বিরিয়ানির প্যাকেটটা

লেখক:

সাদিয়া মাহ্জাবিন ইমাম
দেড় বছরের কালো কুচকুচে ছেলেটা যখন থপথপ করে পা ফেলে, কোমড়ে কালো সুতো দিয়ে বাঁধা ঘুনঘুনিটায় শব্দ হয় – টর-টর… টর… টর। মিজানের বুকের ভেতর ভয় ভয় সুখ ধরে যায়। কত সাধ্যসাধনার পর এ-সন্তান। কত মানত, মোমবাতি-শিন্নি – এমনকি একটা খাসিও মানত করা হয়েছিল। তবে এ-খাসি মানতের কথা তার বউ এখনো জানে না। না জানাই ভালো, সবার সবকিছু জানার প্রয়োজন নেই। এই যে তার মাঝে মাঝে মনে হয় এ-শহরের এমন জটিল জীবন তার নয়; কিন্তু এ-জীবনের কত কিছুই না সে এখন জানে, লাভ কী? জেনে কি ভালো আছে? তার শুধু নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। খুপরিঘরের এতটুকু জানালার বাতাস তার ফুসফুসের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না। অফিসের কাচের বাক্সের ভেতরের ঠান্ডা হাওয়াটা শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত
নামায় ঠিকই, স্বস্তি দেয় না। এর চেয়ে কত ভালো বাতাস তাদের গ্রামের বাড়ির উঠোনের পাশে লাগানো আমগাছটার নিচে। বাতাস উঠলে বাইরের উঠোনের খড়গুলো গড়াতে-গড়াতে পুকুরে গিয়ে পড়ে। তখন কেমন একটা উদাস-উদাস ভাব জাগে মনে, টের পাওয়া যায় বুকের ভেতর এক টুকরো সবুজ রং আছে। আর এ-শহর? সারাজীবন এখানে থাকতে হবে ভাবলেই অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। মানুষগুলোও অন্যরকম। কত কী যে করে আর কত কী ভাবে! গ্রামের কথা ভাবলে মিজানের অফিস থেকেই সোজা বাস ধরে চলে যেতে ইচ্ছে করে। শুধু ওই একটা রাত জীবন থেকে বাদ দিতে পারলে গ্রামই ভালো। সেই যে ভোটের পর হঠাৎ তাদের ঘরে আগুন লাগল, পুড়ে গেল পেটমোটা ধানের গোলাটা, কদিন আগেই বানানো তিনচালা নতুন টিনের বারান্দা, সঙ্গে কদিন আগে চালে তুলে দেওয়া লাউয়ের ডগাগুলোও পুড়ে ছাই হয়েছিল। তখন মাত্র সাদা কচি-কচি ফুল দেখা দিয়েছে পাতার ফাঁক দিয়ে, তাকালেই মনে হতো নতুন শিশুর দুধদাঁত উঠেছে, সে-গাছও পুড়ল। সে-ঘর নতুন করে তুলতেই তো ফসলি জমির অনেকটা বন্ধক দিয়ে টাকা ধার নিলো মিজান। শোধ তো হলোই না, বরং দ্বিগুণ হারে বাড়ল সেই ধারের সুদ।
একদিন তারা আবারো গ্রামেই ফিরে যাবে, আবার লাউয়ের জাংলা তুলে দেবে টিনের চালে। শুধু এই কুচকুচে কালো ছেলেটা লেখাপড়া শিখে বড় হলে যখন চাকরি করবে, তখন একটু-একটু করে মহাজনের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকা শোধ করতে হবে। আগে ফসলি জমি ফিরিয়ে আনবে, তারপর আবার গ্রামে গিয়ে বুকভরে ক্ষেতের বাতাস নেবে মিজান। মাটির কাছের মানুষ কি আর পারে এমন শহরে থাকতে? তার ছেলে সেদিন শহর থেকে বউ-বাচ্চা নিয়ে বাপের কাছে ঈদ করতে যাবে। নতুন গুড়ের পায়েস খাওয়াবে পুত্রবধূকে। তার আগ পর্যন্ত ছেলেকে শহরে থেকে মানুষ করাই একমাত্র কাজ। এ-স্বপ্নটাই এখন সব কষ্ট মেনে নেওয়ার খোড়াকি জোগায় তার। মিজান বুঝল প্রলুব্ধ নয়, বরং ক্লান্ত হয়ে পড়ছে নাগরিক জটিলতায়। শহুরে জীবনের এমন গল্প তার কোনোদিনও জানার আগ্রহ ছিল না। তাই বউয়েরও সবকিছু কম-কম জানাই ভালো। এ-বাজারে একটা খাসির দামের অর্ধেক টাকা বেতন পেয়ে মিজান কেমন করে সংসার চালায় তা কি তার বউ জানে? জানলেই কি! ওই মুখরা রমণীকে বশীকরণের কোনো জাদু তো মিজানের জানা নেই। তবে এই সুশ্রী মুখরা রমণীর সব খেদোক্তি-কটূক্তি সে মাথা পেতে নেয়। এ মহিলাই তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহারটা দিয়েছে।
প্রায় দিনই মিজানের অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে রাত ১০টা বেজে যায় আবার ভোরে উঠে বাস ধরে। রমণী রাতে না খেয়ে অপেক্ষা করে। ভোরে সে ঘুম থেকে ওঠার আগেই ভাতের মধ্যে দুটো আলু, কয়েকটা পটোল ফেলে সেদ্ধ করে দেয়। তারপর মিজানকে খাবার দিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন ক্যারিয়ারের একটা বাটিতে ভাত, তার ওপর একটা ভাজা ডিম দিয়ে ঢেকে দেয়। আর ঢাকনার ওপর বসানো প্লাস্টিকের বাটিতে থাকে পুঁইশাক, ডাল বা হঠাৎ কখনো একটু মাছের ঝোল। পিয়ন হলেও অফিসে তো সে ক্যান্টিনেই বসে খায়, তাই এ-ব্যবস্থা। তবে খাবার নিয়ে আক্ষেপ নেই তার, যেমন ছেলেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত বউ খুব ঘ্যান-ঘ্যান করত, একটা সাদা-কালো টিভির জন্য।
বিয়ের বছর পাঁচেক পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে একরকম উদ্বাস্ত্ত হয়ে ঢাকা আসার সময় ১০ হাজার টাকা পেয়েছিল শ্বশুরের কাছ থেকে। দুঃসময় না হলে টাকাটা হয়তো সে ফিরিয়েই দিত। তবু তো নিয়েছে, বউয়ের মুখে তার বাপের দেওয়া সে-টাকার বড়াই। কিন্তু বউকে বলতে পারেনি, ওয়াসার এক কর্মচারীর হাতে-পায়ে ধরে সে-টাকা ঘুষ দিয়েই চাকরিটা হয়েছে। সেই যে জমি হারিয়ে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বউ নিয়ে গ্রাম থেকে এসেছিল বছর দুয়েক আগে। এক আত্মীয় মেকানিকের দোকানে কাজ শিখতে দিয়েছিল। প্রতিদিন একশ টাকা করে খরচ দিত, তবে মাইনে নয়। তাতে কি আর চলে? কেমন করে যেন ছেলেটা জন্মানোর ঠিক মাসখানেকের মাথায় ওয়াসার চাকরিটা হলো। ছেলেটা তার পয়মন্ত। তবে ও হওয়ার পর আর বউ টেলিভিশনের কথা বলে না। ঘরের মধ্যে এটাই একটা জলজ্যান্ত টিভি, রেডিও। একটু একটু কথা বলা শিখছে, হাত-পা নাড়ছে। সারাদিন মায়ের পেছন-পেছন ঘুরঘুর করে। তিনটি পরিবারের যৌথ রান্নাঘরে তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে মিজানের বউ হাঁড়ি নিয়ে ঘরে ফিরলেও ছেলে চৌকিতে বসে থাকে। অন্য ভাড়াটিয়াদের ডিমভুনা বা মুরগির মাংস কসানো দেখে। ইদানীং আবার প্রশ্ন করা শিখেছে – তোতলাতে-তোতলাতে জিজ্ঞেস করে – কী নান্দো? বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়ারাও আদর করে মোমিনের হাতে এটা-ওটা ধরিয়ে দেয়। ছেলে যাতে সাচ্চা ঈমানদার হয় তাই মিজান নাম রেখেছে মোমিন।
মোমিন আর বউয়ের কথা ভাবতে-ভাবতেই মিজান বাস ধরল। এ-বাস আবার সোজা যাবে না, শহীদনগর থেকে প্রেসক্লাবের মোড়, সেখান থেকে বাস পাল্টে কারওয়ান বাজার সোনারগাঁর সামনে নামিয়ে দেবে। সোনারগাঁ হোটেল থেকে কয়েক পা হেঁটে ওয়াসার বিল্ডিং। কোনো কোনো দিন বাস বদল আর হাঁটার কারণে ওপরের বাটির ঝোল ছলকে বেরিয়ে শক্ত গিট্টু দিয়ে লাগানো নেটের ব্যাগের সঙ্গে মাখে, কাপড়েও লেগে যায়। আজো হলো। অফিস পৌঁছে প্যান্টে পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে-করতেই পাঁচ কাপ চায়ের অর্ডার। ইলেকট্রিক কেটলিতে পানি গরম বসিয়ে আগের দিনের বাসি প্লেট-গ্লাসগুলো ধুয়ে ফেলল সে। বাড়িতে নিজের প্লেটটাও সে ধোয় না; কিন্তু অফিসের প্রথম কাজ আগের রাতে এঁটো পরিষ্কার করা। ভাবতে ভাবতেই পানি গরম করে কিচেনের কাচের দেয়ালে বাষ্প জমিয়ে হুইসেল দিলো কেটলি। চা বানিয়ে স্যারদের টেবিলে- টেবিলে দিয়ে আসার সময় বুঝল, আজ অফিসে বিশেষ আয়োজন। মাথার ওপর সাদা ছাদে খোপ-খোপ করে বেলুন লাগানো হয়েছে, তার সঙ্গে আবার লেজের মতো করে ঝুলছে রঙিন ফিতা। স্যার-ম্যাডামরা মনে হলো সাজগোঁজ করেছে। মেয়েদের আঙুলে নেইলপলিশ দেখেছে সে আর চায়ের কাপে চুমুক দিলে লাল দাগ বসে যাচ্ছে ধবধবে কাপের মুখের কাছে। মুখরা বউকে একদিন গল্প করেছিল – সুইচ দিলে একটা বাক্সর ভেতর ফ্রিজের বরফশীতল খাবারও আগুনগরম হয়, আগুন ছাড়াই কেটলির ভেতর পানি টগবগ করে ফোটে। মুখ ঝামটা দিয়ে উত্তর দিয়েছে – থাউক থাউক আর অ্যাত গল্প শুনায়ো না, কিনে নি আইলি বুঝবানি কিরম জিনিস সিডা। এই এক সমস্যা, রাস্তার বড় বড় বাসের কথা বললেও বউয়ের তা একটা চাই। মুখের ওপরই বলবে – কিনে নিয়ে আসো। বোকা মহিলা কিছুই বোঝে না, কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা না হলেও চলে – পৃথিবীর সবই তার চাই। কেন যেন বারবার বউ আর মোমিনের কথা মাথায় আসছে। কিন্তু আজ যে তার ওপর দিয়ে ঝড় যাবে, সেটা অফিসে আসতেই টের পেয়েছে। বিশেষ দিন হলেই ঝামেলা বাড়ে। সারাদিন চড়কির মতো ঘুরতে হয় বাজারে আর হোটেলে। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ-পঁচিশবার সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা। এ-কাজটা করার জন্য অন্য পিয়নগুলো মুখিয়ে থাকে, কিন্তু মিজানের খুব ছোট-ছোট মনে হয়। পকেটে অন্যের না-বলা দুটো টাকা ভাবতেও কেমন মনটা ময়লা-ময়লা লাগে আর তাই বোধহয় বাইরের সব কাজ তাকেই করতে হয়। এই নিয়ম – যার যেটা ইচ্ছা করে না, তাকে সেটাই করতে হয় জীবনে। তার ওপর আজ বাতাসের হলকা আসলে সহনীয় নেই আর। শহরের গরম ঠিক সহ্য করা যায় না। বাতাস নেই, শুধু শরীরের রক্তগুলো নোনা পানি হয়ে বেরিয়ে যায়। গ্রামে ফসলের মাঠে এর চেয়েও বেশি গরমের ভেতর উদোমপিঠে মাথাইল বা গামছা মাথায় দিয়ে কাজ করা যায়। ক্ষেতের মাঝবয়সী চারাগুলোর গায়ের ওপর দিয়ে আসা পুবদিকের বাতাসটা যখন ধরে না, মনে হয় শরীর তো শরীর, ভেতরের রক্তগুলোও শীতল করে দেয়। ভরদুপুরে ক্ষেতের আইল ধরে সোজা খানিকটা এগিয়ে গেলে যে ডোবা পুকুরটা, ওতে হাত-পা ভিজিয়ে বসে কানে গুঁজে রাখা বিড়িটায় একটা টান দিলে কী যে সুখ লাগত মনে। সেই মানুষ কেমন করে দ্রুত হয়ে গেল মিজান পিয়ন।
গরমে সে আজ বাসে আসতে আসতেই একবার ঘামে ভিজে সপসপে হয়েছে। কিন্তু কোনো বাহানাই ধোপে টিকবে না। আসলে তো ‘পিয়ন’ পদবিতে ‘না’ শব্দটি নেইও। চায়ের কাপগুলো ধুয়ে পত্রিকা ফাইল করতে করতেই কো-অর্ডিনেটর সালমা ম্যাডামের গলা শোনা গেল। এই বেটি পারেও, একটা হারবজ্জাত ছোটলোক। পারলে অফিসের এঁটোকাঁটাগুলোও মহিলা বাড়ি নিয়ে যায় আর প্রতিদিন মেয়েটাকে স্কুল থেকে আনিয়ে অফিসে বসিয়ে রাখে। সততার দোষে মোটা মহিলাটা মিজানকেই সারাদিন ধরে বারবার দোকানে পাঠায়। অথচ এখন যে তার একটু বয়স হয়েছে কথাটা একবারও ভাবে না। এদিকে চ্যাংরা-চ্যাংরা পিয়নগুলো তখন এসির ভেতর বসে গেটের কাছে লাগানো টিভির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। বেশিরভাগ দুপুরেই যখন মিজান স্টার থেকে অফিসের খাবার এনে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে হাঁপিয়ে ওঠে, তখন টিভিগুলোতে বাংলা ছবি চলে, পিয়নগুলো জড়ো হয়ে থাকে ওখানে। চ্যাংরাগুলোর চাকরির মায়াও নেই, স্যাররা চা-পানি চাইলে শুনতেই পায় ১০ মিনিট পর। তবে আজকের গরমটা সত্যিই মিজানের অসহ্য ঠেকছে। কাল রাত থেকেই বারবার সে ঘেমে ভিজে-ভিজে উঠছে। মনে-মনে ঠিক করেছে, বাইরে যেতে বললে অনুরোধ করে এড়িয়ে যাবে। ঠিক এ-সময়েই সালমা ম্যাডাম তার বিশাল বপু ভুঁড়ি নিয়ে নাচতে নাচতে এসে বলল, মিজান আজ পিয়নরাও অফিসে খাবে। অর্ডার দেওয়া আছে। যাও স্টার থেকে দুশো প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আসো। প্রয়োজনে কাউকে সঙ্গে নিও। আর একবারে আনতে পারবে না, দু-তিনবার যেতে হবে।
বিরিয়ানি শব্দটা উচ্চারণ না করলে আজ তার মাথায় আকাশই ভেঙে পড়ত। চেয়ারম্যান স্যার খাওয়াবে বলে কথা, নিশ্চয়ই মাথাপ্রতি হলেও দু-এক প্যাকেট বেশিই আনা হবে। তা না হলেও অসুবিধা নেই। মিজান তো ভাত এনেছেই, ঝোলটা যদিও পড়ে গেছে; ডিমভাজা দিয়ে সে খেয়ে নেবে। কিন্তু বিরিয়ানির প্যাকেটটা সে আজ বাড়ি নেবেই। এর আগেও একদিন পেয়েছিল; কিন্তু সেদিনও এমন গরম ছিল। রাত ১০টায় খুব আশা নিয়ে ছেলের হাতে প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে টিওবয়েলে হাত-মুখ ধুতে-ধুতেই রমণীর তীক্ষ কণ্ঠস্বর – বাসি পইচা যাওয়া বিরানি আইনা ছাওয়ালরে বিরানি খাওয়ায়, কানের পর্দা ভেদ করে বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করেছিল। দ্রুত ঘরে ফিরে দেখে, বাপের জন্য বসে-থাকা ওইটুকু ছেলে বিরিয়ানির প্যাকেটটা কিছুতেই ছাড়বে না বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তাতে নাকের আর চোখের পানি এক হয়ে চলে যাচ্ছে ছেলের গালে। ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছে। সারাদিনে প্যাকেটের ভেতর পচে বিরিয়ানি থেকে একটা ভয়াবহ গন্ধে ভারি হয়ে উঠেছে বাতাস আর প্যাকেটের ঠিক মাঝখানে থাকা মুরগির বড় টুকরোটা যেন আরো লোভাতুর করার জন্যই চেয়ে আছে ছেলের মুখের দিকে। একপাশে পলিথিনের ভেতর আবার শসা, মরিচ আর পেঁয়াজও ছিল অথচ নিজে না খেয়ে সারাদিন প্যাকেটটা সে চোখে-চোখে রেখেছে।
এই ছেলে খাওয়া শেখার পর থেকে মোটা চালের ভাতই খেয়েছে। ঈদে পোলাও খেয়েই তার মুখে স্বাদ লেগেছিল। বেশ কিছুদিন ভাত মুখে দিতে চাইত না। তার মা ছেলেকে অনেক ভুলিয়ে-ভালিয়ে আবার মোটা চালের ভাতে ফেরত এনেছে। বিরিয়ানি না খেয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে ছেলে ঘুমিয়ে পরল। ঘরের অল্প পাওয়ারের আলোতে মিজান দেখেছে ছেলের গালে চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়ার দাগটা যেন একটা চিকন মরা নদী। তার ছেলেবেলায় সে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কুমার নদ দেখেছে, সেই দুধকুমারই কেমন দ্রুত শুকিয়ে হয়ে গেল একটা মরা গাঙ। ঠিক সেই কুমার নদের মতো লাগছে মোমিনের মোলায়েম গালটার ওপর বসে যাওয়া পানির দাগ। মিজানও সারারাত ঘুমাতে পারল না। নিজের অসমর্থতা, না তার ঘুনঘুনি-পরানো কালো ছেলেটির কষ্টে, বুঝে ওঠেনি। শুধু থেকে-থেকে বুকের ভেতর কেমন একটা দুঃখ হাপড় দিয়ে উঠে আসছিল।
মিজান ঠিক করেছে যেভাবেই হোক একদিন বউ আর এই ছোট শয়তানটাকে নিয়ে তারা বিরিয়ানি খেতে যাবে। ভালো একটা হোটেলে ছেলেটাকে মাঝখানে বসিয়ে অর্ডার দেবে তিন প্লেট। খেতে পারুক বা না পারুক, ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করুক, ছেলেরও আলাদা একটা প্লেট থাকবে। বিরিয়ানির সঙ্গে দুটো ঠান্ডাও নেবে। হিসাব করে দেখেছে, যাওয়া-আসা দিয়ে কমসেকম পাঁচশো টাকার হ্যাপা। শহীদনগরের ছোট দোকানগুলোতে ইচ্ছা করলেই দুশো টাকায় তিনজন খেতে পারে; কিন্তু ওইসব দোকানে রিকশাওয়ালা বা কুলিরা যায়, তাই মন ওঠে না মিজানের। যত যাই হোক, সে চাকরি করে; তার আবার একটা পরিচয়পত্রও আছে অফিসের সিল দেওয়া। এটা এ-পাড়ার সবাই জানে কারণ এ-কার্ডটা সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ই গলায় ঝুলিয়ে দেয়। কেমন মেডেল-মেডেল লাগে, লেমিনেটিং করা কার্ডটা সবুজ ফিতার মাথায় ঠিক বুকের ওপর ঝুলে থাকে। এই সেদিনও তো রাতে ডিসপেনসারি থেকে ছেলের ওষুধ কেনার সময় দোকানদার একশ টাকা বাকিতে দিয়ে বলল, যান ভাই অসুবিধা নাই, মাসপয়লা, বেতন পাইলে দিয়া দিয়েন। তা তো ওই পরিচয়পত্রের জন্যই নাকি? ওই পরিচয়পত্রের জন্যই সে ইচ্ছা করলেও মহল্লার সস্তা দোকানগুলোতে ঢুকতে পারে না।
আজ শরীরটা অনেক খারাপ লাগলেও শেষ মুহূর্তে বিরিয়ানির কথা শুনে আর সে না করতে পারল না। তবে আজ দেরি করে যাবে স্টারে। দু’দফা যাওয়া-আসার মধ্যে ব্যবধান রাখবে আধঘণ্টা। অফিসের সবার প্লেট-গ্লাস ধুতে-ধুতে টের পাচ্ছিল শরীর কাঁপছে। আসলে এ-পরিশ্রমে নিজের শরীরটাও ভেতরে-ভেতরে যে ঘুনে ধরে গেছে এতদিনে টের পাচ্ছে। তবু একটাই স্বপ্ন, ছেলেটা যেন অমানুষ না-হয়। সে যদি একটা পিয়নের চাকরি জোগাড় করতে পারে, ছেলেটা কি পারবে না অন্তত একটা কেরানি হতে? নিশ্চয়ই পারবে। আজ সালমাআপাকে অনুরোধ করে বিরিয়ানির প্যাকেটটা অফিসের ফ্রিজে রাখা গেছে। অনেকটা নিশ্চিন্ত তাতে। তবে দুপুরে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা ভাত খাওয়ার সময় সালমান, আবদুল্লাহ টিপ্পনী কেটে বলেছে, আইজও সেই ভাইত (ভাত) মিজানভাই? অতটুকু ছাওয়ালের জন্য অত পিরিত কইরো না, বড় হইলে পুছতো না বাপ-মা। মিজান শুনে মনে মনে হাসে। কী কথা মানুষের, এসব চ্যাংড়া পোলাপান কী বুঝবে একটা কুচকুচে কালো ছেলের কী জাদু!
কাজ শেষ করে বের হতে-হতে প্রায় সাতটা বেজে গেল। আজ নিশ্চয় ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়বে। সোনারগাঁ পর্যন্ত পায়ে-হাঁটা পথ মনে হচ্ছে বহুদূরের। ইটিভির বিল্ডিংয়ের সামনে চার রাস্তার মোড়। চারদিক থেকে গাড়ি আসে। মাথা ঠিক রাখা যায় না, কোনদিক থেকে যে কোনটা গায়ের ওপর এসে পড়ে? বাসটা মনে হয় ছুটেই গেল। মাসেরও শেষ, ধরতে না পারলে এতদূর পথ খুব মুশকিল হবে। ঠিক চার রাস্তার মোড়েই ঘটনাটা ঘটল। চোখের ওপর দিয়ে বাসটা চলে যেতে দেখেই সিগন্যাল পড়ার শেষ মুহূর্তে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল মিজান। বাঁ-পাশ থেকে আসা বাড্ডার বাসের শব্দটা পিচঢালা পথে বড় বেশি ঘ্যাসঘেসে শোনাল আওয়াজ। দ্রুত ব্রেক কষে ঝাঁকি দিয়ে থেমে গেল এক মুহূর্তে, হার্ড ব্রেক। তার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সে বিরিয়ানি ও মোমিনের কথাই ভাবছিল। হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরা ছিল অ্যালুমিনিয়ামের বাটি, তার ভেতর প্লাস্টিকের একটা ছোট্ট বাচ্চাবাটি আর ওপরে বসানো রয়েছে লাল কাগজের বাক্স। সে-বাক্সের মুখের ওপর লেখা ‘স্টার বিরিয়ানি হাউস’। প্লাস্টিকের একটা গোলাপি রঙের দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা বাক্সটা থেতলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল মিজানেরও আগে। সিগন্যাল পড়ায় দু-একজন পথচারী দৌড়ে আসার আগেই ছড়িয়ে-পড়া ভাত আর মাংস খুটে নিতে তীব্র স্বরে কা-কা করতে করতে উড়ে এসেছিল কতগুলো শহুরে কালো আর বাদামি রঙের কাক। এরপর আর তার কিছু মনে নেই।
মিজান নিজেকে আবিষ্কার করল একটা নোংরা তেল-চিটচিটে বিছানায়। অনেকটা সময় পার হলে বুঝল এটা হাসপাতাল। পায়ের কাছে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে – ওটা মোমিনেরই মা। আর বাঁ-পাটা মোটা প্লাস্টারে ভীষণ ভারী। আস্তে আস্তে মনে পড়ল সব। জ্ঞান ফিরেছে – দেখে – সেই মুখরা স্ত্রীলোক ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ নীরবে কাঁদল। যে-মানুষ চিৎকার না-করে কথাই বলতে পারে না, সে চিৎকার করে কেন কাঁদে না, বরং বোকার মতো তাকিয়ে-তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে, আশ্চর্য! আরো আশ্চর্য, মিজান বুঝতে পারছে যে সে বেঁচে আছে। পায়ের যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে বিরিয়ানির প্যাকেটের কথা মনে পড়ায় কষ্টটা বাড়ল। আহা রে ! পুরোটাই কি নষ্ট হলো? একটা অভুক্ত মানুষও যদি খেত তাও হতো! সবই বোধহয় শহুরে কাকেদের পেটে গেল! মোমিনের আর খাওয়া হলো না। এখন কি আর সে চাকরি করতে পারবে? তাহলে তো কোনোদিনই আর মোমিনের বিরিয়ানি খাওয়া হবে না। এমন সময় ডাক্তার আসছে ডাক্তার আসছে বলে একটা লোক ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে ঢাকা মেডিকেলের জেনারেল বেডের দিকে ছুটে এলো। রীতিমতো গালাগাল করতে করতে অতিরিক্ত দর্শনার্থীদের একরকম ঠেলে বের করল ঘর থেকে।
ঠিক একই রকম একটা ঘণ্টার শব্দ হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। নোনাধরা দেয়ালের দরজায় বসানো পুরনো কলিংবেলটা বাজা শেষে এবার দরজায় জোরে-জোরে করাঘাতের শব্দ। দুম-দুম শব্দে সম্বিত ফিরে এলো মিজানের।
তার মানে কি সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল? কিন্তু ঘটে যাওয়া ঘটনা কি মানুষ স্বপ্নে দেখে?
মাথাটা একটু থিতু হলে প্রথম যে-কথাটা মিজানের মাথায় এলো তা হলো ঠিক কত বছর আগে এ-ঘটনা ঘটেছে আর তার কত বছর পর লাগানো হয়েছিল বেলটা? মিলাতে পারছে না সে। মোমিনই কলেজে পড়ার সময় এনে লাগিয়ে দিয়েছিল, মনে পড়েছে। সুইচটার ওপর চায়ের চামচ দিয়ে অাঁচড় দিলে বোধহয় কড়া-কড়া ময়লা উঠবে। আর ভেতরে বসানো গোল বাক্স, যেটা থেকে শব্দ বেরোয়, দেখতে অনেকটা তার সে-ভাতের বাটির পেটের ভেতর বসানো ডালের বাটির মতো ছোট্ট গোল। সে-গোলটার পেটের মধ্যে আবার মাকড়সা জাল পেতেছে। শব্দ শুনে ঝিমুনি ভাবটা কেটে গেল মিজানের। তার মানে এতক্ষণ শুধু পুরনো কথাই ভাবছিল? রাত কত হয়েছে প্রথমে টের পেল না। স্মৃতি থেকে বের হয়ে আসা মিজানের মাথার ভেতর ফসলের সবুজ রং, বিরিয়ানির ঘিয়ে রং আর শহরের ধূসর সব কেমন গুলিয়ে যেতে চাইছে। ছোট বাচ্চারা পাত্রে সব রং একসঙ্গে ঢেলে তুলি দিয়ে নাড়লে যেমন হয় সেরকম।
এত রাতে কেউ একজন এসেছে। দরজা খুলতে হবে; কিন্তু তার পক্ষে এ-চেয়ার ছেড়ে উঠে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রায় দশ বছর হয়ে গেল, ঘরের এ-চেয়ারটাই বলতে গেলে তার একমাত্র আশ্রয়। সেই অ্যাক্সিডেন্টে বাঁ-পাটা থেতলেই গিয়েছিল বলা যায়। পরে কেমন শুকিয়ে যেতে শুরু করল। আস্তে আস্তে বেশ কয়েক বছর সময় নিয়ে অনেকটাই অবশ হয়ে গেল। কী ভয়াবহ দিন শুরু হলো তাদের। মোমিনের মা সেলাই মেশিন দিয়ে সারাদিন উপুর হয়ে বাচ্চাদের কাপড় সেলাই করে। সেলাইয়ের সময় দেখা যায় ব্লাউজের ভেতরের হার-জিরজিরে আকর্ষণহীন শরীর। হাত দিয়ে মেশিন ঘোরানোর সময় প্লাস্টিকের চুড়ি দুটোতে কোনো শব্দ হয় না। অথচ ওই হাতে প্রথম প্রথম সোনার চুড়ির চেয়ে মিষ্টি শব্দে রিনরিন করত কাচের চুড়ি, অন্ধকারেও চিকচিক করত কাচ। কত দ্রুত পাল্টে গেল সব। মিজানের প্রথম দিককার কথা মনে পড়ে। যখন বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে এসেছিল, তখনো খুব চটপটে ছিল মেয়েটা। সবার মুখে-মুখে কথা বলত। তবে বেয়াদবি না, লজ্জাশরম কম। তবে সেসব কথা ছিল রসের কথা। এখন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। আপনমনে নিজের কাজটা করে যায় অভিযোগহীন আর মিজান তখন কোনোমতে অফিসে ফাইল ক্লিপিং, পেপার গোছানো বা কাটিংয়ের মতো বসে থাকার কাজগুলো করত। কতবার একপা আর একটা ক্র্যাচ নিয়ে বাসে ওঠার সময় পড়ে গেল তা আর কেউ দেখল না। তাও তো বহুদিন আগের কথা। ডাক্তারের পেছনেই চলে গেল একটু একটু করে জমানো সব টাকা। দেশের বাড়ির ভিটেটুকু বাদ দিয়ে বাকি জমিটাও মহাজনের কাছে গচ্ছা রেখে একটা ছোটমতো দোকান ভারা নিল। সে-দোকানে সারাদিন বসে থাকত একটা পিচ্চিমতো ছেলেকে জোগানি নিয়ে। মোমিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাপকে বাড়ি নিয়ে আসত। তারপর খেয়েদেয়ে নিজে ঘণ্টাদুয়েক দোকান চালাত। সেই মুখরা রমণীর সেলাই মেশিন আর ছোট দোকানটা দিয়েই পার হয়ে গেল মোমিনের কলেজ পর্যন্ত। ততদিনে পুরো অবশ হয়ে গেল বাঁ-পাশটা। তখন থেকেই এ-ঘর। মাঝে মাঝে দুপুরের খাওয়ার পর ধরে ধরে এ-চেয়ারটায় বসিয়ে দেয় বউ। এখান থেকে বসেই বারান্দা দেখা যায়। সামনের রাস্তায় লোক চলাচল করলে সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। আর সেই পুরনো এক টুকরো সবুজ জমির কথা ভাবে। মোমিন বড় হতে হতে মাঝবয়সী হয়ে এসেছে প্রায়। কিন্তু সে-জমি আর ছাড়ানো হয়নি। মিজানেরও সেই ফসলের জমিতে গিয়ে কাদার ভেতর পা দিয়ে দাঁড়ানো হলো না কোনোদিন। অথচ আজো তার সেই টিনের ঘরটার চৌকাঠে বসে বাতাস খাওয়ার ইচ্ছাটা গেল না। নোনাধরা দেয়ালের পাশ কাটিয়ে ঘুনেধরা দরজার ভেতর দিয়ে দেখল হা-করা দুটো পাল্লার মুখের ভেতর বাইরের শুধুই অন্ধকার।
দরজা খোলার জন্য স্ত্রীকে খানিকক্ষণ ডাকল মিজান। বৃদ্ধা বারান্দার সে-অন্ধকারের পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। আজও তার চোখভর্তি পানি। অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলে এমন মানুষের মুখ ফুলে ওঠে। কিছু জিজ্ঞেস না করে বলল – দ্যাখো তো, কে যেন দরজায় বেল বাজাচ্ছে। মিজান তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখল, সেই মুখরা রমণী দরজা খুলতে খুব আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। আজো সেই অবুঝ আর অদ্ভুত নারী। ক্ষোভে চিৎকার করে আর কষ্টে নীরব হয়ে যায়। দরজা খুলে এসে জানাল, মোমিনের বাসা থেকে খাবার এসেছে। এখন মনে পড়ল, মিজান আসলে তার নাতনির বিয়ের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখেছে পুরনো দিনগুলো। এতবড় স্বপ্ন দেখল বহুদিন পর আর আশ্চর্য স্বপ্নটা মনেও আছে? ইদানীং তো কিছুই মনে রাখতে পারে না, ও-বেলার কথা এ-বেলা ভুলে যায়।
তার নাতনিকে আজ দেখতে আসার কথা। অনেক বড় ঘরের সম্বন্ধ এসেছে। মোমিন নিজে এসে বলে গেছে, আববা মনে কষ্ট নিয়েন না, আপনারই তো নাতি। সম্বন্ধটা অনেক বড় বাড়ির, ছেলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। আজকে দেখতে আসবে। আপনি সামনে থাকলে প্রশ্ন উঠতে পারে – মেয়ের দাদা কী করত? এর থেকে ভালোয় ভালোয় সব ঠিক হোক, বিয়ের দিন আম্মা আর আপনাকে গাড়ি দিয়ে নিয়ে যাব। মিজানও ছেলেকে বলেছে – তাই তো, তাই তো। ঠিক আছে আমাদের না যাওয়াই ভালো। মেয়ের দাদা ফসলের জমি-হারানো পিয়ন। পরিচয় আসলে দুর্বল সম্পর্ক, আগে সব ঠিকঠাক হোক।
বৃদ্ধা মহিলা এসে জানাল, মমিনের ড্রাইভার আইছে। আপনের নাতিনের কাবিন হইছে, দোয়া করতে কইছে আর খাওন পাঠাইছে। কী আশ্চর্য মোমিন যে তাকে বলেছিল দেখতে আসবে শুধু।
তাহলে মিথ্যা বলেছে। আসলে আগেই দেখাদেখি সম্পন্ন। কাবিনের দিন ঠিক হওয়ার পরই মোমিন তাকে জানাতে এসেছিল?
ড্রাইভার চলে গেলে কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা জালি দিয়ে ঢেকে বিয়েবাড়ির খাবার রেখে গেল হাতের কাছের টেবিলটায়। অনেকক্ষণ ধরে সে বাইরের অন্ধকারটার দিকে তাকিয়েছিল। ঠিক অন্ধকারও বলা যায় না। গলির মোরে লাগানো কমলা রঙের নিয়ন বাতি থেকে আসা হালকা একটা আলো পড়ে রাস্তায়। তাতে কেমন একটা ছায়া-ছায়া ভাব। সে-ছায়ার ভেতর মিজান কল্পনা করল, একটা আমগাছ আর মানুষের অবয়ব স্পষ্ট, ইচ্ছা করলে সে একটা ফসলের ক্ষেতও দেখে ফেলতে পারত ওখানে। রাত বাড়লে পাশ থেকে খাবার সরিয়ে নিতে সে ডাকতে থাকল বৃদ্ধাকে। ঘুমিয়ে পড়া দরকার, রাত অনেক। কয়েকবার ডেকে ক্লান্ত হয়ে নিজেই বাঁ-পাশটা টেনে-টেনে তোলার চেষ্টা করছে। হাতের লাঠিটা টেবিলের গলা ধরে দাঁড়ানো। হাত বাড়াতে গিয়ে অনাগ্রহ আর অভিমান নিয়ে একবার সে প্লেটের দিকে তাকাল কিংবা হয়তো চোখ পড়ে গেল। ৪০ ভোল্টের বাল্বটা অসুস্থ একটা হলুদ আলো ছড়াচ্ছে ঘরে। সেই ঘোলাটে আলোর ভেতর দিয়ে তাকিয়ে দেখল – প্লেটের ঠিক মাঝখানে মুরগির অনেক বড় একটা টুকরো তার দিকে চেয়ে আছে। আর বিরিয়ানির ভেতরের জাফরান, আলু বোখারা – জায়ফলের ঘ্রাণে একটা মাছি এসেছে। রাতের বেলা কি মাছি উড়ে? কিন্তু মিজান স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে একটা মাছি। কেন যেন মনে হচ্ছে এ-মাছিটা তার সে-ফসলের ক্ষেত থেকে উড়ে-আসা একটা নিঃসঙ্গ মাছি। মিজান টের পেল তার ছানিপড়া চোখ দিয়ে অকারণে পানি গড়াচ্ছে। চোখের অসুখ বোধহয়। মোমিনকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। দেখা হলে সে জিজ্ঞেস করত – দেখ তো, আমার চোখের পানি শুকিয়ে গেলেও কি মরা গাঙের মতো দেখায় শহুরে মোমিন? 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার