কবি আবুল হোসেন ও তাঁর ভাবনায় কবি বুদ্ধদেব বসু

লেখক:

শ্যামল চন্দ্র নাথ
আবুল হোসেন শুধু বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে নন, দু-বাংলার কবিদের মধ্যে বায়োজ্যেষ্ঠ। আবুল হোসেন চল্লিশের দশকের অন্যতম কবি। তিনিই প্রথম আধুনিক কবিতা লেখেন ওই সময়ে। প্রায় ৯০ বছর সময় অতিক্রান্ত করে দিলেন। বাংলা কবিতাকে নিয়ে এসেছেন এক বিশেষ আধুনিকতায়। নববসন্তের  মধ্যে দিয়ে এই যাত্রা শুরু।
কবিতাকে তিনি মানুষের জীবনের বসন্ত বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ কবির কাছ থেকে বসন্ত কোনোদিনই চলে যাবে না। একটি কবিতার সঙ্গে অন্য কবিতার মিল না থাকাই ভালো। যা লিখতে হবে তা যেন আলাদা হয়, মানে অন্যদের চেয়ে। না হলে কবি হওয়া যাবে না। তিনি বহুবার বলেছেন, ‘একটি কবিতা আমি বহুবার লিখি, বহুদিন ধরে লিখি। এক একটি শব্দ, এক একটি চরণ আমি মনের মধ্যে বহুবার ভাবি, আওড়াই। সাহিত্যকর্মকে অন্যান্য সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ডের সঙ্গে তুলনীয় হলে চলবে না। সাহিত্যের উন্নতির জন্য সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। ভালো লেখক হতে হলে অবশ্যই লেখাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে হবে। কেবল নেশাতে চলবে না। লেখার ব্যাপারে নির্মম হতে হবে, কোনো শিথিলতা চলবে না। নিজের কথা নিজের মতো করে বলতে হবে। পুনরাবৃত্তি চলবে না।’ এই ছিল আবুল হোসেনের আরাধ্য এবং বক্তব্য। এখনো অতৃপ্তি রয়ে গেছে লেখা নিয়ে যে, এর চেয়ে ভালো লেখা যেত না! কিংবা এর চেয়ে ভালো লেখা যায় না।
প্রায় এক বছর হলো তাঁর সঙ্গে আমি নিয়মিত দেখা করি। জানতে চাই বাংলা সাহিত্যের নানা ঘটনা এবং তাঁর সম্পর্কে। কিছুদিন আগে জানতে চেয়েছি কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে । কবি আবুল হোসেন বলেন, ‘তিনিই বাংলাসাহিত্যে প্রথম আধুনিক কবিতা লেখেন। আমার সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে। অসাধারণ এবং ভালো কবি। আমাদের সবাইকে তিনি আধুনিক কবিতা লেখার জন্য বলেন। এক কথায় তিনি আমাদের পথ দেখান।’ তিনি বাংলা এবং ইংরেজি Ñ দুই সাহিত্য-সম্পর্কে ব্যাপক জানতেন। জানার পরিধি, লেখার বিস্তৃতি, ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। পদ্য যেমন লিখতেন, গদ্যেও ছিলেন অনন্য। তাঁর কবিতায় নানা আঙ্গিক, রুচি, রসবোধ এবং প্রাজ্ঞতা ছিল, যা নিয়ে কবি আবুল হোসেনও ভেবেছেন। তবে কেউই রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত ছিলেন না। তবু ত্রিশের দশকের কবিরা কবিতায় অনেকটা নতুন পথ ধরেছিলেন। কিন্তু আমাদের কবিতাকে বিশ্বমানে পৌঁছাতে এখনো অনেক সময় লাগবে। ভালো লেখার জন্য ভালো রুচি দরকার। রুচিবোধ ছাড়া অনেক কিছুই অসম্ভব। কিন্তু কবিতার মান পড়ে গেলে পাঠকসংখ্যা কমে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আবুল হোসেন প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন ১৯৩৯ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘সৈনিক’ নামে কবিতার মধ্যে দিয়ে। পরে ওই কবিতাটির নামও বদলে দেন কবি। ওই কবিতার নাম দেন ‘ঘোড়সওয়ার’; কবিতাটি একাধিকবার পুনর্মুদ্রিত হয় তখন। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। যদিও তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ক্লাস এইটে। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েটে পড়ার সময়। আর প্রথম প্রবন্ধ লিখেন ‘গদ্যকবিতা ও রবীন্দ্রনাথ’ নামে ১৯৩৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনে। এরপর ১৯৩৮ সালে ‘গদ্য কবিতা ও তার ছন্দ’ নামে প্রবন্ধে তিনি গদ্যকবিতার বিরুদ্ধে বলেন; কিন্তু এর অব্যবহিত পরে তিনি গদ্যকবিতা লেখা শুরু করেন। এরপর ১৯৪০ সালে কবিতাগ্রন্থ নববসন্ত বের হয় মুক্তধারা থেকে, যা কিনা উৎসর্গ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।  ওখানে ‘বাংলার মুখ’ নামক কবিতায় তিনি লেখেন Ñ
সব প্রথমেই দিয়ে রাখি পরিচয়। তার মানে এটা নয়, এটাই সুবিধা, এতে সংশয় নেই; বরং ব্যাপার উলটো একেবারেই অর্থাৎ কিনা নামটা না দিলেই ছিল ভালো। কারণটা নয় মোটেই ঘোরালো। বাঙালি মেয়ে দোয়াত কলম আর কালি হাতে পেয়ে প্রকাশ্যে কোনো পত্রিকাতে আপন জবানবন্দী ছাপাতে শুরু করে দেবে, এতখানি নীচে নেমে আসবে এ দেশী মেয়ে!
এরপর প্রেমে পড়া। যদিও সে-প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। কিন্তু  ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ৩০-৩২টি কবিতা ‘মেহেদির জন্য’ সিরিজে লেখা হয়েছে। পরে এটি প্রেমেন্দ্র মিত্র-সম্পাদিত প্রেম যুগে যুগে কবিতায় সংকলিত হয়। এরপর নানা কারণে তথা দেশভাগ এবং পাকিস্তানি শাসনামলে সাহস করে ছাপা হয়নি কোনো বই। প্রায় ৩০ বছর কোনো বই বের হয়নি। ১৯৬৯ সালে বের হয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বিরস সংলাপ। ওই সময়ে লিখেছিলেন বহু কবিতা যার বেশির ভাগই ছাপা হয় পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায়। যদিও তখন তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চেয়েছেন। এরও ১৩ বছর পর বের হয় হাওয়া, তোমার কি দুঃসাহস কবিতাগ্রন্থটি। হাওয়া, তোমার কি দুঃসাহস কবিতায় তিনি লেখেন Ñ
হাওয়া, তোমার কী দুঃসাহস,
হাজার নিষেধ, ঘোর অভিশাপ
কিছুই পারল না আটকাতে,
ঘাড় বেঁকিয়ে দিয়েছ ঝাঁপ
অন্ধকারে, পোষ-না-মানা
অবাধ্য এক ঘোড়ার মতো।
হিসেব কিছু ক’রেছিলে
কি করনি নাই তো জানা।
তিন বছর পর আবার বের হয় প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহার মুক্তধারা থেকে কবিতাগ্রন্থ দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে। ওই চিত্তরঞ্জন সাহাই আবুল হোসেনের প্রথম বই ছাপেন। যিনি কিনা প্রথম বাংলা একাডেমী চত্বরে বইমেলার আয়োজন করেন স্বাধীন বাংলাদেশে।  একাকিত্ব কীভাবে মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায় তারই প্রতিচ্ছবি ‘যার যে পথ’ কবিতায় :
আমি প্রায় একা।
নিঃসঙ্গই বলা যায়।
একদিন একসঙ্গে
আমরা যারা বেরিয়েছিলাম
হাঁটতে
তাঁদের কেউ কেউ রাস্তার
নির্জনতায়
ভড়কে গিয়ে এগোয় নি আর।
সেই ১৯৯৪ সালে স্ত্রীকে হারিয়ে নিজের ভেতর আরো একাই বোধ করছেন।
এরপর ১৯৯৭ সালে এখনও সময় আছে, ২০০০ সালে আর কিসের অপেক্ষা, ২০০৪ সালে রাজকাহিনী, ২০০৭ সালে ব্যঙ্গ কবিতা, ২০০৮ সালে কালের খাতায় ও আবুল হোসেনের প্রেমের কবিতা নামে কাব্যগ্রন্থ এবং সর্বশেষ লেখেন অপরাহ্ণের স্মৃতি নামে স্মৃতিকথা, যা আগামী বইমেলায় বের হবে। সৌভাগ্যক্রমে ওই লেখার প্র“ফ এবং লেখাটি পড়ার সুযোগ আমি পেয়েছি। এখন লেখালেখি বন্ধ। লিখতে পারেন না আমাদের এই প্রবীণতম কবি। যিনি কবিতা ছাড়াও প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ সাহিত্য, শিশুসাহিত্যে অবদান রেখেছেন। এছাড়া ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ এই স্লোগানের উদ্ভবকর্তাও তিনি, যা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বারবার এই কবির কাছে যাই আর ভরা বুক নিয়ে বিদায় নিই।

আমি নাম বলতে পারবো না…
আবুল হোসেনের সাক্ষাৎকার

আবুল হোসেন আমাদের জ্যেষ্ঠতম কবি ও লেখক। জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯২২ সালে খুলনা জেলায়। স্কুলের লেখাপড়া কৃষ্ণনগর ও কুষ্টিয়ায়, এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।  ১৯৪০ সালে প্রথম বই নববসন্ত বের হয়। প্রথম জীবনে রচিত ‘ঘোড়সওয়ার’, ‘বাংলার মেয়ে’ প্রভৃতি কবিতা তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। প্রায় ৩০টির মতো গ্রন্থ লিখেছেন। এই ভূখণ্ডের মানুষকে কবিতার সঙ্গে যুক্ত করার ঐতিহাসিক দ্বায়িত্ব পালনে তিনি এক কবি পথিকৃৎ। তিনি বহু সংবর্ধনা ও পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে আছে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩) ও একুশে পদক (১৯৮০)।
তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শ্যামল চন্দ্র নাথ।
শ্যামল : আপনার প্রথম লেখা ও শেষ লেখা কবে প্রকাশিত হয়?
আবুল হোসেন : প্রথম লেখা কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে পড়া অবস্থায়। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনে। এরপর শেষ লেখা সমকালে ২০০৮ সালে। আমার লেখা স্মৃতিকথা ‘অপরাহ্ণের স্মৃতি’। এবার বের হবে বইমেলায়।
শ্যামল : কবিতায় দশক বিভাজনরীতি কি আপনি স্বীকার করেন?
আবুল হোসেন : করি, আবার করিও না। কবিতার আন্দোলন কোনো কিছু মেনেই চলে না। এক দশকে হয়তো কাউকে পাওয়া যেতে পারে। যেমন Ñ বাংলা কবিতায় ঘটেছিল ত্রিশের দশকে। এরপর অনেকদিন কিছুই ঘটল না। এই শতাব্দীর প্রথম অথবা চল্লিশ কি পঞ্চাশ দশকে তেমন কিছু ঘটেনি। বিশের কবি নজরুল ইসলামকে কেউ দশকওয়ারি বিভাগে ফেলে আলোচনা করেননি। জসীমউদ্দীনের দশক কোনটা?
অথচ নজরুল এবং জসীমউদ্দীন দুজনই বাংলা কবিতায় তাদের বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখে গেছেন।
শ্যামল : চল্লিশের দশকে আপনার সমকালীন কবিদের মধ্যে কে বা কারা আপনার বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ?
আবুল হোসেন : সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় অবশ্যই। তারা অনেক ভালো লিখেছেন। আমার মনে হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
শ্যামল : আপনার কবিতায় কথ্যরীতির ব্যবহার দেখতে পাই কিন্তু কেন?
আবুল হোসেন : কাব্যিকপনাকে আমি ঘৃণা করি। কারণ বাংলায় একটা কাব্যিক ভাষা গড়ে উঠেছিল, যা সাধারণ মানুষের ভাষা থেকে অনেকখানি ভিন্ন। আমি এই কৃত্রিমতাকে বর্জন করতে চেয়েছি। কবিকে আমি বিশেষ জীব বলে কখনো ভাবিনি। কবিও সমাজের অন্যান্য লোকের একজন। যে-প্রেরণায় একজন লোক ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয় ঠিক একই প্রেরণায় কেউ কবি বা সাহিত্যিক হন। যে-ভাষায় আমরা ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, অফিস কিংবা আদালতে কথাবার্তা চালাই আমি সে-ভাষায় সারাজীবন লেখার চেষ্টা করেছি। আমি নিজের পথটা খুঁজতে চেয়েছিলাম। কাব্যের একটা প্রচলিত ভাষা আছে, যে-ভাষায় বা রীতিতে লিখলে সহজেই কবিখ্যাতি পাওয়া যায়, কিন্তু সেই সোজা সড়কে চলতে আমার ইচ্ছে হয়নি। অনেক পাঠক ভাবেন আমি কেবল গদ্যকবিতা লিখি। যদিও আমার গদ্যকবিতা খুব কম। কথ্যরীতি ব্যবহার করে বাংলা কবিতা ক্রমেই সাধারণ লোকের কাছাকাছি আসতে পারবে। তাই আমি কথ্যরীতির প্রতি মনোযোগ দিয়েছি।
শ্যামল : আপনার সাহিত্যিক ঋণ কাদের কাছে আছে বলে আপনি মনে করেন?
আবুল হোসেন : ঋণের কোনো শেষ নেই। বাংলা ও ইংরেজি কবিতার একটা বড় অংশের কাছে আমি ঋণী। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র, ডক্টর সুবোধ সেনগুপ্ত, তারকানাথ সেন, ডক্টর রাধাগোবিন্দ বসাকসহ আরো অনেকেই রয়েছেন। এখন মনে পড়ছে না। এছাড়া সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা, যাঁর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, সাহিত্যালোচনায় কাটিয়েছি। কিন্তু আমি সবচেয়ে ঋণী আবু সয়ীদ আইয়ুবের কাছে। তাঁর কাছে পেয়েছিলাম রুচি।
শ্যামল : রবীন্দ্রনাথকে আপনি প্রথম কবে দেখেন এবং প্রথম কথা হয় কীভাবে?
আবুল হোসেন : সেটা ১৯৩৮ সালের দিকে, শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে। তখন কথাবার্তা হয়নি। দূর থেকে দেখেছিলাম। এরপর ১৯৪০ সালে, তখন আমার সঙ্গে ছিল সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র। আমি ওখানে সম্ভবত ইংরেজি কবিতা সম্পর্কে বলি। আমার ভাষণটা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছিল। ওইদিনও কথা হয়নি। এর পরের দিন আবার গেলাম দেখা করতে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, আপনারা অদ্দুর থেকে এসেছেন Ñ দরজা ভেঙে এলেন না কেন? রবীন্দ্রনাথ খুব নাটকীয় ছিলেন তাঁর কথাবার্তায়। আমি তাঁকে বললাম, সাধারণ শিক্ষার অভাবেই আমরা সাহিত্যে পিছিয়ে পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ তখন বললেল, ‘এই পথেই তোমাদের মুক্তি হবে।’
শ্যামল : জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে দেখা বা কথা বলার স্মৃতি কি এখনো আপনার মনে আছে?
আবুল হোসেন : সব মনে নেই। তবে যতদূর মনে পড়ে জীবনানন্দ একটু বিষণœ ছিলেন, কোনো চাঞ্চল্য আমি লক্ষ করিনি। জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ নিয়ে আমি আলোচনাও করেছি। আমি তাঁকে বলেছিলাম, দেখুন আপনার লেখা একেবারে ভিন্ন, অন্যদের চেয়ে আলাদা। আবার মাঝেমাঝে বুঝতে পারি না।  জীবনানন্দ আমার কথা শুনে হাসলেন।
শ্যামল : আপনি তো দেশের বাইরে অনেকবার গেছেন। বিদেশি কোন কবিকে আপনার ভালো লেগেছে?
আবুল হোসেন : মনে হয়, মার্কিন কবি থিওডর ওয়াইজের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল। জার্মান কবি এসেনবার্গারের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। রুশ কবি ইয়েভতুশেংকোর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। এছাড়া আরো অনেকের সঙ্গে সে-সময় দেখা হয়েছিল।
শ্যামল : আপনার পরিবারে কোনো লেখালেখির আবহ ছিল কিনা?
আবুল হোসেন : না। তবে আমার বাবার গানের শখ ছিল। কিন্তু সেই সময়ে গান গাওয়া নাজায়েজ ছিল। ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল বাগেরহাটে পাকিস্তানিরা আমার বাবাকে মেরে ফেলে। আমি তখন সরকারি চাকরি করতাম। বাবা পুলিশ অফিসার ছিলেন। আর আমার ছোট ভাই আমজাদ হোসেন একসময় পাকিস্তানের মন্ত্রী ছিলেন। বাবাকে নিয়ে আমি একটা কবিতাও লিখে ছিলাম যতদূর মনে পড়ে।
শ্যামল : আপনার লেখা কোন কবিতা আপনার খুব প্রিয়?
আবুল হোসেন : আমার নির্দিষ্ট করে কোনো প্রিয় কবিতা একটিও নেই। প্রিয় কবিতা আছে আমার অনেকগুলো। আমি তো কবিতা নিয়ে অবিরাম কাজ করি Ñ লিখে যাওয়ার পরে কাজ            করি, পত্রিকায় ছাপা হয়ে যাওয়ার পরে কাজ করি এবং বইয়ে    অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার পরও কাজ করি। সেজন্যে আমার অনেক কবিতাকে আমি মনে করি এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, তার থেকে একটি শব্দও বদল করা যাবে না। আমার কবিতার মধ্যে সকলেরই প্রিয় ‘ডি. এইচ. রেলওয়ে’। যেটা আবদুল মান্নান সৈয়দ এই বঙ্গে প্রথম আলোচনা করেছে এবং আমার সম্পর্কে ব্যাপক লিখেছে।
শ্যামল : আপনি বলেছেন, আপনার নববসন্তে আপনার প্রথমদিকের লেখাগুলোয় রবীন্দ্রনাথের ধারার প্রভাব আছে এবং ওই প্রভাব থেকে বের হওয়ার চেষ্টাও করেছেন, সেটা কীভাবে?
আবুল হোসেন : ১৯৩৯ সালের আগে যে-কবিতাগুলো লিখেছি সেগুলোতে রবীন্দ্রনাথের ধারা ছিল। কিন্তু ১৯৩৯ সাল থেকে লেখায় রবীন্দ্রধারা ছিল না। কবিতা পত্রিকায় ‘নবযুগ’, ‘বাংলার মেয়ে, বাংলার ছেলে’, ‘ট্রেন’ Ñ এসব কবিতা যখন বেরোলো তখনই আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম। ১৯৩৯-কে আমি আমার যাত্রা শুরুর কাল মনে করি।
শ্যামল : কবিতা এত কম লিখেছেন কেন?
আবুল হোসেন : আগে অনেক লিখতাম। কম লেখার পেছনে আবু সয়ীদ আইয়ুবের সতর্কতা কাজ করেছে। আইয়ুব বলত, এত লেখেন কেন? বেশি লিখলে কী লেখা ভালো হয়? আমাকে বলল, কোনো লেখা কখনো পুনরায় বলবেন না। একবার যা লিখেছেন তা আর লিখবেন না। এই বলে জীবনানন্দ দাশের উদাহরণ দিলেন। এখন তো আর লিখতেও পারছি না। বলতেও কষ্ট হচ্ছে।
শ্যামল : কবি হিসেবে আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন?
আবুল হোসেন : সমর সেনকে। আমি সম্ভবত কলেজে পড়ি, তখন তাঁর সঙ্গে দেখা আমার। তাঁর চেষ্টা ছিল কবিতাকে কতটা নিরাভরণ করা যায়। আমি তাঁকে খুব উঁচুদরের কবি বলে মনে করি। সমর সেন যখনই বুঝতে পারলেন, তাঁর বলার কিছু নেই, তখনই কবিতা লেখা থামিয়ে দিলেন।
শ্যামল : আপনার প্রিয় কথাশিল্পী কারা?
আবুল হোসেন : দুজন প্রয়াত লেখকের নাম বলব। মাহবুব আলম ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। মাহবুব আলমকে আমি আমাদের প্রথম আধুনিক গল্পলেখক বলব। ওয়ালীউল্লাহ্ তো অসাধারণ। এরপর রশীদ করিম, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও হাসান আজিজুল হক।
শ্যামল : আপনি তো দেশ, আনন্দবাজার, যুগান্তর, অরণি, পূর্বাশা, নবযুগ, বুলবুলে  লিখেছেন। সাহিত্যমানের বিচারে কোন পত্রিকাকে আপনি এগিয়ে রাখবেন?
আবুল হোসেন : আমি অনেক পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে লিখেছি। কিন্তু আমার কাছে দেশকেই সেরা মনে হয়েছে। এর সাহিত্যমান অনেক উঁচু ধরনের। আর বাংলাদেশে কালি ও কলম আমার ভালো লেগেছে। এখন তো আর পড়তে পারি না। কেমন হচ্ছে কোন পত্রিকার সাহিত্যমান তা জানি না।
শ্যামল : আপনি সাহিত্য ম্যাগাজিনের কথা বললেন কিন্তু কোনো পত্রিকার কথা বললেন না কেন?
আবুল হোসেন : না, পত্রিকা তো বাণিজ্যিক চিন্তাধারার কথা ভাবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে ম্যাগাজিনটাই আসল মনে হয় আমার কাছে।
শ্যামল : আপনি তো দেশ ম্যাগাজিনের কথা বললেন, দেশের প্রথম প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়; আপনি একসময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন  তাঁর প্রচ্ছদ ও চলচ্চিত্র সম্পর্কে বা তাঁর সঙ্গে দেখার কোনো স্মৃতি কি আপনার মনে আছে?
আবুল হোসেন : হ্যাঁ, আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কলকাতায়। সত্যজিৎ তো বড় ধরনের নির্মাতা ছিলেন। তাঁর পথের পাঁচালী ছবিটিই তাঁকে বিখ্যাত করে দেয়। যদিও আগে তিনি পেশাদার শিল্পী ছিলেন। পরে চলচ্চিত্রে চলে যান।
শ্যামল : আপনার জীবনে সবচেয়ে কষ্টদায়ক ঘটনা কোনটি?
আবুল হোসেন : আমার মা ও স্ত্রীর চলে যাওয়া। আমার স্ত্রী তো ১৯৯৪ সালেই চলে যায়। আমাকে একা ফেলে। সে যাওয়ার আগে অনেক কথা লিখে যায় আমার ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে, যা তারা অনেক নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছে। আমি অনেক ভালোই আছি বলা যায়। এছাড়া বাবার কথা বেশ মনে পড়ে। এর বাইরে এমন কোনো কষ্ট আমি পাইনি।
শ্যামল : এবার একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব। আপনি প্রথম কখন প্রেমে পড়েন?
আবুল হোসেন : আমি কলেজে পড়া অবস্থায় প্রেমে পড়ি (হেসে উঠলেন)। আমার ভাইয়েরা সব জানত। আমার বন্ধুরাও জানত।
শ্যামল : তাহলে তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন না কেন এবং তার নাম বা তার সম্পর্কে বিস্তারিত কি কিছু জানতে পারি?
আবুল হোসেন : সে ছিল হিন্দু, ভিন্ন সম্প্রদায়ের। আর তখন সমাজব্যবস্থা ছিল ভীষণ রক্ষণশীল। আমরা দুজনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা আমাদের মাঝে যোগাযোগ চালিয়ে যাব, সম্পর্ক রাখব কিন্তু বিয়ে করব না। বিয়ে করব না মানে আমি শাহানাকে বিয়ে করার পর তাকে ভুলে যাইনি। আমাদের মাঝে প্রায়ই কথা হতো, চিঠি দেওয়া-নেওয়া হতো গত কয়েক বছর পর্যন্তও। এখন আর লিখতে পারি না। কিন্তু যোগাযোগ আছে। সে এখনো জীবিত আছে। তাই আমি নাম বলতে পারব না।
শ্যামল : যে-ধারণা বুকের গভীরে লালন করে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন, জীবনের এই শেষ পর্যায়ে এসে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে?
আবুল হোসেন : ছেলেবেলায় যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, কবিতার ভাষা, ছন্দ, মিল, বিষয় এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা ছিল না। লিখতে ভালো লাগত, তা-ই যথেষ্ট। অনেক বিষয়েই লিখেছি। পরে অনেক ভেবেচিন্তে কবিতাকেই বেছে নিলাম। আমি মানুষের মুখের ভাষার প্রেমে পড়ি । ফলে অপ্রত্যাশিত লাভ হলো। কবিত সহজ-সরল হয়ে গেল।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার