেন ভালো, কেন তিনি এই বাষট্টি বছরেও বুড়িয়ে যাননি, তার দোষও রেবেকারই। ভালো লাগে না আর।

কিন্তু রেবেকা এই সকালে হাঁটতে যাওয়াটা বন্ধ করেননি। তিনি এই ভোরেই সারা দিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে আনেন। এটাই তার একমাত্র প্রতিবাদও হয়তো। দুদিন পরে কাওসার সাহেবের জন্য তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন তাল রেঁধে। ভাগ্যিস, তখনো হামিদুর ঘুমিয়ে ছিলেন। নইলে অনর্থ হতো নিশ্চিত। চাল ভেজেও নিয়েছিলেন। কাওসারের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আশা করি ভালো লাগবে। ডায়াবেটিস নেইতো আবার? তাহলে কম খাবেন।’

নাহ্, ওসব বড়লোকি রোগ আমাকে ধরেনি। আসলে পরিবারের কারোরই ছিল না। এদিক দিয়েও বেঁচে গেছি। আপনার আছে নাকি?

না, আমারও নেই।

তাহলে তো বেঁচে গিয়েছেন খুব।

হুম, তা বলতে পারেন।

পরদিন, রেবেকার রান্না করা তালের প্রশংসা হাঁটতে হাঁটতেই করেছিলেন কাওসার। এরপর থেকে প্রতিদিনই দুজনে একসঙ্গে হাঁটেন, নানা বিষয়ে কথা নয়। ঝড়, বৃষ্টি, শীত, গ্রীষ্ম – প্রতিদিনই ভোরে তাদের দেখা হয়। পরিচয়ের কালটা প্রায় বছরদুয়েক হতে চললো। এখন দুজনেই দুজনের অনেক গল্প জানেন। অনেক কথাই বলা হয়, অনিচ্ছাতেও। অন্তত রেবেকা না চাইলেও বলে ফেলেন অনেক কিছুই কাওসারকে। কাওসারও লুকোন না কিছুই। দিন শুরুর এই ভোরে দুজন বয়স্ক মানুষ হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের জীবনের গল্প বলাটা নিশ্চয়ই দোষের কিছু নয়, তাই গল্প থেকে তারা কখন যে দুজন দুজনের জীবনে ঢুকে যান, টেরও পান না। তাইতো যেদিন রেবেকা বাড়ি থেকে মন খারাপ করে আসেন, সেদিন কাওসার অনেক চেষ্টা করেন রেবেকাকে হাসাতে, হাল্কা করে তবে বাড়িতে ফেরত পাঠাতে। রেবেকাও ফেরেন আগের দিনের সব গ্লানিকে পার্কে ফেলে রেখে।

কিন্তু ফিরে এসে সেই অপমানের সংসার। তাও যদি ব্যক্তিগত অপমান হতো, তাহলে কোনো কথা ছিল না। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা শাহবাগে যুদ্ধাপরাধের ফাঁসির দাবিতে দাঁড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও হামিদুর রহমান আর তার ছেলেমেয়েরা নোংরা কথা বলেন। ফোনে ওদের কথা শুনতে পান রেবেকা। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই ওদের গালি দেন হামিদুর রহমান।

রেবেকা মনে মনে ভাবেন, এরা কোনোদিন বদলাবে না? হামিদুর রহমান না-হয় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পক্ষের। কিন্তু ছেলেমেয়েরা তো এদেশেই জন্মেছে, রেবেকারই গর্ভে। ওরা কেন এরকম হলো? কেন হামিদুরের মতোই ওরাও মুক্তিযুদ্ধ শব্দটিকেই আঘাত করতে চায় সব সময়? কী করে বাবার কাছ থেকে রিলে রেসের মতো ছেলেমেয়েদের কাছেও পৌঁছে গেলো এই কদর্যতা? রেবেকা শুধুই অবাক হন। আজকাল অবশ্য অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তও হন খুব। আর ভালো লাগে না তার এই পরিবেশ, এই অপমান, নিজের, দেশের এবং মুক্তিযুদ্ধের। কষ্ট হয়, আর কষ্টের সঙ্গে এক অসহায় রাগও হয় তার।

এরই মধ্যে এক সকালে একটি ছেলে এলো বাড়িতে। অপরিচিত, কিন্তু ছেলেটি দেখতে বেশ। টানা টানা চোখ, কোঁকড়া চুল, গায়ের রং শ্যামলা, এক সময় উজ্জ্বল ছিল বোঝা যায়। বয়স কতো হবে? ত্রিশ পেরিয়েছে হয়তো। তিনি তখনই মাত্র ফিরেছেন পার্ক থেকে। সেদিনও অনেক কথা হয়েছিল কাওসারের সঙ্গে। কোনোদিন যে-প্রশ্ন কাওসার করেননি, সেদিনই করেছিলেন রেবেকাকে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, এতো অপমান সইছেন কেন?  বেরিয়ে গেলেই পারেন? রাস্তায়ও তো মানুষ বাঁচে, কি বাঁচে না? রেবেকা তখনই কোনো উত্তর দেননি, ফিরতে ফিরতে ভেবেছিলেন কথাটা। একটু বেখেয়ালি ছিলেন বলেই ধরতে পারেননি, নইলে এই ছেলেকে দেখে রেবেকা চিনবেন না, তা হওয়ার কথা নয়। মজনুর মুখটি কেটে বসানো এই ছেলের মুখে। নিজের ভেতর ফিরে আসতেই চিনেছিলেন ছেলেটিকে এবং এও বুঝেছিলেন যে, কোনো ভালো খবর নিয়ে ও আসেনি।

হ্যাঁ, মজনু মারা গিয়েছেন, সে-খবরই দিতে এসেছে ও।  রেবেকা ভাবছিলেন কী করবেন? তখনই বাড়িতে হাঁক-ডাক পড়ে গেলো, হামিদুর রহমান উঠেছেন। তার দৈনন্দিন জীবন শুরু হলো, রোজকার মতো রেবেকাকে গালি দিয়েই। ছেলেটাও সব শুনছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। রেবেকা মরমে মরে যেতে যেতে কেমন যেন কঠিনও হয়ে গেলেন। ওকে বসতে বলে ভেতরে গেলেন।

অ্যাতো চেঁচাচ্ছো কেন? একটু তো শান্তিতে থাকতে দাও? শরবত দেয়নি বকুল? এই বকুল, শরবত এনে দে। তিনি রান্নাঘরের দিকে এগুলেন। হামিদুর তখনও চেঁচিয়ে যাচ্ছেন। রোজকার মতো বকুলও শরবত নিয়ে হামিদুরের ঘরের দিকে যাচ্ছে। ঠিক তখনই রেবেকার মনে কথাটা এলো। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মজনু দাদার ছেলের সঙ্গেই বেরিয়ে পড়বেন। তার আগে ছেলে বা মেয়েকে ফোন করে জানিয়ে যাবেন যে, তিনি যাচ্ছেন। বকুল তো থাকলোই, ও জানে হামিদুরের জন্য কী করতে হবে। তিনি ঘরে ঢুকে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলেন। নেওয়ার মতো কিছুই নেই। এই সংসারে তার খুব বেশি কিছু নেইও। প্রতিদিনকার ব্যবহার করা কিছু জিনিসপত্র ছাড়া নিজের বলতে আর কী আছে? ভাবতেও ইচ্ছে হলো না রেবেকার। সময় লাগলো না খুব একটা। ব্যাগ গুছিয়ে তিনি ফোন করলেন, এ-বাড়িতে প্রতি কামরাতেই ফোন আছে। ছেলে ধরলো না। মেয়ে ধরেই বললো, এতো রাতে কী ব্যাপার বাবা? ধরেই নিয়েছে, বাবা ফোন করেছে, কারণ রেবেকা কখনোই ওদেরকে ফোন করেন না। বললেন, বাবা নয়, মা। আমি চলে যাচ্ছি। তোমাদের বাবাকে বকুল দেখাশোনা করতে পারবে। আর না পারলে তোমরা এসে দেখাশোনা করো। মেয়ে প্রথমে বুঝতেই পারছে না, এমনভাবে উত্তর দিলো। কী বলছো তুমি এসব? কোথায় যাবে তুমি? মনে হলো, একটু হাসছেও। রেবেকা কিছুই পাত্তা দিলেন না। ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। তারপর ব্যাগ হাতে বেরুলেন। ছোট্ট ব্যাগটা খুবই হাল্কা।

হামিদুরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। গ্লাস থেকে বেলের শরবত খাচ্ছিলেন তিনি। লক্ষ করেননি হাতের ব্যাগটি। রেবেকা বললেন, ‘মজনু দাদা মারা গেছেন। ওর ছেলে এসেছে আমাকে নিতে। আমি ওর সঙ্গে যাচ্ছি।’ মনে হলো হামিদুর বিষম খেলেন। গ্লাসটা হাতে ধরা তখনো। বকুল তাকিয়ে আছে তার দিকে। হামিদুর গ্লাসটা নামাতেও বোধহয় ভুলে গেছেন। রেবেকা দাঁড়ালেন না আর। বেরুতে বেরুতে হামিদুরের চিৎকার শুনতে পেলেন। গালির তুবড়ি ছুটছে মুখে। মজনু দাদার নামেও গালি দিচ্ছে লোকটা। কিন্তু রেবেকা সে জন্য কিছুই মনে করলেন না, অনেকই তো শুনেছেন। আর তো শুনতে হবে না। তিনি বসার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘চল’। ছেলেটি এই শব্দটির জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করছিলো। তাড়াহুড়ো করে দাঁড়াতে গিয়ে, এগুতে গিয়ে পাশের টেবিল থেকে কী যেন ফেলে দিলো। কিন্তু তারপরও না থেমে এগিয়ে এলো। দরোজা খুলে দুজনে বেরুলেন। ছেলেটি রেবেকার হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে নিলো। লিফ্ট দিয়ে নামতে নামতে রেবেকা ভাবলেন, একবার কাওসারকে জানিয়ে যাবেন কি-না? লিফ্ট নিচতলায় থামার আগেই মনে হলো, মোবাইল নাম্বার তো আছে তার খাতাটায়। কোনো না কোনো সময় জানিয়ে দিলেই হবে। তিনি ব্যাগটার দিকে তাকালেন একবার, খাতাটা নিয়েছেন তো? মনে করার চেষ্টা করলেন। তারপর ছেলেটাকে বললেন, একটা রিকশা ডাকো তো। বাইরে তখন রোদের রং দিনের মতো।

শেয়ার করুন

Leave a Reply