জীবনানন্দের জীবনবেদ

লেখক:

আখতার হুসেন
অনন্য জীবনানন্দ

ক্লিন্টন বি সিলি
অনুবাদ :
ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রথমা
ঢাকা, ২০১১

৮০০ টাকা

এ-বইয়ের শুরুটাই পাঠককে প্রাণিত করবে তার আদ্যোপান্ত পাঠের প্রবণতায়। আগ্রহের সেই বীজ বপন করা হয়েছে বইয়ের ‘ভূমিকা’তেই। উদ্ধৃতি দিয়েই হাজির করা যাক তার প্রমাণ। তার স্বরূপটা এরকমের : ‘আপনাকে চুনিলালের সঙ্গে দেখা করতে হবে’, বেশ জোর দিয়েই আমার পরিচিত লোকটি বলেন, ‘এই ভদ্রলোকই ট্রামের নিচে চাপা পড়ে থাকা জীবনানন্দকে উদ্ধার করেছিলেন।’ আমি চুনিলালের সঙ্গে দেখা করি ১৯৭০ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাংলার সবচেয়ে হূদয়লালিত কবির মৃত্যুর ১৬ বছর পর। দক্ষিণ কলকাতায় রাসবিহারী এভিনিউতে তাঁর চায়ের দোকানে রোজকার মতো বসে ছিলেন চুনিলাল।… ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় এরকম সান্ধ্য ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি (জীবনানন্দ দাশ)। তখনই রাসবিহারী এভিনিউ পার হওয়ার সময় একটা চলন্ত ট্রামের সামনে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
‘চুনিলাল আমাকে জানান, হইচই শুনতে পেয়ে ঘটনা ঘটার মুহূর্তের মধ্যে সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি দেখতে পান, কেউ একজন ট্রামের নিচে পড়ে আটকে আছেন। চুনিলাল – গাট্টাগোট্টা মানুষটি – ঝুঁকে পড়ে ট্রামের একপাশে দুই হাত লাগিয়ে পরিস্থিতির প্রয়োজনে অতিমানবীয় শক্তি প্রয়োগ করে ট্রামের একটা পাশ আলগা করে তুলে ধরেন, যাতে জীবনানন্দের শরীরটাকে টেনে বের করা যায়। ঘটনার আট দিন পর নিউমোনিয়া সংক্রমণের জটিলতায় মারা যান রবীন্দ্রনাথের পর বাংলার স্বীকৃত কবি জীবনানন্দ দাশ, যাঁর নামের প্রথমাংশের অর্থ ‘জীবনের আনন্দ’।’
ক্লিন্টন বি সিলি তাঁর ভূমিকাসূত্রে আরো জানাচ্ছেন, ‘চুনিলাল জীবনানন্দকে ভালো করে চিনতেন না। আসলে যাঁরা চিনতেন তাঁদের সংখ্যাও অল্প। কারণ, তিনি ছিলেন একান্ত একজন, যিনি প্রধানত থাকতেন কবিতার মধ্যেই। জীবনানন্দকে বাঙালি পাঠকবিশ্বে তুলে ধরেছিলেন যে শুভাকাঙ্ক্ষী বুদ্ধদেব বসু তাঁর উপযুক্ত সমাধিফলকই লিখে গিয়েছিলেন, যখন তিনি তাঁকে ‘আমাদের নির্জনতার কবি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। হতে পারে সেই নির্জনতার কারণেই আজ অবধি বাংলা সাহিত্যের এই মহৎ ব্যক্তিত্বের একটি মাত্র জীবনী লেখা হয়েছে বাংলায় – অন্য কোনো ভাষায় একটিও নয়।’
শেষোক্ত এই উদ্ধৃতি-অংশে যে-টীকার উল্লেখ করা হয়েছে, তারই দৌলতে আমরা জানতে পেরেছি যে, ক্লিন্টন বি সিলির এ পোয়েট অ্যাপার্ট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। তার আগে জীবনানন্দ নামে গোপালচন্দ্র রায়ের লেখা একটা জীবনীগ্রন্থ বেরিয়েছিল ১৯৭১ সালে। এটিই ছিল বাংলা সাহিত্যে কবির ওপর লেখা প্রথম জীবনীগ্রন্থ। পরে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জীবনানন্দ দাশ নামে প্রভাতকুমার দাসের লেখা একটি জীবনীগ্রন্থ বের হয় ১৯৯৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। ক্লিন্টন এটিকে ‘উৎকৃষ্ট একটা জীবনী’ বলে অভিহিত করেছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও নিরেট সত্যটা এই যে, বাংলা সাহিত্যপ্রেমী একজন বিদেশি, মার্কিন নাগরিক ক্লিন্টন বি সিলি বাংলা সাহিত্যে যিনি ‘নির্জনতম কবি’ বলে অভিহিত, সেই কবির দ্বিতীয় বিস্তারিত জীবনীটি লেখার জন্য যেভাবে প্রাণিত হন এবং আমাদের আলোচ্য সেই বিশালায়তনের গ্রন্থটি রচনা করেন, এক অর্থে, তা বিস্ময়করই বটে। তাঁর প্রভূত পরিশ্রমলব্ধ এই গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ তাই অবশ্যই একটি স্মরণীয় সাহিত্যিক প্রয়াস। প্রায় স্বীকারোক্তির স্বরে সিলি যখনই আমাদের জানান, ‘১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে যদিও আমি ‘পিস কোর’-এর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দুই বছর জীবনানন্দের নিজ শহর বরিশালে কাজ করেছি, তাঁর সম্পর্কে আমি জানতে পারি আরও পরে, শিকাগোয়, তাঁর কবিতার মাধ্যমে। আইওয়ায় লেখক কর্মশালার সতীর্থ এবং একসময়ের শিকাগো ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং লেকচারার কবি জ্যোতির্ময় দত্ত আমাকে জীবনানন্দের শব্দ ও রূপকল্পের বিস্ময়কর ভুবনের সঙ্গে পরিচিত করান।’ তখন আমরা অনুমান করতে পারি, তাঁর জীবনানন্দ-প্রেম আকস্মিকতা থেকে অগ্রসর হয়েছে গভীর থেকে গভীরতর প্রেমের দিকে। এবং সেটা যে একজন বিদেশির জন্য সরল বা একরৈখিক কোনো বিষয় ছিল না। এবং সেটা যে ছিল না, তার প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ফারুক মঈনউদ্দীন কৃত পোয়েট অ্যাপার্টের অনুবাদ অনন্য জীবনানন্দের প্রতিটি অধ্যায়ের পরতে পরতে।
মনে রাখতে হবে, ক্লিন্টন বি সিলি যখন তাঁর এই গবেষণা-গ্রন্থ রচনা করছেন, বিংশ শতকের সেই নয়ের দশকের সূচনায় কবির বিশেষ এক পাঠকশ্রেণি দাঁড়িয়ে গেলেও, তখনো তারা সংখ্যালঘু (এখনো কি তারা সংখ্যাগুরু?) শ্রেণিভুক্ত। জীবনানন্দের একটি মাত্র জীবনী রচিত হলেও তা পাঠকসমাজে তেমন চলতি-গোছের কিছু ছিল না। তারপরই সিলির এই বই। ফলে আমরা তেমন নিবেদিতপ্রাণ এক গবেষকের সন্ধান পাই, যিনি বিদেশি হয়েও প্রমাণ করেন, কবি জীবনানন্দের জীবনীকার ও তাঁর কাব্যবোদ্ধা হিসেবে তাঁকে খাটো করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। সাধারণত আমেরিকান গবেষকদের সম্পর্কে এরকমের একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, কোনো জার্মান গবেষক যে-গবেষণাকর্ম সম্পাদন করতে ছমাস সময় নেন, সেখানে একজন ফরাসি সময় নেন তিন মাস, একজন ইংরেজ নিয়ে থাকেন দেড় মাস, সেখানে একজন মার্কিন গবেষক সময় নিয়ে থাকেন মাত্র ১৫ দিন। কথাটা পরিহাসচ্ছলে বলা হলেও সত্য যে একেবারে নেই, তা তো নয়। তবে ক্লিন্টন বি সিলি তাঁর এই আলোচ্য গ্রন্থ রচনার ব্যাপারে সেই চলতি পরিহাসপ্রিয় কথাটাকে রীতিমতো অসার প্রমাণ করে দিয়েছেন। আমরা এখন জোর গলায় বলতে পারি, পোয়েট অ্যাপার্ট তথা অনন্য জীবনানন্দ কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও তাঁর কাব্যকৃতি নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত সবচেয়ে বিস্তারিত ও ঋদ্ধ গ্রন্থ। স্মর্তব্য, গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল মার্কিন তথা ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠকদের সঙ্গে জীবনানন্দ ও তাঁর কাব্যকৃতির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকে। ফারুক মঈনউদ্দীনের নিবিড় ও নিষ্ঠশ্রমে বাংলায় অনূদিত হওয়ার পর এ-গ্রন্থ এখন বাংলা সাহিত্যেরও এক অবিচ্ছেদ্য মূল্যবান সাহিত্য-দলিলে পরিণত হলো। নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করার মতো করে জীবনানন্দকে তিনি যেভাবে আবিষ্কার করেন, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কাছেও মনে হয়, আহা আমরা এতদিন আমাদের নিজের ভাষার এই কবিকে এভাবে আবিষ্কার করতে পারিনি কেন?
মোট সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থ। অধ্যায়গুলোর শিরোনাম যথাক্রমে ‘শেকড়’, ‘কল্লোল যুগ’, ‘বরিশালে ফেরা’, ‘যুদ্ধকাল : প্রস্তাবনা ও ফলাফল’, ‘উপন্যাসের আরেকটি প্রয়াস’, ‘রাজনীতির কবিতা’ ও ‘মরণোত্তর জীবনানন্দ’।
‘শেকড়’ শিরোনামীয় অধ্যায়ে প্রায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে জীবনানন্দের বংশানুক্রম এবং তারই ধারাবাহিকতায় তাঁর জন্ম, শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকালের কথা। পরিবারের আর্থিক, সামাজিক ও ধার্মিক পরিবেশে কীভাবে নিজেকে তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন, কীভাবে গড়ে উঠেছিল তাঁর মন ও মানস, আছে তার বিবরণ। আছে তাঁর ভবিষ্যৎ কাব্য-জীবনের বীজ রোপিত হওয়ার কথা, তাঁর জীবনে তাঁর মাতা ও পিতার প্রভাব এবং অন্য আত্মীয়স্বজনের প্রভাবের কথাও। তাঁর মা ছিলেন সেই বিখ্যাত মা, যাঁর ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতা একসময় বাংলার ঘরে ঘরে পঠিত হতো, এখনো যে-কবিতার বাণী শিশু-কিশোরদের চরিত্র গঠন-সহায়ক, যে-কবিতার অন্তর্ভুক্তি ছাড়া ছোটদের কোনো কবিতার সংকলন সম্পূর্ণ হওয়ার নয়। সেই কবিমাতা কুসুমকুমারী দাশ তাঁর জীবনে কী পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, আছে তারো বিবরণ। জীবনানন্দের দৃষ্টিতে তাঁর কবি মা কীভাবে ধরা দিয়েছিলেন, এখানে সংক্ষেপে তার বিবরণ তুলে ধরা হচ্ছে ছেলেরই ভাষ্যে : ‘মা বেশি লেখার সুযোগ পেলেন না। খুব বড় সংসারের ভেতরে এসে পড়েছিলেন যেখানে শিক্ষা ও শিক্ষিতদের আবহ ছিল বটে, কিন্তু দিনরাতের অবিশ্রান্ত কাজের ফাঁকে সময় করে লেখা তখনকার দিনের সেই অসচ্ছল সংসারের একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়ে উঠল না আর। কবিতা লেখার চেয়ে কাজ ও সেবার সর্বাত্মকতার ভেতরে ডুবে গিয়ে তিনি ভালোই করেছেন হয়তো। তাঁর কাজকর্মের আশ্চর্য নিষ্ঠা দেখে সেই কথা মনে হলেও ভেতরের খবর বুঝতে পারিনি, কিন্তু তিনি আরও লিখলে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ কিছু দিয়ে যেতে পারতেন মনে হয়।’
নিজের মা সম্পর্কে তিনি আরো জানাচ্ছেন, ‘মার কবিতায় আশ্চর্য প্রসাদগুণ! অনেক সময় বেশ ভালো কবিতা বা গদ্য রচনা করছেন দেখতে পেতাম। সংসারের নানা কাজকর্মে খুবই ব্যস্ত আছেন এমন সময় ব্রহ্মবাদীর সম্পাদক আচার্য্য মনোমোহন চক্রবর্তী এসে বললেন এখনই ব্রহ্মবাদীর জন্য তোমার কবিতা চাই, প্রেসে পাঠাতে হয়। লোক দাঁড়িয়ে আছে। শুনে মা খাতা-কলম নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে একহাতে খুন্তি আর একহাতে কলম নাড়ছেন দেখা যেত, যেন চিঠি লিখছেন, বড়ো একটি ঠেকছে না কোথাও; আচার্য্য চক্রবর্তীকে প্রায় তখনই কবিতা দিয়ে দিলেন।’
জীবনানন্দের বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে বর্ণনা শেষে সিলি এই অধ্যায়ের ইতি টানছেন এই বলে, ‘কখনোই সমালোচকবিহীন না থাকলেও নিজ দেশ বাংলায় রবীন্দ্রনাথ পরিচিত হতেন শ্রদ্ধেয় গুরু বা শিক্ষকের মতো, গুরুদেব হিসেবে। এই শতাব্দীর (স্মর্তব্য, পোয়েট অ্যাপার্ট প্রকাশিত হয় বিংশ শতকের শেষ দশকের একেবারে গোড়ার দিকে) তৃতীয় দশকের শুরু থেকে তিনি বাঙালি শিক্ষিত সমাজের কর্তৃত্ব ধারণ করেন। এই একই দশকে বাঙালি তরুণ কবি ও লেখকদের একটা নতুন আন্দোলন গলার স্বর উঁচু করতে শুরু করে, এঁদের মধ্যে ছিলেন বেদনাদায়কভাবে লাজুক ও মুখচোরা এক ইংরেজির অধ্যাপক জীবনানন্দ দাশ।’
দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ‘কল্লোল যুগ’। এই অধ্যায়ে ক্লিন্টন বি সিলি প্রায় সবিস্তারে তুলে ধরেছেন জীবনানন্দের কবি বা সাহিত্যজীবনের ক্রমবিকাশের ধারাটিকে। এবং এই পর্যায়ে এসে ক্লিন্টন যখন বলেন, ‘সমসাময়িক হলেও নজরুল ও জীবনানন্দের মধ্যে খুব বেশি মিল ছিল না। হিন্দু (ও ব্রাহ্ম) লেখকপ্রধান কাব্যজগতে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান কবির মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সঙ্গলিপ্সু, উদ্দাম ও আত্মপ্রত্যয়ী বিদ্রোহী কবি। জীবনানন্দ এ রকম বর্ণচ্ছটা প্রদর্শন করেননি। কিন্তু নজরুলের কবিতা ছিল সংক্রামক এবং সাময়িকভাবে তা জীবনানন্দকেও সংক্রমিত করেছিল।’ তখন তাঁর পর্যবেক্ষণের পরিধি ও প্রত্যয়ে একশ ভাগ আস্থা স্থাপন না করে উপায় থাকে না। আবার সেই ক্লিন্টন বি সিলিই যখন ‘কল্লোলে’ জীবনানন্দের প্রকাশিত প্রথম ‘নীলিমা’ কবিতার সূত্র ধরে বলেন, ‘১৯২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে কল্লোল-এ যখন ‘নীলিমা’ ছাপা হয়, তখন সঠিক কবিতাটি স্পষ্টতই সঠিক ক্ষেত্র পেয়েছিল, কারণ লেখাটা বহু তরুণ কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথা কল্লোল যুগে বলেন যে কবিতাটি পড়ে তিনি এতই চমৎকৃত হন যে তিনি তৎক্ষণাৎ অপরিচিত এই কবির সঙ্গে পরিচিত হতে চলে যান।’ তখন তাঁর এমতো উচ্চারণের ভেতর দিয়ে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নজরুলের কবিতার সংক্রমণ থেকে বেরিয়ে আসছেন জীবনানন্দ এবং নিজের একান্ত কণ্ঠস্বরে চিহ্নিত হওয়ার লক্ষণাক্রান্ত হতে শুরু করেছেন। না হলে ‘নীলিমা’ কবিতা তাঁকে ঘনিষ্ঠতর করছে কেন বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমারদের সঙ্গে? তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই জীবনানন্দের সঙ্গপিপাসু হতে অতটা উদ্বেল হয়ে উঠবেন কেন? ঠিক এই ঘটনার পর, বিশেষত বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশের কাব্যসত্তার বিকাশে যে-ভূমিকা গ্রহণ ও পালন করে চলেন প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে, ক্লিন্টন বি সিলি তার বিবরণ তুলে ধরেছেন এই অধ্যায়ে অকৃপণভাবে। পাশাপাশি শনিবারের চিঠিতে সজনীকান্ত দাস তরুণতর জীবনানন্দের কাব্যপ্রয়াসকে যেভাবে, যে-ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁর রক্ষণশীল ও একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিজাত বিচার থেকে, ক্লিন্টন বি সিলির উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে তা বিচলিত না করে পারেনি। সজনীকান্ত জীবনানন্দ ও অন্য আধুনিক কবিদের রচিত কবিতাকে অভিহিত করতেন ‘গবিতা’ বলে। কিন্তু জীবনানন্দসহ ত্রিশের কবিরা যে শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীল কাব্য ও সাহিত্যবোদ্ধাদের চোখের সামনে দিয়েই নিজেদের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছিলেন, পরিবর্তিত কালের প্রেক্ষাপটে নিজেদের পৃথক সাহিত্যিক বা কাব্যিক সত্তাকে স্পষ্ট করার অভিযানে অক্লান্ত ছিলেন এবং সেক্ষেত্রে নানা বিপত্তি ও বাধা সত্ত্বেও তাঁরা যে সাফল্যের মুখ দেখছিলেন, সিলি তাঁর বইয়ের এই অধ্যায়ে তারও বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছেন। সবশেষে তিনি যে-উদাহরণ তুলে ধরেন, তাতে করে সিলির সাহিত্যিক সূক্ষ্ম বিচারক্ষমতার তারিফ না করে পারি না, যখন তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গান সরাসরি শুরু হয় : ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। জীবনানন্দের ভালোবাসার অনুভূতির প্রকাশ একই রকম আন্তরিক, কিন্তু একই সঙ্গে আমরা যা দেখি তা স্বকীয়ভাবেই জীবনানন্দীয়।’
এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায় ‘বরিশালে ফেরা’, যেখানে ঠাঁই পেয়েছে জীবনানন্দের কবিজীবনের পাশাপাশি তাঁর অন্যতর সাহিত্যিক প্রয়াসের বিবরণ। সিলি জানাচ্ছেন, এ-অধ্যায়ের সূচনাতেই, ‘১৯৩০-এর দশকের প্রথমার্ধে জীবনানন্দ নববিবাহিত ও বেকার অবস্থায় বরিশাল প্রত্যাবর্তন করেন।’ ততদিনে প্রকাশিত হয়ে গেছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক। ১৯৩০ সালের মধ্যে পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়ে গেছে তাঁর ধূসর পান্ডুলিপির (১৯৩৬) প্রায় সমুদয় কবিতা। সিলি জানাচ্ছেন, ‘এই দুই গ্রন্থের মাঝখানে তিনি বহু কবিতা ও গল্প রচনা করেন, কিন্তু সেসব ছাপতে দেননি। এমনকি একটা শিরোনামহীন অসমাপ্ত উপন্যাসও লিখেছিলেন ১৯৩৩ সালে। এসব গদ্য প্রকাশের পর জীবনানন্দের বাস্তব ভাষারীতিসিদ্ধ কথ্য বাংলা এবং জীবনঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য ভুবন আবিষ্কার করার ক্ষমতার – যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে আত্মজীবনীমূলক চরিত্রের সূক্ষ্ম ইশারার উপস্থিতিসমৃদ্ধ এক নতুন দিক উন্মোচিত হয়।’ তাঁর এসব গদ্য রচনা কোথায় এবং কোন পরিবেশে তিনি লিখছেন, তার পটভূমিই শুধু নয়, ভাষারীতি এবং বিষয়বস্ত্তর মর্মের আলোচনায়ও তিনি যে বিস্তারের সুযোগ নেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
এই অধ্যায় অধিকার করে আছে ‘বাংলাদেশকে মহিমান্বিত করে রচিত’ কবির ৬০টি সনেটের সংকলন রূপসী বাংলারও বিস্মৃত আলোচনা। গ্রন্থিত কবিতাগুলোর আলোচনা করতে গিয়ে তিনি যে মূল্যায়নে ব্রতী হন, তাকে নাকচ করে দেওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। বলা যেতে পারে, ক্লিন্টন বি সিলির এ-বক্তব্য একান্তভাবে তাঁরই বিশ্লেষণ, রূপসী বাংলার পাঠ-পরবর্তী তাঁর অনুভবসিক্ত প্রগাঢ় উচ্চারণ, যেখানে তিনি বলেন, ‘…বহিরঙ্গে যেটাই বলা হোক না কেন, জীবনানন্দের সনেটগুচ্ছ বুদ্ধিজীবীসুলভ রচনা নয়। নাড়িছেঁড়া ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বক্তব্যের ভেতর দিয়ে এগুলোর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে কোনো এক রোমান্টিকের শিশুসুলভ হূদয়ের পুনর্লব্ধ ভালোবাসার কথা। তিনি যখন এ রকম উদ্বেলিত উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে আপন মনে কথা বলেন, তখন কান পেতে শুনলে বোঝা যেত, এসব অতি ব্যক্তিগত প্রায় বক্তব্যের জন্য কবি লজ্জায় দগ্ধ হয়ে যেতেন। এ রকম একান্ত চর্চায় জীবনানন্দ পরিপূর্ণভাবে পুনর্যাপন করেন বাংলার সঙ্গে, প্রাণী-উদ্ভিদ-আকরিক গ্রামবাংলার সঙ্গে, নগরবাংলার মানবসমাজের সঙ্গে নয়।’
‘বরিশালে ফেরা’ অধ্যায়ে জীবনানন্দের প্রায় সব কবিতার বইয়ের পাশাপাশি তাঁর গদ্য-রচনা প্রয়াসের বিবরণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সেগুলোর চুম্বকাংশের উদ্ধৃতিসহ প্রাসঙ্গিক বিবরণ ও আলোচনা। ক্লিন্টন বি সিলির পঠনপাঠনের ব্যাপ্তি যে কতটা গভীর ও অনুপুঙ্খ, এ অধ্যায় থেকে তার প্রমাণ মিলবে পদে পদে।
জীবনানন্দ সম্পর্কে সুওয়াকিবহাল পাঠকমাত্রেরই একটি বিষয় জানা আছে যে, জীবনানন্দ-বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ইতিমধ্যে তাঁর ‘বনলতা সেন’ কবিতাকে মার্কিন কথাসাহিত্যিক ও কবি এডগার অ্যালান পোর ‘টু হেলেন’ কবিতার প্রায় সমূল অনুবাদ বলে ব্যাখ্যাসহ প্রতিপন্ন করার প্রয়াস চালিয়েছেন। কিন্তু মার্কিন এই গবেষক জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার দীর্ঘ আলোচনায় কোথাও এ ধরনের প্রয়াস চালাননি। ভুলেও নয়। এবং ‘টু হেলেন’ যে সিলির পড়া নেই, এ-কথা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। ফলে যাঁরা বা যেসব গবেষক ‘বনলতা সেন’কে ‘টু হেলেনে’র অনুসৃতি মাত্র বলে থাকেন, তাঁদের এই বইয়ের এ-অধ্যায়টিতে ‘বনলতা সেনে’র আলোচনা নিঃসন্দেহে চমকিত করবে।
‘যুদ্ধকাল : প্রস্তাবনা ও ফলাফল’ এ-বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বলা যেতে পারে, জীবনানন্দ সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত অধ্যায়গুলোর অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনার পটভূমিতে জীবনানন্দের জীবন ও তাঁর কাব্যকৃতির আলোচনা মুখ্য হয়ে উঠলেও এ-অধ্যায়টিতে প্রাসঙ্গিক অন্যবিধ আলোচনাও বাদ পড়েনি। যেমন, অধ্যায়ের শুরুতেই ক্লিন্টন বি সিলি বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে যে-আলোচনার সূত্রপাত করেন, তা যথার্থই শুধু নয়, জীবনানন্দ সম্পর্কে আমাদের নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে। যেমন, ‘১৯৪০-এর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও মার্কসবাদে দীক্ষা নেওয়া বাঙালি লেখকদের প্রসঙ্গ অবশ্যই বিবেচনায় আনা উচিত। আগের দশকগুলোতে সাহিত্যিকরা নিজেদের আধুনিক ও প্রথাগত ধারায় বিভক্ত বলে মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত ও আধুনিক উভয় ধারার বলে প্রমাণিত ও প্রভাবশালী ছিলেন উভয় শিবিরেই। তবে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে ১৯৪০-এর আগে মার্কসবাদ প্রভাব বিস্তার করার আগে পর্যন্ত আধুনিক ও প্রথাগত – এই দুটো ছিল সাধারণ বিভাগ, যার যে-কোনো একটিতে লেখকেরা পড়তেন। কিছু লেখক সরাসরি কমিউনিস্ট হয়ে যান, অন্যরা ছিলেন সমর্থক, তবে বাকিরা সমর্থকও ছিলেন না। লেখকদের কেউ কেউ সাহিত্যিক-রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধাচরণ করে একজোট হন, অন্যরা কোনো ধরনের রাজনৈতিক আনুগত্য থেকে মুক্ত ছিলেন। জীবনানন্দ এ ধরনের দলের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন দূরবর্তীভাবে, তবে তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক সচেতনতা প্রতিফলিত হতে থাকে আগের চেয়ে বেশি।’
সিলি এখানেই থেমে থাকেন না, তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে হাজির করেন আরো নানা উদাহরণ। এবং এসবই করেন যুদ্ধের পটভূমিতে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি জীবনানন্দের কাব্য-মানসের বিলোড়নটিকে আরো প্রত্যক্ষ করার জন্য। তিনি আবু সয়ীদ আইয়ুবের মন্তব্যও উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন, ‘আবু সয়ীদ আইয়ুব জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বলেছেন, তিনি বাংলার সবচেয়ে বিভ্রান্ত কবি। আইয়ুব তাঁর বনলতা সেন গ্রন্থের কবিতাগুলো উপভোগ করেছেন – তিনি মনে করতেন সতীর্থ কোনো কবির চেয়ে সম্ভবত জীবনানন্দের উপলব্ধি ছিল গভীরতর। কিন্তু তিনি জীবনের দর্শন নির্ধারণ করতে গিয়ে নিদারুণ ব্যর্থ হয়ে কোনো কিছু সূত্রায়িত করতে পারেননি। বনলতা সেন-এর কবিতাগুলো কবিতা হিসেবে, ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশ হিসেবে চমৎকার ছিল। আইয়ুব স্বীকার করেন, এমনকি বনলতা সেন-পরবর্তী কিছু সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণও কবিতা হিসেবে সফল। জীবনানন্দ একজন কৃষক বা ভিখারি কিংবা একটা হরিণের মৃত্যুকে একভাবে দেখা এবং একাত্ম হওয়ার ক্ষমতা ধারণ করেন। তবে আইয়ুব আবারও বলেন, যদি দর্শনটা আদৌ বোধ্য হয়, দার্শনিক কবিতাগুলো ব্যর্থ হয়, যেহেতু দর্শন ব্যর্থ।’
জীবনানন্দের জীবন ও সাহিত্যকর্মের বিচারে ক্লিন্টনের বিশ্লেষণ-প্রয়াস একপেশেমিতায় পর্যবসিত নয়। ফলে আমরা দেখি, তিনি, জীবনানন্দ যে রাজনীতির বাইরে থাকতে পারেননি, কিংবা তখনকার বাস্তবতা তাঁকে রাজনীতি-নিস্পৃহ থাকতে দেয়নি, সেটা তুলে ধরতেও তিনি কসুর করেননি। শেষ করছেন তিনি ’৪৭ সালের দেশভাগের সুগভীর মর্মবেদনা ও হাহাকার দীর্ণতা জীবনানন্দ কীভাবে তাঁর কবিতা বা কাব্যকর্মে তুলে ধরছেন, পেশ করছেন তার পরিচয়বাহী স্বাক্ষর। এবং ‘রাজনীতির কবিতা’ নামে যে-অধ্যায়টি যুক্ত করা হয়েছে এ-বইয়ে, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে নানা দৃষ্টান্ত সহযোগে তুলে ধরা হয়েছে বামপন্থী, তথা কমিউনিস্ট চক্রভুক্ত সাহিত্য-ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা এবং এসবের পরিণতি তাঁর সৃজনকর্মে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে, ক্লিন্টন বি সিলি তারও বর্ণনা দিয়েছেন সবিস্তারে। তিনি দেখিয়েছেন, জীবনানন্দের কবিস্বভাব মূলত তাঁর স্বকাল ও জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতেরই ভাষিক অনুরণন, স্রেফ রাজনীতিকেন্দ্রিক কিছু নয়।
‘উপন্যাসের আরেকটি প্রয়াস’ এ-বইয়ের এমনই একটি অধ্যায়, যেখানে জীবনানন্দের গদ্যচর্চা তথা কথাসাহিত্য, বিশেষভাবে তাঁর উপন্যাস রচনার পটভূমি ও প্রয়াসের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে তাঁর জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতজনিত নানা টানাপড়েনের কথাও।
ক্লিন্টন বি সিলি এ-বই নিজের ভূমিকায় জীবনানন্দের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন, শেষও করেছেন তাঁর মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে। সত্যি বলতে কি, জীবনানন্দকে মার্কিন তথা ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠককুলের সঙ্গে পরিচিত করাতে পোয়েট অ্যাপার্ট নামে কবির যে সাহিত্যিক-জীবনী রচনা করেন তিনি, ফারুক মঈনউদ্দীনের স্বচ্ছন্দ ও সাবলীয় অনুবাদে সম্পাদিত অনন্য জীবনানন্দ নামের সেই জীবনীই বাংলা ভাষাভাষী জীবনানন্দ-প্রেমিকদের জন্য অপরিহার্য গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। এ-গ্রন্থ যার সংগ্রহে নেই, তিনি খুবই দীন এবং দরিদ্রতমদের একজন। প্রথমা প্রকাশন এরকম একটি অমূল্য গ্রন্থ প্রকাশ করার জন্য সীমাহীন ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
এ গ্রন্থ প্রকাশ-নেপথ্যে বিশেষত সম্পাদনাগত কাজে যাঁরা ব্যাপৃত ছিলেন, তারাও সমভাবে ধন্যবাদার্হ। তাঁদের শ্রম এই গ্রন্থের জন্মকে মহিমান্বিত করেছে। দুই বাংলাতেই এ-গ্রন্থ সমভাবে পাঠকপ্রিয়তা পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং তাঁরা যে ক্লিন্টন বি সিলিকে জীবনানন্দ দাশের এরকম একটি ঋদ্ধ সাহিত্যিক-জীবনী রচনা করার জন্য কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার