বাংলাদেশে স্থাপত্যের পুরোধা

লেখক:

তানভীর নেওয়াজ

স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং বহুমাত্রিক মেধার একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি। প্রখর শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন  তিনি। প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সৎ মানুষ ছিলেন, যদিও তাঁর প্রজন্মের পক্ষে তা ব্যতিক্রমী কিছু ছিল না। সেই সময়ের অনেকের সঙ্গেই আমার জানাশোনা ছিল Ñ তাঁদের বিভিন্নজনের অর্জনের তারতম্য থাকলেও ব্যক্তিগত সততা ছিল উচ্চমানের। তাঁদের থেকে তিনি ভিন্ন ছিলেন এই অর্থে যে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে বাঙালি স্থপতি হিসেবে সমাদৃত হলেও তিনি ছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। ১৯৫০ সাল থেকে  তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ৬০ বছর ধরে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তিনি ছিলেন আমার পিতার প্রজন্মের মানুষ, তাঁর অধীনে আমি পড়াশোনা করেছি, তাঁর সঙ্গে কয়েকটি প্রকল্পে কাজও করেছি স্থপতি হিসেবে। তাঁর সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছি, কাছ থেকে মানুষটির নান্দনিক ও মানবিক দিকগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কয়েক দশক ধরে তাঁর স্থাপত্যরীতির পরিবর্তন লক্ষ করেছি। আমার জন্য সেটা ছিল বিশেষ এক সৌভাগ্যের বিষয়। তাঁর প্রজন্মের অভিজাত ব্যক্তিদের তিনি ছিলেন একজন – অন্যদের মধ্যে ছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন ও ওস্তাদ (ক্যাপ্টেন) আমিনুর রহমান – সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে – শিল্প, সংগীত, বিমানচালনা ও স্থাপত্যে পথপ্রদর্শক। বঙ্গদেশ ও বাংলাদেশের রেনেসাঁস পুরুষ ছিলেন তাঁরা।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে আমি ১৯৫০ সাল থেকে মনে করতে পারি, যখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। আমরা ১০ কে এম দাস লেনে থাকতাম। কাছেই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ১ কে এম দাস লেনে বাস করতেন। তখন ফায়জুল হক এবং আমি ছিলাম সমসাময়িক এবং বন্ধু। মাঝে মধ্যে গভীর রাতে আমাদের বসার ঘর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুর এবং উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরে আমি জেগে উঠতাম। আমার বাবা মরহুম ওস্তাদ আমিনুর রহমানের ছাত্ররা অনেক রাত পর্যন্ত গান-বাজনার চর্চা করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সেপ্টেম্বরে আমরা কলকাতা থেকে ঢাকায় আসি। আমার বাবা ছিলেন পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের প্রথম এবং দীর্ঘকালের ছাত্র এবং বীণকার ওস্তাদ দবির খানের শিষ্য। তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী এবং অতি উচ্চমানের বংশীবাদক। প্রথম থেকেই রেডিও পাকিস্তান, ঢাকার একজন ‘এ’ গ্রেড শিল্পী। রেডিওতে বাজানো ছাড়াও তিনি কয়েকজন ছাত্রকে গান এবং বংশীবাদন শেখাতেন। বিমানচালনা শিখতে তিনি ঢাকার ফ্লাইং ক্লাবে ভর্তি হন এবং পাকিস্তানের প্রথম বেসামরিক পাইলট হয়ে বের হন। ক্যাপ্টেন আমিনুর রহমান হিসেবে আমার বাবা পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের খুবই নিকট বন্ধু। ১৯৪০-এর দশকের মধ্যভাগে তাঁদের পরিচয় হয় এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।
মাজহারুল ইসলাম ছিলেন আমার বাবার শিষ্য আবদুল্লাহর চাচাতো ভাই। বাবার ছাত্র না হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময়ই তিনি আবদুল্লাহর সঙ্গে এসে সংগীতের অনুশীলনে বসে থাকতেন। ওই ক্লাসে তিনি ঘন ঘন আসতেন। সময়টি ছিল ১৯৫০ এবং ১৯৫১। সংগীতের প্রতি, বিশেষ করে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি, তাঁর আজীবন ভালোবাসা তাঁকে আবার আমার বাবার সান্নিধ্যে নিয়ে আসে এবং সেই সূত্রে ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে ওস্তাদ জহিরউদ্দীন খান ডাগর এবং ওস্তাদ ফৈয়াজুদ্দিন খান ডাগর ভ্রাতৃদ্বয়ের মতো বিশিষ্ট ধ্র“পদী শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটে। এই মহাজনদের সান্নিধ্য তাঁকে শাস্ত্রীয় সংগীতের উৎসাহী বোদ্ধায় পরিণত করে। ১৯৫০-এর দশকে আবার আমাদের দেখা হলো।  আমরা বেইলি রোডের গুলফিশানে বাস করতে শুরু করি। এই সময় আমার বাবা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রধান পাইলটের পদে নিয়োজিত ছিলেন। পঞ্চাশের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সারা বাংলাদেশে বিমানে নিয়ে যান তিনি। ইতোমধ্যে মাজহারুল ইসলাম পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সিঅ্যান্ডবি  বিভাগের  সিনিয়র স্থপতি  হয়ে  গেছেন। সে-সময় রেমন্ড ম্যাককনেল ছিলেন প্রধান স্থপতি। আমার যতদূর মনে পড়ে, এ-বিভাগটি ঢাকার সকল গণপূর্ত কাজের দায়িত্বে ছিল। মাজহারুল ইসলামের ছিল তিন সন্তান, রফিক মাজহার ইসলাম, তানভীর (তান্না) মাজহারুল ইসলাম এবং ডালিয়া মাজহারুল ইসলাম।  গুলফিশান, কাহকেশান আশিয়ানের একই চত্বরে আরো কয়েকটি পরিবার বাস করত। তাদের মধ্যে ছিল বিখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন প্রফেসর ডা. কে এস আলম, সার্জন প্রফেসর ডা. আসিরউদ্দিন এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। নানা বয়সী হলেও এসব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রফিক এবং তান্না ছিল আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট, তাঁরা আমার ছোটভাই সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট তৌফিক নেওয়াজ এবং বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ড. তৌহিদ নেওয়াজের বন্ধু। আমার ছোটভাই অধ্যাপক ড. তইমুর নেওয়াজ (বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ) তখন খুবই ছোট ছিল। আমরা সবাই পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে যেতাম এবং বিভিন্ন সময় সেখান থেকে পাশ করে বেরিয়ে আসি।
গুলফিশানে থাকার সময় (১৯৫৮-৬৩) আমি জানলাম, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির নতুন ভবন এবং কারুকলা কলেজের নকশা করেছেন, এ দুটো ছিল বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যে নতুন ধারার সূচনাকারী Ñ ঢাকার আধুনিক স্থাপত্যকলার পথপ্রদর্শক। ভবন দুটি আমাদের নতুন এক ভাষার সঙ্গে পরিচিত করে, যা আগে আমরা কখনো পাইনি। এর আগে মাজহারুল ইসলাম ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার, যিনি ভারতের শিবপুর থেকে পাশ করে সিঅ্যান্ডবি বিভাগে কাজ করতেন।  ১৯৫০-এর মধ্যভাগে, সম্ভবত ১৯৫৪ সালে, মাজহারুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের  পোর্টল্যান্ড, অরেগনে যান এবং স্থাপত্যে বি.আর্ক. (ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে, ১৯৬১ সালে মাজহারুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. আর্ক. (মাস্টার অব আর্কিটেকচার) ডিগ্রি অর্জন করেন। ইয়েলে মাজহারুল ইসলাম অধ্যয়ন করেন স্থপতি পল রুডলফের অধীনে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে আভাঁ গার্দ (ব্র“টালিজম) স্থাপত্য (অর্থাৎ ইয়েল স্কুল অব আর্কিটেকচার ভবন) ডিজাইন করছিলেন। তিনি শিকাগোর স্থপতি স্ট্যানলি টাইগারম্যান ও স্থপতি লুই আই কানের সংস্পর্শে আসেন, যাঁরা  ইয়েল  বিশ্ববিদ্যালয়ের  ক্যাম্পাস  এবং সক মেডিক্যাল গবেষণাগার ভবনের ডিজাইন করেন। এঁরা প্রত্যেকে বিভিন্ন রীতির স্থাপত্য সৃষ্টি করেন এবং গভীরভাবে প্রভাবিত করেন মাজহারুল ইসলামকে। মধ্য ষাটের দশকে স্ট্যানলি টাইগারম্যান এবং  মাজহারুল  ইসলাম  একসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে পাঁচটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ভবনের ডিজাইন করেন। মাজহারুল ইসলামকে ১৯৬০ সালের প্রথমদিকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় পরিষদ ভবন কমপ্লেক্সের ডিজাইন করতে বলা হলে তিনি প্রস্তাব করলেন যে, এই কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কান, তাঁর সঙ্গে সুইডিশ স্থপতি আলভার আলতো ও ফ্রান্সের ল্য কর্বুইজারকে আমন্ত্রণ জানানো হোক এবং জাতীয় পরিষদ ভবন কমপ্লেক্স ডিজাইন করার জন্য তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করা হোক। এভাবে স্থপতি লুই আই কানকে প্রকল্পের জন্য শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করা হয়। এর ফল হলো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবন আজ বিশ্বের কাছে আধুনিক স্থাপত্যের একটি আইকন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদ ভবন নির্মাণের জন্য এ-নির্বাচনের কৃতিত্ব বেশিরভাগই মাজহারুল ইসলামের প্রাপ্য। এটি ছিল একটি যথার্থ সিদ্ধান্ত এবং এর জন্য মাজহারুল ইসলামের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
মাজহারুল ইসলাম ১৯৬৩ সালে সিঅ্যান্ডবি ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় নিজের প্রতিষ্ঠান বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠা করলেন।
ইউএসএআইডির অধীনে এবং টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয় (কলেজ স্টেশন) সহযোগিতায় ১৯৬২ সালে সদ্য রূপান্তরিত পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ব¦বিদ্যালয়ে (বর্তমান বুয়েটে) স্থাপত্য ও পরিকল্পনার নতুন অনুষদে স্থাপত্য বিভাগ স্থাপিত হয়। বিভাগটির সূচনাকালীন শিক্ষক ছিলেন টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রিচার্ড এডউইন ভ্রুম্যান, স্থপতি ড্যানিয়েল ডানহাম (যিনি ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাপরিকল্পনা-প্রণয়ন আর লাইব্রেরি ভবন ডিজাইন করেছিলেন) এবং স্থপতি জেমস ওয়ালডেন। ১৯৬২ সালের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হওয়ার সুযোগ যাঁরা পেয়েছিলেন, সেই সৌভাগ্যবান ২৩ জনের একজন ছিলাম আমি। প্রফেসর ভ্রুম্যান স্মরণে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সাবেক ছাত্র এবং তাঁর গুণমুগ্ধরা ২০১২ সালে প্রফেসর রিচার্ড ই ভ্রুম্যান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড ফর এক্সেলেন্স ইন আর্কিটেকচার ইন বুয়েট প্রতিষ্ঠা করেন। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ স্থাপত্য ইনস্টিটিউট (আইএবি) এবং এর অনেক অ্যালামনাই ২০১২ সালের ফেব্র“য়ারিতে স্থাপত্য অনুষদ স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেন।
আমাদের সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে মাজহারুল ইসলাম আমাদের ক্লাইমেটোলজি এবং ডিজাইন পড়াতেন। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে পল রুডলফ, স্ট্যানলি টাইগারম্যান ও রিচার্ড নুয়েত্রার মতো বিখ্যাত স্থপতিকেও তিনি এখানে নিয়ে এসেছেন। জাতীয় সংসদের স্থপতি লুই আই কান প্রায়ই আমাদের বিভাগে লেকচার দিতেন। সে-সময় বেশ কয়েকজন বিদেশি স্থপতি হয় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন অথবা এখানে এসেছিলেন। স্থপতি ডক্সিয়াডিস ডিজাইন করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এবং কুমিল্লার বার্ড কমপ্লেক্স। স্থপতি পল রুডলফ ডিজাইন করেছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাপরিকল্পনা। মাজহারুল ইসলাম ডিজাইন করেছিলেন পাঁচটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং মতিঝিলে ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স বিল্ডিং। এই সময়ই, আমার মনে হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাইন করা শুরু হয়।
১৯৬৭ সালে আমি ইপিইউইটির স্থাপত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও আর্কিটেকচারাল প্রতিষ্ঠান কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স ইস্ট পাকিস্তান লিমিটেডে (পরবর্তীকালের নাম রহমান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস) যোগ দিই। প্রতিষ্ঠানটি ছিল ইঞ্জিনিয়ার মকবুলার রহমানের – তিনি ছিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সমসাময়িক এবং বন্ধু। সে-সময় মাজহারুল ইসলামকে গাজীপুরে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি প্রকল্পটির ডিজাইন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাস্তুকলাবিদের সহযোগী ছিল রহমান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। রহমান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের পক্ষ থেকে আমাকে জুনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে বাস্তুকলাবিদের সঙ্গে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
স্বাধীনতাযুদ্ধের পর মাজহারুল ইসলাম কলকাতা থেকে ফিরে আসেন এবং বাস্তুকলাবিদ পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি আমিও নয়াদিল্লি থেকে ফিরে আসি। আমি বক্সনগর, আগরতলা এবং কলকাতা হয়ে নয়াদিল্লিতে গিয়েছিলাম আমার ভগ্নিপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত কে. এম. শেহাবউদ্দিনের সঙ্গে কাজ করার জন্য। তিনি পাকিস্তান দূতাবাস থেকে ১৯৭১-এর ৬ এপ্রিল  পক্ষত্যাগ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের আগস্টে আমরা নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ মিশন প্রতিষ্ঠা করি এবং মিশনে বাংলাদেশের নতুন পতাকা উত্তোলন করি। ফিরে আসার পর দেখতে পেলাম দেশ বিধ্বস্ত। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন,  তাকে বিশাল উষ্ণ সংবর্ধনা দেওয়া হয় রেসকোর্স (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে, যেখানে তিনি ঐতিহাসিক এক উদ্দীপনামূলক ভাষণ দেন। আমি ১৯৭২ সালের মার্চে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। এরপর বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনে ভৌত পরিকল্পনা, গৃহায়ন ও অবকাঠামো বিভাগে যোগদান করি। এ সময় সরকারের পৃথক কোনো স্থাপত্য বিভাগ ছিল না। কয়েকজন স্থপতি গণপূর্ত বিভাগে কাজ করতেন। তখন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অনেক স্নাতকই বেকার ছিলেন। সময়টা ছিল পুনর্গঠনের, স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদের প্রয়োজন ছিল ব্যাপক। দেশ পুনর্গঠনের জন্য স্থপতিদের বিশেষজ্ঞতার প্রয়োজন প্রবলভাবে অনুভূত হয়। মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়। তিনি প্রস্তাব করলেন গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) কাঠামোর ভেতরেই একটি নতুন স্থাপত্য বিভাগ খোলার। এরপর আমরা একটি প্রস্তাব প্রণয়ন করি, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মি. এস ইসলাম দ্বারা অনুমোদন করিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠানো হয় প্রস্তাবটি। এভাবে রেকর্ড তিন মাস সময়ের মধ্যে একটি নতুন স্থাপত্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন বুয়েটের ৩২ জন ডিগ্রিধারী স্থপতি বেকার ছিলেন। এঁদের অনেককেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল নতুন স্থাপত্য বিভাগে। কাউকে কাউকে ডিআইটি এবং ইউডিডিতে (আরবান ডেভেলপমেন্ট অধিদপ্তর) নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এভাবে একটি নতুন যাত্রার সূচনা হয়েছিল। মাজহারুল ইসলাম এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আমি বিশ্বাস করি, এটা সম্ভব হয়েছিল এ-কারণে যে, বঙ্গবন্ধুর কাছে তিনি সহজেই যেতে পারতেন আলোচনা করার জন্য।
মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে আমার পরবর্তী যোগাযোগ হয় ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে। আমি কানাডায় গেলাম, সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি,  রেজিস্টার্ড আর্কিটেক্ট হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করেছি টরেন্টো, রেজিনা এবং অটোয়ায়। এই সময়, সত্তর, আশি এবং নব্বইয়ের দশকে ঢাকার উন্নয়নের ওপর চোখ রাখছিলাম এবং এই লক্ষণীয় উন্নয়ন সম্পর্কে নিয়মিত লেখালেখি করছিলাম।   সারাদেশ থেকে মানুষ ঢাকায় এসে ভিড় জমাচ্ছে, নগরটিকে বসবাসের জন্য কঠিন করে তুলেছে। এই সময়ের মধ্যে মাজহারুল ইসলাম তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লেক্স ডিজাইন করে ফেলেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেখার সুযোগ পেলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি আমার, যদিও এর চূড়ান্ত পরিকল্পনা কাছে থেকে দেখেছি, স্থাপত্যের ছবি থেকে এর নির্মাণ কাঠামো দেখেছি। আমি মনে করি পরিকল্পনা এবং ধারণা দুটোর সমন্বয়েই উল্লেখ করার মতো একটি ডিজাইন তৈরি হয়। তাঁর স্থাপত্যের অখণ্ডতা খুব পরিষ্কারভাবেই পরিস্ফুটিত হয়। ডিজাইন, নির্মাণ এবং উন্মুক্ততার শুদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস এবং এসবের মধ্যে সম্পর্ক ছিল পরিষ্কার। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে একটি মৌলিক নির্মাণ উপাদান ইট, ব্যবহার করেছেন পরিষ্কারভাবে নিজের ধারণাটিকে প্রকাশ করার জন্য। ইটের সঙ্গে মাটির একটি সম্পর্ক আছে। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ইটকে ব্যবহার করেছেন তাঁর তৈরি ডিজাইনের ফর্মগুলোর সঙ্গে মাটির সম্পর্ক রচনায়। তাঁর সব প্রকল্পেই তাঁর ডিজাইন আর ফর্মের শুদ্ধতা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত স্থান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোরানো চড়াই-উতরাইগুলো ব্যবহারকারীদের কাছে সময়ের ব্যবধানে জনপ্রিয়ই থেকে যাবে। এখানেই স্থপতি হিসেবে তাঁর সৃষ্টিশীলতা এবং সাফল্য নিহিত।
সবশেষে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং তাঁর স্থাপত্যকর্মের মূল্যায়ন করার প্রয়াস পাব। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশে স্থাপত্য জগতের একজন আইকন হিসেবে স্মরণীয় থাকবেন। আমার কাছে মাজহারুল ইসলাম আর স্বাধীনতা-পূর্ব এবং পরবর্তী বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্য সমার্থক। পঞ্চাশের দশকে আধুনিক স্থাপত্যকে অনাবশ্যক অলংকার হিসেবে বিবেচনা করা হতো, ভাবা হতো দেশের কোনো স্থপতির প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ভবনই ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা নির্মিত, যাঁরা মনে করতেন তাঁরা যে-কোনো ধরনের নির্মাণ কাজই করতে পারেন। মনে করা হতো, স্থাপত্য শুধু বাইরের অলংকারের মতো। মাজহারুল ইসলাম চারুকলা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ভবন দিয়ে সেই ধারণাটিকে অনেকাংশেই পালটে দিয়েছিলেন। তাঁর কাজ একটি নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে। ষাটের দশকে বুয়েটে (ইপিইউইটি) আর্কিটেকচারের ছাত্র থাকাকালীন সরকার নিয়োজিত স্থপতি থারিয়ানি এবং ভামানি যখন ঢাকায় বিভিন্ন ছদ্ম-ইসলামি স্থাপত্য ডিজাইন করছিলেন, আমরা তখন মাজহারুল ইসলামের কাজ এবং সৃষ্টির গুণমুগ্ধ, তাঁর উপাদানের ব্যবহার, স্টাইল এবং পরিকল্পনা সব সময়ই আমাদের প্রভাবিত করেছে। তিনি আমাদের আধুনিক পাশ্চাত্য স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত করেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি সবসময়ই বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
মাজহারুল ইসলাম এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন কাজ করতে হবে সংগঠিতভাবে। তিনি প্রায়ই বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত নগর এবং আঞ্চলিক পরিকল্পনা নির্মাণের কথা আলোচনা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মাস্টার প্ল্যান হতে হবে নমনীয় কিন্তু সুশৃঙ্খল। সমাজে কৃষি, ভূমি, উন্মুক্ত স্থান, দূষণহীন নদী এবং সংগঠিত নগর এলাকার কথা ভাবার এবং তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হওয়ার বহু আগে তিনি এসবের কথা ভেবেছেন। তাঁর কাছে পরিবেশগত ভারসাম্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নগর-কেন্দ্রগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার এবং বিশুদ্ধ নগর পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা, ফ্যাশনেবল হয়ে ওঠার বহু আগেই তিনি এসব ভেবেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০টিরও বেশি স্থাপত্যবিদ্যার স্কুল রয়েছে, যেগুলো থেকে প্রতি বছর চারশোর বেশি স্থপতি বেরিয়ে আসছেন। তাঁদের অনেকেই সফলভাবে কর্মে নিয়োজিত। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে স্থাপত্যকে একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব ন্যায্যতই বাংলাদেশের স্থাপত্যের পুরোধা স্থপতি মাজহারুল ইসলামের প্রাপ্য।

শেয়ার করুন

Leave a Reply