গ্যাংগ্রিন

লেখক:

চন্দন আনোয়ার

 

মধ্য-যৌবনেও আমি আমার মায়ের যে রূপ-ঐশ্বর্য দেখেছি, তার সিকি পরিমাণ মূল্য বা বিনিময় সে পায়নি। ইতর, জোচ্চোর, হারামি, জুয়াড়ি, বদমায়েশ, বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক, প্রবঞ্চক ইত্যাদি যত ইচ্ছা বিশেষণ যোগ করা যাবে এবং প্রত্যেকটি বিশেষণই মিলবে সুতায় সুতায়, এমনি অমানুষ ছিল আমার বাবা! দুজনে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারত না, সাপ-নেউলের সম্পGangrin finalর্ক। তবে সুখের কথা ছিল, দ্বন্দ্বটা ঘুরপাক খাচ্ছিল স্রেফ দুজনের মধ্যেই। তৃতীয় বলতে আমি। বড়দের এই খেলায় মাথা ঢোকাই না, নিজের লেখাপড়া আর স্কুল নিয়েই আমার জগৎ।

একদিনের ঘটনা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, খেলা শেষে বাড়ি ফিরছি, উঠোনে পা রাখতেই শুনতে পাই বাবার কণ্ঠ। মাকে উদ্দেশ করে বলছে, মালটা কোত্থেকে পেলি, সেই কথা বলে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সতীগিরি ফলাচ্ছিস কেন? তুই কত বড় সতী আমার জানা হয়ে গেছে।

বিদ্যুৎগতিতে একটি তীর এসে বিঁধল আমার বুকে। এদের ফ্যাসাদের নাটেরগুরু তাহলে আমি! আমার জন্মটার মধ্যেই গ-গোল! আমার পিতৃত্বের দাবিকে খারিজ করে দিচ্ছে বাবা!

টসটসে ফর্সা মা কালীমূর্তি ধারণ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

বাবার কণ্ঠে এবার অত্যন্ত বিনয় ও মিনতি, তোর পায়ে পড়ি, একবার মুখ ফুটে বল শুনি, মালটা কার? কথা দিচ্ছি, আমি তোর নাঙের কোনো ক্ষতি করব না। একবার শুধু মুখ ফুটে বল, তোর পায়ে পড়ি।

রাম-রাবণের যুদ্ধ সীতাকে নিয়ে, কিন্তু শেষে সীতার চেয়ে বড় হয়েছিল দুজনের জেদটাই। বাবা-মার জেদাজেদিতে, বিশেষ করে, বাবার চরম অবস্থান এবং সত্য প্রকাশের জন্য মার ওপরে ঘনঘন চাপ প্রয়োগের কারণে আমার জন্মের গ-গোলের খবরটি চারদিকে ছড়াতে থাকে লাউগাছের লতাপাতার মতো। কিন্তু লুকোচুরি আর কতদিন! একদিন মা-বাবার কথাকাটাকাটি চলছিল তুমুল, বাবা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দড়াম দড়াম করে লাথি কষে দরজায়। ডাকাতের হাতে পড়া পথিকের আর্তনাদের মতো আর্তনাদ করে ওঠে মা। এই প্রথম মা গলা ফাটিয়ে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় লুটিয়ে চিৎকার করেছিল। চিৎকারের এক ফাঁকে বলেছিল, খেল খতম! সাপও তুমি, ওঝাও তুমি, কাটো-ঝাড়ো সবই করো!

নাটক করিস না মাগি। নাটক বাদ দিয়ে সত্য কথা বল। আমি তো বীর্য দেইনি, তুই মালটা পেলি কোথায়, সেই কথার জবাব দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। বাবা যথেষ্ট উত্তেজিত।

মা চুপসানো গলায় বাবাকে অনুরোধ করেছিল। ভ্রƒণটিকে হত্যা করতে চেয়েছিলে, আমার শরীরের ওপরে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছো টানা নয় মাস, পারোনি। বারো বছর ধরে একই অন্যায় তুমি করে যাচ্ছো, আমি সহ্যের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি, তোমাকে শেষ অনুরোধ করছি, এরপর কী ঘটবে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

মা যেন রিমান্ডের আসামি। একের পর এক আক্রমণ করে যাচ্ছে বাবা। ওই মালটার নাক, মুখ, চুল, বডি কোনোটাই তো দেখতে আমার মতো না, তারপরও আমার বলে চালিয়ে দিচ্ছিস, এই কি তোর বিচার! একই কথা ঘুরেফিরে বারবার বলছে বলে মনে হচ্ছে, বাবার পজিশন ঠিক। যেন ফাঁসির আসামি জীবনভিক্ষা করছে, এমন ভঙ্গিতে মা বাবার দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বাবার পায়ের ওপরে লুটিয়ে পড়ে বলেছিল, এই শেষ অনুরোধ।

বাবা সেই অনুরোধের মূল্য দেয়নি। হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছিল। এই চরম অপমান মা সহ্য করেনি।

এরপরের ঘটনা উপন্যাসের কাহিনির মতো। বাবা নতুন সংসার পাতে, আর আমরা চলে যাই নানাবাড়ি।

 

স্কুলে ভর্তির দিন। বাবার নামের জায়গাটি খালি রেখেই জমা দিই ভর্তির ফরম। প্রধান শিক্ষক ওই জায়গা লাল কালিতে মার্ক করে মাকে বললেন, এখানে ছেলের বাবার নাম লিখুন।

মা চরম বিব্রত এবং অপ্রস্তুত। না লিখলে চলবে না?

প্রধান শিক্ষক কাজে ব্যস্ত ছিলেন, মার কথার প্রত্যুত্তরে শুধু বললেন, না, লিখতেই হবে।

মা আর কিছু বলেনি। হঠাৎ একটানে লিখে ফেলল, বাবুল হোসেন।

এই লোকটির নাম আমি প্রথম শুনলাম।

বাড়ি ফেরার পথে মা হাঁটছে আগে, আমি হাঁটছি পিছে। দুজন স্রেফ পথচারী, অচেনা। বাড়ির উঠোনে পৌঁছেই মা দৌড়াল, এমনভাবে দৌড়াল, যেন আমি এক আততায়ী, তার পিঠে ছোরা বসানোর জন্য উদ্ধত। যাহোক, সেদিন আর দুজনে মুখোমুখি হইনি। সেই রাতে খাবার, বিছানা সবই চলে নানির তত্ত্বাবধানে। আর সেদিন থেকেই আমি যেন যুবতী মায়ের বিবাহ-উপযুক্ত যুবক ছেলে, দুজনের ভীষণ সংকোচ। বাবুল হোসেন লোকটি কে? এই প্রশ্নটি লাশের মতো নিরাপদে শুয়ে আছে দুজনের সম্পর্কের মধ্যখানে।

মাসদুই পরে, স্কুলে যাচ্ছি, পেছন থেকে কে যেন ডাকে, ওই ছোকরা, দাঁড়া।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, বাবা! এই লোকটা এখানে! মিচকে শয়তানের মতো মিচকে হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছে, আমি যমভয় নিয়ে দৌড়ানোর মতো হাঁটছি। লোকটি একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল। আমি স্কুলমাঠে পৌঁছে দৌড়ে টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে আঁজলা আঁজলা পানি নাকে-মুখে ছিটিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাসে এসে বসতেই, আমীর আলি স্যার সাপের মতো বেতটিকে নাকের ওপরে একপাক ঘুরিয়ে ধরলেন, তুই পাঁচ মিনিট লেট করে এসেছিস, তুই-ই প্রথমে বল, বাবা বাড়ি নেই, এটি কোন টেন্স?

বাবা বাড়ি নেই, বাবা মরে গেছে, পাস্ট টেন্স স্যার।

বাবা মরে গেছে! সাপের মতো বেতটির লেজ দিয়ে কান চুলকানোর মতো আমার গালে দুই খোঁচা মারলেন স্যার, পাজির পা-ঝাড়া! এখানে ইয়ার্কি!  আমার মা মারা গেছে, এটি ট্রান্সলেট কর? অন্যথা এই বেতটি তো দেখছিস, এর জনম শেষ আজ।

মাই মাদার ইজ ডেড।

গুড গুড! তবু বেতটি মোলায়েমভাবে আমার পিঠকে স্পর্শ করে।

আমার মধ্যে দুশ্চিন্তা ও ভয়, লোকটি যদি…

যা ভেবেছি, বর্ণে বর্ণে তাই মিলে গেল। ঠিকই লোকটি স্কুলে হাজির। প্রধান শিক্ষকের অফিসে ঢুকে কিছুক্ষণ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল।

বই-খাতা এক বন্ধুর জিম্মায় রেখে জীবনে এই প্রথম স্কুল-পালাই। কী দিয়ে যে এলো, আমি তো এলাম দৌড়ে, তবু লোকটি আমার আগেই নানিবাড়ি উপস্থিত হয়।

দুজন অবলা নারী, পুরুষ মানুষ আমি একা। বৃত্তাকার উঠোনের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে লোকটি এমন ভয়ানক ও বীভৎসভাবে চিৎকার করে যে, যেন কেউ মুগুর দিয়ে তার হাড়-পাঁজর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, গমগমে লোহার পাত দিয়ে কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় করছে।

গেল তো! থলের কালো বিড়াল বের হয়ে গেল তো! এবার কী বলবি? বেশ্যামাগি, এবার কী বলবি? এবার তোর মুখে কথা নাই। আমার সন্দেহটাই ঠিক। বাবুল হোসেন মালটা কে? এত বড় প্রতারণা! আমার ঘর করলি, আর শুইলি…। ছি! ছি! মুখ থেকে একদলা থুতু ওয়াক করে ছুড়ে ফেলল উঠোনে। পরকীয়ার খাউজানি থাকলে আমারে বললি না ক্যান? ভালোয় ভালোয় মেটাতে পারতি। নেমকহারামি করলি!

মা-নানি ঘরের ভেতরে, আমি দাঁড়িয়ে আছি নিরাপদ দূরত্বে। হাঙরের মতো হাঁ-মুখ করে লোকটি আমার দিকে তাকাতেই আমার পাকস্থলীতে র্গর করে শব্দ হলো। এবার আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, পেট-বাঁধালি কার সাথে, আর মালটা আমার বলে চালিয়ে দিচ্ছিলি। পাঁঠিমাগি, রংবাজি করার আর মানুষ পাওনি। এবার দেখবি খেলা। একধারসে আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

ভেবেছিলাম, এত বছরের সংসার, মায়ের ওপরে বড় ধরনের কোনো অবিচার করবে না। বড়জোর ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবে।

বাবার খেলা যে এত ভয়ংকর হবে, মা, আমি-আমরা কেউ ভাবিনি।

পরের দিনই বাড়িতে পুলিশ উপস্থিত। আমরা হতবাক। প্রতারণা ও ক্ষতিপূরণের মামলার আসামি মা। দশ ভরি স্বর্ণ ও নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে বাবুল হোসেন নামের এক যুবকের সঙ্গে চম্পট দিয়েছে।

নানিবাড়িতে যেন আগুন লেগেছে, মানুষজন রুদ্ধশ্বাসে ছুটে আসে।

মা একটি বাক্যও খরচ করেনি। যেন পুলিশের অপেক্ষায় থেকে অস্থির, তাদের আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে দেয়নি। চলুন, বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। পুলিশ ছিল পাঁচজন। আসামির এই আচরণে তারাও অপ্রস্তুত।

মায়ের জামিন নিতে সময় লেগেছিল ১৫ দিন। এ-কদিনে এই খবরটি লেলিহান আগুনের মতো ছড়িয়েছিল। ঢিঢিক্কার পড়ে গেল। আমার স্কুলের ভর্তি বাতিল হয়ে গেল। এই ঘটনায় নানি বিছানা নিয়েছিল। মা যেদিন জামিন নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল তার পরের দিনই নানি মারা গেল।

ইতিহাসের এক পর্ব এখানেই শেষ।

 

মায়ের সাহস ছিল অতিরিক্ত। সেই যুবতী বয়সে, ঢাকায় এসে সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একটি বস্তিতে ঘরভাড়া নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্ব। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, মায়ের চালচলন, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা দেখে। যেন কতকাল ধরে এই শহরে! জন্ম, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি এই ঢাকা শহরেই হয়েছে। স্বামী মারা গেছে, এই কথাটি মা অত্যন্ত শান্ত, স্বাভাবিক ও পাকাপোক্তভাবে বলে। জলজ্যান্ত জীবিত মানুষকে যেভাবে মৃত বলে চালিয়ে দেয়, তা অবিশ্বাস্য। হাতে কিছু টাকা ছিল, সেই টাকায় চলে মাস তিন। বস্তির অন্যেরা যে কাজ করে, মায়ের দ্বারা সেসব কাজ করা সম্ভব ছিল না। ভদ্রঘরের মেয়ে, অষ্টম শ্রেণি পাশ করে নবম শ্রেণির প্রথম সাময়িক পর্যন্ত পড়া মেয়েমানুষের জন্য সত্যিই কঠিন ছিল কোনো কাজ জোটানো। কঠিন প্রত্যয়ী মা নেতিয়ে পড়া লতার মতো ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ছে দেখে আমি যারপরনাই ছোটাছুটি করতে লাগলাম। যেটাই ঠিক করি, মায়ের তাতে সায় নেই। ছেলেকে ডাক্তার, না হয় ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখে যে মা, সে কী করে ছেলের কর্ম হিসেবে হোটেলবয় বা দোকানের কর্মচারীর কাজ মেনে নেয়। হঠাৎ এক দর্জির সঙ্গে পরিচয় হওয়া ছিল আমাদের জন্য আশীর্বাদ। মা টুকটাক সেলাই জানত, গ্রামের মেয়েরা যতটুকু জানে আর কি। সেখান থেকেই শুরু। পনেরো দিনের মধ্যেই পাকাপোক্ত দর্জি হয়ে ওঠে। মায়ের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। আমাকে নিয়ে তার স্বপ্নটা অর্ধমৃত অবস্থায় বেঁচে ছিল। বছরের চার মাস চলে গেছে বলে কোনো স্কুলেই ভর্তি নিচ্ছিল না, শেষে আরো আট মাস অপেক্ষা করে জানুয়ারিতে স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো আর অগোছালো। লেখাপড়ার প্রতি আমার মন নেই। অনেক বন্ধু-বান্ধব জুটেছে। যদিও কিছুই ছুঁইনি, সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়াই বলে কেমন মালখোর মালখোর টাইপের চেহারা হয়েছে। মা আমাকে শিখিয়ে দেয়নি, আমি নিজেই বলি, বাবা মরে গেছে। কীভাবে মারা গেছে, জানতে চাইলে সোজা বলে দিই, রোড অ্যাক্সিডেন্টে। এতে আমি ভালোই আছি। কিন্তু আমার নিজের যে-জগৎটি, যেখানে আমি সম্পূর্ণ একা, সেখানে ঠিকই শিকড় পুঁতে আছে এই জিজ্ঞাসা চিহ্নগুলো। এই জিজ্ঞাসাচিহ্নগুলো যেন ধারালো চকচকে এক-একটা চাকু, তিলার্ধ নড়চড় হলেই কচুকাটার মতো কচকচ করে কাটে কলিজা।

মায়ের হাতযশ অবিশ্বাস্য। পাঁচ বছরেই একটি দোকান ও একটি টেইলার্সের মালিক। পাঁচজন লোক খাটে। এই উন্নতিতে বস্তি ছেড়ে একটি পুরনো ফ্ল্যাটবাড়ির নিচতলায় উঠি। জীবনের একটা ছন্দ তৈরি করে নিয়েছে মা। দিনরাত তার ব্যস্ততা। টাকা উপার্জনের অন্ধ নেশায় ধরেছে। আমার সন্দেহ হয়, মা বুঝি নিজের ওপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে। এই টাকার নেশা কার জন্য? নাকি নিজের অতীতকে ভুলে থাকার একটি ইন্দ্রজাল তৈরি করছে। রাতে খাবারটা একসঙ্গে হয়। সেখানে তার খিটমিটে মেজাজ। সারাদিন কী করি, লেখাপড়া চলছে কেমন ইত্যাদি রুটিন কথাবার্তা। আমি অতিষ্ঠ। মানুষ বেঁচে থাকলে বদলাবে, তাই বলে এভাবে! বাবা তার জীবনে ছিল একযুগের বেশি সময়। জন্মভিটা। সেই গ্রাম। এত ঠুনকো জিনিস! প্রকাশ্যে বা আড়ালে তার অতীতকে স্মরণ করে একবারও জোরে শ্বাস ফেলার নজির নেই। তার চোখমুখ তন্ময় বর্তমানে, ভবিষ্যতে। মা নিজেকে যে-হারে পালটে নিয়েছে বা নিচ্ছে, আমি তার তুলনায় অনেক পেছনে। বিপরীতে বরং আমি ক্রমশ অতীতচারী হচ্ছি। মা বোধহয় বোঝে ব্যাপারটা। তাই, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ ফেলে কথা বলা কঠিন অস্বস্তির আমার জন্য। স্রেফ পালিয়ে বেড়াচ্ছি আর কি!

বাবার সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেওয়াটা ভালো ছিল না। অতর্কিত আক্রমণের মতো মায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হঠাৎ একদিন কথাটি বলে ফেলি।

তালাচাবি দেওয়া বন্ধ কপাটে জোরে লাথি মারলে যেমন নড়ে ওঠে, কিন্তু খোলে না, মায়ের অবস্থা তাই। আমার কথার কোনো প্রত্যুত্তর দিলো না।

তুমি অথবা আমি যতই অস্বীকার করি না কেন, লোকটা তো বেঁচে আছে।

মা এবার নড়েচড়ে বসে, কিছু বলবে এমন একটি অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে চেহারায়। তবু নীরবই রইল। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে যাচ্ছি, তখনি মা মুখ খোলে, এই নিয়ে আর কখনো কথা বলো না। বড় হয়েছো, কলেজে পড়, যদি পারো সমাধান বের করো, দুদিন আগে-পরে তোমাকেই একটি সমাধান বের করতে হবে।

মায়ের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। এই ভাষা অর্জুনের ধনুর্বাণের মতো লক্ষ্যভেদী। এই ভাষায় কথা বললে আর পেরে ওঠা যায় না। আগেও দেখেছি, বাবার অনেক কথার জবাব একটি-দুটি বাক্যে দিয়েছে। বাবা যখন পেরে উঠত না, তখনি জংলি আচরণ করত। আমার সমস্ত জিজ্ঞাসা, এতদিনের পরিকল্পনা, দ্বিধা-ভয়-সংকোচ অর্থাৎ সমগ্র প্যাকেজটিরই এককথায় একটি উপসংহার টেনে দিলো। জীবিত মানুষকে মৃত বলে চালিয়ে দিচ্ছি, এখন তার কী সমাধান?

 

হেমন্তের সন্ধ্যা। বিদ্যুৎ নেই। সন্ধ্যার প্রেতায়িত অন্ধকার নেমে আসছে। আমি বের হব বের হব করছি। ঠিক তখনি মোবাইল বেজে ওঠে। অপরিচিত নম্বর। রিসিভ বাটন টিপে কানে তুলতেই শুনতে পেলাম, আমি তোমার পিতা বলছি।

শুধু আমি একা নই, সমস্ত বিল্ডিংটি কেঁপে উঠল। নির্বাক আমি। কী বলব ভাষা পাচ্ছি না।

কথা বলছ না কেন? আমি তোমার পিতা মতিউর রহমান বলছি।

মতিউর রহমান! কে মতিউর রহমান? আমার বাবা মারা গেছেন।

তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! জলজ্যান্ত বাপ বেঁচে থাকতে মৃত বলছ! আল্লাহর আরশ কাঁপছে!

মোবাইল আর ধরে রাখা সম্ভব হলো না। কট করে লাইনটি কেটে দিলাম। লোকটি আরো দুবার রিং ঢুকিয়েছে, কিন্তু আমি রিসিভ করিনি। এত বছর পরে লোকটি হঠাৎ করে ভোল পালটে ছেলে দাবি করছে! নিশ্চয় এখন মার কাছে স্বামীর অধিকারও দাবি করবে। মিরাকেল! মোবাইল নম্বর যখন কোনোভাবে ম্যানেজ করে নিয়েছে, সেয়ানা লোক, নিশ্চয় বাসার ঠিকানাও জোগাড় করতে বাকি নেই। কোনো একদিন সশরীরে হাজির হলে মা অথবা আমার এই মহল্লায় বাস করা কঠিন। বন্ধুদের বাড়াবাড়িতে দুবার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীও পালন করেছি। এখন যখন ওরা জানবে, বাবা বেঁচে আছে, কী অঘটনটাই না ঘটবে! কিন্তু মায়ের দিকটা আরো কঠিন। সধবা নারী বিধবা সেজে ব্যবসা গড়ে তুলেছে, জানাজানি হলে সর্বনাশ। বহুকালের পুরনো ও ঘুমন্ত একটি ব্যথা হঠাৎ যেন জেগে ওঠে সাপের মতো প্যাঁচিয়ে ধরছে বুকের জমিন। রুমের দরজা-জানালা বন্ধ ছিল। একটি জানালা খুলে দিতেই বাতাসকে দাবড়িয়ে আগেই ঢুকে পড়ে সন্ধ্যার অন্ধকার। এই অন্ধকার তাড়াতে লাইট দিতে গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলটা তখনো বেজে যাচ্ছে একধারসে। সুইচ অফ করে দিই।

সন্ধ্যার গুমোট অন্ধকার মগজে ঢুকে সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। এখন অন্ধকারই নিরাপদ। আর বের হওয়া হয়নি। মা ফিরেছে রাত ১০টার দিকে। প্রতিদিনের রুটিন কাজ করে মা শুয়ে পড়ে। আমি জেগে থাকি গভীর রাত পর্যন্ত।

এত ত্বরিতগতিতে লোকটি সব ঘটিয়ে ফেলবে, আমি অথবা মা কেউ ভাবিনি। সাধারণত, কাজের মেয়েমানুষটি আসে সকাল সাতটার মধ্যে। সকাল ছয়টার দিকেই বেল বেজে ওঠে। মা ঘুমিয়েই ছিল। আমি দরজা খুলেই অবাক। মুখভর্তি নিপাট দাড়ি, মাথায় টুপি, সাদারঙের পাঞ্জাবির নিচে কালোরঙের নরমাল প্যান্ট-পরিহিত পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী ধারাল চেহারার সুবেশধারী একলোক দাঁড়িয়ে আছে। টুপির নিচে ফেসো পাটের মতো সাদাকালো চুল, মস্তবড় কালো দুটি চোখের ওপরে মোটা ফ্রেমের চশমা।

কোনো প্রকার অনুমতির তোয়াক্কা করেনি লোকটি। আমাকে প্রায় ধাক্কা মেরে বাসার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমি পথ আটকে দাঁড়াই। আপনি কে? এভাবে বাসায় ঢুকে পড়ছেন!

বাইরে দাঁড়িয়ে বলব? এক প্রকার ধমক দিলো লোকটি।

আশ্চর্য, আমি আপনাকে চিনি না, আর এভাবে অশোভনভাবে বাসায় ঢুকে পড়ছেন?

তোমার মাকে ডাকো, সে চিনে কিনা দেখি। ভালো সুখেই আছো দেখছি।

ওহ! আপনি?  লোকটির কণ্ঠস্বর পালটায়নি মোটেই।

এখন মা কী করবে? আমিই-বা কী করতে পারি? লোকটিকে দরজা থেকেই তাড়িয়ে দেব কিনা তা ভাবতে গিয়ে বুকের ভেতরে সন্ধ্যার ব্যথাটা লাফিয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা প্রয়োজন। এখনি তাড়িয়ে দিতে পারি, কিন্তু এ কোনো সমাধান নয়। এছাড়া লোকটি এত সহজ মানুষ নয় যে, ঘটনাটি সহজে মিটবে। এত বছরে যখন মেটেনি, এখন তো আরো জটিল। ভেতরে ভেতরে নিশ্চয় যাবতীয় খোঁজখবর নিয়ে এসেছে। বড় ধরনের প্রস্তুতি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। লোকটি কী করতে পারে, এ-ধারণা আমার আছে বলেই এই ভয়।

ততক্ষণে মায়ের ঘুম ভেঙে গেছে। কে এসেছে, বিছানা থেকেই জিজ্ঞেস করে। আমার প্রত্যুত্তর না পেয়ে নিজেই উঠে আসে। আমি যা কল্পনা করিনি, মা তাই বলে, তাকে ভেতরে আসতে দাও।

লোকটি সাবলীলভাবে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে, যেন তারই বাসা এবং এই কিছুক্ষণ আগে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন, এখনি ফিরলেন।  তাকে বসতে দিই আমার রুমে।

তুমি লোকটিকে ভেতরে ঢুকতে দিলে কেন? আমি মাকে বললাম।

তুমি তাকে চেন না, ও খালি হাতে আসেনি।

খালি হাতে আসেনি মানে? আমি চমকে উঠলাম।

খালি হাতে মানে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া আসেনি। আমাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে এসেছে।

সে তো আমাকে ছেলে বলে স্বীকার করে না। এখন কেন পিতার দাবি নিয়ে… ? টাকা-পয়সার লোভে!

কেন বুঝতে পারোনি?

এখন কী করব? এখনি তাড়িয়ে দিই।

তাড়িয়ে দিলেই চলে যাবে? গেলেই কি ছেড়ে দেবে? ও এরকম মানুষ নয়।

কী করবে?

কী করবে, তুমি আমি ভাবতেও পারব না।

এ পর্যন্ত কথা হয়েছে মায়ের সঙ্গে। তারপর সোজা লোকটির সামনে এসে বলি, আপনি এখনি চলে যান, আর কোনোদিন আসবেন না। যদি আসেন, তবে…।

আমি ভেবেছিলাম, বড় ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া জানাবে। আমার কথা শোনার পরে মোটামুটি শান্তভাবেই বসে থাকল। দ্বিতীয়বার যখন বলেছি, আপনি এখান থেকে চলে যান, তখন বলল, তোমার মাকে ডাকো। এইটা কি তোমার মার কথা, নাকি তোমার কথা? আমি বললাম, আমাদের দুজনেরই। সে বলল, তোমার মাকে ডাকো, সে নিজের মুখে বলুক। আমি ক্ষিপ্ত হয়ে গেলাম, মাকে ডাকতে হবে কেন? আমি বলছি, আপনার হচ্ছে না। আপনি আর কথা না বাড়িয়ে এখনি চলে যান। আর কোনোদিন এদিকে এলে…। কথা বলতে বলতে আমি তার মুখোমুখি দাঁড়াই।

এবার লোকটি আশ্চর্য এক কা- ঘটিয়ে ফেলে, ঠাস করে এক চড় মারে আমার গালে। বেয়াদব ছেলে, মা-টা যেমন বেয়াদব মহিলা, ছেলেটাও হয়েছে তাই। পিতার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় শেখায়নি।

আমার এখন কী করা উচিত, তা বুঝে উঠতে পারি না। ভাবতেই পারিনি, লোকটি অকস্মাৎ এমন কা- ঘটিয়ে ফেলবে। জানোয়ার টাইপের মানুষ, আরো বড় ধরনের কিছু ঘটিয়ে ফেলে কিনা, মার কথাই সত্যি হয় কিনা, কে জানে।

আমি এখন কী করতে পারি? মানুষটির রক্ত আমার শরীরে। রক্তের সঙ্গে রক্তের লড়াই ভয়ানক হয়। প্রকৃতপক্ষে তার সঙ্গে লড়াই করার কোনো ইচ্ছাই নেই। বরং যে-কোনো একটি আপসে পৌঁছাই মঙ্গল। কিন্তু মা এতটা নীরব কেন? বিশেষত, শিকার যখন তার খাঁচায় বন্দি। মা আর তার সামনে আসেনি। এই অপমান সহ্য করে তার পক্ষে এখানে একমুহূর্ত থাকা কঠিন। যখন চলে যাচ্ছিল, তখন লোকটির জন্য বরং কিছুটা মায়াই লেগেছিল।

এই ঘটনার পরে কিছুদিন ধরে কেবলি মনে হয়, এই বুঝি লোকটি এলো। একটা ভয় শিকারখেকো বাঘের মতো পেছন থেকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। জীবনে আর কখনো এতটা অসহায় হইনি। মা ভেঙে পড়ছে। মুখোমুখি হলেই দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলে। আমি তার কিছুই ধরতে পারি না। তার এত শ্রম ও যতেœর সাজানো বাগান যেন একমুহূর্তেই ল-ভ- করে দিয়ে গেল লোকটি। কোনোমতেই মা আগের জীবনে ফিরে যেতে চায় না। লোকটির কাছে তো নয়ই। মুক্তির একটিই উপায়, মা ডিভোর্স দিতে পারে। কিন্তু এতদিন পরে তা কি সম্ভব? লোকটি সেটা মানবে না, মামলা-মোকদ্দমায় ওস্তাদ। একে তো ধুরন্ধর, ভিলেজ পলিটিক্স করা লোক, তার ওপরে ধর্মের লেবাস। অপ্রতিরোধ্য টেনশন ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে কাটে দুই সপ্তাহ। আমি ধরেই নিয়েছি, লোকটি আমাদের ওপরে দয়া দেখিয়েছে। তবু ভয়, মানুষের বেসিক চরিত্র সাধারণত বদলায় না। লোকটি কঠিন জেদি, যা বলে তা করেই ছাড়ে, জান-মানের ভয় করে না। কুকুরের লেজের মতো আর কি।

বিষয়টি নিয়ে মায়ের সঙ্গে আরো খোলামেলা আলাপ করা উচিত। এভাবে আতঙ্ক নিয়ে বাঁচা যায় না। একটি নির্দিষ্ট সমাধানে আসতেই হবে। সেদিনের ঘটনার পরে এই প্রথম মায়ের মুখোমুখি হই।

লোকটিকে তুমি ডিভোর্স দাও, এভাবে বাঁচা যায় না।

মা ঘাড় গুঁজে হিসাব কষছিল, আমার কথার প্রত্যুত্তরে বলে, তুমি?

আমি, আমি মানে?

তোমাকে কী করব?

আমাকে কী করবে মানে?

কী হবে ডিভোর্স দিলে? অস্বীকার করা যাবে? তুমি তারই অংশ।

কঠিন এক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি। বিষয়টিকে এভাবে ভাবিনি। মা-ই বলল, তুমি কিছু বললে না যে। আমি তাকে চিনেছি, কতটা চিনেছি তা তোমাকে বোঝাতে পারব না।

সে কী করবে? সে কী করার সমর্থ রাখে? প্রচ- ক্রোধ ও হিংস্রতা জ্বলে ওঠে রক্তের ভেতরে।

প্রয়োজনে খুন করবে।

অ্যা! খুন? কাকে?

আমাকে?

কেন?

তুমি তার ছেলে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে।

আমার চোখেমুখে বিদ্রƒপের হাসি, কী ভয়ানক তামাশা! আমার পিতৃত্বকে অস্বীকার করে কী ভয়ানক নির্যাতন চালিয়েছে তোমার ওপরে! এখন সেই ছেলের ওপরে দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য তোমাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে!

আমার কথার প্রত্যুত্তরে মা নীরব। তার নীরবতাকে আঘাত করার জন্যই প্রায় চেঁচিয়ে বললাম, আমি লোকটিকে পিতা বলে মানি না। এই রকম বর্বর অমানুষ আমার পিতা…

তার রক্ত তোমার শরীরে। মা বলে।

এবার মাথায় লাল সিগন্যাল জ্বলে ওঠে। বিকট শব্দে চিৎকার করি। আমি এই রক্তকে অস্বীকার করি। সাপে কামড় দিলে বিষাক্ত রক্ত যেমন শরীর থেকে বের করা হয়, আমি আমার শরীরের সমস্ত বিষাক্ত রক্ত বের করে ফেলব। তোমার কর্মচারী রেহেনা খালা, গ্যাংগ্রিন হয়েছে বলে টাকা খরচ করে এক পা কেটে ফেলেছে, তাতে কী হয়েছে? ওই পা-টা থাকলে তো বাঁচতই না।

হঠাৎ রান্নাঘরে থালাবাসন পড়ার হুটহাট শব্দ হলো। মা লাফিয়ে উঠল,  প্রতিদিন মাছ খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে বিড়ালটা, পোষা বিড়াল বলে খাতির নেই, দাঁড়া।

আমি জীবনে মাকে এতটা নৃশংস হতে দেখিনি। প্রথমে বিড়ালটির মাথার ওপরে প্রচ- জোরে আঘাত করে বঁটি দিয়ে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বেচারা। চার হাত-পা ছেড়ে দিয়ে কোঁ-কোঁ শব্দ করে কোঁকাচ্ছে। এক মিনিট হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিড়ালটির দিকে। হঠাৎ দুই ঠ্যাঙ দুই দিকে ধরে একটানে ফেড়ে ফেলে।